স্বতন্ত্রদের সংসদীয় যাত্রা: শোরগোলে কি হারিয়ে যাবে কণ্ঠস্বর

স্ট্রিম গ্রাফিক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য আছেন সাতজন। তাঁরা মূলত বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হয়েছেন। দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে এককভাবে প্রার্থী হওয়ার কারণে তাদেরকে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ বলা হয়। যদিও সংবিধান বা নির্বাচনি আইনে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ বলে কোনো শব্দে নেই।

স্বতন্ত্র প্রার্থীরূপে নির্বাচন করা এবং নির্বাচিত হওয়া আইনসিদ্ধ। সংবিধানের ৭০ (৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে: কোনো ব্যক্তি নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর কোনো রাজনৈতিক দলে যোগদান করলে তিনি ওই দলের মনোনীত প্রার্থীরূপে নির্বাচিত হয়েছেন বলে গণ্য হবেন। এখন প্রশ্ন হলো, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে এমপিরা সংসদে তাদের কণ্ঠস্বর কতটা জোরালো করতে পারেন?

স্বতন্ত্র সদস্য বলা হয় সংসদের সেইসব সদস্যকে যারা কোনো দলের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচিত হননি কিংবা দলীয় আনুগত্য স্বীকার করেন না। তারা দল-নিরপেক্ষ, দলীয় পরিচয়বিহীন। স্বতন্ত্র সদস্যরা নির্বাচনি এলাকার সমস্যা নিরসনের অঙ্গীকার করে নির্বাচিত হন। দলীয় প্রার্থীদের মতো তাদের কোনো দলীয় মেনিফেস্টো থাকে না। তবে তারা জাতীয় ও স্থানীয় রাজনীতি ও উন্নয়ন সম্পর্কে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করেন।

১৭ শতকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি রাজনীতিতে স্বতন্ত্র বলতে রাজার সঙ্গে সংশ্রবহীন সদস্যদের বুঝাতো। তখন দলীয় আনুগত্য ও দলের সাংগঠনিক শৃঙ্খলার নীতি এত কঠোর ছিল না। কোনো কোনো সদস্য দলনিরপেক্ষ হলেও তাদের সাধারণভাবে টোরি, উইগ বা র‍্যাডিকেল দলের সদস্য বলে মনে করা হতো। পরবর্তীকালে পার্লামেন্টারি রাজনীতিতে দলীয় ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠায় স্বতন্ত্র ও দলীয় সদস্যদের অবস্থান সুনির্দিষ্ট হয়ে পড়ে। তবে সব সময়ই স্বতন্ত্র সদস্যরা পার্লামেন্টের একটি বৈচিত্র্যপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে বিবেচিত হয়েছেন। (জালাল ফিরোজ, পার্লামেন্টারি শব্দকোষ, বাংলা একাডেমি/১৯৯৮, পৃ. ১২০)।

স্বতন্ত্র সদস্যরা পছন্দমতো বিলে, প্রস্তাবে সম্মতি বা ভোট দিতে পারেন। নিজস্ব বিবেচনা অনুযায়ী বিল, প্রস্তাব সম্পর্কে ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারেন। কোনো বড় দলের ব্যাকবেঞ্চারদের তুলনায় অধিক মনোযোগ আকর্ষণ করেন ও গুরুত্ব পান। তবে স্বতন্ত্র সদস্যদের যোগ্যতা থাকলেও মন্ত্রী হওয়া সম্ভব হয় না।

বাংলাদেশের সংসদে স্বতন্ত্র এমপিত্বের বিষয়টিকে ‘ভাওতাবাজি’ ও ‘প্রহসন’ বলে উল্লেখ করেছেন খ্যাতিমান রাজনীতিবিদ, এরশাদ সরকারের একসময়কার প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খান। আত্মজীবনীতে লিখেছেন: এই সদস্যরা কে বা কাহারা? কোনো রাজনৈতিক দলের সহিত তাহারা যুক্ত নয়। অতএব তাহাদিগকে অরাজনৈতিক বলা চলে। তাহাদের কোনো কর্মসূচিও থাকে না-থাকিতে পারে না। কারণ নির্বাচনি এলাকার অভাব অভিযোগ পূরণ করিবার কোনো ক্ষমতাই তাহার ব্যক্তিগত পর্যায়ে থাকিতে পারে না। অবশ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী হইলে সেই প্রভাব বিস্তার করিয়া কিছু কাজ করাইয়া নিতে পারে। সেই অবস্থাও বিরল ও ব্যতিক্রমী। (প্রধানমন্ত্রিত্বের নয় মাস, ঐতিহ্য/, পৃ. ২২৯) ।

যেহেতু স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা কোনো দলকে প্রতিনিধিত্ব করেন না, এবং জয়ী প্রার্থীরাও নিজেদের মধ্যে কোনো স্বতন্ত্র জোট গঠন করেন না, ফলে দলীয় প্রার্থীদের শোরগোলের ভিড়ে তাদের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যায় কি না, সেটি বড় প্রশ্ন। আবার দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বা দলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে যারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান, তাদের অনেককে দুই কুলই হারাতে হয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে যে সাত জন জয়ী হয়েছেন, তারা দল থেকে বহিষ্কৃত হলেও স্থানীয়ভাবে তথা জনগণের কাছে তাদের গুরুত্ব আছে। আর দশজন এমপির মতোই তারা সকল সুযোগ-সুবিধাও পাচ্ছেন। ফলে দল যদি তাদেরকে পুনরায় কাছে টেনে না নেয়, তাতে তাদের খুব অসুবিধা হয়তো হবে না। কিন্তু যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে হেরে গেছেন, আবার দল থেকে বহিষ্কৃতও হয়েছেন, তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় পড়লো কি না, সেটি বড় প্রশ্ন। কেননা এই তালিকায় এমনও অনেকে আছেন যারা বহু বছর ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্তই ছিলেন না, বরং আওয়ামী লীগের আমলে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নানারকম অত্যাচার নির্যাতন জেলজুলুম সহ্য করেছেন। রাজপথে সক্রিয় থেকেছেন।

তখনও এই আলোচনা উঠেছিল যে, স্বতন্ত্রভাবে জয়ী এই বিপুল সংখ্যক এমপি কি বিরোধী দলে যোগ দিয়ে সংসদকে প্রাণবন্ত করায় ভূমিকা রাখবেন? কিন্তু স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত হলেও তারা সংসদে সরকারবিরোধী অবস্থান নিতে আগ্রহী হননি। কারণ এতে দলে এবং স্থানীয় পর্যায়ে রাজনীতির মাঠে তাদের গুরুত্ব ও প্রভাব কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতো।

২০২৬-এর নির্বাচনে সংসদে যে সাত জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়েছেন তারা হলেন এ জেড এম রেজওয়ানুল হক (দিনাজপুর-৫), লুৎফর রহমান খান আজাদ (টাঙ্গাইল-৩), মোহাম্মদ সালমান ওমর (ময়মনসিংহ-১), শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল (কিশোরগঞ্জ-৫), আতিকুল আলম (কুমিল্লা-৭), মো. আবদুল হান্নান (চাঁদপুর-৪) এবং রুমিন ফারহানা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২) ।

এই সাত জনের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে নির্বাচিত রুমিন ফারহানা। একাদশ সংসদে যিনি বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সদস্য থাকা অবস্থায় সংসদে সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন। ওই সংসদে বিএনপির প্রতিনিধিত্ব খুবই সামান্য থাকলেও রুমিন ফারহানার কণ্ঠস্বরে মনে হতো যে তিনি একাই একশো। সেটি সংসদে যেমন, তেমনি সংসদের বাইরেও। বিশেষ করে টেলিভিশনের টকশোতে। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার মনোনয়ন না পাওয়া যেমন তার এলাকার মানুষকে বিস্মিত করেছে। বিএনপির নেতাকর্মীরাও হয়তো বিস্মিত হয়েছেন। কিন্তু রুমিন ফারহানা দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরেও মাঠে টিকেছিলেন এবং জয়ী হয়েছেন। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হয়েও সংসদে তিনি সুযোগ পেলেই নানা বিষয়ে নিজের মতামত তুলে ধরছেন। সম্প্রতি মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধেও তিনি সংসদে বেশ জোরালো বক্তৃতা দিয়েছেন।

নির্বাচনি জোটের রাজনীতির মারপ্যাঁচে রুমিন ফারহানার দল ছিটকে পড়ায় কার বেশি ক্ষতি হলো, তার নিজের না বিএনপির—সেটি অন্য তর্ক। তবে দলকে এটা স্বীকার করতে হবে যে, যারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে বা মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করে জয়ী হয়ে এসেছেন, তারাই তাদের নির্বাচনি এলাকার প্রকৃত প্রতিনিধি। দলের সমর্থন ছাড়াই যে তারা জয়ী হয়ে আসতে পারলেন, এটি তাদের জনপ্রিয়তা ও সক্ষমতার প্রমাণ দেয়। সুতরাং দল থেকে বহিষ্কার নয়, বরং যারা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করে জয়ী হয়ে আসতে পেরেছেন, তারা চাইলে দলের উচিত তাদেরকে দলের জন্য কাজ করতে সুযোগ দেওয়া। না হয় একসময় এই জনপ্রিয় নেতারা অন্য দলে ভিড়ে যাবেন—যেটি বিএনপির জন্য কল্যাণকর হবে না।

এক্ষেত্রে বিএনপির অবস্থান হলো এই যে, যারা নির্বাচনি জোটের হিসাব-নিকাশের কারণে দলীয় মনোনয়ন পাননি, তাদেরকে নানাভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। যেমন অনেকেই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রশাসক হয়েছেন। এমনকি আমিনুল হক নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারলেও টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রীও হয়েছেন। বিএনপির হাইকমান্ড মনে করে, যারা দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন, তারা ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়েছেন। ভোটের পরে দল সেটির মূল্যায়নের চেষ্টা করেছে। আর যারা ধৈর্য না ধরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন, তারা বিদ্রোহ করেছেন। বিদ্রোহীদের ব্যাপারে দলের কোনো সহানুভূতি নেই।

হয়তো দুপক্ষের দাবিই যৌক্তিক। কিন্তু স্বতন্ত্র এমপিদের পরিচয় একটা বড় সমস্যা। যেমন তাদেরকে সরকারি দলের সদস্য বলা যায় না, আবার স্বতন্ত্র এমপিরা বিরোধী দলেও যেতে চান না। স্মরণ করা যেতে পারে, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ৬২টি আসনে জয় পেয়েছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। যাদের মধ্যে ৫৮ জনই ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা। দলের মনোনয়ন প্রক্রিয়া থেকে ছিটকে পড়ায় তারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এত বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর স্বতন্ত্র হিসেবে জয়ী হওয়ার ঘটনা বিশ্বেই বিরল। এটি সম্ভব হয়েছিল কারণ তৎকালীন বিরোধী জোট ভোট বর্জন করায় ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ নিজেদের মধ্যে যে (আমি-ডামি) নির্বাচন করে, সেটিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক দেখানোর জন্য প্রার্থিতা উন্মুক্ত করে দেয়। আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নিজেরাই নিজেদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

তখনও এই আলোচনা উঠেছিল যে, স্বতন্ত্রভাবে জয়ী এই বিপুল সংখ্যক এমপি কি বিরোধী দলে যোগ দিয়ে সংসদকে প্রাণবন্ত করায় ভূমিকা রাখবেন? কিন্তু স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচিত হলেও তারা সংসদে সরকারবিরোধী অবস্থান নিতে আগ্রহী হননি। কারণ এতে দলে এবং স্থানীয় পর্যায়ে রাজনীতির মাঠে তাদের গুরুত্ব ও প্রভাব কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতো। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংসদে থাকলে নানাভাবে লাভবান হতে পারবেন—এই ভাবনাটাও তাদের মাথায় ছিল। যদিও দ্বাদশ সংসদের মেয়াদ ছিল খুবই কম। অভ্যুত্থানের মুখে চব্বিশের আগস্টে আওয়ামী লীগের পতন হলে দ্বাদশ সংসদের বিলুপ্তি ঘটে।

ত্রয়োদশ সংসদে যে সাত জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য আছেন, তাদের মধ্যে রুমিন ফারহানা ব্যতীত আর কারো কণ্ঠস্বর এখন পর্যন্ত জোরালো নয়। যদিও এই সংসদের প্রথম অধিবেশন এখনও শেষ হয়নি। আগামী দিনগুলোতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অন্য স্বতন্ত্র এমপিদের কণ্ঠস্বর কতটা জোরালো হয় এবং দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচিত হওয়া এই ব্যক্তিদের ব্যাপারে দল কী সিদ্ধান্ত দেয়, সেদিকে দেশবাসীর নজর থাকবে।

  • আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক

সম্পর্কিত