বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার: বাংলাদেশের জন্য জরুরি প্রয়োজন ‘বনায়ন’

এ কে এম রাশিদুল আলম
এ কে এম রাশিদুল আলম

স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের পরিবেশ আজ এক সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এদেশের বিপুল বৈচিত্রময় বনভূমি আজ জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষি সম্প্রসারণ, নগরায়ন ও সম্পদের আগ্রাসী আহরণের সম্মিলিত চাপে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়েছে। বনভূমি এখন দেশের মোট ভূখণ্ডের এগারো শতাংশেরও কম, যা অবক্ষয়ের মাত্রা স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।

বন কেবল নান্দনিক ল্যান্ডস্কেপ বা জীববৈচিত্র্যের আধার নয়; এগুলো জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করার, মাটি স্থিতিশীল রাখার, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনর্ভরণ করার এবং লাখ লাখ মানুষের জীবিকা নির্বাহের প্রাকৃতিক অবকাঠামো। জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা একটি দেশে বনায়নের মাধ্যমে বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার কোনো বিলাসিতা নয়। এটি বৈজ্ঞানিক প্রয়োজনীয়তা এবং নীতিগত আবশ্যকতা।

সরকারকে বনায়নকে কেবল বিচ্ছিন্ন বৃক্ষরোপণ অভিযান থেকে উন্নীত করে একটি জাতীয়ভাবে সমন্বিত কৌশলে রূপান্তর করতে হবে, যা তথ্য-প্রমাণভিত্তিক বিজ্ঞানের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সাথে সংগতিপূর্ণ।

বনায়নের বৈজ্ঞানিক যুক্তি অত্যন্ত জোরালো। বন কার্বন সিঙ্ক হিসেবে কাজ করে। কার্বন সিঙ্কের অর্থ হচ্ছে, বায়ুমণ্ডলীয় কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করা এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন প্রশমিত করা। বাংলাদেশে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন বারবার বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং লবণাক্ততার অনুপ্রবেশের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, সেখানে বনায়ন একটি প্রাকৃতিক বাফার বা ঢাল হিসেবে কাজ করে। উদাহরণ হিসেবে উপকূলীয় বেল্টে ম্যানগ্রোভ বানানের কথা বলা যায়। ঘূর্ণিঝড়ের বিরুদ্ধে তারা উল্লেখযোগ্য স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে। এতে প্রাণহানি এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি উভয়ই হ্রাস পেয়েছে। একইভাবে, বনায়ন নদীর পাড়কে স্থিতিশীল করে, ক্ষয় রোধ করে এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বৃদ্ধি করে, যার ফলে এটি জলতাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণে অবদান রাখে।

জলবায়ু ও পানির বাইরেও বন জীববৈচিত্র্যের করিডোর হিসেবে কাজ করে, যা বিপন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল পুনরুদ্ধার করে। দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণ, বিশেষ করে মধ্য সমতলে শাল এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাহাড়ি বনগুলো পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য অপরিহার্য। গাছের আচ্ছাদনের নিচে মাটির উর্বরতাও বৃদ্ধি পায়, কারণ ঝরা পাতার জৈব পদার্থ পুষ্টি চক্রকে সমৃদ্ধ করে। সুতরাং, বনায়ন হচ্ছে বহুমাত্রিক পরিবেশগত সমাধান।

একটি নীতিগত কাঠামো দীর্ঘকাল ধরেই আছে বটে, তবে সেগুলোর বাস্তবায়ন ঠিকমতো হয় না। বাংলাদেশের ‘ন্যাশনাল রেড প্লাস স্ট্র্যাটেজি’ বন উজাড়জনিত কার্বন নির্গমন কমানোর পাশাপাশি কার্বন মজুত বাড়ানোর একটি রূপরেখা প্রদান করেছিল। আবার জলাভূমিতে সম্প্রদায়-চালিত বাস্তুতন্ত্র ব্যবস্থাপনা প্রকল্পগুলো অংশগ্রহণমূলক সংরক্ষণের সম্ভাবনা দেখিয়েছে। তবে বনায়নকে প্রায়ই গ্রামীণ উন্নয়ন, কৃষি পরিকল্পনা এবং জাতীয় অবকাঠামো প্রকল্পের সাথে সমন্বিত করার বদলে একটি বিচ্ছিন্ন কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

তদারকি ব্যবস্থা দুর্বল ছিল। বৃক্ষরোপণ অভিযানগুলোকে মূল্যায়ন করা হতো কতগুলো চারা রোপন করা হয়ছে তা দিয়ে। অথচ মূল্যায়ণ করার কথা ছিল কতগুলো বেঁচে আছে কিংবা পরিবেশের ওপর তাদের প্রভাব কী, তা দিয়ে। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপকে আরও ব্যাহত করেছে। এখন যা প্রয়োজন তা হলো খণ্ডিত উদ্যোগ থেকে একটি সামগ্রিক জাতীয় কৌশলে পরিবর্তন।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বে নবনির্বাচিত সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পাঁচ বছরের মধ্যে পঁচিশ বিলিয়ন (২,৫০০ কোটি) গাছ লাগানোর অঙ্গীকার করেছে। এটি এমন একটি রূপকল্প যা জাতিসংঘের ‘বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার দশক (২০২১-২০৩০)’ এবং আইইউসিএন কমিশন অন ইকোসিস্টেম ম্যানেজমেন্টের মানদণ্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই অঙ্গীকার যদি বৈজ্ঞানিক সূক্ষ্মতা এবং অংশগ্রহণমূলক শাসনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বাংলাদেশকে জীববৈচিত্র পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে উন্নয়নের একটি বৈশ্বিক মডেলে পরিণত করতে পারে।

জাতিসংঘের ‘বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার দশক’ দেশগুলোকে বাস্তুতন্ত্রের অবক্ষয় প্রতিরোধ, বন্ধ এবং বিপরীতমুখী করার আহ্বান জানিয়েছে, যেখানে জোর দেওয়া হয়েছে যে স্বাস্থ্যকর বাস্তুতন্ত্র উর্বর মাটি, সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য এবং অধিকতর কার্বন সঞ্চয় নিশ্চিত করে।

একইভাবে আইইউসিএন কমিশন অন ইকোসিস্টেম ম্যানেজমেন্ট জোর দিয়ে বলেছে যে, জীবিকা ও পরিবেশগত স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করতে জীববৈচিত্র পুনরুদ্ধারকে অবশ্যই উন্নয়ন কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাই বাংলাদেশের বনায়ন অভিযানকে এই বৈশ্বিক গতির মধ্যে স্থাপন করতে হবে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে স্থানীয় বাস্তবতার উপযোগী কৌশল গ্রহণ করা হবে।

জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে সমন্বয় সাধন করা আরেকটি অগ্রাধিকার। বনায়নকে অবশ্যই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), বিশেষ করে জলবায়ু কার্যক্রমবিষয়ক লক্ষ্য ১৩ এবং স্থলজ জীবনবিষয়ক লক্ষ্য ১৫-এর সাথে সংগতিপূর্ণ হতে হবে। মহাসড়ক হোক বা শিল্পাঞ্চল, অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে ক্ষতিপূরণমূলক বনায়ন অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নগর পরিকল্পনায় গ্রিন বেল্ট বা সবুজ বলয় এবং শহরতলীর বনকেও গ্রহণ করতে হবে। স্বীকার করতে হবে যে, পরিবেশগত স্থিতিস্থাপকতা গ্রামীণ এলাকার মতো শহরগুলোর জন্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে জীববৈচিত্র্য হ্রাসের কারণগুলো সক্রিয় এবং নিষ্ক্রিয় উভয় প্রকারের। সক্রিয় কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে বন উজাড় করা, বনজ সম্পদের অতি-আহরণ, কৃষি জমি দখল এবং অবকাঠামো উন্নয়ন। নিষ্ক্রিয় কারণগুলো খুবই সূক্ষ্ম কিন্তু ধ্বংসাত্মক। কারণগুলো হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং আবাসস্থলের খণ্ডবিখণ্ডতা।

জনসংখ্যার উচ্চ ঘনত্ব এবং ভূমির অসম বণ্টন এই চাপগুলোকে আরও বাড়িয়ে তোলে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা এবং অভিবাসন বন উজাড়কে ত্বরান্বিত করে। এর সম্মিলিত প্রভাবে প্রাকৃতিক বনগুলো খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়েছে।

এসব সমস্যা সমাধানের জন্য কেবল বনায়নই যথেষ্ট নয়। একটি সামগ্রিক কৌশলের প্রয়োজন যা জলাভূমি সংরক্ষণ, ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার এবং টেকসই কৃষিকে একীভূত করবে।

বনানয়নের লক্ষ্যগুলো অর্জনের জন্য নতুন সরকারের একটি সুগঠিত এবং তথ্য-প্রমাণভিত্তিক পরিকল্পনা দরকার। প্রথম পদক্ষেপ হতে হবে সম্ভাব্য বৃক্ষরোপণ এলাকার বায়োফিজিক্যাল অবস্থার ব্যাপকভিত্তিক জরিপ, যার মাধ্যমে মাটির উর্বরতা, জলতত্ত্ব এবং জীববৈচিত্র্যের করিডোরগুলো মানচিত্রভুক্ত করা হবে। এই ধরনের তথ্য ছাড়া বনায়ন সত্যিকার অর্থে কার্যকর হবে না। বরং প্রতীকী হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। দ্বিতীয় পদক্ষেপ হলো প্রজাতির নির্বাচন, যেখানে পরিবেশগত এবং আর্থ-সামাজিক প্রয়োজনের সাথে মিল রেখে গাছ নির্বাচন করতে হবে। ওষধি গাছ কমিউনিটির স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়তা করতে পারে, কাষ্ঠল প্রজাতি টেকসই নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহ করতে পারে, ফলদ গাছ পুষ্টি ও জীবিকা বৃদ্ধি করতে পারে এবং শোভাবর্ধক গাছ শহর ও শহরতলীর সৌন্দর্য বাড়াতে পারে।

রাঙামাটি জেলার লংগদু উপজেলার মাইনি মুখ রেস্ট হাউসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে বকুল গাছের চারাটি রোপণ করেছিলেন, সেটি চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের অধীনে এখনও জীবিত আছে। ছবি: লেখক
রাঙামাটি জেলার লংগদু উপজেলার মাইনি মুখ রেস্ট হাউসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে বকুল গাছের চারাটি রোপণ করেছিলেন, সেটি চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের অধীনে এখনও জীবিত আছে। ছবি: লেখক

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, পরিবেশগত অখণ্ডতা নিশ্চিত করতে দেশীয় এবং জলবায়ু-সহনশীল প্রজাতিগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এরপর আসবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে স্থান প্রস্তুত করা, যেখানে চারা বেঁচে থাকার হার সর্বোচ্চ করতে মাটির কন্ডিশনিং, পানি ব্যবস্থাপনা এবং ক্ষয় নিয়ন্ত্রণ কৌশল অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এরপর অংশগ্রহণমূলক সংহতিকরণের মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, এনজিও এবং বেসরকারি অংশীদারদের সম্পৃক্ত করা হবে।

বনায়ন কেবল উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া নির্দেশের মাধ্যমে সফল হতে পারে না। এটি সেইসব জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে লালিত হতে হবে যারা তাদের জীবিকার জন্য বনের ওপর নির্ভরশীল। সুবিধা-বণ্টন প্রক্রিয়া, ক্ষুদ্রঋণের সুযোগ এবং অ-কাষ্ঠল বনজ সম্পদের অধিকার স্থানীয় দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারে, যা জনগণকে বনের শোষকের পরিবর্তে রক্ষকে পরিণত করবে। রোপণ-পরবর্তী যত্ন এবং তদারকিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহ্যগত প্রতিবেদন ব্যবস্থা, যা প্রায়শই কেবল রোপণ করা চারার সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তা অপর্যাপ্ত। এর পরিবর্তে, জিআইএস-ভিত্তিক বন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত, যা বনের আচ্ছাদন, প্রজাতির বৈচিত্র্য এবং কার্বন পৃথকীকরণের রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং সক্ষম করবে। বনায়নের ফলাফলের ওপর বার্ষিক প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক করতে হবে, যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। নীতি মূল্যায়নে বৈজ্ঞানিক কঠোরতা বজায় রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন মূল্যায়নের জন্য সম্পৃক্ত করা উচিত।

এমন একটি উচ্চাভিলাষী কর্মসূচির অর্থায়নের জন্য উদ্ভাবনী চিন্তার প্রয়োজন হবে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন ব্যবস্থা, যেমন গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি, ইউএনডিপি এবং গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড সম্পদ সংগ্রহের সুযোগ দেয়। বাংলাদেশ তার শক্তিশালী জলবায়ু ঝুঁকির প্রোফাইল নিয়ে এই ধরনের তহবিল ব্যবহারের জন্য ভালো অবস্থানে রয়েছে।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বও একটি ভূমিকা পালন করতে পারে, বিশেষ করে বড় আকারের বৃক্ষরোপণ অভিযানে। কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি উদ্যোগগুলোকে বনায়নের দিকে পরিচালিত করা উচিত, যা বেসরকারি পুঁজিকে জনকল্যাণমূলক পরিবেশগত সম্পদে রূপান্তরিত করবে। উদ্ভাবনী অর্থায়ন ব্যবস্থা, যেমন বাস্তুতন্ত্রের জন্য অর্থ প্রদান, জনগণকে বনের পরিবেশগত সুবিধার বিনিময়ে পুরস্কৃত করে বন সংরক্ষণে উৎসাহিত করতে পারে।

কেস স্টাডিগুলো সাফল্য এবং চ্যালেঞ্জ উভয়ই তুলে ধরে। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার দেখিয়েছে, কীভাবে বনায়ন ঘূর্ণিঝড় এবং লবণাক্ততার বিরুদ্ধে স্থিতিস্থাপকতা তৈরি করতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামে সামাজিক বনায়ন স্থানীয় নেতৃত্বের ক্ষমতা দেখিয়েছে। তবুও চ্যালেঞ্জগুলো রয়েই গেছে। কৃষি ও নগরায়নের প্রতিযোগিতামূলক চাহিদার কারণে জমির অভাব বনায়নের জায়গাকে সীমিত করেছে। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কাজের ওভারল্যাপিংয়ের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় দুর্বল। আর্থ-সামাজিক চাপ, বিশেষ করে দারিদ্র্য, বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে দেয়, যার ফলে অতি-আহরণের ঝুঁকি তৈরি হয়। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করার জন্য কেবল পরিবেশ বিজ্ঞানই নয়, বরং আর্থ-সামাজিক নীতিগত উদ্ভাবনও প্রয়োজন। বিএনপির জাতীয় উন্নয়ন এজেন্ডার মধ্যে জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যমাত্রা অন্তর্ভুক্ত করে, আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে, আইইউসিএন-সিইএম মানদণ্ড গ্রহণ করে এবং তদারকি ও স্বচ্ছতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে বাংলাদেশ এই বাধাগুলো অতিক্রম করতে পারে।

তাই সরকারকে বহুমুখী পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। প্রথমত, বনায়নকে একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে উন্নীত করতে হবে এবং উন্নয়নের সকল খাতের সাথে একে একীভূত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রজাতি নির্বাচন, জোনেশন এবং তদারকির ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদি অনুসরণ করতে হবে। তৃতীয়ত, জনগোষ্ঠীকে সহ-ব্যবস্থাপক হিসেবে ক্ষমতায়ন করতে হবে এবং তাদের জন্য স্পষ্ট প্রণোদনা ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক তহবিল এবং বেসরকারি পুঁজি ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থায়নের উৎস বহুমুখী করতে হবে। পঞ্চমত, বনায়নের মাধ্যমে বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার তদারকি করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় শক্তিশালী করতে হবে। পরিশেষে, বনায়নকে কেবল একটি পরিবেশগত হস্তক্ষেপ হিসেবে নয়, বরং জাতীয় স্থিতিস্থাপকতা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক সমতার একটি স্তম্ভ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে।

বাংলাদেশের পরিবেশগত ভবিষ্যৎ আজকের নেওয়া সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। বনায়ন কোনো জাদুকরী সমাধান নয়, তবে এটি এমন একটি ভিত্তি যার ওপর ভিত্তি করে ব্যাপক বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার সম্ভব। বৈজ্ঞানিক প্রমাণের সাথে শক্তিশালী নীতিগত কাঠামোর সমন্বয় ঘটিয়ে নবনির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার অবক্ষয়িত ল্যান্ডস্কেপকে স্থিতিস্থাপক বাস্তুতন্ত্রে রূপান্তরিত করতে পারে। এই ধরনের রূপান্তর কেবল জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমিত করবে না, বরং জীবিকা নিশ্চিত করবে, খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধি করবে এবং জাতীয় স্থিতিস্থাপকতা শক্তিশালী করবে।

এর মাধ্যমে বাংলাদেশ কেবল তার বন পুনরুদ্ধার করবে না; এটি তার পরিবেশগত পরিচয় পুনরুদ্ধার করবে এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতি তার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করবে। পঁচিশ বিলিয়ন গাছ লাগানোর বিএনপির অঙ্গীকারকে তাই একটি জাতীয় আবশ্যকতা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, যা উন্নয়নকে প্রকৃতির বিনিময়ে প্রবৃদ্ধি হিসেবে নয়, বরং পরিবেশগত পুনর্নবীকরণের মাধ্যমে সমৃদ্ধি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে। বিচ্ছিন্ন বৃক্ষরোপণ অভিযানের সময় শেষ হয়েছে। এখন প্রয়োজন একটি জাতীয়ভাবে সমন্বিত বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার কৌশল, যা বনকে জাতির বেঁচে থাকা এবং সমৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য একটি জীবন্ত অবকাঠামো হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

সরকারকে দ্রুত ও সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে, কারণ পদক্ষেপ না নেওয়ার মাশুল কেবল বর্তমান প্রজন্ম নয়, বরং আগামী প্রজন্মগুলোকেও দিতে হবে।

  • অধ্যাপক ড. এ কে এম রাশিদুল আলম: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস বিভাগের চেয়ারম্যান

সম্পর্কিত