শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

ঢাকার বাণিজ্যিক ভবনগুলোর চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। একই ভবনে রেস্তোরাঁ কিংবা পোশাকের ব্র্যান্ডের ঠিক পাশের তলাতেই এখন দেখা মিলছে অত্যাধুনিক লেজার এসথেটিক ক্লিনিকের। গত দুই দশকে সৌন্দর্য চিকিৎসা সীমিত পরিসর ছাড়িয়ে শহুরে জীবনের এক নিয়মিত অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। একসময় যা ছিল কেবল উচ্চবিত্তের বিলাসিতা, তা এখন মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও তরুণ পেশাজীবীদের কাছেও সহজলভ্য। তবে এই রূপান্তর শুধু সামাজিক প্রবণতার ফল নয়, এর পেছনে রয়েছে শক্তিশালী এক অর্থনৈতিক বাস্তবতা, যা আমাদের চেনা অর্থনীতির অনেক পুরোনো প্রশ্নকেই নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।
বাংলাদেশের সৌন্দর্য ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা বাজারের আকার এখন প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা, যা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৮০০ থেকে ৮২৫ মিলিয়ন ডলারের সমান। এই বাজার মূলত তিনটি প্রধান খাতে বিভক্ত। সবচেয়ে বড় অংশটি হলো প্রসাধনী ও ত্বক পরিচর্যা পণ্যের খুচরা বিক্রি। ক্রিম, সিরাম, সানস্ক্রিন, মেকআপ ও চুলের যত্নের পণ্য দেশীয় উৎপাদন এবং আমদানির মাধ্যমে সুপারশপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দেদার বিক্রি হচ্ছে। বাজার পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালে শুধু ত্বক পরিচর্যা পণ্যের বাজারই ১৬ কোটি ৬৬ লাখ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা পুরো খাতের শক্ত ভিতের ইঙ্গিত দেয়। এর পরেই রয়েছে পার্লার ও সেলুন সেবা, যেখানে হাজারো ছোট-বড় প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত অবদান বাজারকে বিস্তৃত করেছে।
তবে সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে চিকিৎসাভিত্তিক এসথেটিক সেবা। বোটক্স, ফিলার, লেজার থেরাপি, পিআরপি ও থ্রেড লিফটের মতো সেবার বাজার এখন প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার, যা মোট বাজারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। একটি ক্লিনিকে বোটক্সের একেকটি সেশনের খরচ ৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। আর বোটক্স, ফিলার ও থ্রেড লিফট মিলিয়ে পূর্ণ মুখের চিকিৎসায় লাগে ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা, যার কার্যকারিতা সাধারণত ৪ থেকে ৬ মাস স্থায়ী হয়। ফলে একই গ্রাহককে নিয়মিত এই সেবা নিতে হয়। একটি মাঝারি ক্লিনিক মাসে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি সেবা দিলেই বছরে আয় করে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকা। চেইন ক্লিনিকগুলোর আয় এর কয়েক গুণ বেশি। দেশে এক থেকে দুই হাজার সক্রিয় সেবাকেন্দ্র হিসাব করলে এই উপখাতের বাজার দেড়শ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো অবাস্তব নয়।
এখানেই একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে মাথায় আসে। যে দেশের মানুষ এখনো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য হাসপাতালের বারান্দায় লাইন দেয়, সেই দেশে সৌন্দর্য চিকিৎসার বাজার এত দ্রুত বাড়ছে কীভাবে? উত্তরটা আসলে দুই স্তরের। এক স্তরে আছে ভোক্তার মনস্তত্ত্ব, চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা, বিয়ের বাজার, সামাজিক মাধ্যমের তুলনামূলক সংস্কৃতি, এসব মিলিয়ে চেহারা এখন এক ধরনের সামাজিক পুঁজিতে রূপান্তরিত হয়েছে। আরেক স্তরে আছে সরবরাহের অর্থনীতি। প্রযুক্তি সস্তা হয়েছে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক বেড়েছে, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই সেবা এখন আর কেবল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় না। চাহিদা আর সরবরাহ যখন একসঙ্গে বাড়ে, তখন বাজার এভাবেই লাফিয়ে বাড়ে।
ঢাকার আধুনিক পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোতে এখন একাধিক শাখায় শতাধিক চিকিৎসক ও থেরাপিস্ট কাজ করছেন, যাদের একটি বড় অংশ নারী। ২০০৪ সালে দেশে লেজারভিত্তিক এসথেটিক চিকিৎসার যাত্রা শুরু হয়েছিল কেবল দাগ বা তিল অপসারণ এবং হেয়ার রিমুভালের মতো সেবায়। এখন সেখানে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক লেজার প্রযুক্তির মতো আধুনিক সেবা। ফলে এই খাতটি শুধু প্রযুক্তিতেই এগোচ্ছে না, নারীর কর্মসংস্থানেরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে বাড়ছে বিদেশি বিনিয়োগ। সম্প্রতি তুরস্কভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রসাধনী অস্ত্রোপচার হাসপাতাল চালু করেছে, যা দেশীয় বাজারে প্রযুক্তি ও দক্ষতার নতুন গতি আনছে।
এই খাতের অর্থনৈতিক প্রভাব বোঝার জন্য একটু বড় ক্যানভাসে তাকানো দরকার। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে চার থেকে আট লাখ মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান, আর এই বহির্গমনের পেছনে খরচ হয় বছরে চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ প্রধানত ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীন, ইরান ও তুরস্কের মতো দেশে ব্যয় হয়। এর একটা অংশ অবশ্যই জটিল রোগের চিকিৎসা, হৃদরোগ, ক্যানসার বা কিডনির সমস্যা, যেখানে দেশীয় সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সত্যিকারের বাধা। কিন্তু এই বিশাল বহির্গমনের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে আছে প্রসাধনী চিকিৎসা, দন্ত চিকিৎসা আর ওয়েলনেস সেবা, যেগুলো তুলনামূলক কম জটিল, অথচ আস্থার অভাবে মানুষ দেশ ছেড়ে যান। এখানেই এসথেটিক মেডিসিনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিছুদিন আগেও বোটক্স বা ফিলারের মতো চিকিৎসার জন্য উচ্চবিত্তদের থাইল্যান্ড বা ভারতে যেতে হতো। এখন তাদের অনেকেই একই মানের সেবা দেশেই নিচ্ছেন। অর্থনীতির ভাষায় এটি আমদানি প্রতিস্থাপনের একটি বাস্তব উদাহরণ। এতে চিকিৎসা ব্যয়ের অর্থ দেশের ভেতরেই থাকছে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো, দেশের ভেতরে গড়ে ওঠা এই দেড়শ মিলিয়ন ডলারের এসথেটিক বাজার কি সেই চার-পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বহির্গমনের একটা অংশ ঠেকিয়ে দিতে পারবে? উত্তরটা সরল হ্যাঁ বা না নয়। প্রসাধনী ও নন-ইনভেসিভ সেবার ক্ষেত্রে দেশীয় বাজার ইতিমধ্যে বড় অংশ ধরে রাখছে, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহরে। কিন্তু জটিল অস্ত্রোপচার বা উচ্চমাত্রার কসমেটিক সার্জারির ক্ষেত্রে এখনো আস্থার ঘাটতি প্রকট।
বৈশ্বিক এসথেটিক মেডিসিন বাজারে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে এবং ইউরোপের বাজার স্থিতিশীল হলেও, সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল। চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও থাইল্যান্ডে মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধি এবং মেডিক্যাল ট্যুরিজম এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ড ইতোমধ্যে এ খাতকে বড় শিল্পে পরিণত করেছে। তুরস্ক চুল প্রতিস্থাপন চিকিৎসায় বিশ্বনেতা, আর ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও তুলনামূলক কম খরচে উন্নত চিকিৎসা দিয়ে লাখো বিদেশি রোগী আকর্ষণ করছে। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, সঠিক নীতিমালা, দক্ষ জনবল ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এই বাজারকে অল্প সময়েই রপ্তানিমুখী সেবা শিল্পে রূপান্তর করা সম্ভব।
এই খাতের বিস্তারে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রচারণা এবং বিফোর-আফটার ছবি তরুণদের মধ্যে এসথেটিক চিকিৎসার গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। তবে এর একটি নেতিবাচক দিকও আছে। ডিজিটাল ফিল্টারে তৈরি নিখুঁত সৌন্দর্যের অবাস্তব ধারণা অনেকের মধ্যে নিজের চেহারা নিয়ে হীনম্মন্যতা ও উদ্বেগ তৈরি করছে। তবে এর উল্টো পিঠে, অনেকেই সচেতন সিদ্ধান্ত নিয়েই এসব চিকিৎসা নিচ্ছেন, যা কর্মক্ষেত্রে ও ব্যক্তিগত জীবনে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাহলে সৌন্দর্য চিকিৎসা কি আসলে ক্ষমতায়নের হাতিয়ার, নাকি এক নতুন ধরনের সামাজিক চাপের ফাঁদ? বাস্তবতা হলো, দুটোই সত্যি, আর সেটা নির্ভর করে ব্যক্তির সিদ্ধান্তটা আসছে কোথা থেকে, নিজের ইচ্ছা থেকে না তুলনার তাড়না থেকে।
সম্ভাবনার পাশাপাশি এই খাতে ঝুঁকিও কম নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাব। বোটক্স বা ডার্মাল ফিলারের মতো ইনজেকশনভিত্তিক চিকিৎসা অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত। কিন্তু এ খাতের জন্য এখনও স্বতন্ত্র লাইসেন্সিং ও কঠোর তদারকি ব্যবস্থা নেই। ফলে ব্যবহৃত ওষুধের মান বা সেবাদাতার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। প্রশিক্ষণহীন কর্মী দ্বারা এসব সেবা দেওয়ার ফলে ত্বকের ক্ষতি থেকে শুরু করে অন্ধত্বের মতো গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাহলে সরকার কি চুপচাপ বসে থাকবে, নাকি এই খাতকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনবে? এখানেই আসলে নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। ওষুধ ও কসমেটিকস আইনের অধীনে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ইতিমধ্যে বিভিন্ন লাইসেন্সিং কাঠামো তৈরি করছে, কিন্তু এসথেটিক ও কসমেটিক চিকিৎসার জন্য পৃথক স্বীকৃত মানদণ্ড এখনো গড়ে ওঠেনি। এই ফাঁক পূরণ না হলে গ্রাহকের নিরাপত্তা ঝুঁকিতেই থেকে যাবে।
এছাড়া এই খাতের বড় অংশ এখনও করজালের বাইরে থাকায় রাষ্ট্র রাজস্ব হারাচ্ছে। চিকিৎসাশিক্ষায় এসথেটিক মেডিসিনকে স্বীকৃত বিশেষায়িত শাখা হিসেবে গুরুত্ব না দেওয়ায় দক্ষ জনবল তৈরির পথও সীমিত। উপরন্তু, যন্ত্রপাতি ও ইনজেক্টেবল উপকরণের উচ্চ আমদানিনির্ভরতার কারণে প্রকৃত দেশীয় মূল্য সংযোজন কতটা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও রয়ে যায়।
সৌন্দর্য চিকিৎসার এই ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি আমাদের সামনে এক দ্বৈত বাস্তবতা তুলে ধরছে। একদিকে এটি সামাজিক প্রতিযোগিতার প্রতিফলন, অন্যদিকে কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি বিনিয়োগ ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের এক অপার সম্ভাবনাময় খাত। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার এই উদীয়মান বাজারকে অবহেলা করার সুযোগ নেই, বিশেষত যখন পাশাপাশি প্রতি বছর চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার চিকিৎসা ব্যয়ে দেশ ছেড়ে যাচ্ছে। সমন্বিত মানসনদ, কঠোর লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এবং কার্যকর কর কাঠামোর আওতায় আনা গেলে এটি কেবল অভ্যন্তরীণ চাহিদাই পূরণ করবে না, ভবিষ্যতে একটি সাশ্রয়ী আঞ্চলিক সেবা শিল্প হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

ঢাকার বাণিজ্যিক ভবনগুলোর চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। একই ভবনে রেস্তোরাঁ কিংবা পোশাকের ব্র্যান্ডের ঠিক পাশের তলাতেই এখন দেখা মিলছে অত্যাধুনিক লেজার এসথেটিক ক্লিনিকের। গত দুই দশকে সৌন্দর্য চিকিৎসা সীমিত পরিসর ছাড়িয়ে শহুরে জীবনের এক নিয়মিত অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। একসময় যা ছিল কেবল উচ্চবিত্তের বিলাসিতা, তা এখন মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও তরুণ পেশাজীবীদের কাছেও সহজলভ্য। তবে এই রূপান্তর শুধু সামাজিক প্রবণতার ফল নয়, এর পেছনে রয়েছে শক্তিশালী এক অর্থনৈতিক বাস্তবতা, যা আমাদের চেনা অর্থনীতির অনেক পুরোনো প্রশ্নকেই নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।
বাংলাদেশের সৌন্দর্য ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা বাজারের আকার এখন প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা, যা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৮০০ থেকে ৮২৫ মিলিয়ন ডলারের সমান। এই বাজার মূলত তিনটি প্রধান খাতে বিভক্ত। সবচেয়ে বড় অংশটি হলো প্রসাধনী ও ত্বক পরিচর্যা পণ্যের খুচরা বিক্রি। ক্রিম, সিরাম, সানস্ক্রিন, মেকআপ ও চুলের যত্নের পণ্য দেশীয় উৎপাদন এবং আমদানির মাধ্যমে সুপারশপ ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দেদার বিক্রি হচ্ছে। বাজার পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালে শুধু ত্বক পরিচর্যা পণ্যের বাজারই ১৬ কোটি ৬৬ লাখ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা পুরো খাতের শক্ত ভিতের ইঙ্গিত দেয়। এর পরেই রয়েছে পার্লার ও সেলুন সেবা, যেখানে হাজারো ছোট-বড় প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত অবদান বাজারকে বিস্তৃত করেছে।
তবে সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে চিকিৎসাভিত্তিক এসথেটিক সেবা। বোটক্স, ফিলার, লেজার থেরাপি, পিআরপি ও থ্রেড লিফটের মতো সেবার বাজার এখন প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার, যা মোট বাজারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। একটি ক্লিনিকে বোটক্সের একেকটি সেশনের খরচ ৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। আর বোটক্স, ফিলার ও থ্রেড লিফট মিলিয়ে পূর্ণ মুখের চিকিৎসায় লাগে ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা, যার কার্যকারিতা সাধারণত ৪ থেকে ৬ মাস স্থায়ী হয়। ফলে একই গ্রাহককে নিয়মিত এই সেবা নিতে হয়। একটি মাঝারি ক্লিনিক মাসে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি সেবা দিলেই বছরে আয় করে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকা। চেইন ক্লিনিকগুলোর আয় এর কয়েক গুণ বেশি। দেশে এক থেকে দুই হাজার সক্রিয় সেবাকেন্দ্র হিসাব করলে এই উপখাতের বাজার দেড়শ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো অবাস্তব নয়।
এখানেই একটা প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে মাথায় আসে। যে দেশের মানুষ এখনো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য হাসপাতালের বারান্দায় লাইন দেয়, সেই দেশে সৌন্দর্য চিকিৎসার বাজার এত দ্রুত বাড়ছে কীভাবে? উত্তরটা আসলে দুই স্তরের। এক স্তরে আছে ভোক্তার মনস্তত্ত্ব, চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা, বিয়ের বাজার, সামাজিক মাধ্যমের তুলনামূলক সংস্কৃতি, এসব মিলিয়ে চেহারা এখন এক ধরনের সামাজিক পুঁজিতে রূপান্তরিত হয়েছে। আরেক স্তরে আছে সরবরাহের অর্থনীতি। প্রযুক্তি সস্তা হয়েছে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চিকিৎসক বেড়েছে, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই সেবা এখন আর কেবল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় না। চাহিদা আর সরবরাহ যখন একসঙ্গে বাড়ে, তখন বাজার এভাবেই লাফিয়ে বাড়ে।
ঢাকার আধুনিক পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোতে এখন একাধিক শাখায় শতাধিক চিকিৎসক ও থেরাপিস্ট কাজ করছেন, যাদের একটি বড় অংশ নারী। ২০০৪ সালে দেশে লেজারভিত্তিক এসথেটিক চিকিৎসার যাত্রা শুরু হয়েছিল কেবল দাগ বা তিল অপসারণ এবং হেয়ার রিমুভালের মতো সেবায়। এখন সেখানে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক লেজার প্রযুক্তির মতো আধুনিক সেবা। ফলে এই খাতটি শুধু প্রযুক্তিতেই এগোচ্ছে না, নারীর কর্মসংস্থানেরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে বাড়ছে বিদেশি বিনিয়োগ। সম্প্রতি তুরস্কভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রসাধনী অস্ত্রোপচার হাসপাতাল চালু করেছে, যা দেশীয় বাজারে প্রযুক্তি ও দক্ষতার নতুন গতি আনছে।
এই খাতের অর্থনৈতিক প্রভাব বোঝার জন্য একটু বড় ক্যানভাসে তাকানো দরকার। বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে চার থেকে আট লাখ মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান, আর এই বহির্গমনের পেছনে খরচ হয় বছরে চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ প্রধানত ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীন, ইরান ও তুরস্কের মতো দেশে ব্যয় হয়। এর একটা অংশ অবশ্যই জটিল রোগের চিকিৎসা, হৃদরোগ, ক্যানসার বা কিডনির সমস্যা, যেখানে দেশীয় সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা সত্যিকারের বাধা। কিন্তু এই বিশাল বহির্গমনের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে আছে প্রসাধনী চিকিৎসা, দন্ত চিকিৎসা আর ওয়েলনেস সেবা, যেগুলো তুলনামূলক কম জটিল, অথচ আস্থার অভাবে মানুষ দেশ ছেড়ে যান। এখানেই এসথেটিক মেডিসিনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিছুদিন আগেও বোটক্স বা ফিলারের মতো চিকিৎসার জন্য উচ্চবিত্তদের থাইল্যান্ড বা ভারতে যেতে হতো। এখন তাদের অনেকেই একই মানের সেবা দেশেই নিচ্ছেন। অর্থনীতির ভাষায় এটি আমদানি প্রতিস্থাপনের একটি বাস্তব উদাহরণ। এতে চিকিৎসা ব্যয়ের অর্থ দেশের ভেতরেই থাকছে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো, দেশের ভেতরে গড়ে ওঠা এই দেড়শ মিলিয়ন ডলারের এসথেটিক বাজার কি সেই চার-পাঁচ বিলিয়ন ডলারের বহির্গমনের একটা অংশ ঠেকিয়ে দিতে পারবে? উত্তরটা সরল হ্যাঁ বা না নয়। প্রসাধনী ও নন-ইনভেসিভ সেবার ক্ষেত্রে দেশীয় বাজার ইতিমধ্যে বড় অংশ ধরে রাখছে, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহরে। কিন্তু জটিল অস্ত্রোপচার বা উচ্চমাত্রার কসমেটিক সার্জারির ক্ষেত্রে এখনো আস্থার ঘাটতি প্রকট।
বৈশ্বিক এসথেটিক মেডিসিন বাজারে যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষে এবং ইউরোপের বাজার স্থিতিশীল হলেও, সবচেয়ে দ্রুত বাড়ছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল। চীন, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও থাইল্যান্ডে মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধি এবং মেডিক্যাল ট্যুরিজম এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ড ইতোমধ্যে এ খাতকে বড় শিল্পে পরিণত করেছে। তুরস্ক চুল প্রতিস্থাপন চিকিৎসায় বিশ্বনেতা, আর ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও তুলনামূলক কম খরচে উন্নত চিকিৎসা দিয়ে লাখো বিদেশি রোগী আকর্ষণ করছে। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, সঠিক নীতিমালা, দক্ষ জনবল ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এই বাজারকে অল্প সময়েই রপ্তানিমুখী সেবা শিল্পে রূপান্তর করা সম্ভব।
এই খাতের বিস্তারে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা অনস্বীকার্য। ইনফ্লুয়েন্সারদের প্রচারণা এবং বিফোর-আফটার ছবি তরুণদের মধ্যে এসথেটিক চিকিৎসার গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। তবে এর একটি নেতিবাচক দিকও আছে। ডিজিটাল ফিল্টারে তৈরি নিখুঁত সৌন্দর্যের অবাস্তব ধারণা অনেকের মধ্যে নিজের চেহারা নিয়ে হীনম্মন্যতা ও উদ্বেগ তৈরি করছে। তবে এর উল্টো পিঠে, অনেকেই সচেতন সিদ্ধান্ত নিয়েই এসব চিকিৎসা নিচ্ছেন, যা কর্মক্ষেত্রে ও ব্যক্তিগত জীবনে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাহলে সৌন্দর্য চিকিৎসা কি আসলে ক্ষমতায়নের হাতিয়ার, নাকি এক নতুন ধরনের সামাজিক চাপের ফাঁদ? বাস্তবতা হলো, দুটোই সত্যি, আর সেটা নির্ভর করে ব্যক্তির সিদ্ধান্তটা আসছে কোথা থেকে, নিজের ইচ্ছা থেকে না তুলনার তাড়না থেকে।
সম্ভাবনার পাশাপাশি এই খাতে ঝুঁকিও কম নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাব। বোটক্স বা ডার্মাল ফিলারের মতো ইনজেকশনভিত্তিক চিকিৎসা অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত। কিন্তু এ খাতের জন্য এখনও স্বতন্ত্র লাইসেন্সিং ও কঠোর তদারকি ব্যবস্থা নেই। ফলে ব্যবহৃত ওষুধের মান বা সেবাদাতার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। প্রশিক্ষণহীন কর্মী দ্বারা এসব সেবা দেওয়ার ফলে ত্বকের ক্ষতি থেকে শুরু করে অন্ধত্বের মতো গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাহলে সরকার কি চুপচাপ বসে থাকবে, নাকি এই খাতকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনবে? এখানেই আসলে নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। ওষুধ ও কসমেটিকস আইনের অধীনে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ইতিমধ্যে বিভিন্ন লাইসেন্সিং কাঠামো তৈরি করছে, কিন্তু এসথেটিক ও কসমেটিক চিকিৎসার জন্য পৃথক স্বীকৃত মানদণ্ড এখনো গড়ে ওঠেনি। এই ফাঁক পূরণ না হলে গ্রাহকের নিরাপত্তা ঝুঁকিতেই থেকে যাবে।
এছাড়া এই খাতের বড় অংশ এখনও করজালের বাইরে থাকায় রাষ্ট্র রাজস্ব হারাচ্ছে। চিকিৎসাশিক্ষায় এসথেটিক মেডিসিনকে স্বীকৃত বিশেষায়িত শাখা হিসেবে গুরুত্ব না দেওয়ায় দক্ষ জনবল তৈরির পথও সীমিত। উপরন্তু, যন্ত্রপাতি ও ইনজেক্টেবল উপকরণের উচ্চ আমদানিনির্ভরতার কারণে প্রকৃত দেশীয় মূল্য সংযোজন কতটা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও রয়ে যায়।
সৌন্দর্য চিকিৎসার এই ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি আমাদের সামনে এক দ্বৈত বাস্তবতা তুলে ধরছে। একদিকে এটি সামাজিক প্রতিযোগিতার প্রতিফলন, অন্যদিকে কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি বিনিয়োগ ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের এক অপার সম্ভাবনাময় খাত। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার এই উদীয়মান বাজারকে অবহেলা করার সুযোগ নেই, বিশেষত যখন পাশাপাশি প্রতি বছর চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার চিকিৎসা ব্যয়ে দেশ ছেড়ে যাচ্ছে। সমন্বিত মানসনদ, কঠোর লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এবং কার্যকর কর কাঠামোর আওতায় আনা গেলে এটি কেবল অভ্যন্তরীণ চাহিদাই পূরণ করবে না, ভবিষ্যতে একটি সাশ্রয়ী আঞ্চলিক সেবা শিল্প হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
.png)

আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যু—বিশেষ করে সংস্কার প্রশ্নে বিরোধী শিবিরের সম্ভাব্য চাপ সামলাতে সরকার আগেভাগেই নিজেদের ঘর গুছিয়ে নিতে চাইছে।
১ ঘণ্টা আগে
ভারতে গত এক দশকে একের পর এক গণআন্দোলন কেন্দ্রীয় রাজনীতিকে নাড়া দিয়েছে। কখনো নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (এনআরসি) বিরুদ্ধে শাহিনবাগের আন্দোলন, কখনও কৃষকদের দীর্ঘ আন্দোলন, আবার কখনও বিশ্ববিদ্যালয়-ভিত্তিক ছাত্র প্রতিবাদ।
২ ঘণ্টা আগে
একটি রাজনৈতিক তুলনা তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন দুই ঘটনার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ক্ষমতার অবস্থান, দেশত্যাগের কারণ এবং জন-প্রতিক্রিয়া সমমানের হয়। সাম্প্রতিক সময়ে একটি যুক্তি সামনে আনা হয় যে, এক-এগারোর সময় তারেক রহমানের দেশত্যাগ এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগ একই প্রকৃতির ঘটনা।
১৮ ঘণ্টা আগে
লিথুয়ানিয়ায় কাজের আশায় নেপাল ঘুরে দেশে ফিরে এসেছেন ছয় তরুণ। এই কাহিনী কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি এই ছয় তরুণ। দেশে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা এবং দেশের বাইরে গিয়ে এই জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রবল বাসনাকে পুঁজি করে প্রতিনিয়ত সক্র
১৯ ঘণ্টা আগে