তনভিয়া বড়ুয়া

ভারতে গত এক দশকে একের পর এক গণআন্দোলন কেন্দ্রীয় রাজনীতিকে নাড়া দিয়েছে। কখনো নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (এনআরসি) বিরুদ্ধে শাহিনবাগের আন্দোলন, কখনও কৃষকদের দীর্ঘ আন্দোলন, আবার কখনও বিশ্ববিদ্যালয়-ভিত্তিক ছাত্র প্রতিবাদ। প্রতিটি আন্দোলনেরই নিজস্ব চরিত্র ছিল। ২০২৬ সালে দিল্লির যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া নিট-দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন আগের গণআন্দোলনের সঙ্গে মিল থাকলেও, অনেক দিক থেকেই এটি আলাদা এবং নতুন ধরনের আন্দোলন হিসেবে উঠে এসেছে।
এই আন্দোলনকে অনেকেই আর পাঁচটা প্রতিবাদের মতোই মনে করতে পারেন। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এই আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি, অংশগ্রহণকারীদের মানসিকতা, দাবি, নেতৃত্বের ধরন এবং রাজনৈতিক অভিঘাত—সব ক্ষেত্রেই আগের আন্দোলনগুলির সঙ্গে পার্থক্য রয়েছে।
এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল শিক্ষাব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে। ১৬ মে অভিজিৎ দীপকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামে একটি নতুন প্ল্যাটফর্মের ঘোষণা করেন। সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত পরিচিতি পাওয়ার পর ২০ জুন তিনি হাতে ড. বি আর আম্বেদকরের লেখা এবং সংবিধানের মূল্যবোধের প্রতীক নিয়ে দিল্লির যন্তর মন্তরে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান শুরু করেন। তাঁদের মূল অভিযোগ, নিট পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে এবং সেই ঘটনার নৈতিক দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ করা উচিত। একই সঙ্গে তাঁরা গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার জবাবদিহি ও সংস্কারের দাবিও তোলেন। আন্দোলনের শুরু থেকেই সংবিধান হাতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের আহ্বান ছিল অন্যতম প্রতীক।
প্রথম দিকে আন্দোলনে ছিলেন মূলত ছাত্রছাত্রী, পরীক্ষার্থী, অভিভাবক এবং তরুণ-তরুণীরা। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আন্দোলনের পরিধি বাড়তে থাকে। পরিবেশকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক অনশনে বসেন। আদালতের হস্তক্ষেপ, পুলিশি নিরাপত্তা, তাঁকে হাসপাতালে স্থানান্তর, বিরোধী দলগুলির সমর্থন এবং শেষ পর্যন্ত 'সংসদ চলো' কর্মসূচির ডাকে আন্দোলনটি জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, এখানে প্রতিবাদকারীরা মূলত নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। কারও সন্তান নিট পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে মানসিক চাপে আত্মহত্যা করেছে, কেউ বহু বছর ধরে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ আগামী বছর পরীক্ষায় বসবেন। সংবাদমাধ্যমের সামনে ১৬-১৭ বছরের কিশোর-কিশোরীরাও বলেছেন, যদি পরীক্ষা প্রক্রিয়ার উপরই ভরসা না থাকে, তবে তাঁদের ভবিষ্যৎ কোথায়? অর্থাৎ এই আন্দোলনের মূলেই রয়েছে নিজের ভবিষ্যৎ, পরিশ্রম এবং জীবনের সঙ্গে জড়িত এক বাস্তব সংকট।
এই জায়গাতেই শাহিনবাগের আন্দোলনের সঙ্গে বড় পার্থক্য তৈরি হয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে সংসদে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাশ হওয়ার পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। ১৫ ডিসেম্বর জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশি অভিযানের পর দিল্লির শাহিনবাগে কয়েকজন সাধারণ মুসলিম নারী শান্তিপূর্ণ অবস্থান শুরু করেন। কোনো রাজনৈতিক দলের ডাকে নয়, কোনো পূর্বপরিকল্পনা নয়—স্বতঃস্ফূর্তভাবে শুরু হওয়া সেই প্রতিবাদ কয়েক মাসের মধ্যে বিশ্বজোড়া পরিচিতি পায়।
শাহিনবাগের আন্দোলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল, সেটি ছিল মূলত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগের প্রকাশ। সেখানে বহু মানুষ এসেছিলেন যাঁদের ব্যক্তিগতভাবে সিএএ বা এনআরসির কারণে কোনো তাৎক্ষণিক সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা ছিল না। তাঁরা এসেছিলেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়াতে। অর্থাৎ আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি ছিল সংহতি, সহমর্মিতা এবং অন্যের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
অবশ্যই সেখানে মুসলিম মহিলারাই ছিলেন মুখ্য শক্তি। কিন্তু তাঁদের পাশে ছিলেন হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টান, দলিত, ছাত্রছাত্রী, শিল্পী, অধ্যাপক, আইনজীবী এবং নানা শ্রেণির সাধারণ মানুষ। শাহিনবাগ ধীরে ধীরে প্রতিবাদের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক পরিসরেও পরিণত হয়েছিল। সংবিধান পাঠ, কবিতা, গান, শিল্প, আলোচনা—সব মিলিয়ে সেটি হয়ে উঠেছিল এক বিকল্প গণতান্ত্রিক পরিসর।
এই আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় কলকাতার পার্ক সার্কাস, লখনউয়ের ঘণ্টাঘর, বেঙ্গালুরুর বিলালবাগ-সহ বহু জায়গায় একই ধরনের অবস্থান আন্দোলন শুরু হয়। পার্ক সার্কাসে শিশুকে কোলে নিয়েই মহিলারা দিনের পর দিন আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছিলেন। যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি ও আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও সেখানে যোগ দিয়েছিলেন।
আজ যখন বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক মহিলার নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ উঠছে, তখন অনেকের কাছেই শাহিনবাগের স্মৃতি নতুন করে ফিরে আসছে। কারণ নাগরিকত্ব এবং পরিচয় সংক্রান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় মহিলারাই সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখে পড়েন। বহু মহিলার নামে জমি, সম্পত্তি কিংবা প্রয়োজনীয় নথি থাকে না। দ্য হিন্দুর তথ্য অনুযায়ী, বিহারে এসআইআর-এ প্রায় ৪৭ লাখ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে যাদের মধ্যে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশই মহিলা। অসমের এনআরসিতেও অসমে বাদ পড়া ১৯ লাখ মানুষের ৭০ শতাংশই মহিলা। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী প্রক্রিয়ার পরে প্রায় ৬১ লক্ষ ৯৩ হাজার (৬১,৯৩,৩৮৬) মহিলা ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা মোট বাদ পড়া ভোটারের প্রায় ৬১.৮%। ফলে নাগরিক পরিচয় নিয়ে উদ্বেগের প্রশ্নটি এখনও প্রাসঙ্গিক।
কিন্তু নিট আন্দোলনের চরিত্র অন্য জায়গায়। এখানে প্রতিবাদকারীরা অন্য কারও হয়ে নয়, নিজের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য আন্দোলন করছেন। এই আত্মস্বার্থ কোনো নেতিবাচক শব্দ নয়। বরং গণতন্ত্রে নাগরিক যখন নিজের অধিকার, নিজের পরিশ্রম এবং নিজের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য রাস্তায় নামেন, তখন সেই আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি আরও বিস্তৃত হতে পারে।
কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করলেও একই ধরনের পার্থক্য চোখে পড়ে। ২০২০ সালে কেন্দ্রীয় সরকার বিতর্কিত তিনটি কৃষি আইন পাশ করায় কৃষকদের দীর্ঘ আন্দোলন শুরু হয়। কৃষক সংগঠনগুলির অভিযোগ ছিল, এই আইনগুলি কর্পোরেট সংস্থার সুবিধা করবে এবং কৃষকদের বাজারে আরও দুর্বল করে দেবে। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, সংসদে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই বিলগুলি পাশ করানো হয়েছে।
২০২৪ সালেও ন্যূনতম সহায়ক মূল্যকে আইনি স্বীকৃতি-সহ একাধিক দাবিতে পঞ্জাব ও হরিয়ানার কৃষকেরা আবার দিল্লি চলো কর্মসূচি নেন। সীমান্তে কাঁটাতার, কংক্রিটের ব্যারিকেড, কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট, জলকামান—সবই ব্যবহার করা হয়। শুভকরণ সিং নামে এক তরুণ কৃষকের মৃত্যুও সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে। পঞ্জাব ও হরিয়ানার বিস্তীর্ণ এলাকা অবরোধ হয়। ট্র্যাক্টর মিছিল হয়। ২৫০টিরও বেশি সংগঠন এই আন্দোলনে সামিল হয়।
কৃষি ভারতের কোটি কোটি মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘ আন্দোলনের পর কেন্দ্র সরকার তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। রাজনৈতিকভাবেও এই আন্দোলনের প্রভাব স্পষ্ট দেখা যায়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কৃষক আন্দোলনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি ছিল এমন বহু আসনে বিজেপি পিছিয়ে যায়। দেশ জুড়ে আসন সংখ্যা ৩০৩ থেকে নেমে যায় ২৪০-এ। কৃষক আন্দোলনে যোগদানকারীদের অঞ্চল মিলিয়ে মোট ৩৮টি আসনে হেরেছে বিজেপি। তালিকায় রয়েছে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ, পঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর রাজস্থান, মহারাষ্ট্রের একাধিক পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চল। ২০১৯ সালে হরিয়ানাতে কৃষক সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের ১০টি আসনে জিতেছিল বিজেপি। ২০২৪ সালে ওই অঞ্চলেরই ৫টি আসন কমে গিয়েছে। পঞ্জাবেরও এমন দুটি আসনে বিজেপি হেরেছে। রাজস্থানে ২০১৯ সালে ২৫টির মধ্যে ২৪টি আসন পেয়েছিল বিজেপি। এ বার সেখানেই শুধুমাত্র ১৪টি আসনে জয় পায়। মহারাষ্ট্রে পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চলে মোট ১৩টি লোকসভা কেন্দ্র ছিল, তার মধ্য ১২টি আসনেই হেরে গিয়েছে বিজেপি। যেসব গণআন্দোলন সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রাণ কেড়েছে তার মধ্যে একটি কৃষক আন্দোলন। কৃষক আন্দোলনের প্রভাবে বিজেপি সরকার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। দেশব্যাপী আন্দোলন যে মামুলি কথা নয় তা নির্বাচনী ফল প্রকাশের পর আরও স্পষ্ট হয়েছিল।
এনসিআরবি-র তথ্য অনুযায়ী ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এক লক্ষেরও বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ জন কৃষকের আত্মহত্যার হিসাব কৃষি সংকটের গভীরতা বোঝায়। আন্দোলনের সময় বহু কৃষককে ‘খলিস্তানি’, ‘দেশদ্রোহী’, ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলেও আক্রমণ করা হয়েছিল।
তবে কৃষক আন্দোলন এবং নিট আন্দোলনের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কৃষক আন্দোলন ছিল মূলত জীবিকা ও অর্থনীতির প্রশ্নে। নিট আন্দোলন ভবিষ্যৎ এবং সুযোগের সমতার প্রশ্নে। একজন কৃষক তাঁর উৎপাদনের ন্যায্য দাম চাইছেন, আর একজন ছাত্র চাইছেন তাঁর পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্যায়ন হোক। দুই ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের জবাবদিহির প্রশ্ন রয়েছে, কিন্তু সামাজিক অভিজ্ঞতা আলাদা।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনা আসে ২০২০ সালের দিল্লি হিংসা-পরবর্তী গ্রেফতারির প্রসঙ্গে। উমর খালিদ, শারজিল ইমাম-সহ একাধিক ছাত্রনেতাকে ইউএপিএ-সহ বিভিন্ন ধারায় গ্রেফতার করা হয়। দিল্লি পুলিশের এফআইআর দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের কেন্দ্র ছিল। সেই সময় আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল রাষ্ট্র, নাগরিক অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন।
নিট আন্দোলনের শুরুতে সেই ধরনের রাজনৈতিক ভাষা খুব বেশি ছিল না। প্রথম দাবি ছিল স্পষ্ট—শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।

পুলিশি লাঠিচার্জ, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা এবং আন্দোলন দমনের চেষ্টার একাধিক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরে আন্দোলনের চরিত্রেও পরিবর্তন দেখা যায়। শুরুতে যারা শুধুমাত্র নিট দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। প্রশাসনিক দাবি ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
ভারতের গণআন্দোলনের ইতিহাসে এই পরিবর্তন নতুন নয়। বহু আন্দোলনই একটি নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে শুরু হয়ে পরে রাষ্ট্রের আচরণকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে। শাহিনবাগে যেমন সিএএ থেকে প্রশ্ন গিয়েছিল সংবিধান ও নাগরিক অধিকারের দিকে, কৃষক আন্দোলনে কৃষি আইন থেকে প্রশ্ন পৌঁছেছিল গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিতে। নিট আন্দোলনেও শিক্ষা থেকে প্রশ্ন ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের জবাবদিহির দিকে এগোচ্ছে।
তবু এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি এখনও তার সামাজিক ভিত্তি। এখানে আন্দোলনকারীদের বড় অংশ কোনো রাজনৈতিক কর্মী নন। তাঁরা পরীক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, কোচিং পড়ুয়া কিংবা ভবিষ্যতের পরীক্ষার্থী। সেই কারণেই এই আন্দোলন সমাজের মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ভেতরে সরাসরি সাড়া ফেলছে।
আর এখানেই দিল্লির বর্তমান আন্দোলন আগের গণআন্দোলনগুলির থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা। শাহিনবাগের আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নাগরিকত্ব এবং ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে উদ্বেগ। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাংবিধানিক অধিকার ও পরিচয় রক্ষার প্রশ্নটি সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সেই আন্দোলনে অনেক মানুষই অংশ নিয়েছিলেন, যাঁদের ব্যক্তিগতভাবে সিএএ বা এনআরসির প্রভাব পড়ার আশঙ্কা ছিল না। তাঁরা মূলত অন্যের অধিকারের পাশে দাঁড়াতেই রাস্তায় নেমেছিলেন।
অন্যদিকে, কৃষক আন্দোলনের মূল প্রশ্ন ছিল জীবিকা, ন্যায্য দাম এবং কৃষকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। আর নিট-দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই আন্দোলনের সঙ্গে ধর্ম বা পরিচয়ের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। এখানে মানুষের দাবি একটাই—শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। তাই এই আন্দোলনে মানুষ অন্য কারও জন্য নয়, নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের পরিশ্রম এবং নিজের স্বপ্ন রক্ষার জন্যই রাস্তায় নেমেছেন।
গণতন্ত্রে এই তিন ধরনের আন্দোলনেরই আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। কোনোটি নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন তোলে, কোনোটি অর্থনৈতিক ন্যায়ের প্রশ্ন তোলে, আবার কোনোটি সুযোগের সমতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন তোলে। দিল্লির বর্তমান আন্দোলন সেই তৃতীয় ধারার প্রতিনিধিত্ব করছে। তবে সাম্প্রতিক পুলিশি পদক্ষেপ এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অভিযোগের পর এই আন্দোলনও ধীরে ধীরে কেবল শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তার রাজনৈতিক অভিঘাতও ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। ইতিহাস বলছে, বহু গণআন্দোলনের মোড় ঘুরেছে ঠিক এই জায়গাতেই—যেখানে একটি নির্দিষ্ট দাবি থেকে শুরু হয়ে আন্দোলন রাষ্ট্র, গণতন্ত্র এবং নাগরিক অধিকারের বৃহত্তর আলোচনায় প্রবেশ করেছে। দিল্লির বর্তমান আন্দোলনও সেই পথেই এগোচ্ছে কি না, তার উত্তর দেবে আগামী দিনের ভারতীয় রাজনীতি।

ভারতে গত এক দশকে একের পর এক গণআন্দোলন কেন্দ্রীয় রাজনীতিকে নাড়া দিয়েছে। কখনো নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (এনআরসি) বিরুদ্ধে শাহিনবাগের আন্দোলন, কখনও কৃষকদের দীর্ঘ আন্দোলন, আবার কখনও বিশ্ববিদ্যালয়-ভিত্তিক ছাত্র প্রতিবাদ। প্রতিটি আন্দোলনেরই নিজস্ব চরিত্র ছিল। ২০২৬ সালে দিল্লির যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া নিট-দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন আগের গণআন্দোলনের সঙ্গে মিল থাকলেও, অনেক দিক থেকেই এটি আলাদা এবং নতুন ধরনের আন্দোলন হিসেবে উঠে এসেছে।
এই আন্দোলনকে অনেকেই আর পাঁচটা প্রতিবাদের মতোই মনে করতে পারেন। কিন্তু একটু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, এই আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি, অংশগ্রহণকারীদের মানসিকতা, দাবি, নেতৃত্বের ধরন এবং রাজনৈতিক অভিঘাত—সব ক্ষেত্রেই আগের আন্দোলনগুলির সঙ্গে পার্থক্য রয়েছে।
এই আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল শিক্ষাব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে। ১৬ মে অভিজিৎ দীপকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নামে একটি নতুন প্ল্যাটফর্মের ঘোষণা করেন। সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত পরিচিতি পাওয়ার পর ২০ জুন তিনি হাতে ড. বি আর আম্বেদকরের লেখা এবং সংবিধানের মূল্যবোধের প্রতীক নিয়ে দিল্লির যন্তর মন্তরে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান শুরু করেন। তাঁদের মূল অভিযোগ, নিট পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে এবং সেই ঘটনার নৈতিক দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ করা উচিত। একই সঙ্গে তাঁরা গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার জবাবদিহি ও সংস্কারের দাবিও তোলেন। আন্দোলনের শুরু থেকেই সংবিধান হাতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের আহ্বান ছিল অন্যতম প্রতীক।
প্রথম দিকে আন্দোলনে ছিলেন মূলত ছাত্রছাত্রী, পরীক্ষার্থী, অভিভাবক এবং তরুণ-তরুণীরা। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আন্দোলনের পরিধি বাড়তে থাকে। পরিবেশকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক অনশনে বসেন। আদালতের হস্তক্ষেপ, পুলিশি নিরাপত্তা, তাঁকে হাসপাতালে স্থানান্তর, বিরোধী দলগুলির সমর্থন এবং শেষ পর্যন্ত 'সংসদ চলো' কর্মসূচির ডাকে আন্দোলনটি জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।
এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, এখানে প্রতিবাদকারীরা মূলত নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। কারও সন্তান নিট পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে মানসিক চাপে আত্মহত্যা করেছে, কেউ বহু বছর ধরে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ আগামী বছর পরীক্ষায় বসবেন। সংবাদমাধ্যমের সামনে ১৬-১৭ বছরের কিশোর-কিশোরীরাও বলেছেন, যদি পরীক্ষা প্রক্রিয়ার উপরই ভরসা না থাকে, তবে তাঁদের ভবিষ্যৎ কোথায়? অর্থাৎ এই আন্দোলনের মূলেই রয়েছে নিজের ভবিষ্যৎ, পরিশ্রম এবং জীবনের সঙ্গে জড়িত এক বাস্তব সংকট।
এই জায়গাতেই শাহিনবাগের আন্দোলনের সঙ্গে বড় পার্থক্য তৈরি হয়। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে সংসদে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাশ হওয়ার পর দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়। ১৫ ডিসেম্বর জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশি অভিযানের পর দিল্লির শাহিনবাগে কয়েকজন সাধারণ মুসলিম নারী শান্তিপূর্ণ অবস্থান শুরু করেন। কোনো রাজনৈতিক দলের ডাকে নয়, কোনো পূর্বপরিকল্পনা নয়—স্বতঃস্ফূর্তভাবে শুরু হওয়া সেই প্রতিবাদ কয়েক মাসের মধ্যে বিশ্বজোড়া পরিচিতি পায়।
শাহিনবাগের আন্দোলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল, সেটি ছিল মূলত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাগরিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগের প্রকাশ। সেখানে বহু মানুষ এসেছিলেন যাঁদের ব্যক্তিগতভাবে সিএএ বা এনআরসির কারণে কোনো তাৎক্ষণিক সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা ছিল না। তাঁরা এসেছিলেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়াতে। অর্থাৎ আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি ছিল সংহতি, সহমর্মিতা এবং অন্যের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।
অবশ্যই সেখানে মুসলিম মহিলারাই ছিলেন মুখ্য শক্তি। কিন্তু তাঁদের পাশে ছিলেন হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টান, দলিত, ছাত্রছাত্রী, শিল্পী, অধ্যাপক, আইনজীবী এবং নানা শ্রেণির সাধারণ মানুষ। শাহিনবাগ ধীরে ধীরে প্রতিবাদের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক পরিসরেও পরিণত হয়েছিল। সংবিধান পাঠ, কবিতা, গান, শিল্প, আলোচনা—সব মিলিয়ে সেটি হয়ে উঠেছিল এক বিকল্প গণতান্ত্রিক পরিসর।
এই আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় কলকাতার পার্ক সার্কাস, লখনউয়ের ঘণ্টাঘর, বেঙ্গালুরুর বিলালবাগ-সহ বহু জায়গায় একই ধরনের অবস্থান আন্দোলন শুরু হয়। পার্ক সার্কাসে শিশুকে কোলে নিয়েই মহিলারা দিনের পর দিন আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছিলেন। যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি ও আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরাও সেখানে যোগ দিয়েছিলেন।
আজ যখন বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক মহিলার নাম বাদ যাওয়ার অভিযোগ উঠছে, তখন অনেকের কাছেই শাহিনবাগের স্মৃতি নতুন করে ফিরে আসছে। কারণ নাগরিকত্ব এবং পরিচয় সংক্রান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় মহিলারাই সবচেয়ে বেশি সমস্যার মুখে পড়েন। বহু মহিলার নামে জমি, সম্পত্তি কিংবা প্রয়োজনীয় নথি থাকে না। দ্য হিন্দুর তথ্য অনুযায়ী, বিহারে এসআইআর-এ প্রায় ৪৭ লাখ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে যাদের মধ্যে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশই মহিলা। অসমের এনআরসিতেও অসমে বাদ পড়া ১৯ লাখ মানুষের ৭০ শতাংশই মহিলা। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী প্রক্রিয়ার পরে প্রায় ৬১ লক্ষ ৯৩ হাজার (৬১,৯৩,৩৮৬) মহিলা ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, যা মোট বাদ পড়া ভোটারের প্রায় ৬১.৮%। ফলে নাগরিক পরিচয় নিয়ে উদ্বেগের প্রশ্নটি এখনও প্রাসঙ্গিক।
কিন্তু নিট আন্দোলনের চরিত্র অন্য জায়গায়। এখানে প্রতিবাদকারীরা অন্য কারও হয়ে নয়, নিজের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য আন্দোলন করছেন। এই আত্মস্বার্থ কোনো নেতিবাচক শব্দ নয়। বরং গণতন্ত্রে নাগরিক যখন নিজের অধিকার, নিজের পরিশ্রম এবং নিজের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য রাস্তায় নামেন, তখন সেই আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি আরও বিস্তৃত হতে পারে।
কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে তুলনা করলেও একই ধরনের পার্থক্য চোখে পড়ে। ২০২০ সালে কেন্দ্রীয় সরকার বিতর্কিত তিনটি কৃষি আইন পাশ করায় কৃষকদের দীর্ঘ আন্দোলন শুরু হয়। কৃষক সংগঠনগুলির অভিযোগ ছিল, এই আইনগুলি কর্পোরেট সংস্থার সুবিধা করবে এবং কৃষকদের বাজারে আরও দুর্বল করে দেবে। বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, সংসদে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই বিলগুলি পাশ করানো হয়েছে।
২০২৪ সালেও ন্যূনতম সহায়ক মূল্যকে আইনি স্বীকৃতি-সহ একাধিক দাবিতে পঞ্জাব ও হরিয়ানার কৃষকেরা আবার দিল্লি চলো কর্মসূচি নেন। সীমান্তে কাঁটাতার, কংক্রিটের ব্যারিকেড, কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট, জলকামান—সবই ব্যবহার করা হয়। শুভকরণ সিং নামে এক তরুণ কৃষকের মৃত্যুও সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রতীক হয়ে ওঠে। পঞ্জাব ও হরিয়ানার বিস্তীর্ণ এলাকা অবরোধ হয়। ট্র্যাক্টর মিছিল হয়। ২৫০টিরও বেশি সংগঠন এই আন্দোলনে সামিল হয়।
কৃষি ভারতের কোটি কোটি মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িত। দীর্ঘ আন্দোলনের পর কেন্দ্র সরকার তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। রাজনৈতিকভাবেও এই আন্দোলনের প্রভাব স্পষ্ট দেখা যায়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কৃষক আন্দোলনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি ছিল এমন বহু আসনে বিজেপি পিছিয়ে যায়। দেশ জুড়ে আসন সংখ্যা ৩০৩ থেকে নেমে যায় ২৪০-এ। কৃষক আন্দোলনে যোগদানকারীদের অঞ্চল মিলিয়ে মোট ৩৮টি আসনে হেরেছে বিজেপি। তালিকায় রয়েছে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ, পঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তর রাজস্থান, মহারাষ্ট্রের একাধিক পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চল। ২০১৯ সালে হরিয়ানাতে কৃষক সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের ১০টি আসনে জিতেছিল বিজেপি। ২০২৪ সালে ওই অঞ্চলেরই ৫টি আসন কমে গিয়েছে। পঞ্জাবেরও এমন দুটি আসনে বিজেপি হেরেছে। রাজস্থানে ২০১৯ সালে ২৫টির মধ্যে ২৪টি আসন পেয়েছিল বিজেপি। এ বার সেখানেই শুধুমাত্র ১৪টি আসনে জয় পায়। মহারাষ্ট্রে পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চলে মোট ১৩টি লোকসভা কেন্দ্র ছিল, তার মধ্য ১২টি আসনেই হেরে গিয়েছে বিজেপি। যেসব গণআন্দোলন সবচেয়ে বেশি মানুষের প্রাণ কেড়েছে তার মধ্যে একটি কৃষক আন্দোলন। কৃষক আন্দোলনের প্রভাবে বিজেপি সরকার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। দেশব্যাপী আন্দোলন যে মামুলি কথা নয় তা নির্বাচনী ফল প্রকাশের পর আরও স্পষ্ট হয়েছিল।
এনসিআরবি-র তথ্য অনুযায়ী ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এক লক্ষেরও বেশি কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ জন কৃষকের আত্মহত্যার হিসাব কৃষি সংকটের গভীরতা বোঝায়। আন্দোলনের সময় বহু কৃষককে ‘খলিস্তানি’, ‘দেশদ্রোহী’, ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলেও আক্রমণ করা হয়েছিল।
তবে কৃষক আন্দোলন এবং নিট আন্দোলনের মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কৃষক আন্দোলন ছিল মূলত জীবিকা ও অর্থনীতির প্রশ্নে। নিট আন্দোলন ভবিষ্যৎ এবং সুযোগের সমতার প্রশ্নে। একজন কৃষক তাঁর উৎপাদনের ন্যায্য দাম চাইছেন, আর একজন ছাত্র চাইছেন তাঁর পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্যায়ন হোক। দুই ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের জবাবদিহির প্রশ্ন রয়েছে, কিন্তু সামাজিক অভিজ্ঞতা আলাদা।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনা আসে ২০২০ সালের দিল্লি হিংসা-পরবর্তী গ্রেফতারির প্রসঙ্গে। উমর খালিদ, শারজিল ইমাম-সহ একাধিক ছাত্রনেতাকে ইউএপিএ-সহ বিভিন্ন ধারায় গ্রেফতার করা হয়। দিল্লি পুলিশের এফআইআর দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের কেন্দ্র ছিল। সেই সময় আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল রাষ্ট্র, নাগরিক অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন।
নিট আন্দোলনের শুরুতে সেই ধরনের রাজনৈতিক ভাষা খুব বেশি ছিল না। প্রথম দাবি ছিল স্পষ্ট—শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।

পুলিশি লাঠিচার্জ, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা এবং আন্দোলন দমনের চেষ্টার একাধিক ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরে আন্দোলনের চরিত্রেও পরিবর্তন দেখা যায়। শুরুতে যারা শুধুমাত্র নিট দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছিলেন, তাঁদের অনেকেই এখন রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। প্রশাসনিক দাবি ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
ভারতের গণআন্দোলনের ইতিহাসে এই পরিবর্তন নতুন নয়। বহু আন্দোলনই একটি নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে শুরু হয়ে পরে রাষ্ট্রের আচরণকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে। শাহিনবাগে যেমন সিএএ থেকে প্রশ্ন গিয়েছিল সংবিধান ও নাগরিক অধিকারের দিকে, কৃষক আন্দোলনে কৃষি আইন থেকে প্রশ্ন পৌঁছেছিল গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতিতে। নিট আন্দোলনেও শিক্ষা থেকে প্রশ্ন ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের জবাবদিহির দিকে এগোচ্ছে।
তবু এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি এখনও তার সামাজিক ভিত্তি। এখানে আন্দোলনকারীদের বড় অংশ কোনো রাজনৈতিক কর্মী নন। তাঁরা পরীক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, কোচিং পড়ুয়া কিংবা ভবিষ্যতের পরীক্ষার্থী। সেই কারণেই এই আন্দোলন সমাজের মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ভেতরে সরাসরি সাড়া ফেলছে।
আর এখানেই দিল্লির বর্তমান আন্দোলন আগের গণআন্দোলনগুলির থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা। শাহিনবাগের আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নাগরিকত্ব এবং ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে উদ্বেগ। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাংবিধানিক অধিকার ও পরিচয় রক্ষার প্রশ্নটি সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সেই আন্দোলনে অনেক মানুষই অংশ নিয়েছিলেন, যাঁদের ব্যক্তিগতভাবে সিএএ বা এনআরসির প্রভাব পড়ার আশঙ্কা ছিল না। তাঁরা মূলত অন্যের অধিকারের পাশে দাঁড়াতেই রাস্তায় নেমেছিলেন।
অন্যদিকে, কৃষক আন্দোলনের মূল প্রশ্ন ছিল জীবিকা, ন্যায্য দাম এবং কৃষকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। আর নিট-দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই আন্দোলনের সঙ্গে ধর্ম বা পরিচয়ের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই। এখানে মানুষের দাবি একটাই—শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, পরিশ্রমের ন্যায্য মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। তাই এই আন্দোলনে মানুষ অন্য কারও জন্য নয়, নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের পরিশ্রম এবং নিজের স্বপ্ন রক্ষার জন্যই রাস্তায় নেমেছেন।
গণতন্ত্রে এই তিন ধরনের আন্দোলনেরই আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। কোনোটি নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন তোলে, কোনোটি অর্থনৈতিক ন্যায়ের প্রশ্ন তোলে, আবার কোনোটি সুযোগের সমতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন তোলে। দিল্লির বর্তমান আন্দোলন সেই তৃতীয় ধারার প্রতিনিধিত্ব করছে। তবে সাম্প্রতিক পুলিশি পদক্ষেপ এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অভিযোগের পর এই আন্দোলনও ধীরে ধীরে কেবল শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। তার রাজনৈতিক অভিঘাতও ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে। ইতিহাস বলছে, বহু গণআন্দোলনের মোড় ঘুরেছে ঠিক এই জায়গাতেই—যেখানে একটি নির্দিষ্ট দাবি থেকে শুরু হয়ে আন্দোলন রাষ্ট্র, গণতন্ত্র এবং নাগরিক অধিকারের বৃহত্তর আলোচনায় প্রবেশ করেছে। দিল্লির বর্তমান আন্দোলনও সেই পথেই এগোচ্ছে কি না, তার উত্তর দেবে আগামী দিনের ভারতীয় রাজনীতি।
.png)

দেশে দ্রুত বাড়ছে চিকিৎসাভিত্তিক এসথেটিক সেবা। বোটক্স, ফিলার, লেজার থেরাপি, পিআরপি ও থ্রেড লিফটের মতো সেবার বাজার এখন প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার, যা মোট বাজারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। একটি ক্লিনিকে বোটক্সের একেকটি সেশনের খরচ ৮ থেকে ২০ হাজার টাকা।
৩১ মিনিট আগে
একটি রাজনৈতিক তুলনা তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন দুই ঘটনার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ক্ষমতার অবস্থান, দেশত্যাগের কারণ এবং জন-প্রতিক্রিয়া সমমানের হয়। সাম্প্রতিক সময়ে একটি যুক্তি সামনে আনা হয় যে, এক-এগারোর সময় তারেক রহমানের দেশত্যাগ এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগ একই প্রকৃতির ঘটনা।
১৭ ঘণ্টা আগে
লিথুয়ানিয়ায় কাজের আশায় নেপাল ঘুরে দেশে ফিরে এসেছেন ছয় তরুণ। এই কাহিনী কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি এই ছয় তরুণ। দেশে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, উন্নত জীবনের আকাঙ্ক্ষা এবং দেশের বাইরে গিয়ে এই জীবন থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রবল বাসনাকে পুঁজি করে প্রতিনিয়ত সক্র
১৮ ঘণ্টা আগে
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে অভূতপূর্ব গণবিক্ষোভ ও ক্ষমতার রদবদল দেখা যচ্ছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি গভীর অর্থনৈতিক সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং তরুণ প্রজন্মের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া এক আন্তঃসীমান্ত ‘ডমিনো ইফেক্ট’।
১৮ ঘণ্টা আগে