তারেক রহমানের দেশত্যাগ এবং শেখ হাসিনার পলায়ন: ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২৬, ২০: ০২
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

একটি রাজনৈতিক তুলনা তখনই গ্রহণযোগ্য হয়, যখন দুই ঘটনার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ক্ষমতার অবস্থান, দেশত্যাগের কারণ এবং জন-প্রতিক্রিয়া সমমানের হয়। সাম্প্রতিক সময়ে একটি যুক্তি সামনে আনা হয় যে, এক-এগারোর সময় তারেক রহমানের দেশত্যাগ এবং ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগ একই প্রকৃতির ঘটনা। এই তুলনাটি রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু বিশ্লেষণধর্মী দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি এত সরল নয়।

গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই তুলনাটি প্রথম শুরু করে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের পলাতক কর্মীরা। তাদের এই দাবিতে সমর্থন জোগায় দেশের অভ্যন্তরে থাকা কর্মীরা। আওয়ামীপন্থীদের সেই দাবিকে হাসির খোরাক হিসেবে নিয়েছিলাম অনেকের মতো আমিও। তবে পার্শ্ববর্তী দেশের বিজ্ঞ ব্যক্তি একই দাবি করায় এবার একটু নড়ে-চড়ে বসার সময় এসেছে।

সম্প্রতি দিল্লি সফরে যাওয়া বাংলাদেশের মিডিয়া ডেলিগেশনের সঙ্গে মতবিনিময়কালে দিল্লিভিত্তিক কৌশলগত ও ভূরাজনীতিবিষয়ক প্রভাবশালী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ন্যাটস্ট্র্যাট’-এর কর্ণধার ও বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ এ দাবি করেছেন। দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে রেখে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের উন্নয়ন সম্ভব কি না-জানতে চাইলে পঙ্কজ শরণ বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ১৭ বছর ধরে লন্ডনে আশ্রয়ে ছিলেন। তাই কেউ ভারত বা অন্য কোনো দেশে আশ্রয় নেওয়া, এক্ষেত্রে শেখ হাসিনা একেবারেই ব্যতিক্রম কিছু নয়। এখানে কিছুটা রাজনীতি আছে, কিছুটা আইনি বিষয়ও আছে। বর্তমানে বিষয়টি বেশ সংবেদনশীল এবং আমাদের দেখতে হবে দুই সরকার কীভাবে এটি পরিচালনা করে।

গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল সচিবালয়সহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করা সাবেক এ কূটনীতিক ও একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত বোধসম্পন্ন ব্যক্তির থেকে এমন মন্তব্য অপ্রত্যাশিত। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানে রাষ্ট্রক্ষমতার বৈধতা (লেজিটিমেসি) এবং রাজনৈতিক নির্বাসন (পলিটিক্যাল এক্সাইল)–এর ধারণা ব্যবহার করলে দেখা যায়, দুই ঘটনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

যদিও হাসিনার এই পলায়নকে পরবর্তী কালে নিরাপত্তাজনিত পদক্ষেপ বলে দাবি করেন। তবে হাসিনার এই দেশত্যাগকে সে সময় দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে ব্যাপক গণঅসন্তোষ ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে খুনির দায় নিয়ে একজন স্বৈরশাসকের পালায়ন হিসেবে চিত্রিত হয়।

প্রথমত, তারেক রহমান ও শেখ হাসিনার দেশত্যাগের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এক ছিল না। তারেক রহমান দেশত্যাগ করেন ২০০৭ সালের এক-এগারো পরবর্তী সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। সে সময় বাংলাদেশে জরুরি অবস্থা জারি ছিল এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছিল। বহু রাজনৈতিক নেতা গ্রেপ্তার, জিজ্ঞাসাবাদ ও রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্মম নির্যাতনের ফলে গুরুতর আহত হন তিনি। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের বিদেশযাত্রাকে তাঁর সমর্থকদের পাশাপাশি দল-মত নির্বিশেষে সারাদেশের মানুষ রাজনৈতিক চাপ ও বাধ্যতামূলক নির্বাসন হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।

অন্যদিকে শেখ হাসিনার দেশত্যাগ—সমর্থক ও সমালোচকদের দৃষ্টিতে ভিন্নভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। আওয়ামী সমর্থকেরা দলের প্রধান নেতার এমন পলায়নে কিছুদিন বিব্রত ছিলেন। ‘হাসিনা পালায় না’— জোরেসোরে এমন দম্ভোক্তির পর শেখ পরিবারের সকল সদস্য এবং আত্মীয় স্বজনকে চুপিচুপি দেশের বাইরে নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে দেওয়ায় এবং হঠাৎ করে তিনি নিজে পালিয়ে যাওয়ায় জনরোষের মুখে থাকা লাখ লাখ নেতাকর্মী কয়েক মাস ধরে নিজেদেরকে প্রতারিত মনে করতেন। যদিও হাসিনার এই পলায়নকে পরবর্তী কালে নিরাপত্তাজনিত পদক্ষেপ বলে দাবি করেন। তবে হাসিনার এই দেশত্যাগকে সে সময় দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে ব্যাপক গণঅসন্তোষ ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে খুনির দায় নিয়ে একজন স্বৈরশাসকের পালায়ন হিসেবে চিত্রিত হয়। অর্থাৎ, দুই ক্ষেত্রেই দেশত্যাগ ঘটলেও রাষ্ট্রক্ষমতায় অবস্থান, ক্ষমতার প্রকৃতি এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক ছিল না।

দ্বিতীয়ত, ক্ষমতার অবস্থান ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক তত্ত্বে একটি মৌলিক ধারণা হলো—ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তি ও বিরোধী অবস্থানে থাকা ব্যক্তির রাজনৈতিক দায় সমান নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার রাষ্ট্রের বৈধ বলপ্রয়োগ ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রসঙ্গে দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহারের সঙ্গে দায়বদ্ধতার প্রশ্ন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তারেক রহমান দেশত্যাগের সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন না; বরং তাঁর দল ক্ষমতার বাইরে ছিল। বিপরীতে শেখ হাসিনা দীর্ঘ সময় অবৈধ ও অনির্বাচিত পন্থায় রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও সরকারের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হবে। এ কারণেই দুই ব্যক্তির রাজনৈতিক জবাবদিহির কাঠামো এক নয়।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক নির্বাসন ও পালিয়ে যাওয়া—এই দুই ধারণা রাজনৈতিক তত্ত্বে এক বিষয় নয়। ‘তুলনামূলক রাজনীতি’তে ‘রাজনৈতিক নির্বাসন’ সাধারণত বোঝায় এমন পরিস্থিতিকে, যেখানে ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় বা সামরিক চাপ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা নিরাপত্তাহীনতার কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। অন্যদিকে ক্ষমতাচ্যুত শাসকের দেশত্যাগকে অনেক সময় ‘রেজিম কোলাপ্স’ বা ‘ফোর্সড এক্সিট’ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়। ইতিহাসে এই দুই ধরনের উদাহরণ আলাদা রাজনৈতিক শ্রেণিতে আলোচিত হয়েছে। তাই ‘দেশ ছেড়েছে’—এই একক তথ্য দিয়ে দুই ঘটনাকে অভিন্ন বলা বিশ্লেষণগতভাবে দুর্বল যুক্তি।

চতুর্থত, জনপ্রতিক্রিয়াও রাজনৈতিক ঘটনার ব্যাখ্যায় একটি উপাদান। কোনো নেতার দেশত্যাগে তাঁর সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া, বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ ভিন্ন হতে পারে। তারেক রহমানের দেশত্যাগ তাঁর সমর্থকদের কাছে ছিল ক্ষোভ ও বেদনার বিষয়। অন্যদিকে শেখ হাসিনার প্রস্থান নিয়ে ভিন্ন রাজনৈতিক শিবিরে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তবে জনতার বৃহৎ অংশের উল্লাস বা ক্ষোভ একাই কোনো ঘটনার নৈতিক বা আইনি সত্য নির্ধারণ করে না; বরং এটি রাজনৈতিক বৈধতা ও জনমতের সূচক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনা যখন দিল্লিতে ছিলেন, তখন তিনি একজন স্বজন হারানো ভুক্তভোগী হিসেবে আশ্রয় পেয়েছিলেন। এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন খুনি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে দিল্লিতে আশ্রয় নিয়েছেন শেখ হাসিনা।

সবশেষে, প্রশ্নটি ‘কে ফিরতে পারবে’ নয়; বরং ‘কোন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও জনসমর্থনের ভিত্তিতে ফিরবে’। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অধিকার শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় আইন, রাজনৈতিক বৈধতা এবং জনগণের রায়ের মাধ্যমে। তাই তারেক রহমান ও শেখ হাসিনার দেশত্যাগকে একই ফ্রেমে ফেলে দেখা রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে কার্যকর হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও তুলনামূলক রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মানদণ্ডে দুই ঘটনার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান।

গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল সচিবালয়সহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করা সাবেক এ ভারতীয় কূটনীতিক আরো বলেন, শেখ হাসিনা এই প্রথম দিল্লিতে আশ্রয় নেননি। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত তিনি দিল্লিতেই ছিলেন। জিয়াউর রহমানের সময়েই, অর্থাৎ বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তখন শেখ হাসিনা দেশে ফিরেছিলেন। দেশে ফিরে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও শুরু করেন। এখন আবার বিএনপি ক্ষমতায় দেখা যাক কী হয়। রাজনীতিতে অনেক কিছু ঘটতে পারে।

উল্লেখ্য, ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনা যখন দিল্লিতে ছিলেন, তখন তিনি একজন স্বজন হারানো ভুক্তভোগী হিসেবে আশ্রয় পেয়েছিলেন। এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন খুনি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে দিল্লিতে আশ্রয় নিয়েছেন শেখ হাসিনা। সে সময় নারী-শিশুসহ পরিবারের সকলকে হারিয়ে নিঃস্ব হাসিনার প্রতি মানুষের সামান্য হলেও সহানুভূতি ছিল। কিন্তু বর্তমানে হাসিনার উল্টো শিশু হত্যাকারী। তাই এবারের প্রেক্ষাপট সব দিক থেকেই হাসিনার প্রতিকূলে।

পরিশেষে বলতে চাই—প্রবল জনরোষের মুখে নির্বিচারে মানুষ হত্যার পর গণহত্যার দায় মাথায় নিয়ে একজন অবৈধ ও ফ্যাসিস্ট সরকার প্রধানের পদত্যাগ করা ও পালিয়ে যাওয়া এবং সেনাসমর্থিত সরকার কর্তৃক নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের একজন নেতার দেশত্যাগ এক নয়। তারেক রহমানের দেশত্যাগ ও শেখ হাসিনার পালায়ন কোনো যুক্তিতেই এক নয়।

এই দুটি ঘটনাকে একই পাল্লায় মাপা ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিকভাবে চরম ভুল হবে। তারেক রহমান ও শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঘটনা দুটি ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের অবসান এবং উত্থানের গল্প বলে। এদের প্রেক্ষাপট, কারণ এবং রাজনৈতিক ফলাফল—কোনোটিই এক নয়। ইতিহাস সবসময়ই ঘটনার বস্তুনিষ্ঠতা ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে রায় দেয়। তাই এই দুই প্রস্থানকে একই রাজনৈতিক বাস্তবতা বলা চলে না, বরং দুটি ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসের দুটি ভিন্ন কালখন্ডের সম্পূর্ণ পৃথক রাজনৈতিক সমীকরণ।

  • লেখক: আনিসুর রহমান: প্রভাষক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), এসএসএইচএল, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250

সম্পর্কিত