শরিক রাজনীতি, সংস্কার ও ক্ষমতার সমীকরণ

ড. সাব্বির আহমেদ
ড. সাব্বির আহমেদ

প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬, ১৩: ২৪
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

সরকার গঠনের দীর্ঘ পাঁচ মাস পর অবশেষে শরিক দলগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘ এই বিরতির পর হঠাৎ শরিকদের সঙ্গে আলোচনার এই উদ্যোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে স্বাভাবিকভাবেই নানা রকম প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যু—বিশেষ করে সংস্কার প্রশ্নে বিরোধী শিবিরের সম্ভাব্য চাপ সামলাতে সরকার আগেভাগেই নিজেদের ঘর গুছিয়ে নিতে চাইছে।

মিত্রদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের দূরত্ব বা ‘গ্যাপ’ কমিয়ে এনে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সংহত করাই মূলত এই বৈঠকের প্রধান লক্ষ্য।

তবে এই বৈঠকে আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বাধীন জেএসডি এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মতো যুগপৎ আন্দোলনের পুরোনো মিত্রদের বৈঠক বর্জনের ঘটনাটি সচেতন মহলের নজর কেড়েছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, এই বর্জনের রাজনৈতিক তাৎপর্য কতটা গভীর? বাস্তবতার নিরিখে বিচার করলে, বিএনপির বিশাল সাংগঠনিক শক্তির সামনে এই দলগুলোর শক্তি একেবারেই নগণ্য। ফলে তাদের বর্জনে সরকারের বা বিএনপির অবস্থানের খুব একটা হেরফের হবে না এবং বিএনপিও হয়তো বিষয়টিকে খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে না।

শরিক দলগুলোর আরেকটি বড় অসন্তোষের জায়গা হলো জাতীয় নির্বাচনে আসন বণ্টন। নির্বাচনে মাত্র ১৫টি আসন পাওয়ায় তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শরিক দলগুলোর নিজস্ব যে সাংগঠনিক ভিত্তি বা জনসমর্থন রয়েছে, তাতে এককভাবে ১৫টি আসনে জয়লাভ করার মতো সক্ষমতা তাদের নেই। ছোট দলগুলোর প্রার্থীর ছড়াছড়ি থাকলেও ভোটের মাঠে তাদের আবেদন অত্যন্ত সীমিত। তাই আসন বণ্টন নিয়ে তাদের এই ক্ষোভ মূলত দরকষাকষি বা ‘বারগেইনিং’-এর হাতিয়ার ছাড়া আর কিছুই নয়।

নির্বাচনের আগে ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার বাস্তবায়নও খুব একটা দৃশ্যমান নয়। বিশাল মন্ত্রিসভায় মাত্র তিনটি শরিক দলের তিনজনকে রাখা হয়েছে। উল্টো কিছু শরিক দলের নেতাদের সরাসরি সরকারি দলে টেনে নেওয়ার একটি প্রচ্ছন্ন প্রক্রিয়া দেখা গেছে। এতে ছোট দলগুলোর রাজনৈতিক অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে কি না এবং তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে কি না সেই প্রশ্ন ওঠে।

তবে রূঢ় বাস্তবতা হলো, বড় দলের বলয়ে থাকা এসব ছোট দলের নিজস্ব কোনো স্বাধীন রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নেই। এদের অনেকেরই চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকে বড় দলে বিলীন হওয়া বা বড় দলের বিশাল ছায়ায় নিজেদের অবস্থান কোনোমতে টিকিয়ে রাখা।

সংস্কার প্রস্তাবগুলোর মূল লক্ষ্যই ছিল সরকারি দলকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন সাধন। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলো, ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার পর কোনো দলই স্বপ্রণোদিত হয়ে জবাবদিহিতার শেকলে আটকা পড়তে চায় না।

এখানে একটি অবধারিত প্রশ্ন দাঁড়ায়, তাহলে এসব শরিকদের নিয়ে রাজনীতি করার ফায়দা কী? আসলে এই দলগুলোর ‘ইলেক্টোরাল ভ্যালু’ বা নিজস্ব নির্বাচনী শক্তি না থাকলেও, দলগুলোর কিছু নেতার ব্যক্তিগত ‘ফেসভ্যালু’ বা জনমানসে একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি রয়েছে, যা সরকার কাজে লাগাতে চায়। আন্দালিব রহমান পার্থ, নুরুল হক নুর, জোনায়েদ সাকি বা রাশেদ খানদের মতো নেতারা অত্যন্ত ভালো বক্তা। জনমত গঠন বা ‘পাবলিক ওপিনিয়ন মোল্ড’ করার ক্ষেত্রে তাদের কথার যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।

বিশেষ করে তরুণ সমাজ ও ছাত্রসমাজের ওপর নুরুল হক নুরের মতো নেতাদের প্রভাব প্রধানমন্ত্রী ভালোভাবেই বোঝেন। তাই ছোট ছোট এই প্রভাবগুলোকে একত্রিত করে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির যে চিরায়ত কৌশল, সরকার সুকৌশলে সেটাই প্রয়োগ করছে।

তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামী ছাড়া অন্য কোনো শরিক দল কখনো বড় কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে—এমন নজির নেই। জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ রাজনীতি বরাবরই সফল ছিল। এর মূল কারণ হলো, জামায়াতের ৮-৯ শতাংশের একটি ‘সলিড’ বা একনিষ্ঠ ভোটব্যাংক এবং দেশব্যাপী সুদৃঢ় সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে, যা জাতীয় পার্টির মতো দলেরও নেই। এই জোটের ভর করেই তারা একসময় ক্ষমতায় এসেছিল এবং এই জোটবদ্ধ রাজনীতির সুবাদেই আজ জামায়াতের রাজনৈতিক পুনরুত্থান ঘটেছে। এটি উভয় দলের জন্যই একটি ‘উইন-উইন’ বা পারস্পরিক লাভজনক পরিস্থিতি ছিল। এমনকি বর্তমান প্রেক্ষাপটেও মতপার্থক্য থাকলেও দল দুটির মধ্যে একধরনের অলিখিত বোঝাপড়া এখনো বিদ্যমান।

সবশেষে যে বিষয়টি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি আলোচনার দাবি রাখে, তা হলো ‘জুলাই সনদ’ এবং রাষ্ট্র সংস্কারে সরকারের ঘোষিত ৩১ দফার বাস্তবায়ন। গত পাঁচ মাসে সংস্কার কাজের ধীরগতি নিয়ে খোদ শরিকদের মধ্যেই চরম হতাশা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার সাম্প্রতিক বৈঠকে এর কারণ হিসেবে ‘ধ্বংসস্তূপ থেকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনে সময় লাগার’ কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এই যুক্তিকে অনেকেই সময়ক্ষেপণের একটি খোঁড়া যুক্তি হিসেবেই দেখছেন।

এই সময়ক্ষেপণ থেকে একটি বড় ও মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—সরকার কি তবে পুরোনো পথেই হাঁটতে চাইছে? সংস্কার প্রস্তাবগুলোর মূল লক্ষ্যই ছিল সরকারি দলকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন সাধন। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলো, ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার পর কোনো দলই স্বপ্রণোদিত হয়ে জবাবদিহিতার শেকলে আটকা পড়তে চায় না। প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে সংস্কারের বিষয়ে আগ্রহী হলেও, তার আশেপাশের দলীয় বলয় এই ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের ঘোর বিরোধী বলেই প্রতীয়মান হয়।

সামগ্রিকভাবে বলা যায়, সরকারি দলের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখে হয়তো লোকদেখানো কিছু পরিবর্তন আনা হবে; কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে প্রকৃত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সদিচ্ছা সরকারের আছে কি না, তা নিয়ে ঘোর সংশয় রয়েই যায়। সংস্কার বাস্তবায়নে এই সময়ক্ষেপণের পেছনে ভবিষ্যৎ ক্ষমতা সুসংহত করার নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ কাজ করছে কি না, আগামী দিনের রাজনীতিতে সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে।

  • ড. সাব্বির আহমেদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক
Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত