leadT1ad

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে পায়ের নিচ থেকে মাটি সরছে ভারতের

জুনায়েদ কাথজু
জুনায়েদ কাথজু

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে পায়ের নিচ থেকে মাটি সরছে ভারতের

ভারত বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় বহুমুখী ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দিল্লির বলয় থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ঢাকা ও ইসলামাবাদের দূরত্ব কমছে। ক্ষমতায় থাকার সময় শেখ হাসিনার সঙ্গে দিল্লির সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। অন্যদিকে মিয়ানমারে ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে চীন সেখানে নিজেদের শক্তিশালী প্রভাব ধরে রেখেছে।

কৌশলগত সম্পর্কের এই পালাবদল এমন এক সময়ে ঘটছে যখন বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন আসন্ন। ওদিকে মিয়ানমারও তাদের দীর্ঘস্থায়ী ও বহু-ধাপে আয়োজিত নির্বাচনের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।

ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির জিন্দাল স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের শ্রীরাধা দত্তের মতে, মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক সামলানো ভারতের জন্য বাংলাদেশের চেয়েও বেশি জটিল ও কঠিন। তিনি বলেন, ভারত বরাবরই জান্তা সরকার ও সেখানকার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে কাজ করেছে। কিন্তু সুশীল সমাজ চায় ভারত যেন মিয়ানমারে আরও গভীরভাবে যুক্ত হয় ও চীনের প্রভাব কমিয়ে দেয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই কাজ মোটেও সহজ নয়।

হাসিনাকে কেন্দ্র করে নতুন সমীকরণ

২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের নেতা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো হয়েছে। দুই পক্ষই এখন কূটনৈতিক ও বাণিজ্য আলোচনা জোরদার করছে। এমনকি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়েও দুই দেশের কথা হচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রে শোনা যাচ্ছে, ইসলামাবাদ তাদের চীনের তৈরি জে-১৭ যুদ্ধবিমান বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করার পরিকল্পনা করছে।

বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক গবেষণা বিষয়ক গবেষক উমর করিম মনে করেন, হাসিনার পতনের পর পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে ‘ব্ল্যাংক চেক ডিপ্লোমেসি’ বা শর্তহীন কূটনীতি চালাচ্ছে।

বাংলাদেশে এখন দিল্লি ও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জনমনে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। হাসিনা বর্তমানে ভারতে স্বেচ্ছা-নির্বাসনে আছেন। উমর করিমের মতে, পাকিস্তান এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। তারা ঢাকার মন জয়ের চেষ্টা করছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। ঢাকা বারবার দিল্লির কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়েছে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হাসিনার অনুপস্থিতিতেই তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এরপরও ভারত এখনো হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়নি।

উমর করিম বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার উত্তেজনা কমাতে হলে দিল্লিকে অবশ্যই হাসিনা সংকট সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশের অনেক তরুণ এখন পাকিস্তানকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে। তাই নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, ঢাকার রাজনৈতিক দলগুলো ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহী। তিনি আরও বলেন, ভারতের রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ হয়তো পাকিস্তান ও চীনের দিকে আরও ঝুঁকবে। মূলত ভারতের সঙ্গে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য উত্তেজনা সামাল দিতে তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব শক্তিশালী করতে চাইবে।

মিয়ানমারে চীনের একচ্ছত্র আধিপত্য

একই সময়ে ভারতের আরেক প্রতিবেশী মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বাড়তে থাকায় দিল্লির মাথা ব্যাথা ক্রমশ বাড়ছে। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকেই বেইজিং মিয়ানমারে শক্ত অবস্থানে আছে। চীন দীর্ঘ দিন ধরেই মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। গত বছর প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের আমন্ত্রণে মিয়ানমারের জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের সম্মেলনে যোগ দিতে তিয়ানজিনে গিয়েছিলেন।

ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুর ও কিংস কলেজ লন্ডনের ডক্টরাল প্রার্থী অংশুমান চৌধুরী বলেন, ভারত আশা করছিল জান্তার সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক দিয়ে চীনের প্রভাব ঠেকানো যাবে। তবে মিয়ানমারে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে হলে দিল্লিকে আরও বেশি কিছু করতে হবে। তাদের উচিত মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে লিপ্ত বিভিন্ন জাতিগত মিলিশিয়াদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা।

অংশুমান চৌধুরী মনে করেন, ভারত সম্ভবত সামরিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ককে কৌশলগত অবস্থান হিসেবে দেখে। তবে চীনের প্রভাব সামাল দেওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট নয়। বেইজিং জান্তা ও শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন উভয়ের সঙ্গেই জোর সম্পর্ক রেখে চলেছে।

মিয়ানমারে প্রভাব বিস্তারের এই লড়াই এমন সময়ে হচ্ছে যখন ভারত ও চীন উভয়েই দেশটিতে বড় প্রকল্প শুরু করেছে। ভারত ৪৮৪ মিলিয়ন ডলারের একটি করিডর তৈরি করছে। এর মাধ্যমে রাখাইন রাজ্যের সিত্তে বন্দরের সঙ্গে সমুদ্র বা নদী ও সড়কপথে কলকাতার সংযোগ ঘটবে। অন্যদিকে চীন কয়েক বিলিয়ন ডলারের রেল ও সড়ক প্রকল্প তৈরি করছে। এর মাধ্যমে ইউনান প্রদেশের সঙ্গে রাখাইন রাজ্যের কাকপিউ (চাউকপ্রু) শহরের সংযোগ ঘটবে।

ভারতের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় লাগাম

বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল এই জটিলতার নতুন দিক খুলবে। এর ওপরই নির্ভর করবে এই দুই দেশ চীন ও ভারতের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ভবিষ্যতে কীভাবে সাজাবে। অংশুমান চৌধুরী বলেন, জান্তা আয়োজিত নির্বাচনের পর মিয়ানমারে চীনের সুবিধাজনক অবস্থান বজায় থাকবে। নির্বাচনের পর যে নতুন সরকার গঠিত হবে তারা ভারতের চেয়ে চীনের বেশি ঘনিষ্ঠ হবে। কারণ তথাকথিত নির্বাচনের প্রস্তুতির জন্য দেশটির উত্তরাঞ্চলে গৃহযুদ্ধ স্থিতিশীল করতে চীনই সেনাবাহিনীকে সহায়তা করেছিল। এসব ক্ষেত্রে ভারতের সরাসরি অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে।

সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক কে পি ফ্যাবিয়ান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার ক্ষেত্রে দিল্লির নীতি খুব একটা কাজে আসেনি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারত অতিরিক্ত মাত্রায় হাসিনার ওপর নির্ভর ছিল। অন্যদিকে মিয়ানমারের জান্তার ওপরও তাদের প্রভাব খুব সীমিত। চীন ভারতকে এশিয়ার নেতা হিসেবে উঠে আসার পথে বাধা মনে করে। তবে পাকিস্তানের মতো চীন ভারতকে সরাসরি শত্রু মনে করে না। তবুও বেইজিং ও ইসলামাবাদ উভয়ই দিল্লির আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় লাগাম টানতে আগ্রহী।

ফ্যাবিয়ানের মতে, ভারতকে অবশ্যই পাকিস্তান ও চীনের গভীর মৈত্রীর বিষয় বুঝতে হবে। তাদের মনে রাখা দরকার এই দুই দেশ এখন ভারতের বিরুদ্ধে একজোট হওয়াকেই নিজেদের স্বার্থের অনুকূল মনে করছে।

বাংলাদেশে কাজ করে যাওয়া অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ মনে করেন, ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করার ক্ষেত্রে ইসলামাবাদের চেয়ে বেইজিংয়ের সুযোগ বেশি। তবে ড্যানিলোভিচ বলেন, ভারতের ক্ষতি করে পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে অনেকটা এগিয়েছে। নির্বাচনের পর নতুন ভারসাম্য তৈরি হবে। হাসিনা ক্ষমতায় থাকার সময় ভারত যে অবস্থানে ছিল তা আর ফিরে পাবে না।

তবে ওয়াশিংটনের ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টারের ফেলো নীলান্থি সামারানায়েক মনে করেন, বাংলাদেশের পাকিস্তান ও চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ার এবং ভারত থেকে দূরে সরে যাওয়ার বিষয়টি অতিরঞ্জিত হতে পারে। তিনি বলেন, ভারতের হাতে এখনো আঞ্চলিক প্রভাব খাটানোর সুযোগ আছে। অতীতের সমস্যা সত্ত্বেও দিল্লি সেখানে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে পেরেছে। ঢাকা যথাসম্ভব বেশি অংশীদার বা বন্ধু চাইবে। কিন্তু তারা এটাও বোঝে যে সম্পর্কের একটা সীমা আছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ভারতেরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা বা ‘রেডলাইন’ আছে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ইঙ্গিত মিলছে ভারত বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাদের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের বেলায় একই ধরনের কৌশল নিচ্ছে।

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। আল জাজিরা, ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন, এনবিসি নিউজ ও দ্য কুইন্টসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের জন্য লেখেন।

হংকংভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট থেকে অনুবাদ করেছেন তুফায়েল আহমদ।

Ad 300x250

সম্পর্কিত