গবেষণা

জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বজুড়ে বদলে যাচ্ছে প্রজাপতির আবাস

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৬ আগস্ট ২০২৬, ১৭: ০০
যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে ছোট প্রজাপতি কুপিডো মিনিমাস। ছবি: সংগৃহীত

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে প্রজাপতির আবাসস্থলে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কোথাও তারা নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে, আবার কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো আবাস থেকে। গবেষকদের দাবি, এই পরিবর্তন শুধু প্রজাপতির নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রের জন্য সতর্কবার্তা।

নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের প্রতি ১০টি প্রজাতির মধ্যে অন্তত একটি প্রজাতির প্রজাপতি ইতিমধ্যে ভৌগোলিক বিচরণের ক্ষেত্র বাড়িয়েছে বা কমিয়েছে অথবা উচ্চতার দিক থেকে স্থান পরিবর্তন করেছে।

১০৫টি দেশের ১ হাজার ৭৫৮টি প্রজাতির প্রজাপতি নিয়ে পরিচালিত এই গবেষণার প্রধান গবেষক ও অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল চেঞ্জ ইকোলজি ল্যাবের প্রধান ড. শাওয়ান চৌধুরী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও বিরূপ আবহাওয়ার কারণে প্রজাপতির আবাসস্থলে অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটছে।

তিনি বলেন, প্রজাপতিকে প্রকৃতির আগাম বার্তাবাহক হিসেবে ধরা হয়। তাই তাদের বিচরণ ক্ষেত্রে এমন বড় পরিবর্তন পুরো বাস্তুতন্ত্রে গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব প্রজাতির আবাসস্থলে পরিবর্তন এসেছে, তাদের প্রায় ৮০ শতাংশই নতুন এলাকায় বিস্তৃতি ঘটিয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে প্রায়ই তারা নতুন নতুন উপযোগী এলাকায় চলে যাচ্ছে।

ড. শাওয়ান চৌধুরী বলেন, কিছু প্রজাতি খুব দ্রুত এলাকা পরিবর্তন করেছে। ভারত, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার স্থানীয় প্রজাতি টনি কস্টার প্রজাপতি ২০১২ সালে অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশের পর থেকে বছরে গড়ে ১৩৫ কিলোমিটার হারে বিস্তৃতি ঘটিয়েছে। তবে নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়া সব সময় ইতিবাচক নয়। কারণ, অনেক সময় তারা কম উপযোগী পরিবেশে চলে যায়। তবে এ সংখ্যা কম থাকে।

অন্যদিকে প্রায় ২৭ শতাংশ প্রজাতির বিচরণক্ষেত্র কমে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে ছোট প্রজাপতি কুপিডো মিনিমাস। আগে এসব প্রজাতি যেখানে দেখা যেত, এখন সেখানে অনেকটাই হারিয়ে গেছে। আবার কিছু প্রজাতি উঁচু বা নিচু এলাকায় সরে গেছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রজাপতির বিচরণের ক্ষেত্র বাড়ার ঘটনা সব মহাদেশে দেখা গেলেও সবচেয়ে বেশি ঘটেছে উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে। কমেছে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায়। আর উচ্চতার পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি ঘটেছে উত্তর গোলার্ধে।

গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও বিরুপ আবহাওয়া এ পরিবর্তনের প্রধান কারণ। তবে আবাসস্থল ধ্বংস, জলাভূমি শুকিয়ে ফেলা এবং কৃষিকাজের ধরন পাল্টানোয় অনেক প্রজাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এলথাম কপার প্রজাতির প্রজাপতি তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে প্রায়শই নতুন নতুন উপযোগী এলাকায় চলে যাচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত
এলথাম কপার প্রজাতির প্রজাপতি তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে প্রায়শই নতুন নতুন উপযোগী এলাকায় চলে যাচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

উদাহরণ হিসেবে গবেষণায় বলা হয়েছে, জার্মানিতে জলাভূমি শুকিয়ে ফেলার কারণে ক্র্যানবেরি ফ্রিটিলারি প্রজাপতি তাদের বড় একটি আবাসস্থল হারিয়েছে। রোমানিয়ায় অতিরিক্ত চাষাবাদের কারণে কমেছে ড্যানিউব ক্লাউডেড ইয়েলো প্রজাপতির বিস্তৃতি। অন্যদিকে ব্রাজিলে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় গোডার্টিয়ানা বাইসেস নামের নীল প্রজাপতি নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।

ড. শাওয়ান চৌধুরী বলেন, কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে একদিকে নতুন এলাকায় বিস্তৃতি ঘটছে, আবার অন্যদিকে পুরোনো এলাকা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এসব প্রজাতি বিপন্ন হবে নাকি টিকে থাকবে, তা এখন নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় বিশ্বজুড়ে প্রজাপতি সংরক্ষণের কৌশল নতুন করে ভাবতে হবে। বিশেষ করে উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে সমন্বিত পর্যবেক্ষণ জোরদার করা জরুরি। এতে প্রজাপতিগুলো কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে এবং কীভাবে তাদের সংরক্ষণ করা যায়, তা বোঝা সম্ভব হবে।

এর মধ্যেই একটি আশার খবরও এসেছে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন থেকে। একসময় বিলুপ্ত বলে মনে করা এলথাম কপার প্রজাপতি আবার ফিরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্থানীয় মানুষ, পরিবেশবাদী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের আবাসস্থল পুনরুদ্ধার কর্মসূচির ফলে এ প্রজাতির লার্ভার সংখ্যা প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে।

ইয়ারা ভ্যালি ওয়াটারের জীববৈচিত্র্য কর্মকর্তা ক্রিস ফ্যারো বলেন, স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণই এই প্রজাপতির ফিরে আসার সবচেয়ে বড় কারণ।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত