বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক: সম্ভাবনা, প্রত্যাশা ও কিছু ব্যক্তিগত ভাবনা

লেখা:
লেখা:
মো. শাহাদাত হোসেন

প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৬, ১৮: ৩৬
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে। গত কয়েক মাসে দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ হয়েছে। অনুষ্ঠিত হয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ক আলোচনা। এসব তৎপরতা থেকে বোঝা যায়, উভয় দেশই তাদের সম্পর্ককে আরও বাস্তবমুখী ও ফলপ্রসূ করতে আগ্রহী। একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমি এই পরিবর্তনগুলো গভীর আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করছি। এছাড়া, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক ও চীনা ভাষা প্রচারে সম্পৃক্ত থাকার কারণেও বিষয়টি আমার কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

১৯৮৮ সালে যখন প্রথম চীনা ভাষা শেখা শুরু করি, তখন কল্পনাও করিনি যে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নিয়ে এত দীর্ঘ সময় কাজ করার সুযোগ পাব। পরবর্তীকালে আমার চীনে পড়াশোনা করার সুযোগ হয়। যুক্ত হই বিভিন্ন শিক্ষা ও গবেষণামূলক কর্মকাণ্ডে। সেই সঙ্গে পরিচালনা করছি ‘উই স্পিক চাইনিজ ক্লাব বাংলাদেশ লিমিটেড (ডাব্লিউএসসিসি)’-এর কার্যক্রম। এসব অভিজ্ঞতা থেকে আমার একটি উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে, দুটি রাষ্ট্রের সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি কেবল চুক্তি, ঋণ বা অবকাঠামো নয়। বরং এর মূল ভিত্তি হলো মানুষের মধ্যে বিশ্বাস, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার মানসিকতা।

২০২৪ সালের ২০ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ ভবনে একটি গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছিল। এর বিষয়বস্তু ছিল ‘চায়না-বাংলাদেশ রিলেশনস অ্যান্ড বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’। সেখানে চীন ও বাংলাদেশের শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং নীতিনির্ধারণী মহলের প্রতিনিধিদের আলোচনায় একটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে—বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক এখন আর কেবল প্রতীকী বন্ধুত্বের সীমায় আটকে নেই। বরং এটি দ্রুত অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সংযোগভিত্তিক অংশীদারিত্বে পরিণত হচ্ছে।

সম্প্রতি দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতে বেশকিছু বিষয় তুলে ধরা হয়। সেখানে অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে।

তবে আমার কাছে মনে হয়, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা। বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার নীতিতে বিশ্বাসী। তাই কোনো একটি শক্তির দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়া নয়, বরং বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়াই হওয়া উচিত আমাদের মূল লক্ষ্য। আমার এই বিশ্লেষণ ভুলও হতে পারে। তবে বর্তমান আন্তর্জাতিক বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করে আমার কাছে এমনটাই মনে হয়।

যেকোনো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রকল্পের সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে সাধারণ মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রভাবের ওপর। জনগণের হৃদয় ও আস্থা অর্জন করতে না পারলে কোনো প্রকল্পই দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার বিষয়গুলো তাই সর্বাগ্রে বিবেচিত হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে আমি প্রায়ই নিজেকে একটি প্রশ্ন করি। তা হলো—কোন প্রকল্পগুলো সাধারণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে?

আমার মতে, আগামী দিনের সহযোগিতামূলক উদ্যোগে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। দেশের আটটি বিভাগে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা গেলে উন্নয়নের সুফল আরও সমভাবে ছড়িয়ে পড়বে। একইভাবে ঢাকা-কেন্দ্রিক উচ্চগতির রেল যোগাযোগ দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে আরেকটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র হলো ব্লু ইকোনমি বা সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি। বঙ্গোপসাগরের বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে একটি আন্তর্জাতিক মানের সামুদ্রিক গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে সহযোগিতা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দীর্ঘদিন চীনা ভাষা শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। তাই কারিগরি শিক্ষা, ভাষা প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষতা উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। চীনা ভাষাসহ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ভবিষ্যতে হাজার হাজার তরুণের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যেকোনো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রকল্পের সফলতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে সাধারণ মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রভাবের ওপর। জনগণের হৃদয় ও আস্থা অর্জন করতে না পারলে কোনো প্রকল্পই দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার বিষয়গুলো তাই সর্বাগ্রে বিবেচিত হওয়া উচিত।

বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের পঞ্চাশ বছর পূর্তি আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে এবং সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে আগামী কয়েক বছরে এই সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে। তবে সম্পর্কের প্রকৃত সাফল্য কেবল চুক্তি স্বাক্ষরের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। বরং কতজন মানুষের জীবনমান উন্নত হলো, কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো এবং কতটা টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেল—তার ওপরেই এই সাফল্য নির্ধারিত হবে।

সবশেষে, একজন দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষক ও কর্মী হিসেবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো অবকাঠামো, বাণিজ্য বা অর্থায়নের পরিসংখ্যান নয়। বরং এই শক্তির মূল ভিত্তি হলো দুই দেশের জনগণের মধ্যে গড়ে ওঠা আস্থা, বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক সম্মান। এই ভিত্তি যত বেশি শক্তিশালী হবে, উভয় দেশের ভবিষ্যৎ ততটাই উজ্জ্বল হবে।

  • লে. কর্নেল (অব.) মো. শাহাদাত হোসেন: প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক, উই স্পিক চাইনিজ ক্লাব বাংলাদেশ লিমিটেড (ডাব্লিউএসসিসি)
Ad 300x250

সম্পর্কিত