লেখা:

রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ অদ্ভুত ‘ক্লান্তির ফাঁদে’ আটকা পড়েছে। সংকট সমাধানের সমস্ত প্রচেষ্টাই কেবল এই ক্লান্তি সামাল দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। কৌশল পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
বাংলাদেশ দাবি, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনই এই সংকটের বাস্তবসম্মত সমাধান। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো ভিত্তি নেই। নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের সুযোগ না থাকলে এমন প্রচেষ্টা খুব কমই সফল হয়। সরকারি নথিপত্রের অগ্রগতি ও মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার দূরত্বই রোহিঙ্গা কূটনীতিকে থমকে দিয়েছে।
বাংলাদেশ আগেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। কারণ নিরাপত্তা, অধিকার, নাগরিকত্ব এবং মর্যাদার সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা ছাড়া শরণার্থীরা ফিরে যেতে রাজি হয়নি। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে কোনো শিক্ষা হয়নি।
বাংলাদেশ প্রায়ই এই ব্যর্থতাকে পরিবহন, সময় বা চাপের অভাব হিসেবে তুলে ধরে। অথচ এগুলো মূলত রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট। যেসব রোহিঙ্গা শরণার্থী মিয়ানমার ঘুরে এসেছেন, তাঁরা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা সেখানে ফিরে যাবেন না। এই মনোভাব দিন দিন আরও জোরালো হচ্ছে।
সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু সেই সহায়তা এখন অনিশ্চিত। বিশ্বের মনোযোগ এখন ইউক্রেন, গাজা, ইরান এবং পশ্চিম এশিয়ার দিকে ঘুরে গেছে। দাতা সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে তহবিলের প্রবাহ কমিয়ে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উচিত তাদের রোহিঙ্গা নীতি নিয়ে নতুন করে ভাবা।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আশা করা হয়েছিল, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে শুধু কথার ফুলঝুরি না ছুটিয়ে কাজে নামবে। এমনকি নির্বাচনী প্রচারেও রোহিঙ্গা ইস্যু প্রায় অনুপস্থিত ছিল। বেশিরভাগ ভোটারের মনোযোগ ছিল দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দিকে। দশ লাখেরও বেশি শরণার্থীর কথা কেউ ভাবেনি। অনেক রোহিঙ্গা জানিয়েছেন, এই নির্বাচন নিয়ে তাদের কোনো প্রত্যাশাই ছিল না।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, নতুন সরকার কি রোহিঙ্গা কূটনীতিতে নতুন কোনো সাহসী পদক্ষেপ নেবে?
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে ১১ লাখ ৮২ হাজার ৭৫৫ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে ২০২৫ সালের মার্চে ‘জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান ২০২৫-২৬’ চালু করা হয়। এর প্রথম বছরে ১৪ লাখ ৮০ হাজার মানুষকে (রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী মিলে) সহায়তা দেওয়ার জন্য ৯৩ কোটি ৪৫ লাখ ডলার চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই বিশাল বোঝা এভাবে অনন্তকাল বহন করা সম্ভব নয়।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এই সংকটের দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ফেরানোর চেষ্টা করেছিল। তারা জাতিসংঘের সঙ্গে কাজ করেছে, উচ্চ পর্যায়ের কূটনীতিতে জোর দিয়েছে এবং এই ইস্যুকে কেবল মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিরোধ না ভেবে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার বারবার রোহিঙ্গা ইস্যুকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে আনার চেষ্টা করেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইউনূস প্রশাসন খলিলুর রহমানকে রোহিঙ্গা ইস্যুর উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে তাঁকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে রোহিঙ্গা বিষয়ক দায়িত্ব তাঁর দপ্তরের সঙ্গেই রাখা হয়। এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে অন্তর্বর্তী সরকার প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক নিয়মের বাইরে গিয়ে সুনির্দিষ্ট চ্যানেলের মাধ্যমে এই আলোচনা চালাতে চেয়েছিল।
২০২৫ সালের আগস্টে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনের আগে ঢাকা কক্সবাজারে এই ইস্যুর অংশীজনদের নিয়ে সংলাপের আয়োজন করে। এই বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মকর্তা, কূটনীতিক, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। উদ্দেশ্য ছিল সমন্বিত আন্তর্জাতিক সাড়া তৈরি করা। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অধ্যাপক ইউনূস জানান, শরণার্থী সংকটে আরও সম্পদ ব্যয় করার ‘কোনো সুযোগই’ বাংলাদেশের নেই। পরে তিনি বলেন, ‘নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পর বাংলাদেশই দ্বিতীয় ভুক্তভোগী।’
এই কথাগুলো শক্তিশালী শোনালেও বর্তমান নীতির মূল সমস্যা এখানেই লুকিয়ে আছে। আগের সরকারের মতো অন্তর্বর্তী সরকারের কাছেও কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। যদি বছরের পর বছর প্রত্যাবাসন আটকে থাকে তবে বাংলাদেশ কী করবে—এই প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না ইউনূস প্রশাসনের।
একই সময়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে আরাকান আর্মি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে তারা রাখাইন রাজ্যের বেশিরভাগ শহর থেকে জান্তা বাহিনীকে বিতাড়িত করে।
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী প্রধান শহর মংডু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেই আরাকান আর্মির দখলে চলে যায়। স্থিতিশীল সরকারে আছে এই ভিত্তিতেই প্রত্যাবাসন পরিকল্পনাগুলো করা হচ্ছে। কিন্তু রাখাইনে সেই পরিস্থিতি আর নেই। বাংলাদেশকে এখন আর সীমান্তের ওপারে একটি সরকারের সঙ্গে ডিল করতে হচ্ছে না। বাংলাদেশ এখন জান্তা, আরাকান আর্মি, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী, চোরাকারবারি, ত্রাণ সংস্থা এবং সাধারণ মানুষ—সবকিছুর এক অপ্রত্যাশিত সমীকরণে জড়িয়ে আছে।
নিরাপত্তাজনিত সমস্যা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মিয়ানমারে লড়াই করার জন্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এদের কাউকে জোর করে, কাউকে টাকার লোভ দেখিয়ে, আবার কাউকে প্রতিশোধ বা ক্যাম্পের হতাশাজনক জীবনের সুযোগ নিয়ে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রাও বেড়েছে। ক্যাম্পের জীবন যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন মানুষ আর কূটনৈতিক সমাধানের জন্য অপেক্ষা করে না। তারা উগ্রপন্থার খাতায় নাম লেখায়।
ত্রাণ পরিস্থিতিও দিন দিন খারাপ হচ্ছে। ২০২৫ সালের মার্চে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বরাদ্দ কমানোর কথা জানানো হয়। ওই মাসেই রমজান চলাকালে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস কক্সবাজার সফর করেন এবং অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে দেখা করেন। এই সফর রোহিঙ্গা ইস্যুকে আবার খানিকটা আলোচনায় আনলেও বাস্তবে খুব একটা কাজে আসেনি। পুরো রোহিঙ্গা সংকটজুড়ে বাংলাদেশ বারবার এই শিক্ষাই পেয়েছে—শুধু আলোচনায় থাকা মানেই প্রভাব বিস্তার করা নয়।
তবে মাঝেমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপে নতুনভাবে চিন্তার আভাস পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের বসন্তে রাখাইনে জাতিসংঘের তদারকিতে একটি ‘মানবিক করিডোর’ তৈরির আলোচনা শুরু হয়। তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছিলেন, সরকার শর্তসাপেক্ষে এই ধারণায় নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। তবে দেশে কিছুটা বিতর্কের পর সরকার জানায়, কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।
তারপরও ওই মুহূর্তকে ছোট করে দেখা ঠিক হবে না। এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে অন্তর্বর্তী সরকার বুঝতে পেরেছিল, পুরোনো পদ্ধতি আর কাজ করছে না।
বছরের পর বছর ধরে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট নিয়ে বাংলাদেশের কার্যক্রম এক জায়গায় আটকে আছে। বৈঠক চলছে, সরকারি বিবৃতির আকার বড় হচ্ছে, কিন্তু আসল সমাধানের আশা ক্রমশ কমছে। শরণার্থী ক্যাম্পগুলো আরও ঘিঞ্জি হচ্ছে, দাতাদের আগ্রহ কমছে এবং মিয়ানমার আরও বেশি বিভক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ অনেক জোর দিয়ে বিভিন্ন কথা বললেও কোনো সুস্পষ্ট কাজ চোখে পড়ছে না।
নতুন সরকার হয়তো চিরাচরিত পথেই হাঁটতে পারে—ইস্যুকে আন্তর্জাতিকীকরণের চেষ্টা করা, প্রত্যাবাসনকেই একমাত্র সমাধান হিসেবে তুলে ধরা, দাতাদের কাছে সাহায্য চাওয়া এবং মিয়ানমারের পরিস্থিতির উন্নতির আশায় বসে থাকা। ঢাকার রাজনীতির মাঠে এই পদক্ষেপই সবচেয়ে সহজ পথ। কিন্তু এই পথেই ক্লান্তির ফাঁদ আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
যেকোনো বাংলাদেশ সরকারই দাবি করতে পারে, প্রত্যাবাসনই একমাত্র স্থায়ী সমাধান। আসল চ্যালেঞ্জ হলো প্রত্যাবাসনের অপেক্ষার এই সময়ে বাংলাদেশ কী করবে তা পরিষ্কার করা। অথবা রাখাইনের পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয়, অর্থাৎ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও পিছিয়ে যায়, তখন কী হবে তার জবাব দেওয়া।
নতুন সরকারকে শক্তিশালী রোহিঙ্গা নীতিতে একই সঙ্গে কয়েকটি ফ্রন্টে কাজ করতে হবে। প্রত্যাবাসনকে আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য হিসেবে রাখতে হবে, কিন্তু এই জিকির জপলেই সব ঠিক হয়ে যাবে—এমন ভান করা বন্ধ করতে হবে। সরকারকে বুঝতে হবে মিয়ানমারের আনুষ্ঠানিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা এবং বর্তমানে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নিরাপত্তা, শিক্ষা, যাতায়াত এবং ক্যাম্প ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনার জন্য নিবন্ধন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। নীতিতে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সমস্যা থেকে রক্ষার উপায় থাকতে হবে এবং সংকুচিত হয়ে আসা ত্রাণ সহায়তাকে জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগ হিসেবে দেখতে হবে।
ঢাকায় এখনো রোহিঙ্গা ইস্যু নৈতিকভাবে পরিষ্কার বিষয়, তাই নীতি অস্পষ্ট রাখলেও চলবে—এই মনোভাব আছে। এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই—রোহিঙ্গাদের জোর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, মিয়ানমারকে অবশ্যই তাদের ফিরিয়ে নিতে হবে এবং বাংলাদেশকে একা এই বোঝা টানতে দেওয়া উচিত নয়। তবে পরিষ্কার নৈতিক অবস্থান কখনোই নীতিনির্ধারণের বিকল্প হতে পারে না।
২০২৫ সালের জুনে লন্ডনে ড. ইউনূস বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা যদি ‘কোনো আশা’ না দেখে, তবে সেখানে একটি ‘বিস্ফোরণ’ ঘটবে। এখন প্রশ্ন হলো, নতুন সরকার কি এই সতর্কবার্তাকে কেবল আলোচনার খোরাক হিসেবে ব্যবহার করবে, নাকি আসন্ন বিপর্যয় ঠেকাতে বাস্তব কোনো কৌশলের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করবে।
বাংলাদেশ শুধু শরণার্থী, দাতা বা কূটনৈতিক ক্লান্তির সঙ্গেই লড়ছে না। তারা ‘পলিসি ফ্যাটিগ’ বা নীতিগত ক্লান্তির মুখে পড়েছে—অর্থাৎ নতুন ধারণার অভাব দেখা দিয়েছে। দেশটি এখনো খাদের কিনারায় পৌঁছায়নি, কিন্তু খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।
পরিস্থিতি পাল্টে গেলেও বাংলাদেশ এখনো প্রত্যাবাসনকেই একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে আঁকড়ে ধরে আছে। ঢাকাকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে যে প্রত্যাবাসন হয়তো কখনোই শুরু হবে না। যদি কেবল প্রত্যাবাসনের দিকেই একচেটিয়া মনোযোগ দেওয়া হয়, তবে ক্লান্তি আরও বাড়বে।
সে কারণেই নতুন সরকারের উচিত একটি সুনির্দিষ্ট ‘রোহিঙ্গা পলিসি উইং’ প্রতিষ্ঠা করা। এই উইংয়ের ছাতার নিচে কূটনীতি, নিরাপত্তা বিশ্লেষণ, মানবিক পরিকল্পনা, ক্যাম্প পরিচালনা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করার সক্ষমতা থাকতে হবে। নয়তো বাংলাদেশ সংকটের খণ্ড খণ্ড অংশ সামলাতে থাকবে, কিন্তু পুরো বিষয়কে মোকাবিলা করার কোনো সমন্বিত দিকনির্দেশনা থাকবে না।
নতুন সরকার জনসমর্থন নিয়ে কাজ শুরু করেছে এবং এই সমস্যাকে সততার সঙ্গে সংজ্ঞায়িত করার সময় এখনো তাদের হাতে আছে। তারা যদি তা না করে তবে ক্যাম্পগুলো যন্ত্রণার কুঁড়েঘর হিসেবে আরও বড় হতে থাকবে। মিয়ানমারের যুদ্ধের প্রভাব সীমান্তে আছড়ে পড়বে। ঢাকা হয়তো অনেক দেরিতে বুঝতে পারবে, যাকে তারা কেবল বিলম্ব মনে করেছিল, তা আসলে নীতিগত সিদ্ধান্তই ছিল।
রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রে হাত গুটিয়ে বসে থাকার মানে নিরপেক্ষতা নয়, বরং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সবচেয়ে ধীর এবং ধ্বংসাত্মক উপায়।
লেখক পরিচিতি: ড. হেলাল মহিউদ্দীন একজন রোহিঙ্গা গবেষক, লেখক এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত দুটি বইয়ের সম্পাদক। তিনি বর্তমানে কানাডার কনফ্লিক্ট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক এবং নর্থ ড্যাকোটার মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটির লিবারেল আর্টসের সহকারী অধ্যাপক।

রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ অদ্ভুত ‘ক্লান্তির ফাঁদে’ আটকা পড়েছে। সংকট সমাধানের সমস্ত প্রচেষ্টাই কেবল এই ক্লান্তি সামাল দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। কৌশল পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
বাংলাদেশ দাবি, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনই এই সংকটের বাস্তবসম্মত সমাধান। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো ভিত্তি নেই। নিরাপদ, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের সুযোগ না থাকলে এমন প্রচেষ্টা খুব কমই সফল হয়। সরকারি নথিপত্রের অগ্রগতি ও মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার দূরত্বই রোহিঙ্গা কূটনীতিকে থমকে দিয়েছে।
বাংলাদেশ আগেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে প্রত্যাবাসনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। কারণ নিরাপত্তা, অধিকার, নাগরিকত্ব এবং মর্যাদার সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা ছাড়া শরণার্থীরা ফিরে যেতে রাজি হয়নি। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে কোনো শিক্ষা হয়নি।
বাংলাদেশ প্রায়ই এই ব্যর্থতাকে পরিবহন, সময় বা চাপের অভাব হিসেবে তুলে ধরে। অথচ এগুলো মূলত রাজনৈতিক ও মানবিক সংকট। যেসব রোহিঙ্গা শরণার্থী মিয়ানমার ঘুরে এসেছেন, তাঁরা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা সেখানে ফিরে যাবেন না। এই মনোভাব দিন দিন আরও জোরালো হচ্ছে।
সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু সেই সহায়তা এখন অনিশ্চিত। বিশ্বের মনোযোগ এখন ইউক্রেন, গাজা, ইরান এবং পশ্চিম এশিয়ার দিকে ঘুরে গেছে। দাতা সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে তহবিলের প্রবাহ কমিয়ে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের উচিত তাদের রোহিঙ্গা নীতি নিয়ে নতুন করে ভাবা।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আশা করা হয়েছিল, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে শুধু কথার ফুলঝুরি না ছুটিয়ে কাজে নামবে। এমনকি নির্বাচনী প্রচারেও রোহিঙ্গা ইস্যু প্রায় অনুপস্থিত ছিল। বেশিরভাগ ভোটারের মনোযোগ ছিল দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দিকে। দশ লাখেরও বেশি শরণার্থীর কথা কেউ ভাবেনি। অনেক রোহিঙ্গা জানিয়েছেন, এই নির্বাচন নিয়ে তাদের কোনো প্রত্যাশাই ছিল না।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, নতুন সরকার কি রোহিঙ্গা কূটনীতিতে নতুন কোনো সাহসী পদক্ষেপ নেবে?
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে ১১ লাখ ৮২ হাজার ৭৫৫ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে ২০২৫ সালের মার্চে ‘জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান ২০২৫-২৬’ চালু করা হয়। এর প্রথম বছরে ১৪ লাখ ৮০ হাজার মানুষকে (রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী মিলে) সহায়তা দেওয়ার জন্য ৯৩ কোটি ৪৫ লাখ ডলার চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই বিশাল বোঝা এভাবে অনন্তকাল বহন করা সম্ভব নয়।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এই সংকটের দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ ফেরানোর চেষ্টা করেছিল। তারা জাতিসংঘের সঙ্গে কাজ করেছে, উচ্চ পর্যায়ের কূটনীতিতে জোর দিয়েছে এবং এই ইস্যুকে কেবল মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিরোধ না ভেবে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকার বারবার রোহিঙ্গা ইস্যুকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে আনার চেষ্টা করেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ইউনূস প্রশাসন খলিলুর রহমানকে রোহিঙ্গা ইস্যুর উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে তাঁকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে পুনর্নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে রোহিঙ্গা বিষয়ক দায়িত্ব তাঁর দপ্তরের সঙ্গেই রাখা হয়। এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে অন্তর্বর্তী সরকার প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক নিয়মের বাইরে গিয়ে সুনির্দিষ্ট চ্যানেলের মাধ্যমে এই আলোচনা চালাতে চেয়েছিল।
২০২৫ সালের আগস্টে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের সম্মেলনের আগে ঢাকা কক্সবাজারে এই ইস্যুর অংশীজনদের নিয়ে সংলাপের আয়োজন করে। এই বৈঠকে বাংলাদেশি কর্মকর্তা, কূটনীতিক, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। উদ্দেশ্য ছিল সমন্বিত আন্তর্জাতিক সাড়া তৈরি করা। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অধ্যাপক ইউনূস জানান, শরণার্থী সংকটে আরও সম্পদ ব্যয় করার ‘কোনো সুযোগই’ বাংলাদেশের নেই। পরে তিনি বলেন, ‘নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পর বাংলাদেশই দ্বিতীয় ভুক্তভোগী।’
এই কথাগুলো শক্তিশালী শোনালেও বর্তমান নীতির মূল সমস্যা এখানেই লুকিয়ে আছে। আগের সরকারের মতো অন্তর্বর্তী সরকারের কাছেও কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। যদি বছরের পর বছর প্রত্যাবাসন আটকে থাকে তবে বাংলাদেশ কী করবে—এই প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিল না ইউনূস প্রশাসনের।
একই সময়ে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে আরাকান আর্মি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে তারা রাখাইন রাজ্যের বেশিরভাগ শহর থেকে জান্তা বাহিনীকে বিতাড়িত করে।
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী প্রধান শহর মংডু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরেই আরাকান আর্মির দখলে চলে যায়। স্থিতিশীল সরকারে আছে এই ভিত্তিতেই প্রত্যাবাসন পরিকল্পনাগুলো করা হচ্ছে। কিন্তু রাখাইনে সেই পরিস্থিতি আর নেই। বাংলাদেশকে এখন আর সীমান্তের ওপারে একটি সরকারের সঙ্গে ডিল করতে হচ্ছে না। বাংলাদেশ এখন জান্তা, আরাকান আর্মি, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী, চোরাকারবারি, ত্রাণ সংস্থা এবং সাধারণ মানুষ—সবকিছুর এক অপ্রত্যাশিত সমীকরণে জড়িয়ে আছে।
নিরাপত্তাজনিত সমস্যা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে মিয়ানমারে লড়াই করার জন্য নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এদের কাউকে জোর করে, কাউকে টাকার লোভ দেখিয়ে, আবার কাউকে প্রতিশোধ বা ক্যাম্পের হতাশাজনক জীবনের সুযোগ নিয়ে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। সমুদ্রপথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রাও বেড়েছে। ক্যাম্পের জীবন যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন মানুষ আর কূটনৈতিক সমাধানের জন্য অপেক্ষা করে না। তারা উগ্রপন্থার খাতায় নাম লেখায়।
ত্রাণ পরিস্থিতিও দিন দিন খারাপ হচ্ছে। ২০২৫ সালের মার্চে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে বরাদ্দ কমানোর কথা জানানো হয়। ওই মাসেই রমজান চলাকালে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস কক্সবাজার সফর করেন এবং অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে দেখা করেন। এই সফর রোহিঙ্গা ইস্যুকে আবার খানিকটা আলোচনায় আনলেও বাস্তবে খুব একটা কাজে আসেনি। পুরো রোহিঙ্গা সংকটজুড়ে বাংলাদেশ বারবার এই শিক্ষাই পেয়েছে—শুধু আলোচনায় থাকা মানেই প্রভাব বিস্তার করা নয়।
তবে মাঝেমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপে নতুনভাবে চিন্তার আভাস পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের বসন্তে রাখাইনে জাতিসংঘের তদারকিতে একটি ‘মানবিক করিডোর’ তৈরির আলোচনা শুরু হয়। তৎকালীন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছিলেন, সরকার শর্তসাপেক্ষে এই ধারণায় নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। তবে দেশে কিছুটা বিতর্কের পর সরকার জানায়, কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।
তারপরও ওই মুহূর্তকে ছোট করে দেখা ঠিক হবে না। এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে অন্তর্বর্তী সরকার বুঝতে পেরেছিল, পুরোনো পদ্ধতি আর কাজ করছে না।
বছরের পর বছর ধরে রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট নিয়ে বাংলাদেশের কার্যক্রম এক জায়গায় আটকে আছে। বৈঠক চলছে, সরকারি বিবৃতির আকার বড় হচ্ছে, কিন্তু আসল সমাধানের আশা ক্রমশ কমছে। শরণার্থী ক্যাম্পগুলো আরও ঘিঞ্জি হচ্ছে, দাতাদের আগ্রহ কমছে এবং মিয়ানমার আরও বেশি বিভক্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ অনেক জোর দিয়ে বিভিন্ন কথা বললেও কোনো সুস্পষ্ট কাজ চোখে পড়ছে না।
নতুন সরকার হয়তো চিরাচরিত পথেই হাঁটতে পারে—ইস্যুকে আন্তর্জাতিকীকরণের চেষ্টা করা, প্রত্যাবাসনকেই একমাত্র সমাধান হিসেবে তুলে ধরা, দাতাদের কাছে সাহায্য চাওয়া এবং মিয়ানমারের পরিস্থিতির উন্নতির আশায় বসে থাকা। ঢাকার রাজনীতির মাঠে এই পদক্ষেপই সবচেয়ে সহজ পথ। কিন্তু এই পথেই ক্লান্তির ফাঁদ আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা বেশি।
যেকোনো বাংলাদেশ সরকারই দাবি করতে পারে, প্রত্যাবাসনই একমাত্র স্থায়ী সমাধান। আসল চ্যালেঞ্জ হলো প্রত্যাবাসনের অপেক্ষার এই সময়ে বাংলাদেশ কী করবে তা পরিষ্কার করা। অথবা রাখাইনের পরিস্থিতি যদি আরও খারাপ হয়, অর্থাৎ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও পিছিয়ে যায়, তখন কী হবে তার জবাব দেওয়া।
নতুন সরকারকে শক্তিশালী রোহিঙ্গা নীতিতে একই সঙ্গে কয়েকটি ফ্রন্টে কাজ করতে হবে। প্রত্যাবাসনকে আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য হিসেবে রাখতে হবে, কিন্তু এই জিকির জপলেই সব ঠিক হয়ে যাবে—এমন ভান করা বন্ধ করতে হবে। সরকারকে বুঝতে হবে মিয়ানমারের আনুষ্ঠানিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা এবং বর্তমানে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নিরাপত্তা, শিক্ষা, যাতায়াত এবং ক্যাম্প ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনার জন্য নিবন্ধন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। নীতিতে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সমস্যা থেকে রক্ষার উপায় থাকতে হবে এবং সংকুচিত হয়ে আসা ত্রাণ সহায়তাকে জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগ হিসেবে দেখতে হবে।
ঢাকায় এখনো রোহিঙ্গা ইস্যু নৈতিকভাবে পরিষ্কার বিষয়, তাই নীতি অস্পষ্ট রাখলেও চলবে—এই মনোভাব আছে। এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই—রোহিঙ্গাদের জোর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, মিয়ানমারকে অবশ্যই তাদের ফিরিয়ে নিতে হবে এবং বাংলাদেশকে একা এই বোঝা টানতে দেওয়া উচিত নয়। তবে পরিষ্কার নৈতিক অবস্থান কখনোই নীতিনির্ধারণের বিকল্প হতে পারে না।
২০২৫ সালের জুনে লন্ডনে ড. ইউনূস বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা যদি ‘কোনো আশা’ না দেখে, তবে সেখানে একটি ‘বিস্ফোরণ’ ঘটবে। এখন প্রশ্ন হলো, নতুন সরকার কি এই সতর্কবার্তাকে কেবল আলোচনার খোরাক হিসেবে ব্যবহার করবে, নাকি আসন্ন বিপর্যয় ঠেকাতে বাস্তব কোনো কৌশলের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করবে।
বাংলাদেশ শুধু শরণার্থী, দাতা বা কূটনৈতিক ক্লান্তির সঙ্গেই লড়ছে না। তারা ‘পলিসি ফ্যাটিগ’ বা নীতিগত ক্লান্তির মুখে পড়েছে—অর্থাৎ নতুন ধারণার অভাব দেখা দিয়েছে। দেশটি এখনো খাদের কিনারায় পৌঁছায়নি, কিন্তু খুব কাছাকাছি চলে এসেছে।
পরিস্থিতি পাল্টে গেলেও বাংলাদেশ এখনো প্রত্যাবাসনকেই একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে আঁকড়ে ধরে আছে। ঢাকাকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে যে প্রত্যাবাসন হয়তো কখনোই শুরু হবে না। যদি কেবল প্রত্যাবাসনের দিকেই একচেটিয়া মনোযোগ দেওয়া হয়, তবে ক্লান্তি আরও বাড়বে।
সে কারণেই নতুন সরকারের উচিত একটি সুনির্দিষ্ট ‘রোহিঙ্গা পলিসি উইং’ প্রতিষ্ঠা করা। এই উইংয়ের ছাতার নিচে কূটনীতি, নিরাপত্তা বিশ্লেষণ, মানবিক পরিকল্পনা, ক্যাম্প পরিচালনা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করার সক্ষমতা থাকতে হবে। নয়তো বাংলাদেশ সংকটের খণ্ড খণ্ড অংশ সামলাতে থাকবে, কিন্তু পুরো বিষয়কে মোকাবিলা করার কোনো সমন্বিত দিকনির্দেশনা থাকবে না।
নতুন সরকার জনসমর্থন নিয়ে কাজ শুরু করেছে এবং এই সমস্যাকে সততার সঙ্গে সংজ্ঞায়িত করার সময় এখনো তাদের হাতে আছে। তারা যদি তা না করে তবে ক্যাম্পগুলো যন্ত্রণার কুঁড়েঘর হিসেবে আরও বড় হতে থাকবে। মিয়ানমারের যুদ্ধের প্রভাব সীমান্তে আছড়ে পড়বে। ঢাকা হয়তো অনেক দেরিতে বুঝতে পারবে, যাকে তারা কেবল বিলম্ব মনে করেছিল, তা আসলে নীতিগত সিদ্ধান্তই ছিল।
রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রে হাত গুটিয়ে বসে থাকার মানে নিরপেক্ষতা নয়, বরং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সবচেয়ে ধীর এবং ধ্বংসাত্মক উপায়।
লেখক পরিচিতি: ড. হেলাল মহিউদ্দীন একজন রোহিঙ্গা গবেষক, লেখক এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত দুটি বইয়ের সম্পাদক। তিনি বর্তমানে কানাডার কনফ্লিক্ট অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা পরিচালক এবং নর্থ ড্যাকোটার মেভিল স্টেট ইউনিভার্সিটির লিবারেল আর্টসের সহকারী অধ্যাপক।

একটি গাছের পাতা হলদে হয়ে যায় যখন নাইট্রোজেনের অভাব হয়। ফল ঝরে পড়ে যখন ফসফরাস নেই। ডাল শুকিয়ে আসে পটাশিয়াম না পেলে। এই তিনটি উপাদান ছাড়া গাছ বাঁচে না, ফসল হয় না। আর এই তিনটি উপাদানের মূল বাহক হলো রাসায়নিক সার।
৩ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে এটি একটি দুঃখজনক বাস্তবতা যে, এক সরকার এসে পূর্ববর্তী সরকারের সব কাজ, এমনকি ভালো কাজগুলোও বাতিল করে দেয়। এই ‘ভাঙা-গড়ার’ প্রবণতার কারণে সময় ও অর্থ—দুটোরই অপচয় হয়। আমরা এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই।
৫ ঘণ্টা আগে
নতুন প্রজন্ম বা ‘জেন-জি’রা আর বাহাত্তরের সংবিধান চায় না বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ। রবিবার (২৯ মার্চ) জাতীয় সংসদে মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি নিজেকে জেন-জি প্রজন্মের প্রতিনিধি দাবি করে বলেন, ‘আমি এই সংসদের সর্বকনিষ্ঠ এমপি, বাংলাদেশে
৬ ঘণ্টা আগে
গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যের আড়ালে প্রায় ৬৮ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে—গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)-এর এই তথ্য বেশ উদ্বেগজনক। এমনকি এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। কেন না এই তথ্য কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এর ভেতর আছে নানান অপূর্ণতা।
৯ ঘণ্টা আগে