সুমন সুবহান

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭-এর শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন ফ্রান্স সফরে রয়েছেন। এই সফরের মধ্যেই ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ঐতিহাসিক ভার্সাই প্রাসাদে গত ১৭ জুন (বুধবার রাতে) তিনি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতা স্মারকে সই করেন। তবে ইরানের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে চুক্তি স্বাক্ষরের একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও পোস্ট করে এই ঐতিহাসিক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, দুই দেশের প্রেসিডেন্ট দূরবর্তী অবস্থান থেকে চুক্তিটিতে ইলেকট্রনিকভাবে স্বাক্ষর করেছেন।
এই চুক্তির মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চুক্তিটি অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে করা এই সমঝোতা স্মারকের ১৪ দফার নথি প্রকাশ করা হয়েছে। এই ঐতিহাসিক সমঝোতায় অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া এবং ইরানের ওপর থেকে নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের কথা বলা হয়েছে। একই সাথে, ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি সমাধান করার প্রত্যাশাও তুলে ধরা হয়েছে। এই প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এখন দুই দেশের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের একটি সময়সীমা শুরু হলো।
এই নির্ধারিত ৬০ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষ একটি স্থায়ী ও চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কারিগরি ও নীতিগত স্তরে নিবিড় আলোচনা পরিচালনা করবে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং কাতারের সক্রিয় সমর্থনে একটি বিশেষ রূপরেখা তৈরি হয়েছে। সমঝোতার চুক্তি অনুযায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন এই সময়ে দুই দেশই পারস্পরিক যুদ্ধাবস্থা থেকে সাময়িকভাবে বিরত থাকবে। এখন এই ৬০ দিনের সময়সীমার মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে পরবর্তী কারিগরি আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হবে।
সমঝোতার প্রধান শর্তানুযায়ী, আগামী ৬০ দিন ইরানকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ নিরাপদ ও উন্মুক্ত রাখতে হবে। এর বিপরীতে একটি বড় ছাড় হিসেবে মার্কিন প্রশাসন ইরানের ওপর থেকে নির্দিষ্ট কিছু কঠোর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে এবং দেশটির বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ তুলে নিতে সম্মত হয়েছে। এই চুক্তির ফলে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ইরান তেল রপ্তানির সুযোগসহ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক লাইফলাইন ফিরে পেতে যাচ্ছে। তবে ফ্রান্সের সায়েন্সেস পো’র সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক নিকোল গ্রায়েভস্কি মন্তব্য করেছেন যে, এই সমঝোতায় সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলো আপাতত ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণের মতো অত্যন্ত জটিল ও বিতর্কিত বিষয়টি এই ৬০ দিনের চূড়ান্ত আলোচনার ওপরই নির্ভর করছে। ফলে এই সময়সীমার ভেতরে দুই পক্ষ কোনো বাস্তবসম্মত সমাধানে পৌঁছাতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
চুক্তি স্বাক্ষরের খবর প্রকাশের পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত কমতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের গড় দাম কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালন ৪ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। তবে তেলের বাজারে এমন স্বস্তির হাওয়া বইলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির মাঠপর্যায়ের চিত্র এখনো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের উপাত্ত অনুযায়ী, গত তিন দিনে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মোটেও স্বাভাবিক হয়নি। সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও ট্র্যাকিং নিশ্চিতকারী সংস্থা ‘মেরিন ট্রাফিক’-এর দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রোববার প্রাথমিক চুক্তির ঘোষণা আসার পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র সাতটি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সুযোগ পেয়েছে। অথচ বর্তমান যুদ্ধাবস্থা শুরু হওয়ার আগে স্বাভাবিক সময়ে এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৪০টি পণ্যবাহী ও তেলবাহী জাহাজ অত্যন্ত অনায়াসে চলাচল করত।
বর্তমানে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ৫৫০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এখনো প্রণালির দুই পাশে পারস্য উপসাগরীয় জলসীমায় অবরুদ্ধ হয়ে চলাচলের সুযোগের অপেক্ষায় আটকে রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, প্রণালিটি এখন সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং তেল প্রবাহ আবার শুরু হয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই দাবির সাথে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার অমিল রয়েছে এবং ইরানি কর্মকর্তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছেন।
তেহরানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এখনও কোনো বাণিজ্যিক জাহাজকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হলে অবশ্যই ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে পূর্ব সমন্বয় করতে হবে। একই সাথে জাহাজগুলোকে আন্তর্জাতিক জলসীমার পরিবর্তে ইরানের উপকূলের কাছাকাছি নির্ধারিত নিরাপদ পথ অনুসরণ করে চলাচল করার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মূলত ‘ট্যাঙ্কার ট্র্যাকার্স’-এর তথ্যমতে এই সাতটি জাহাজের কয়েকটি ছিল ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার, যা দুই মাসের মধ্যে ইরানের প্রথম অপরিশোধিত তেল রপ্তানির চিত্র তুলে ধরে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি সত্ত্বেও সামুদ্রিক পরিবহন ও আন্তর্জাতিক বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো চরম সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ডেনমার্কভিত্তিক জিসকে ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ ইকুইটি বিশ্লেষক হায়দার আনজুম আল-জাজিরাকে জানান, প্রণালি সচল করার ক্ষেত্রে প্রধান তিনটি বাধা কাজ করছে। মূলত পানির নিচের মাইন, বিমার আকাশচুম্বী খরচ এবং ইরানের একতরফা টোল নীতিই জাহাজ চলাচলের গতিকে শ্লথ করে দিয়েছে। এই তিনটি বড় সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের যাতায়াত স্বাভাবিক হওয়া কঠিন।
যুদ্ধের শুরুতে ইরানের মাইন পাতার হুমকির কারণে হরমুজ প্রণালির পানির নিচে মাইন থাকার আশঙ্কা এখনো কাটেনি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সিনেটের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির শুনানিতেও এই মারাত্মক ঝুঁকির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন। সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জলপথের পুরো করিডোরটি সম্পূর্ণ মাইনমুক্ত করতে অন্তত দুই মাস সময় লেগে যেতে পারে। ফলে রাজনৈতিক স্তরে সমঝোতা হলেও নাবিক ও জাহাজ মালিকেরা এখনই এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহারের সাহস পাচ্ছেন না।
চলমান যুদ্ধাবস্থার কারণে এই রুটে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের যুদ্ধঝুঁকিসংক্রান্ত বিমার কিস্তি নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পায়। যুদ্ধ চলাকালে বিমার এই কিস্তির হার জাহাজের মূল্যের স্বাভাবিক ০.২৫% থেকে বেড়ে রেকর্ড ৫%-এ গিয়ে পৌঁছেছিল। চুক্তি স্বাক্ষরের পর বর্তমানে তা কিছুটা কমে ১ থেকে ৩%-এ নামলেও তা স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে অনেক বেশি। বিমার এই অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা বহন করা অধিকাংশ জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী হরমুজের মতো কোনো প্রাকৃতিক প্রণালিতে সরাসরি টোল বা ফি আদায় করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে এই আইনকে পাশ কাটিয়ে ইরান গত মে মাসে 'পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ' নামে একটি নতুন সংস্থা গঠন করেছে। তারা এই জলপথে নিরাপদ যাতায়াত ও নিরাপত্তা সমন্বয়ের নামে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে একতরফা ফি আদায়ের চেষ্টা করছে। সমুদ্রপথে অবাধ চলাচলের নীতি পরিপন্থী ইরানের এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও জিসিসিভুক্ত দেশগুলো।
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতায় বিপর্যস্ত ইরানের জন্য এই ওয়াশিংটন-তেহরান চুক্তিটি একটি বড় লাইফলাইন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন, ইরাক, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংক হিসাবে ইরানের মালিকানাধীন প্রায় ১০০ বিলিয়ন তথা ১০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ আটকে রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা কড়া মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বিভিন্ন দেশের ব্যাংক ও সরকার এই বিপুল পরিমাণ অর্থ তেহরানে অবাধে স্থানান্তর করতে পারছিল না। তবে বর্তমান যুদ্ধবিরতি ও প্রাথমিক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর এই অবরুদ্ধ অর্থ উদ্ধারের বিষয়টি ইরানের জন্য এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। তেহরানের নীতিনির্ধারকেরা এখন তাদের বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার ব্যাপক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই বিশাল অঙ্কের তহবিল থেকে অন্তত ২৪ বিলিয়ন বা ২,৪০০ কোটি ডলার ধাপে ধাপে ছাড় করার জন্য মার্কিন প্রশাসনের ওপর জোর দাবি জানাচ্ছেন।
ইরানের বাইরে আটকে থাকা সম্পদের সবচেয়ে বড় অংশটি রয়েছে চীনের কাছে, যার আনুমানিক পরিমাণ ২ হাজার কোটি থেকে ৫ হাজার কোটি ডলার। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই চীন ছিল ইরানের সবচেয়ে বড় জ্বালানি ক্রেতা এবং বছরের পর বছর ধরে তেল বিক্রির পুঞ্জীভূত অর্থই বেইজিংয়ের ব্যাংকে জমা হয়ে আছে। এছাড়া ইরান থেকে বিদ্যুৎ এবং প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির বকেয়া বিলবাবদ প্রায় ১,০০০ কোটি থেকে ১,৫০০ কোটি ডলার আটকে রয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাকের কাছে। অপরদিকে, ২০১৮ সালে ওয়াশিংটন পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার আগে ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া ছিল ইরানের অন্যতম বৃহৎ তেল ক্রেতা। সেই অপরিশোধিত তেল ক্রয়ের মূল্যবাবদ বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রায় ৭০০ কোটি ডলার করে মোট ১,৪০০ কোটি ডলার অবরুদ্ধ অবস্থায় আছে। এই আটকে থাকা আন্তর্জাতিক সম্পদ যদি শেষ পর্যন্ত তেহরান উদ্ধার করতে পারে, তবে তা তাদের জাতীয় মুদ্রার মান স্থিতিশীল করতে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে অন্যতম বড় পুরস্কার হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া এই আকস্মিক সমঝোতা স্মারক ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য একটি চরম ‘রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন’ এবং ব্যক্তিগতভাবে বড় আঘাত হিসেবে দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের অক্টোবরে ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ, বিচার বিভাগীয় সংস্কার নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্ক এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা থেকে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের হামলার সময় জনগণকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে ৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহু আগে থেকেই তীব্র সমালোচনার মুখে ছিলেন। এখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা এবং ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক সামলানোর বিষয়েও তাঁকে সরাসরি ভোটারদের কঠিন বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। জনমত জরিপ অনুযায়ী, এই চুক্তি হওয়ার আগেই নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট আসন্ন নির্বাচনে চরম পরাজয়ের পথে রয়েছে। এই ভঙ্গুর পরিস্থিতির মাঝেই ট্রাম্পের যুদ্ধ অবসানের আকস্মিক সিদ্ধান্ত তাঁর নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার শেষ আশাটুকুও ধূলিসাৎ করে দিল।
লিকুদ পার্টির এই যুদ্ধবাজ নেতা গত মার্চ মাসেও দম্ভভরে বলেছিলেন, "আমরা মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দিচ্ছি"। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করার পর মার্চের শুরুতে দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল ইসরায়েল। দিন যত গড়িয়েছে, নেতানিয়াহুর সেই কট্টরপন্থী দম্ভোক্তি ক্রমে ফাঁপা বুলিতে পরিণত হয়েছে, কারণ তিনি গাজা ও লেবাননে কোনো স্থায়ী বিজয়ের দেখা পাননি। বরং তাঁর একগুঁয়ে সামরিক অভিযানের কারণে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ইসরায়েলি সামরিক মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু ইসরায়েলের লক্ষ্য পূরণ হওয়ার অনেক আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের শর্ত মেনে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের উল্লেখসহ সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন। এই চুক্তির ফলে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য হওয়ার মাধ্যমে নেতানিয়াহুর এতদিনের তৈরি করা কট্টরপন্থী ও কঠোর নিরাপত্তাপন্থী ভাবমূর্তি দেশের ভেতরে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
দেশের অভ্যন্তরে সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন যে, নেতানিয়াহু গাজা সীমান্তের নিরাপত্তা থেকে নজর সরিয়ে নিয়েছিলেন এবং হামাসকে বাস্তব হুমকি হিসেবে গুরুত্ব দেননি। বেশির ভাগ ইসরায়েলি যুদ্ধকে সমর্থন করলেও শীর্ষ জেনারেল এবং জিম্মিদের পরিবারের সদস্যরা নেতানিয়াহুর যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল ও স্পষ্ট পরিকল্পনাহীনতার তীব্র সমালোচনা করেছেন। হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহ বা ইরানের সর্বোচ্চ নেতার হত্যাকাণ্ড উগ্রপন্থী ইহুদিরা উদ্যাপন করলেও হামাস এখনো গাজার বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ করছে এবং হিজবুল্লাহও সক্রিয় রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করে ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, "নেতানিয়াহু যুদ্ধ হেরে গেছেন, তিনি কোনো কিছুই অর্জন করতে পারেননি—চূড়ান্ত পরীক্ষার সময় তিনি ভেঙে পড়েছেন"। নেতানিয়াহু এসব সমালোচনাকে ইসরায়েলের অর্জনকে খাটো করে দেখানোর প্রচার বলে নিন্দা করলেও, ভোটারদের অসন্তোষ এবং মিত্র ট্রাম্পের এই বৈরী সিদ্ধান্ত তাঁকে এক নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক চুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের সভাপতি জামাল আবদি এই সমঝোতাকে দীর্ঘদিনের ব্যর্থ ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতির একটি ইতিবাচক ও বাস্তবসম্মত সংশোধন বলে অভিহিত করেছেন। তবে এই সাময়িক স্বস্তির সমান্তরালে চুক্তিটির স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় ও ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগও কোনো অংশে কম নয়।
বিবিসির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, ইরান যদি এই ৬০ দিনের মধ্যে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না করে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ না করে, তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ আবারও তাদের ওপর তীব্র সামরিক অভিযান শুরু করতে এবং কঠোরতম অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। এছাড়া ব্রিটেনের মতো ইউরোপীয় মিত্রদেরও এই জলপথে মাইন অপসারণের মতো অভিযানে আরও বড় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। বর্তমান এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির আবহে আগামী ৬০ দিন তাই শুধু মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য নয়, বরং সমগ্র বিশ্বরাজনীতি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণের জন্য এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অগ্নিপরীক্ষা।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭-এর শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন ফ্রান্স সফরে রয়েছেন। এই সফরের মধ্যেই ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ঐতিহাসিক ভার্সাই প্রাসাদে গত ১৭ জুন (বুধবার রাতে) তিনি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতা স্মারকে সই করেন। তবে ইরানের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সকালে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে চুক্তি স্বাক্ষরের একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও পোস্ট করে এই ঐতিহাসিক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, দুই দেশের প্রেসিডেন্ট দূরবর্তী অবস্থান থেকে চুক্তিটিতে ইলেকট্রনিকভাবে স্বাক্ষর করেছেন।
এই চুক্তির মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চুক্তিটি অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে করা এই সমঝোতা স্মারকের ১৪ দফার নথি প্রকাশ করা হয়েছে। এই ঐতিহাসিক সমঝোতায় অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া এবং ইরানের ওপর থেকে নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের কথা বলা হয়েছে। একই সাথে, ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি সমাধান করার প্রত্যাশাও তুলে ধরা হয়েছে। এই প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এখন দুই দেশের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের একটি সময়সীমা শুরু হলো।
এই নির্ধারিত ৬০ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষ একটি স্থায়ী ও চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কারিগরি ও নীতিগত স্তরে নিবিড় আলোচনা পরিচালনা করবে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং কাতারের সক্রিয় সমর্থনে একটি বিশেষ রূপরেখা তৈরি হয়েছে। সমঝোতার চুক্তি অনুযায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন এই সময়ে দুই দেশই পারস্পরিক যুদ্ধাবস্থা থেকে সাময়িকভাবে বিরত থাকবে। এখন এই ৬০ দিনের সময়সীমার মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে পরবর্তী কারিগরি আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হবে।
সমঝোতার প্রধান শর্তানুযায়ী, আগামী ৬০ দিন ইরানকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ নিরাপদ ও উন্মুক্ত রাখতে হবে। এর বিপরীতে একটি বড় ছাড় হিসেবে মার্কিন প্রশাসন ইরানের ওপর থেকে নির্দিষ্ট কিছু কঠোর আর্থিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে এবং দেশটির বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ তুলে নিতে সম্মত হয়েছে। এই চুক্তির ফলে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটে থাকা ইরান তেল রপ্তানির সুযোগসহ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক লাইফলাইন ফিরে পেতে যাচ্ছে। তবে ফ্রান্সের সায়েন্সেস পো’র সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক নিকোল গ্রায়েভস্কি মন্তব্য করেছেন যে, এই সমঝোতায় সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলো আপাতত ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণের মতো অত্যন্ত জটিল ও বিতর্কিত বিষয়টি এই ৬০ দিনের চূড়ান্ত আলোচনার ওপরই নির্ভর করছে। ফলে এই সময়সীমার ভেতরে দুই পক্ষ কোনো বাস্তবসম্মত সমাধানে পৌঁছাতে পারে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
চুক্তি স্বাক্ষরের খবর প্রকাশের পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত কমতে শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের গড় দাম কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালন ৪ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। তবে তেলের বাজারে এমন স্বস্তির হাওয়া বইলেও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির মাঠপর্যায়ের চিত্র এখনো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের উপাত্ত অনুযায়ী, গত তিন দিনে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মোটেও স্বাভাবিক হয়নি। সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও ট্র্যাকিং নিশ্চিতকারী সংস্থা ‘মেরিন ট্রাফিক’-এর দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, রোববার প্রাথমিক চুক্তির ঘোষণা আসার পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র সাতটি বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার সুযোগ পেয়েছে। অথচ বর্তমান যুদ্ধাবস্থা শুরু হওয়ার আগে স্বাভাবিক সময়ে এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৪০টি পণ্যবাহী ও তেলবাহী জাহাজ অত্যন্ত অনায়াসে চলাচল করত।
বর্তমানে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ৫৫০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এখনো প্রণালির দুই পাশে পারস্য উপসাগরীয় জলসীমায় অবরুদ্ধ হয়ে চলাচলের সুযোগের অপেক্ষায় আটকে রয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, প্রণালিটি এখন সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং তেল প্রবাহ আবার শুরু হয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই দাবির সাথে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার অমিল রয়েছে এবং ইরানি কর্মকর্তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছেন।
তেহরানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এখনও কোনো বাণিজ্যিক জাহাজকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হলে অবশ্যই ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে পূর্ব সমন্বয় করতে হবে। একই সাথে জাহাজগুলোকে আন্তর্জাতিক জলসীমার পরিবর্তে ইরানের উপকূলের কাছাকাছি নির্ধারিত নিরাপদ পথ অনুসরণ করে চলাচল করার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মূলত ‘ট্যাঙ্কার ট্র্যাকার্স’-এর তথ্যমতে এই সাতটি জাহাজের কয়েকটি ছিল ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার, যা দুই মাসের মধ্যে ইরানের প্রথম অপরিশোধিত তেল রপ্তানির চিত্র তুলে ধরে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি সত্ত্বেও সামুদ্রিক পরিবহন ও আন্তর্জাতিক বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো চরম সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ডেনমার্কভিত্তিক জিসকে ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ ইকুইটি বিশ্লেষক হায়দার আনজুম আল-জাজিরাকে জানান, প্রণালি সচল করার ক্ষেত্রে প্রধান তিনটি বাধা কাজ করছে। মূলত পানির নিচের মাইন, বিমার আকাশচুম্বী খরচ এবং ইরানের একতরফা টোল নীতিই জাহাজ চলাচলের গতিকে শ্লথ করে দিয়েছে। এই তিনটি বড় সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের যাতায়াত স্বাভাবিক হওয়া কঠিন।
যুদ্ধের শুরুতে ইরানের মাইন পাতার হুমকির কারণে হরমুজ প্রণালির পানির নিচে মাইন থাকার আশঙ্কা এখনো কাটেনি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সিনেটের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির শুনানিতেও এই মারাত্মক ঝুঁকির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন। সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জলপথের পুরো করিডোরটি সম্পূর্ণ মাইনমুক্ত করতে অন্তত দুই মাস সময় লেগে যেতে পারে। ফলে রাজনৈতিক স্তরে সমঝোতা হলেও নাবিক ও জাহাজ মালিকেরা এখনই এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহারের সাহস পাচ্ছেন না।
চলমান যুদ্ধাবস্থার কারণে এই রুটে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের যুদ্ধঝুঁকিসংক্রান্ত বিমার কিস্তি নজিরবিহীনভাবে বৃদ্ধি পায়। যুদ্ধ চলাকালে বিমার এই কিস্তির হার জাহাজের মূল্যের স্বাভাবিক ০.২৫% থেকে বেড়ে রেকর্ড ৫%-এ গিয়ে পৌঁছেছিল। চুক্তি স্বাক্ষরের পর বর্তমানে তা কিছুটা কমে ১ থেকে ৩%-এ নামলেও তা স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে অনেক বেশি। বিমার এই অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা বহন করা অধিকাংশ জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী হরমুজের মতো কোনো প্রাকৃতিক প্রণালিতে সরাসরি টোল বা ফি আদায় করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে এই আইনকে পাশ কাটিয়ে ইরান গত মে মাসে 'পারস্য উপসাগর প্রণালি কর্তৃপক্ষ' নামে একটি নতুন সংস্থা গঠন করেছে। তারা এই জলপথে নিরাপদ যাতায়াত ও নিরাপত্তা সমন্বয়ের নামে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকে একতরফা ফি আদায়ের চেষ্টা করছে। সমুদ্রপথে অবাধ চলাচলের নীতি পরিপন্থী ইরানের এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও জিসিসিভুক্ত দেশগুলো।
দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতায় বিপর্যস্ত ইরানের জন্য এই ওয়াশিংটন-তেহরান চুক্তিটি একটি বড় লাইফলাইন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীন, ইরাক, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যাংক হিসাবে ইরানের মালিকানাধীন প্রায় ১০০ বিলিয়ন তথা ১০ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ আটকে রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা কড়া মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে বিভিন্ন দেশের ব্যাংক ও সরকার এই বিপুল পরিমাণ অর্থ তেহরানে অবাধে স্থানান্তর করতে পারছিল না। তবে বর্তমান যুদ্ধবিরতি ও প্রাথমিক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর এই অবরুদ্ধ অর্থ উদ্ধারের বিষয়টি ইরানের জন্য এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। তেহরানের নীতিনির্ধারকেরা এখন তাদের বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার ব্যাপক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই বিশাল অঙ্কের তহবিল থেকে অন্তত ২৪ বিলিয়ন বা ২,৪০০ কোটি ডলার ধাপে ধাপে ছাড় করার জন্য মার্কিন প্রশাসনের ওপর জোর দাবি জানাচ্ছেন।
ইরানের বাইরে আটকে থাকা সম্পদের সবচেয়ে বড় অংশটি রয়েছে চীনের কাছে, যার আনুমানিক পরিমাণ ২ হাজার কোটি থেকে ৫ হাজার কোটি ডলার। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই চীন ছিল ইরানের সবচেয়ে বড় জ্বালানি ক্রেতা এবং বছরের পর বছর ধরে তেল বিক্রির পুঞ্জীভূত অর্থই বেইজিংয়ের ব্যাংকে জমা হয়ে আছে। এছাড়া ইরান থেকে বিদ্যুৎ এবং প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির বকেয়া বিলবাবদ প্রায় ১,০০০ কোটি থেকে ১,৫০০ কোটি ডলার আটকে রয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইরাকের কাছে। অপরদিকে, ২০১৮ সালে ওয়াশিংটন পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার আগে ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়া ছিল ইরানের অন্যতম বৃহৎ তেল ক্রেতা। সেই অপরিশোধিত তেল ক্রয়ের মূল্যবাবদ বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রায় ৭০০ কোটি ডলার করে মোট ১,৪০০ কোটি ডলার অবরুদ্ধ অবস্থায় আছে। এই আটকে থাকা আন্তর্জাতিক সম্পদ যদি শেষ পর্যন্ত তেহরান উদ্ধার করতে পারে, তবে তা তাদের জাতীয় মুদ্রার মান স্থিতিশীল করতে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে অন্যতম বড় পুরস্কার হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া এই আকস্মিক সমঝোতা স্মারক ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য একটি চরম ‘রাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন’ এবং ব্যক্তিগতভাবে বড় আঘাত হিসেবে দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের অক্টোবরে ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ, বিচার বিভাগীয় সংস্কার নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্ক এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা থেকে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের হামলার সময় জনগণকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে ৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহু আগে থেকেই তীব্র সমালোচনার মুখে ছিলেন। এখন ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা এবং ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক সামলানোর বিষয়েও তাঁকে সরাসরি ভোটারদের কঠিন বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। জনমত জরিপ অনুযায়ী, এই চুক্তি হওয়ার আগেই নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট আসন্ন নির্বাচনে চরম পরাজয়ের পথে রয়েছে। এই ভঙ্গুর পরিস্থিতির মাঝেই ট্রাম্পের যুদ্ধ অবসানের আকস্মিক সিদ্ধান্ত তাঁর নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার শেষ আশাটুকুও ধূলিসাৎ করে দিল।
লিকুদ পার্টির এই যুদ্ধবাজ নেতা গত মার্চ মাসেও দম্ভভরে বলেছিলেন, "আমরা মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দিচ্ছি"। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করার পর মার্চের শুরুতে দক্ষিণ লেবাননে নতুন করে সামরিক অভিযান চালিয়েছিল ইসরায়েল। দিন যত গড়িয়েছে, নেতানিয়াহুর সেই কট্টরপন্থী দম্ভোক্তি ক্রমে ফাঁপা বুলিতে পরিণত হয়েছে, কারণ তিনি গাজা ও লেবাননে কোনো স্থায়ী বিজয়ের দেখা পাননি। বরং তাঁর একগুঁয়ে সামরিক অভিযানের কারণে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ইসরায়েলি সামরিক মৃত্যুর সংখ্যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু ইসরায়েলের লক্ষ্য পূরণ হওয়ার অনেক আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের শর্ত মেনে লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের উল্লেখসহ সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন। এই চুক্তির ফলে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য হওয়ার মাধ্যমে নেতানিয়াহুর এতদিনের তৈরি করা কট্টরপন্থী ও কঠোর নিরাপত্তাপন্থী ভাবমূর্তি দেশের ভেতরে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।
দেশের অভ্যন্তরে সমালোচকেরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন যে, নেতানিয়াহু গাজা সীমান্তের নিরাপত্তা থেকে নজর সরিয়ে নিয়েছিলেন এবং হামাসকে বাস্তব হুমকি হিসেবে গুরুত্ব দেননি। বেশির ভাগ ইসরায়েলি যুদ্ধকে সমর্থন করলেও শীর্ষ জেনারেল এবং জিম্মিদের পরিবারের সদস্যরা নেতানিয়াহুর যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল ও স্পষ্ট পরিকল্পনাহীনতার তীব্র সমালোচনা করেছেন। হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহ বা ইরানের সর্বোচ্চ নেতার হত্যাকাণ্ড উগ্রপন্থী ইহুদিরা উদ্যাপন করলেও হামাস এখনো গাজার বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ করছে এবং হিজবুল্লাহও সক্রিয় রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করে ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, "নেতানিয়াহু যুদ্ধ হেরে গেছেন, তিনি কোনো কিছুই অর্জন করতে পারেননি—চূড়ান্ত পরীক্ষার সময় তিনি ভেঙে পড়েছেন"। নেতানিয়াহু এসব সমালোচনাকে ইসরায়েলের অর্জনকে খাটো করে দেখানোর প্রচার বলে নিন্দা করলেও, ভোটারদের অসন্তোষ এবং মিত্র ট্রাম্পের এই বৈরী সিদ্ধান্ত তাঁকে এক নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক চুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের সভাপতি জামাল আবদি এই সমঝোতাকে দীর্ঘদিনের ব্যর্থ ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতির একটি ইতিবাচক ও বাস্তবসম্মত সংশোধন বলে অভিহিত করেছেন। তবে এই সাময়িক স্বস্তির সমান্তরালে চুক্তিটির স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় ও ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগও কোনো অংশে কম নয়।
বিবিসির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তেহরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, ইরান যদি এই ৬০ দিনের মধ্যে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না করে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ না করে, তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ আবারও তাদের ওপর তীব্র সামরিক অভিযান শুরু করতে এবং কঠোরতম অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। এছাড়া ব্রিটেনের মতো ইউরোপীয় মিত্রদেরও এই জলপথে মাইন অপসারণের মতো অভিযানে আরও বড় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। বর্তমান এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির আবহে আগামী ৬০ দিন তাই শুধু মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য নয়, বরং সমগ্র বিশ্বরাজনীতি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণের জন্য এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ অগ্নিপরীক্ষা।

ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য অনুসারে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের সংখ্যা ছিল ৪১ দশমিক ৬ মিলিয়ন, যা ২০১৫ সালে ছিল ২১ দশমিক ৩ মিলিয়ন। এই পরিসংখানের সঙ্গে শরণার্থী ব্যতীতও বিশ্বের সমগ্র বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী যারা নানা কারণে নিজ দেশেই বাস্তুচ্যুত হয়ে পরে (আইডিপি) এবং বিভিন্ন দেশে যারা শরণার্থী
৪ ঘণ্টা আগে
গত বছরের বেশির ভাগ সময়জুড়ে টানাপোড়েনের পর চলতি বছরের এপ্রিলে ভারত ও বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনরায় স্বাভাবিক করার অঙ্গীকার করেছিল। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে নয়াদিল্লিতে ভারতীয় কর্মকর্তাদের আচরণ সেই আশাবাদে নতুন করে ধাক্কা দিয়েছে।
১৬ ঘণ্টা আগে
বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ নাগরিক রাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে এখনো সেবাগ্রহীতা ও সেবাদাতার সম্পর্ক হিসেবে দেখেন। অথচ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক কেবল সুবিধাভোগী নন; তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম অংশীদ্বার।
১৮ ঘণ্টা আগে
ঢাকার পল্লবীতে আট বছরের শিশুকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার ঘটনা আমাদের বিমূঢ় করেছিল। জানা যায়, ঘাতক ছিল মাদকাসক্ত। তার মধ্যে ছিল পাশবিক প্রবণতা।
২০ ঘণ্টা আগে