leadT1ad

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নতুন সংকট: রোহিঙ্গাদের গণ্ডি ছাড়িয়ে

লেখা:
লেখা:
সাকলাইন রিজভী

নাফ নদীতে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের অপহরণ, আটক এবং হয়রানির অভিযোগ নিয়মিতই শোনা যাচ্ছে। ছবি: ডিপ্লোম্যাট থেকে নেওয়া

বাংলাদেশের মিয়ানমারনীতি নিয়ে কথা উঠলে সাধারণত রোহিঙ্গা সংকটের কথাই সামনে আসে। তবে রোহিঙ্গা সংকট ছাড়াও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে। এখন শুধু রোহিঙ্গা নয়, সীমান্তসংক্রান্ত নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখেও পড়ছেন বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকরা।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি ৯ বছর বয়সী হুজাইফা সুলতানা ঢাকার একটি হাসপাতালে মারা যায়। মিয়ানমার সীমান্তের ওপার থেকে ছোড়া একটি গুলি তার মাথায় লেগেছিল। সেদিন দাদার সঙ্গে দোকানে নাশতা কিনতে গিয়েছিল হুজাইফা। বাড়ি ফেরার পথেই এই দুর্ঘটনা ঘটে।

এর কিছুদিন পর ২৮ মার্চ টেকনাফের ১৩ জন বাংলাদেশি জেলেকে নাফ নদীতে মাছ ধরার সময় আরাকান আর্মি (এএ) আটক করে বলে খবর আসে। আবার ২৪ মে নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে স্থলমাইনের বিস্ফোরণে তিন বাংলাদেশি নিহত হন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে এমন ঘটনার সংখ্যা কম নয়। নাফ নদীতে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের অপহরণ, আটক এবং হয়রানির অভিযোগ নিয়মিতই শোনা যাচ্ছে। ফলে সীমান্তবর্তী এলাকার বহু মানুষের জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এসব ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে, মিয়ানমারের সংঘাত আর শুধু সীমান্তের ওপারের সমস্যা নয়, এর প্রভাব এখন বাংলাদেশের ভেতরেও অনুভূত হচ্ছে।

রোহিঙ্গা সংকট থেকে নতুন বাস্তবতায়

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের মিয়ানমার নীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল রোহিঙ্গা সংকট। ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা রাখাইন থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আগের ঢল মিলিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি।

তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনই এতদিন বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার ছিল। তবে ২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটি গৃহযুদ্ধের দিকে চলে যায়। এই পরিস্থিতিতে রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা বিস্তীর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। ফলে নাফ নদীর ওপারের অনেক অঞ্চল এখন মিয়ানমার সরকারের নয়, আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে।

নাফ নদীতে জেলেদের আতঙ্ক

এই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রভাব দেখা যাচ্ছে নাফ নদীতে। বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি), স্থানীয় প্রশাসন ও জেলেদের সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর থেকে শত শত বাংলাদেশি জেলেকে আটক করেছে আরাকান আর্মি। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর মংডু শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে অন্তত ৩৯৯ জন বাংলাদেশি জেলে অপহরণ বা আটক হয়েছেন।

চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত তাদের মধ্যে প্রায় ১৬৫ জন এখনও আরাকান আর্মির হেফাজতে রয়েছেন। কেউ কেউ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে আটক। অনেক পরিবার এখনও জানে না তাদের স্বজন বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন। অনেকের মতে, এটি এখন কার্যত একটি জিম্মি সংকটে পরিণত হয়েছে।

জীবিকা হারাচ্ছে সীমান্তের মানুষ

দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের অনেক এলাকায় মানুষের আয়ের প্রধান উৎস মাছ ধরা। সমুদ্রে যাওয়ার আগে অনেক জেলে নৌকার মালিক বা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঋণ নেন। তারা আটক হলে পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে যায়, অথচ ঋণের বোঝা থেকেই যায়।

নাফ নদীর ভৌগোলিক অবস্থানও এই সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে। নদীটি সরু, জোয়ার-ভাটার প্রভাব প্রবল এবং নৌচলাচলও কঠিন। তীব্র স্রোত, পরিবর্তনশীল চর ও অস্পষ্ট সীমারেখার কারণে অনেক সময় জেলেদের নৌকা অনিচ্ছাকৃতভাবে মিয়ানমারের দিকে চলে যায়।

বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছে, অনেক ক্ষেত্রে জেলেরা ভুলবশত সীমান্ত অতিক্রম করেন। মুক্তি পাওয়া কয়েকজন জেলে অভিযোগ করেছেন, আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রিত ক্যাম্পগুলোতে তাদের কঠিন পরিস্থিতিতে রাখা হয়েছিল। কেউ কেউ দাবি করেছেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থও দাবি করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জেলেদের নৌকা, জাল কিংবা ধরা মাছও ফেরত দেওয়া হয়নি।

শুধু জেলে নয়, বড় এক পরিবর্তনের ইঙ্গিত

জেলেদের আটক করার ঘটনাগুলো শুধু মানবিক সংকট নয়। এর মাধ্যমে আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান ক্ষমতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সীমান্তের অনেক এলাকায় তারা শুধু ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে না, বরং চলাচল নিয়ন্ত্রণ, নিজস্ব নিয়ম প্রয়োগ এবং সীমান্তনির্ভর মানুষের জীবিকাকেও প্রভাবিত করছে—যা সাধারণত একটি রাষ্ট্রের কাজ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই এখানে বাংলাদেশের জন্য বড় এক কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত দ্বিধা তৈরি হয়েছে।

আরাকান আর্মি সীমান্তের ওপারে বাস্তব ক্ষমতার অধিকারী হলেও এটি কোনো স্বীকৃত সরকার নয়। ফলে বাংলাদেশ তাদের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক চ্যানেলে যোগাযোগ করতে পারে না। কিন্তু সীমান্তের বাস্তবতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কার্যকর সমাধানের জন্য সীমান্তের ওপারে কর্তৃত্বকারী শক্তির সঙ্গে কোনো না কোনো ধরনের যোগাযোগের প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে।

সীমান্ত ব্যবস্থাপনার নতুন চ্যালেঞ্জ

২০২৫ সালের একটি গবেষণায় বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তকে দেশের সবচেয়ে জটিল সীমান্তগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মাত্র ২৭১ কিলোমিটার স্থলসীমান্ত হলেও এখানে পাহাড়, বন, নদী ও উপকূলীয় পথ রয়েছে, যা নজরদারি ও আইন প্রয়োগকে কঠিন করে তোলে।

গবেষকরা চোরাচালান, মাদক পাচার, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, দারিদ্র্য, রোহিঙ্গা সংকট এবং মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এই দুর্বলতাগুলোকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। রাখাইনে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ভূখণ্ড, বাণিজ্যপথ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব বাড়িয়েছে। ফলে বাংলাদেশের পাশেই এমন একটি অঞ্চল তৈরি হয়েছে, যেখানে সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি সবসময় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার নয়।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনও এখন আরও জটিল

এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ প্রত্যাবাসনও অনেকাংশে রাখাইনের বাস্তব পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। এতদিন বাংলাদেশ মূলত মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে এসেছে।

কিন্তু রাখাইনের বড় অংশ যদি আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে প্রত্যাবাসনের বাস্তবতা নির্ধারণে তাদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ সীমান্ত নিরাপত্তা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং রোহিঙ্গা নীতি—সবকিছু এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।

বাংলাদেশের সামনে কঠিন প্রশ্ন

বাংলাদেশের সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে। সীমান্তের ওপারে সবচেয়ে শক্তিশালী পক্ষ যদি মিয়ানমার সরকার না হয়ে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী হয়, তাহলে বাংলাদেশ কীভাবে নিজের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে?

রাজনৈতিক স্বীকৃতি না দিয়েও কি আরাকান আর্মির সঙ্গে ব্যবহারিক যোগাযোগ সম্ভব? আর মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে রাখাইনের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে কীভাবে খাপ খাওয়াবে বাংলাদেশ?

এখনও পর্যন্ত বাংলাদেশের জনপরিসর ও রাজনৈতিক আলোচনায় ভারতের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে নীরবে তৈরি হচ্ছে এক নতুন নিরাপত্তা সংকট।

রোহিঙ্গা সংকট এখনও অমীমাংসিত। তবে এর পাশাপাশি এখন যুক্ত হয়েছে সীমান্তে সহিংসতা, জেলেদের অপহরণ, সামুদ্রিক বিরোধ, স্থলমাইনের ঝুঁকি এবং সীমান্তের ওপারে একটি শক্তিশালী অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান।

(দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা)

Ad 300x250

সম্পর্কিত