আমীন আল রশীদ

গত ১৩ জুন দিনভর সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও এবং কয়েকটি ছবি অনেকেই শেয়ার করেন। সেখানে দেখা যাচ্ছে, নদী খননের মাটিতে ঢাকা পড়েছে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বেশ কিছু ঘর। ২০ থেকে ৩০ ফুট উঁচু কাদামাটির স্তূপ তৈরি হয়েছে। তাতে ঢেকে গেছে আবাসন প্রকল্পের ঘরের দরজা, জানালা, রাস্তাঘাট, টিউবওয়েল। ভিডিওতে দু-একজন ভুক্তভোগীর কথাও শোনা গেছে। কিন্তু এই ছবি ও ভিডিওটি কখন, কোথায় এবং এটি আসল নাকি বানানো—তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে পরদিন দুপুরের দিকে এ নিয়ে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিই। কেননা, এই ঘটনা সত্যি হলে সেটি গণমাধ্যমের জন্য বড় খবর।
দেখা গেল ওই পোস্টের নিচে অনেকেই লিখেছেন, এটা ভুয়া। কেউ কেউ দাবি করেছেন, এআই দিয়ে বানানো। আবার কেউ কেউ লিখেছেন ঘটনা সঠিক।
ইনবক্সে একটি ইংরেজি দৈনিকের একজন সাংবাদিক জানালেন, ঘটনাটি সত্য। ঘটেছে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায়। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে নদী ও আশ্রয়ণ প্রকল্পের নামটিও জানান। শুধু তাই নয়, ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহের জন্য গিয়ে তাদের একজন রিপোর্টার হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি খুলনা প্রতিনিধিকে জানাই। তিনিও ঘটনাস্থলে গিয়ে সত্যতা পান। পরদিন এটি নিয়ে ভুক্তভোগী এবং ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারসহ সংবাদ পাঠান। এরইমধ্যে দুটি অনলাইন পোর্টালেও সংবাদটি আসে। এরপর একে একে দেশের শীর্ষ সংবাদপত্র এবং অনলাইন পোর্টালগুলোও সরেজমিন প্রতিবেদন করে। সেখানে ফুটে ওঠে নদী খননের মাটিতে চাপা পড়া ঘরবাড়ির বাসিন্দাদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কথা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সরকারের প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা এই বিষয়ে গণমাধ্যমে কথা বলতে নারাজ।
জনগণের উন্নয়নের জন্য জনগণের করের পয়সায় রাষ্ট্রীয় প্রকল্প গ্রহণ করা হবে, অথচ সেই প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন করলে সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উত্তর দেবেন না! সাংবাদিকদের সাথে কথা বলবেন না; ফোন ধরবেন না! কোনোভাবে মুখোমুখি হওয়া গেলেও উপর মহলের সাথে বা মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করবেন—এগুলো পুরোনো ‘সংস্কৃতি’।
আবার যেকোনো ঘটনার বিষয়ে সচিবালয়ে সাংবাদিকরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর মুখোমুখি হলে তিনি এমনভাবে উত্তর দেবেন, যাতে মনে হবে সেখানে কোনো অন্যায় হয়নি। বরং যা হয়েছে সেটাই সঠিক। যেমন, ডুমুরিয়ার এই ঘটনা নিয়ে যখন তোলপাড়, তখন পদ্মা রেলসেতুর পিলারের নিচ থেকে মাটি কেটে ইটের ভাটায় বিক্রির খবরটিও আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। কিন্তু এ বিষয়ে সাংবাদিকরা সড়কমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘পিলারের নিচ থেকে অতিরিক্ত মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেখানে গাছ লাগানো হবে।’ কিন্তু এই ঘটনা নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন সেখানে গিয়ে মাটি কাটা বন্ধ করে দেয়।
আসা যাক ডুমুরিয়ার প্রসঙ্গে।
সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আপার ভদ্রা নদী পুনঃখননের কাজের কারণে চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্পের দেড় শতাধিক মানুষের ঘরের এখন কোনো অস্তিত্ব নেই। ভুক্তভোগীদের অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন চুকনগর গরুর হাটের মাঠে অস্থায়ী খুপরিতে। নদী খননের মাটিতে চাপা পড়েছে ঘর, টয়লেট, চলাচলের রাস্তা।
কয়েক মাস আগে থেকে এই ঘটনা ঘটছে। কিন্তু এটা নিয়ে কোনো সংবাদ হয়নি। বরং কেউ একজন এখানকার ছবি ও ভিডিও তুলে সেটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার পরেই আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তার মানে এতদিন ধরে এখানে এরকম একটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে, অথচ স্থানীয় সাংবাদিকরা এটা টের পেলেন না? নাকি তারা জানতেন, কিন্তু এই প্রকল্পের সঙ্গে এমন কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠান জড়িত যাদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করা ঝুঁকিপূর্ণ?
হাজেরা নামে একজন ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘যখন গাঙ কাটতে আসছিল, তখন চাপায়–চুপায়ে দেছে। আমরা ঘর বাঁচাতি পারিনি। শুধু টিনগুলো খুলে নিয়েছিলাম। এখন গরুর হাটের মাঠে আছি, ইজারাদারেরা উঠে যেতে বলে। এমপি পুনর্বাসনের আশ্বাস দিয়েছেন। ইউএনও একবার এসেছিলেন। পরে ডেকে নিয়ে ৩০ কেজি চাল দিয়েছেন। ওই শেষ।’
চুকনগর ও কাঁঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশাপাশি বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পেরও ২৪টি ঘর মাটিচাপা পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মূলত সম্প্রতি সেখানে ঘরের ওপর মাটি ফেলার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকারের যে ভাষ্য পত্রিকা ও টেলিভিশনে এসেছে, সেটি এরকম— নদী খননের প্রকল্পটি যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনী বাস্তবায়ন করছে। বরাতিয়ায় আশ্রয়ণের ঘরের পাশে যে মাটি ফেলা হয়েছে, তিনি নিজে গিয়েছেন। পাউবোর যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা হয়েছে। ইতিমধ্যে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে মাটি সরানো শুরু হয়েছে। কারও ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে পাউবো জানিয়েছে।
কিন্তু এ বিষয়ে সেনাবাহিনী বা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সড়কমন্ত্রীর মতো সাংবাদিকরা এ বিষয়ে পানিসম্পদমন্ত্রীকে প্রশ্ন করলে তিনি কী জবাব দেন, সেটি দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষির বিকাশ ও সামগ্রিকভাবে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য ভরাট হয়ে যাওয়া নদী ও খাল খননের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে যশোর-খুলনা অঞ্চলের ভবদহ সংকট লাঘবেও প্রধান উপায় হলো খাল খনন বা ভরাট হয়ে যাওয়া জলাধারগুলো পুনঃখনন। যে প্রশ্নটি সুরাহা করা দরকার সেটি হলো— খননের পরে ওই মাটি কোথায় ফেলা হবে, সেটি কি প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানতেন না? প্রকল্পের সঙ্গে এই বিষয়টি যুক্ত ছিল না?
নদী ও খাল খননের পরে তার মাটি সাধারণত সংশ্লিষ্ট নদী ও খালের তীরেই ফেলা হয়। পাড় উঁচু করা হয়। অনেক সময় ওই মাটি নিলামে বিক্রি করা হয়। নিচু জমি ভরাটের জন্য অনেকে কিনে নেন। অনেক সময় সরকারের অন্য প্রকল্পে ওই মাটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ডুমুরিয়ায় আপার ভদ্রা নদী খননের পরে এখানকার মাটিগুলো কোথায় ফেলা হবে, সেটি কি ঠিকাদার বা প্রকল্প বাস্তবায়নকারীরা জানতেন না? বসতঘরের পাশে ২০-৩০ ফুট উঁচু করে মাটি ফেললে যে ওই ঘরগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে, মানুষ ঘরগুলোয় আর বাস করতে পারবে না—এই বোধটুকু প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের নেই?
এমন তো নয় যে ওই ঘরগুলো বা আবাসন প্রকল্পটি পরিত্যক্ত, সেখানে কেউ থাকে না। ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনেকগুলো ভূমিহীন পরিবার বসবাস করছে, এটা প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের না জানার কোনো কারণ নেই। তারা কি জেনেশুনেই সেখানে মাটির পাহাড় তৈরি করেছেন যাতে সেখান থেকে মানুষগুলো সরে যায় বা উচ্ছেদ হয়ে যায়? এটা কি পরিকল্পিত? যদি পরিকল্পিত হয় তাহলে এর পেছনে কি কোনো রাজনীতি আছে? নাকি এটি প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা? এর পেছনে কারণ যাই থাকুক না কেন, এটি স্পষ্টত মানবাধিকারের লঙ্ঘন। ফৌজদারি অপরাধ। নাকি এরকম একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে সরকারকে বিতর্কিত ও বিব্রত করার চেষ্টা হলো? এটি স্যাবোটাজ কি না—তাও খতিয়ে দেখা দরকার।
মোদ্দা কথা, এই ঘটনার পেছনে কারণ যাই হোক না কেন, সরকারের উচিত হবে এর নির্মোহ অনুসন্ধান ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। কারণ ভূমিহীন মানুষদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করে তাদেরকে আবারও ভূমিহীন বা উদ্বাস্তু করে দেওয়া কোনো সরকারের লক্ষ্য হতে পারে না। কোনো মানবিক ও গণতান্ত্রিক সরকার এই ধরনের ঘটনা অনুমোদন বা সমর্থন দিতে পারে না। সরকারের কোনো অংশের সঙ্গে ঘটনার সম্পর্ক থাকলে সরকারপ্রধানকে বুঝতে হবে যে, এরা সরকারকে বিপদে ফেলতে চায়। তারা সরকারের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা সরকারবিরোধী শক্তি।
আরেকটা বিষয়ও এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। আজকাল আমাদের দেশে একটা অদ্ভুত ‘ভাইরাল সংস্কৃতি’ তৈরি হয়েছে। কোন কিছু সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল না হওয়া পর্যন্ত সরকারেরও টনক নড়ে না। আবার গণমাধ্যমও অনেক সময় অনেক বড় খবর এড়িয়ে যায় বা জানতে পারে না যতক্ষণ না সেটি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা হচ্ছে।
ডুমুরিয়ায় নদী খননের মাটি দিয়ে বসতঘর চাপা দেয়ার ঘটনাটি বেশ আগে হলেও মানুষ জানলো সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পরে। সংবাদও হলো তার পরে। তার মানে ঘটনা বা অপরাধ যত বড়ই হোক, সেটি যদি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল না হয়, যদি সেটির ছবি বা ভিডিও না থাকে, তাহলে সেটির বিষয়ে সরকার বা সংশ্লিষ্টরা কোনো পদক্ষেপ নেবে না? সংবাদ হবে না? সংবাদ হলেও কেউ সেটি পাত্তা দেবে না? সোশ্যাল মিডিয়াই কি তাহলে এখন গণমাধ্যমের এজেন্ডা ঠিক করে দেবে?

গত ১৩ জুন দিনভর সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও এবং কয়েকটি ছবি অনেকেই শেয়ার করেন। সেখানে দেখা যাচ্ছে, নদী খননের মাটিতে ঢাকা পড়েছে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বেশ কিছু ঘর। ২০ থেকে ৩০ ফুট উঁচু কাদামাটির স্তূপ তৈরি হয়েছে। তাতে ঢেকে গেছে আবাসন প্রকল্পের ঘরের দরজা, জানালা, রাস্তাঘাট, টিউবওয়েল। ভিডিওতে দু-একজন ভুক্তভোগীর কথাও শোনা গেছে। কিন্তু এই ছবি ও ভিডিওটি কখন, কোথায় এবং এটি আসল নাকি বানানো—তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে পরদিন দুপুরের দিকে এ নিয়ে ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিই। কেননা, এই ঘটনা সত্যি হলে সেটি গণমাধ্যমের জন্য বড় খবর।
দেখা গেল ওই পোস্টের নিচে অনেকেই লিখেছেন, এটা ভুয়া। কেউ কেউ দাবি করেছেন, এআই দিয়ে বানানো। আবার কেউ কেউ লিখেছেন ঘটনা সঠিক।
ইনবক্সে একটি ইংরেজি দৈনিকের একজন সাংবাদিক জানালেন, ঘটনাটি সত্য। ঘটেছে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায়। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে নদী ও আশ্রয়ণ প্রকল্পের নামটিও জানান। শুধু তাই নয়, ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহের জন্য গিয়ে তাদের একজন রিপোর্টার হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি খুলনা প্রতিনিধিকে জানাই। তিনিও ঘটনাস্থলে গিয়ে সত্যতা পান। পরদিন এটি নিয়ে ভুক্তভোগী এবং ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারসহ সংবাদ পাঠান। এরইমধ্যে দুটি অনলাইন পোর্টালেও সংবাদটি আসে। এরপর একে একে দেশের শীর্ষ সংবাদপত্র এবং অনলাইন পোর্টালগুলোও সরেজমিন প্রতিবেদন করে। সেখানে ফুটে ওঠে নদী খননের মাটিতে চাপা পড়া ঘরবাড়ির বাসিন্দাদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কথা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, সরকারের প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা এই বিষয়ে গণমাধ্যমে কথা বলতে নারাজ।
জনগণের উন্নয়নের জন্য জনগণের করের পয়সায় রাষ্ট্রীয় প্রকল্প গ্রহণ করা হবে, অথচ সেই প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন করলে সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উত্তর দেবেন না! সাংবাদিকদের সাথে কথা বলবেন না; ফোন ধরবেন না! কোনোভাবে মুখোমুখি হওয়া গেলেও উপর মহলের সাথে বা মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করবেন—এগুলো পুরোনো ‘সংস্কৃতি’।
আবার যেকোনো ঘটনার বিষয়ে সচিবালয়ে সাংবাদিকরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর মুখোমুখি হলে তিনি এমনভাবে উত্তর দেবেন, যাতে মনে হবে সেখানে কোনো অন্যায় হয়নি। বরং যা হয়েছে সেটাই সঠিক। যেমন, ডুমুরিয়ার এই ঘটনা নিয়ে যখন তোলপাড়, তখন পদ্মা রেলসেতুর পিলারের নিচ থেকে মাটি কেটে ইটের ভাটায় বিক্রির খবরটিও আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। কিন্তু এ বিষয়ে সাংবাদিকরা সড়কমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ‘পিলারের নিচ থেকে অতিরিক্ত মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেখানে গাছ লাগানো হবে।’ কিন্তু এই ঘটনা নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন সেখানে গিয়ে মাটি কাটা বন্ধ করে দেয়।
আসা যাক ডুমুরিয়ার প্রসঙ্গে।
সংবাদমাধ্যমের খবর বলছে, খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আপার ভদ্রা নদী পুনঃখননের কাজের কারণে চুকনগর আশ্রয়ণ প্রকল্পের দেড় শতাধিক মানুষের ঘরের এখন কোনো অস্তিত্ব নেই। ভুক্তভোগীদের অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন চুকনগর গরুর হাটের মাঠে অস্থায়ী খুপরিতে। নদী খননের মাটিতে চাপা পড়েছে ঘর, টয়লেট, চলাচলের রাস্তা।
কয়েক মাস আগে থেকে এই ঘটনা ঘটছে। কিন্তু এটা নিয়ে কোনো সংবাদ হয়নি। বরং কেউ একজন এখানকার ছবি ও ভিডিও তুলে সেটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার পরেই আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তার মানে এতদিন ধরে এখানে এরকম একটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে, অথচ স্থানীয় সাংবাদিকরা এটা টের পেলেন না? নাকি তারা জানতেন, কিন্তু এই প্রকল্পের সঙ্গে এমন কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠান জড়িত যাদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার করা ঝুঁকিপূর্ণ?
হাজেরা নামে একজন ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘যখন গাঙ কাটতে আসছিল, তখন চাপায়–চুপায়ে দেছে। আমরা ঘর বাঁচাতি পারিনি। শুধু টিনগুলো খুলে নিয়েছিলাম। এখন গরুর হাটের মাঠে আছি, ইজারাদারেরা উঠে যেতে বলে। এমপি পুনর্বাসনের আশ্বাস দিয়েছেন। ইউএনও একবার এসেছিলেন। পরে ডেকে নিয়ে ৩০ কেজি চাল দিয়েছেন। ওই শেষ।’
চুকনগর ও কাঁঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশাপাশি বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পেরও ২৪টি ঘর মাটিচাপা পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মূলত সম্প্রতি সেখানে ঘরের ওপর মাটি ফেলার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবিতা সরকারের যে ভাষ্য পত্রিকা ও টেলিভিশনে এসেছে, সেটি এরকম— নদী খননের প্রকল্পটি যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনী বাস্তবায়ন করছে। বরাতিয়ায় আশ্রয়ণের ঘরের পাশে যে মাটি ফেলা হয়েছে, তিনি নিজে গিয়েছেন। পাউবোর যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা হয়েছে। ইতিমধ্যে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে মাটি সরানো শুরু হয়েছে। কারও ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে পাউবো জানিয়েছে।
কিন্তু এ বিষয়ে সেনাবাহিনী বা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সড়কমন্ত্রীর মতো সাংবাদিকরা এ বিষয়ে পানিসম্পদমন্ত্রীকে প্রশ্ন করলে তিনি কী জবাব দেন, সেটি দেখতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষির বিকাশ ও সামগ্রিকভাবে মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য ভরাট হয়ে যাওয়া নদী ও খাল খননের কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে যশোর-খুলনা অঞ্চলের ভবদহ সংকট লাঘবেও প্রধান উপায় হলো খাল খনন বা ভরাট হয়ে যাওয়া জলাধারগুলো পুনঃখনন। যে প্রশ্নটি সুরাহা করা দরকার সেটি হলো— খননের পরে ওই মাটি কোথায় ফেলা হবে, সেটি কি প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানতেন না? প্রকল্পের সঙ্গে এই বিষয়টি যুক্ত ছিল না?
নদী ও খাল খননের পরে তার মাটি সাধারণত সংশ্লিষ্ট নদী ও খালের তীরেই ফেলা হয়। পাড় উঁচু করা হয়। অনেক সময় ওই মাটি নিলামে বিক্রি করা হয়। নিচু জমি ভরাটের জন্য অনেকে কিনে নেন। অনেক সময় সরকারের অন্য প্রকল্পে ওই মাটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ডুমুরিয়ায় আপার ভদ্রা নদী খননের পরে এখানকার মাটিগুলো কোথায় ফেলা হবে, সেটি কি ঠিকাদার বা প্রকল্প বাস্তবায়নকারীরা জানতেন না? বসতঘরের পাশে ২০-৩০ ফুট উঁচু করে মাটি ফেললে যে ওই ঘরগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে, মানুষ ঘরগুলোয় আর বাস করতে পারবে না—এই বোধটুকু প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের নেই?
এমন তো নয় যে ওই ঘরগুলো বা আবাসন প্রকল্পটি পরিত্যক্ত, সেখানে কেউ থাকে না। ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনেকগুলো ভূমিহীন পরিবার বসবাস করছে, এটা প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের না জানার কোনো কারণ নেই। তারা কি জেনেশুনেই সেখানে মাটির পাহাড় তৈরি করেছেন যাতে সেখান থেকে মানুষগুলো সরে যায় বা উচ্ছেদ হয়ে যায়? এটা কি পরিকল্পিত? যদি পরিকল্পিত হয় তাহলে এর পেছনে কি কোনো রাজনীতি আছে? নাকি এটি প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা? এর পেছনে কারণ যাই থাকুক না কেন, এটি স্পষ্টত মানবাধিকারের লঙ্ঘন। ফৌজদারি অপরাধ। নাকি এরকম একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে সরকারকে বিতর্কিত ও বিব্রত করার চেষ্টা হলো? এটি স্যাবোটাজ কি না—তাও খতিয়ে দেখা দরকার।
মোদ্দা কথা, এই ঘটনার পেছনে কারণ যাই হোক না কেন, সরকারের উচিত হবে এর নির্মোহ অনুসন্ধান ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। কারণ ভূমিহীন মানুষদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করে তাদেরকে আবারও ভূমিহীন বা উদ্বাস্তু করে দেওয়া কোনো সরকারের লক্ষ্য হতে পারে না। কোনো মানবিক ও গণতান্ত্রিক সরকার এই ধরনের ঘটনা অনুমোদন বা সমর্থন দিতে পারে না। সরকারের কোনো অংশের সঙ্গে ঘটনার সম্পর্ক থাকলে সরকারপ্রধানকে বুঝতে হবে যে, এরা সরকারকে বিপদে ফেলতে চায়। তারা সরকারের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা সরকারবিরোধী শক্তি।
আরেকটা বিষয়ও এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। আজকাল আমাদের দেশে একটা অদ্ভুত ‘ভাইরাল সংস্কৃতি’ তৈরি হয়েছে। কোন কিছু সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল না হওয়া পর্যন্ত সরকারেরও টনক নড়ে না। আবার গণমাধ্যমও অনেক সময় অনেক বড় খবর এড়িয়ে যায় বা জানতে পারে না যতক্ষণ না সেটি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা হচ্ছে।
ডুমুরিয়ায় নদী খননের মাটি দিয়ে বসতঘর চাপা দেয়ার ঘটনাটি বেশ আগে হলেও মানুষ জানলো সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পরে। সংবাদও হলো তার পরে। তার মানে ঘটনা বা অপরাধ যত বড়ই হোক, সেটি যদি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল না হয়, যদি সেটির ছবি বা ভিডিও না থাকে, তাহলে সেটির বিষয়ে সরকার বা সংশ্লিষ্টরা কোনো পদক্ষেপ নেবে না? সংবাদ হবে না? সংবাদ হলেও কেউ সেটি পাত্তা দেবে না? সোশ্যাল মিডিয়াই কি তাহলে এখন গণমাধ্যমের এজেন্ডা ঠিক করে দেবে?

একটি রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে মানুষ রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চায়। বিশেষ করে সরকারি অর্থ ও ক্ষমতায় ব্যক্তিস্বার্থ বা পারিবারিকীকরণের যে সংস্কৃতি কয়েক দশকে জেঁকে বসেছিল, তার অবসান জরুরি।
২ ঘণ্টা আগে
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭-এর শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন ফ্রান্স সফরে রয়েছেন। এই সফরের মধ্যেই ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ঐতিহাসিক ভার্সাই প্রাসাদে গত ১৭ জুন (বুধবার রাতে) তিনি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতা স্মারকে সই করেন। তবে ইরানের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবা
৬ ঘণ্টা আগে
ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য অনুসারে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের সংখ্যা ছিল ৪১ দশমিক ৬ মিলিয়ন, যা ২০১৫ সালে ছিল ২১ দশমিক ৩ মিলিয়ন। এই পরিসংখানের সঙ্গে শরণার্থী ব্যতীতও বিশ্বের সমগ্র বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী যারা নানা কারণে নিজ দেশেই বাস্তুচ্যুত হয়ে পরে (আইডিপি) এবং বিভিন্ন দেশে যারা শরণার্থী
৮ ঘণ্টা আগে
গত বছরের বেশির ভাগ সময়জুড়ে টানাপোড়েনের পর চলতি বছরের এপ্রিলে ভারত ও বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনরায় স্বাভাবিক করার অঙ্গীকার করেছিল। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে নয়াদিল্লিতে ভারতীয় কর্মকর্তাদের আচরণ সেই আশাবাদে নতুন করে ধাক্কা দিয়েছে।
২১ ঘণ্টা আগে