ইসলামাবাদ বৈঠক, হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব: যুদ্ধের ভেতরের যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের অদৃশ্য ঝুঁকি

সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ
সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ

স্ট্রিম গ্রাফিক

‘যুদ্ধ রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি জীবন-মৃত্যুর ক্ষেত্র; সাম্রাজ্যের টিকে থাকা বা পতনের ওপর নির্ভর করে। তাই এটিকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা অপরিহার্য।’ — সান ঝু, দ্য আর্ট অব ওয়্যার

‘বিষয়টি খুবই সহজ। আমি খুব উচ্চ লক্ষ্য স্থির করি এবং তা অর্জনের জন্য নিরন্তর চাপ প্রয়োগ করি।’ — ডোনাল্ড ট্রাম্প, দ্য আর্ট অব ডিল

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে ঘোষিত দুই সপ্তাহের বিরতির মধ্যেই ইসলামাবাদে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনাগুলো অনুষ্ঠিত হলো। এই সংঘাত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে শুরু হয়ে দ্রুতই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তীব্র অভিঘাত সৃষ্টি করে। ৮ এপ্রিল একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর পরিস্থিতি আপাতত স্থির মনে হলেও, তা স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত নয়। বরং এই যুদ্ধবিরতি আশার চেয়ে অনিশ্চয়তার প্রতিফলন বেশি। কারণ বাস্তবতা হলো, যুদ্ধ থামেনি; কেবল তার রূপ পরিবর্তিত হয়েছে।

হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের একটি সংকীর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি। সেটি আজ বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাব এল-মান্দেব প্রণালি, যেখানে ইয়েমেনভিত্তিক হুতি গোষ্ঠীর মাধ্যমে ইরানের প্রভাব বিস্তার ঘটছে। ফলে এই সংঘাত আর আঞ্চলিক নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিয়েছে।

প্রতিঘাতের কৌশল: শক্তির নয়, প্রভাবের যুদ্ধ

ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার প্রাথমিক পর্যায়ে ইরানের প্রতিরক্ষা অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, দ্রুতই তারা কৌশলগত পাল্টা আঘাত শুরু করে। লক্ষ্য ছিল সরাসরি সামরিক বিজয় নয়, বরং প্রতিপক্ষের সক্ষমতা ও মনস্তাত্ত্বিক স্থিতি দুর্বল করা।

এই কৌশলের অংশ হিসেবে ইরান শুধু ইসরায়েল নয়, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও জর্ডানে আঘাত এবং তুরস্ক, সাইপ্রাস ও দিয়েগো গার্সিয়ার দিকে সতর্কতামূলক বার্তা—সবই একটি বৃহত্তর উদ্দেশ্যের অংশ। সেটি হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ করা এবং তার নিরাপত্তা ছাতার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করা।

প্রণালি নিয়ন্ত্রণ: ইরানের কৌশলগত ‘লিভারেজ’

ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তি তার সামরিক সক্ষমতা নয়, বরং তার প্রাচীন সভ্যতা, জাতীয় ঐক্য এবং সর্বোপরি ভূ-কৌশলগত অবস্থান। তারা জাতি হিসেবে, দেশের জনগণ হিসেবে সরকারের সমালোচনা এবং বিরোধিতা করে কিন্তু বহিঃশত্রুর আক্রমণে গোটা জাতি ঐক্যবদ্ধ। হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব, এই দুই প্রণালির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তারা বৈশ্বিক অর্থনীতির ‘শ্বাসনালি’ চেপে ধরতে সক্ষম।

এই প্রণালিগুলোর সংকীর্ণ নৌপথ, উত্তর উপকূলে শক্তিশালী উপস্থিতি এবং ব্যবহৃত কৌশল তথা মিসাইল, স্পিডবোট, ক্ষুদ্র সাবমেরিন, বিস্ফোরক ড্রোন, সব মিলিয়ে এমন এক যুদ্ধক্ষেত্র তৈরি করেছে, যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাশালী নৌবাহিনীও নিরাপদ নয়। অনেক ক্ষেত্রে আক্রমণ শনাক্ত হওয়ার আগেই সংঘটিত হচ্ছে, ফলে প্রচলিত এসকর্ট কৌশল কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলাফল তাৎক্ষণিক। বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো কভারেজ স্থগিত করেছে, জাহাজ চলাচল কমে গেছে এবং ইরান তাদের অনুমোদন ব্যতীত ট্রানজিট সীমিত করে শুল্ক আরোপ করছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচ্য প্রধান বিষয়গুলো কী

ইসলামাবাদ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। যেমন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, হরমুজ প্রণালি, পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ, এবং লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দাবি, হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, ইরান এই সংকীর্ণ জলপথে তার কর্তৃত্বের স্বীকৃতি চায় এবং সেখানে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ট্রানজিট ফি আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘যৌথ ব্যবস্থাপনা’ ধারণার কথা উল্লেখ করেছেন, যার মাধ্যমে দুই দেশ মিলে টোল নির্ধারণ করতে পারে।

পারমাণবিক ইস্যুতে, ইরান দাবি করছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করছে না, তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হওয়া উচিত। যুক্তরাষ্ট্র এই দাবিকে সম্পূর্ণভাবে নাকচ করেছে এবং ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেছেন—‘ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কোনোভাবেই অনুমোদিত হবে না।’

এই পারমাণবিক কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে, যার জেরে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

লেবানন ইস্যুতেও মতবিরোধ স্পষ্ট। ইরান চায় যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক, যেখানে ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে লেবাননের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। তবে ইসরায়েল দাবি করেছে, এই যুদ্ধবিরতি লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় এবং তারা সেখানে হামলা অব্যাহত রেখেছে।

এছাড়া ইরান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পুনরায় হামলা না করার নিশ্চয়তা চেয়েছে—অর্থাৎ দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির বাইরে গিয়ে একটি স্থায়ী শান্তির কাঠামো প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে।

যুদ্ধের ভেতরে আরেক যুদ্ধ: অর্থনীতির শ্বাসরোধ

আমাদের বুঝতে হবে, এই সংকটের সবচেয়ে গভীর মাত্রা সামরিক নয়—অর্থনৈতিক। হরমুজ দিয়ে বিশ্বে ব্যবহৃত তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ, সার ৩০ শতাংশ, হেলিয়াম ৩০ শতাংশ এবং অ্যালুমিনিয়াম ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। এই প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার অর্থ হলো, জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙন, খাদ্য ও শিল্প উৎপাদনে চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক সংকট।

বিশ্ববাজার ইতোমধ্যে অস্থির। জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি, শেয়ারবাজারের ওঠানামা এবং মুদ্রাস্ফীতি, সবই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এই সংকট শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়, আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রে আঘাত হানছে।

অবিশ্বাসের যুদ্ধবিরতি: স্থিতিশীলতা নয়, বিরতি

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতি বাস্তবে এমন হতে পারে যে এটি একটি ‘কৌশলগত বিরতি’ বা ‘অপারেশনাল পজ’ মাত্র। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, ঘোষিত যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে জরুরি কোনো কিছু নেই। যেমন, নির্ভরযোগ্য যাচাই ব্যবস্থা, কার্যকর প্রয়োগ কাঠামো, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর রাজনৈতিক ঐকমত্য ইত্যাদি।

ইতিহাস বলে, এমন যুদ্ধবিরতি প্রায়শই পুনর্গঠনের সময় ও সুযোগ দেয়; সমাধান নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতেও তাই দেখা যাচ্ছে—সংঘাত থেমে নেই, বরং ছায়া-যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে।

কৌশলগত বাস্তবতা: অসম যুদ্ধের সাফল্য

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের ইরানের বিরুদ্ধে চলমান এই যুদ্ধ আমাদের সবাইকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিচ্ছে। তা হলো, আধুনিক যুদ্ধে জয় সবসময় শক্তির ওপর নির্ভর করে না। হাজার বছরের সভ্যতাসমৃদ্ধ ইরান নিজস্ব ভূখণ্ড, আঞ্চলিক মিত্র (হামাস, হিজবুল্লাহ, হুতি) এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে একটি বহুমাত্রিক অসম যুদ্ধ প্রায় সফলভাবে পরিচালনা করছে। এর ফলে প্রযুক্তিগতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী জোটও প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। আর তা প্রমাণ করে, কৌশল, স্থিতিস্থাপকতা এবং সময় ব্যবস্থাপনাই আধুনিক যুদ্ধের আসল শক্তি।

স্থবির সংঘাত: সামনে কী আসছে

বর্তমান প্রবণতা ইঙ্গিত দেয়, এই সংঘাত সরাসরি সমাধানের দিকে নয়, বরং একটি ‘স্থবির সংঘাত’-এর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অর্থাৎ যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ হবে না, আবার পূর্ণমাত্রায়ও চলবে না। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে সামরিক চাপ বজায় রাখছে, অন্যদিকে কৌশলগত অনিশ্চয়তা তৈরি করছে—যা বাজার ও প্রতিপক্ষ উভয়কেই প্রভাবিত করার একটি উপায়। কিন্তু এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রূপান্তর

বিশ্বব্যবস্থা ধীরে ধীরে এক নতুন ভারসাম্যের দিকে এগোচ্ছে। এই সংকট একটি বৃহত্তর পরিবর্তনের সূচনা করছে। যেমন, ইরানের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রভাব বৃদ্ধি, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন, ইউরোপ ও উপসাগরীয় দেশগুলোর কৌশলগত পুনর্বিবেচনা, ন্যাটোতে বিভাজনের সম্ভাবনা, বিকল্প শক্তি জোটগুলোর (যেমন ব্রিকস) আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি ইত্যাদি।

বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয় বার্তা

হরমুজ বা বাব এল-মান্দেব আমাদের ভূগোলের অংশ নয়—কিন্তু আমাদের ভবিষ্যতের অংশ। বাংলাদেশের জন্য এই সংকট একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা হচ্ছে, সমুদ্রপথ এখন কেবল বাণিজ্যের মাধ্যম নয়—অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মূল ভিত্তি। দূরবর্তী চোকপয়েন্টও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ। ফলে কৌশলগত প্রস্তুতি ও নীতিগত দূরদর্শিতা অপরিহার্য।

এই সংকট আমাদের একটি মৌলিক সত্য মনে করিয়ে দেয়। একটি সংকীর্ণ সমুদ্রপথও পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিতে পারে। ইরানের কৌশল দেখিয়েছে, শক্তি নয়, অবস্থান ও কৌশলই কখনো কখনো বৈশ্বিক প্রভাব নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের জন্য বার্তাটি সুস্পষ্ট—সমুদ্রকে বুঝতে হবে, প্রস্তুত থাকতে হবে এবং কৌশলগতভাবে এগোতে হবে। কারণ আজকের বিশ্বে সমুদ্রপথ নিরাপদ না হলে, অর্থনীতিও নিরাপদ নয়।

  • কমোডর সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ (অবসরপ্রাপ্ত): মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)

সম্পর্কিত