অধ্যাপক এম শামসুল আলমের নিবন্ধ
এম শামসুল আলম

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির চরম সংকটকালেও দেশের বাজারে দাম বাড়ায়নি সরকার। ফলে সরকারের প্রতি জনগণের একটি বড় আস্থার জায়গা তৈরি হয়। বিশ্ববাজারে তেলের দাম যখন ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলারে উন্নীত হয়, তখনও সরকার দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্তে অনড় ছিল। বরং ভর্তুকি দিয়ে তারা পরিস্থিতি সামাল দেয় এবং জনগণ গ্রীষ্মের তাপদাহে রোদে পুড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বালানি তেলের জন্য ফিলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে চাতক পাখির মত অপেক্ষা করে। তেলের চরম সংকট সরকার ও জনগণের মধ্যে এই ভাগাভাগির দৃষ্টান্ত ছিল সত্যিই অভাবনীয়।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১২০ ডলার থেকে কমে যখন ৯০ ডলারের নিচে নেমে এলো, তখন দাম বাড়ানো হলো। অথচ এমন পরিস্থিতিতে এই দামবৃদ্ধির আর কোনো যৌক্তিকতা বা ন্যায্যতা থাকে না। ফলে এই ন্যায্যতা উপেক্ষা করার কারণেই সরকার আজ জনগণের অনাস্থার শিকার। তেলের সংকট হয়তো একসময় কেটে যাবে, কিন্তু এই আস্থার সংকট সরকার কোনোদিন কাটিয়ে উঠতে পারবে কি না, তা সময়ই বলবে।
সংবিধান অনুযায়ী জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করাই সরকারের দায়িত্ব। জনগণের সম্পদ ব্যবহার করে সরকার জনগণের সেবা প্রদান করবে, এটিই সরকারের মৌলিক নীতি। এই সেবা প্রদানের পরিবর্তে জনগণের সম্পদ জনগণের নিকট বেচা-বিক্রি করে সরকার কোনোভাবেই মুনাফাখোরে পরিণত হতে পারে না। কিন্তু বর্তমান জ্বালানিতন্ত্রের দিকে তাকালে মনে হয়, মুনাফালোভী প্রবণতা থেকে পূর্বতন সরকারের মতো বর্তমান সরকারও বেরিয়ে আসতে পারেনি।
জ্বালানি তেল সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোর মার্জিন বা চার্জহার বৃদ্ধি করা হয়েছে। গণশুনানিতে জেট ফুয়েলের মূল্য নির্ধারণের সময় প্রমাণিত হয় যে, কেবল লুণ্ঠনমূলক চার্জহার নির্ধারণের মাধ্যমেই বিপুল পরিমাণ মুনাফা লুটছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তথা বিইআরসি’র লাইসেন্সীগুলো। পরিকল্পিতভাবেভাবে তাদের বিপুল মুনাফা লাভের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। আর এর সম্পূর্ণ ভার জনগণের কাঁধে এসে পড়েছে। শুনানিতে প্রমাণ পাওয়া যায়, পদ্মা ওয়েল কোম্পানির লিটার প্রতি জেট ফুয়েল বিতরণ চার্জ ৫০ পয়সায় তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ জমেছে ২ হাজার ১’শ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম ও ঢাকার পরিবাগে নির্মাণাধীন ১৪ তলা বিশিষ্ট দু‘টি বাণিজ্যিক ভবন। এরপরও বিইআরসি তাদের মার্জিন লিটার প্রতি ৫০ পয়সা থেকে বৃদ্ধি করে ৮৮ পয়সা করে লুণ্ঠনের মাত্রা বাড়িয়ে অসাধু ব্যবসা সংরক্ষণ করেছে। জনগণ জ্বালানি সুবিচার বঞ্চিত হয়েছে।
আমাদের জ্বালানি খাতের আজকের এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হলো ২০১০ সালে প্রণীত ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’। সংকট নিরসনের অজুহাত দেখিয়ে দুই বছরের জন্য এই আইন করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বারবার এর মেয়াদ বাড়ানো হয় এবং মেয়াদ যত বেড়েছে, সংকট তত ঘনীভূত হয়। গত ৫ আগস্ট যখন পূর্বতন সরকারের পতন হয়, তখন দেখা যায় বিদ্যুৎ খাতে ঘাটতি প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। অথচ অবাক করার বিষয় হলো, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই বিশেষ আইনটি অধ্যাদেশ জারি করে বাতিল করলেও, এই আইনের আওতায় অতীতে হওয়া সব কার্যক্রমকে অধ্যাদেশে সংযোজিত দু‘টি উপধারায় ‘দায়মুক্তি’ বা প্রোটেকশন দিয়েছে। আরও হতাশাজনক বিষয়, বর্তমান সংসদ সেই সুরক্ষামূলক ২টি উপধারা বাতিল না করেই অধ্যাদেশটি অনুমোদন দিয়েছে। এই নীতিগত, আদর্শগত ও দর্শনগত বিপর্যয় দেশের রাজনীতির জন্য একটি বড় অশনিসংকেত।
সংকটের সময় যখন দাম বাড়ানো হয়নি, তখন বেসরকারি রিফাইনারিগুলোর অকটেন-পেট্রোলের কোনো খোঁজ ছিল না। কিন্তু যেই মুহূর্তে দাম বাড়ল, অমনি তাদের ট্যাংক কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল! এমনকি তারা সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে বলছে, তাদের তেল উপচে পড়ছে, সরকার কিনছে না। দাম বাড়ার অপেক্ষায় তেল মজুত ও অধিক দামে তেল বিক্রির লক্ষ্যে কালোবাজার তৈরির এই যে দুরভিসন্ধি—এর বিচার করার কোনো সক্ষমতা কি সরকারের নেই? বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা গণতান্ত্রিক সরকার যদি এসব সিন্ডিকেটের কাছে নতজানু হয়, তাহলে রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতাই অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই দৃষ্টান্তে বুঝা যায়, আমাদের জ্বালানি সংকটের কারণ ইরান-ইসরাইল-আমেরিকা যুদ্ধ নয়, পতিত সরকারের তৈরি কাঠামোগত লুণ্ঠনমুলক জ্বালানিতন্ত্র।
দেশে উৎপাদিত পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য এক হতে পারে না। সরকারি ও বেসরকারি এলপিজির দামের তারতম্য এর বড় প্রমাণ। অথচ বেসরকারি খাতের মুনাফাকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে সরকার নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে ফেলেছে। শোনা যাচ্ছে একমাত্র ইস্টার্নরিফাইনারিটি বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ ব্যক্তি মালিকানাধীন রিফাইনারির তেল উপচে পড়ছে। সরকার কিনছে না। জনগণ কি অদ্ভুত নির্মম পরিহাসের শিকার! বিআরটিএ, বিইআরসি, বিপিসি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, প্রতিযোগিতা কমিশন—এরাই তো সরকারের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। এরা যদি লুণ্ঠনকারীদের প্রশ্রয় দেয় ও নতজানু হয়, তাহলে খোদ সরকারই অকার্যকর হয়ে পড়ে। বাস্তবে তাই হয়েছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার প্রমাণ গণপরিবহণ ভাড়াবৃদ্ধির প্রস্তাব। ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। অর্থাৎ ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। গণপরিবহণে এই তেল অধিক পরিমাণে ব্যবহার হয়। এই তেলের দাম ১৫ শতাংশ বৃদ্ধির অজুহাতে পরিবহন মালিকরা ৪০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। বিদ্যমান ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ঢাকা শহরে ২.৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ২.২০ টাকা। প্রস্তাব অনুযায়ী বর্ধিত ভাড়া হবে ঢাকা শহরে ৩.৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩.০৮ টাকা। এখন বিবেচ্য বিষয়, এই প্রস্তাব ন্যায্য ও যৌক্তিক কিনা?
জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধিতে গণপরিবনের ভাড়া কি পরিমাণ বৃদ্ধি হবে তা বিবেচনার ভিত্তি জ্বালানি বাবদ ব্যয় ভাড়ার কত শতাংশ। জেট ফুয়েল মূল্য নির্ধারণ প্রস্তাব গণশুনানিতে আনা হয় এবং বিমানযাত্রীর ভাড়ায় কি পরিবর্তন হতে পারে, তা আলোচিত হয়। ক্যাব ভারতীয় বিমানের এক যাত্রীর টিকিট গণশুনানিতে উপস্থাপন করে। তাতে দেখা যায়, নির্ধারিত বিমানভাড়ার বিভাজিত ব্যয়ে জ্বালানি ব্যয় মোট ভাড়ার ২০ শতাংশ। বাংলাদেশে এই ব্যয় বিভাজন বিমান বা গণপরিবহণে দেখানো হয় না। যা অন্যায় ও অযৌক্তিক এবং জ্বালানি সুবিচারের সাথে সাংঘর্ষিক। জ্বালানি বাবদ ব্যয় একটি গণপরিবহণ পরিচালন ব্যয়ের কত শতাংশ? বিমানের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ। যদি তেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়ে, তবে মোট ভাড়ার ওপর তার প্রভাব হওয়া উচিত ভাড়ার ২০ শতাংশের ১৫ শতাংশ (অর্থাৎ খুবই নগণ্য)।
১৫ শতাংশ বৃদ্ধিতে ডিজেলের মূল্যহার ১০০ টাকা থেকে বেড়ে হলো ১১৫ টাকা। প্রতি কিলোমিটারে বিদ্যমান গণপরিবহণ ভাড়া ঢাকায় ২.৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ২.২০ টাকা। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সমন্বয় করা হলে উক্ত ভাড়া বেড়ে হবে ঢাকায় ২.৫৮ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ২.২৭ টাকা। অথচ এই সহজ হিসাব নিয়ে মালিক সমিতির সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা বিআরটিএ-এর নেই। অর্থাৎ সরকারের নেই। গণপরিবহণ মালিক সমিতি ভাড়া ৪০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। তাতে ভাড়া বেড়ে ঢাকায় হবে ৩.৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩.০৮ টাকা। জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে সরকারের যে লাভ হবে, পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির চিত্রে বুঝা যায়, এর চেয়ে বহুগুণ বেশি নানা পণ্য ও সেবার মূল্য বৃদ্ধি হবে এবং জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় কত বেশি বাড়বে। সরকারের কোন প্রতিষ্ঠান —এর কোন বিচার-বিশ্লেষণ করে না।
বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর তদন্তে উঠে এসেছে, পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত অন্যায় ও যৌক্তিক ব্যয় সমন্বয় করে তা লুণ্ঠন করা হয়। আদানির সঙ্গে অসম বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির কারণে প্রতিবছর ৫০০ মিলিয়ন ডলার লুট হচ্ছে। ২০ বছর মেয়াদে এই লুণ্ঠনের পরিমাণ হবে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার! এমন সব লুণ্ঠন ও অর্থ পাচারের কারণে সৃষ্ট ঘাটতির বোঝা সরকার যদি মূল্যবৃদ্ধি করে জনগণের কাঁধে চাপায়, তাহলে জ্বালানি নিরাপত্তা কখনোই নিশ্চিত হবে না।
আমি যদি সরকার হতাম, তাহলে প্রথমেই এ-খাতকে বাণিজ্যিক খাত থেকে আবার সেবা খাতে ফিরিয়ে আনতাম এবং সরকারকে মুনাফাভোগীর কলঙ্ক থেকে মুক্তি দিতাম। জ্বালানি সেবা প্রদানে প্রকৃত খরচ যতটুকু, ততটুকু সমন্বয় করে মূল্যহার নির্ধারণ হতো। মূল্যবৃদ্ধির পরিবর্তে গণশুনানীর ভিত্তিতে লুন্ঠনমূলক ব্যয় ও মুনাফা কমিয়ে ঘাটতি সমন্বয়ের একটি কর্মপরিকল্পনা সরকারি নিকট দাখিল করার জন্য বিইআরসি-কে নির্দেশ দিতাম। সে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতাম। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিতিশীলতা মোকাবেলার জন্য একটি ‘প্রাইস স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড’ বা মূল্য স্থিতিশীলতা তহবিল গঠন করতাম; যেখানে দাম কম থাকাকালে উদ্বৃত্ত অর্থ জমা হতো এবং দাম বাড়লে সেখান থেকে ভর্তুকি দেয়া হতো। ফলে মূল্য স্থিতিশীল থাকতো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হতো।
সর্বোপরি, দুর্নীতি, লুণ্ঠন, আত্মসাৎ ও পাচারের মাধ্যমে যারা দেশের জ্বালানি খাতকে বিপর্যস্ত করেছে, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে তাদের ‘জ্বালানি অপরাধী’ হিসেবে বিচার করাতাম। ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাদের দেশ-বিদেশে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে সরকারি কোষাগারে জমা দিতাম এবং এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতাম, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো লুটেরা চক্রের জন্ম হতো না।
অতএব, সরকার যদি অবিলম্বে এই দর্শনগত ও নীতিগত বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে এসে জ্বালানি সুবিচার নিশ্চিত করতে না পারে, তবে জনগণের ক্ষয়ক্ষতি ও ভোগান্তি কেবল বাড়তেই থাকবে। দেশ এক দীর্ঘস্থায়ী ও অমোচনীয় সংকটের দিকে ধাবিত হবে।
এম শামসুল আলম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির চরম সংকটকালেও দেশের বাজারে দাম বাড়ায়নি সরকার। ফলে সরকারের প্রতি জনগণের একটি বড় আস্থার জায়গা তৈরি হয়। বিশ্ববাজারে তেলের দাম যখন ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলারে উন্নীত হয়, তখনও সরকার দাম না বাড়ানোর সিদ্ধান্তে অনড় ছিল। বরং ভর্তুকি দিয়ে তারা পরিস্থিতি সামাল দেয় এবং জনগণ গ্রীষ্মের তাপদাহে রোদে পুড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বালানি তেলের জন্য ফিলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে চাতক পাখির মত অপেক্ষা করে। তেলের চরম সংকট সরকার ও জনগণের মধ্যে এই ভাগাভাগির দৃষ্টান্ত ছিল সত্যিই অভাবনীয়।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১২০ ডলার থেকে কমে যখন ৯০ ডলারের নিচে নেমে এলো, তখন দাম বাড়ানো হলো। অথচ এমন পরিস্থিতিতে এই দামবৃদ্ধির আর কোনো যৌক্তিকতা বা ন্যায্যতা থাকে না। ফলে এই ন্যায্যতা উপেক্ষা করার কারণেই সরকার আজ জনগণের অনাস্থার শিকার। তেলের সংকট হয়তো একসময় কেটে যাবে, কিন্তু এই আস্থার সংকট সরকার কোনোদিন কাটিয়ে উঠতে পারবে কি না, তা সময়ই বলবে।
সংবিধান অনুযায়ী জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করাই সরকারের দায়িত্ব। জনগণের সম্পদ ব্যবহার করে সরকার জনগণের সেবা প্রদান করবে, এটিই সরকারের মৌলিক নীতি। এই সেবা প্রদানের পরিবর্তে জনগণের সম্পদ জনগণের নিকট বেচা-বিক্রি করে সরকার কোনোভাবেই মুনাফাখোরে পরিণত হতে পারে না। কিন্তু বর্তমান জ্বালানিতন্ত্রের দিকে তাকালে মনে হয়, মুনাফালোভী প্রবণতা থেকে পূর্বতন সরকারের মতো বর্তমান সরকারও বেরিয়ে আসতে পারেনি।
জ্বালানি তেল সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত কোম্পানিগুলোর মার্জিন বা চার্জহার বৃদ্ধি করা হয়েছে। গণশুনানিতে জেট ফুয়েলের মূল্য নির্ধারণের সময় প্রমাণিত হয় যে, কেবল লুণ্ঠনমূলক চার্জহার নির্ধারণের মাধ্যমেই বিপুল পরিমাণ মুনাফা লুটছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান তথা বিইআরসি’র লাইসেন্সীগুলো। পরিকল্পিতভাবেভাবে তাদের বিপুল মুনাফা লাভের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। আর এর সম্পূর্ণ ভার জনগণের কাঁধে এসে পড়েছে। শুনানিতে প্রমাণ পাওয়া যায়, পদ্মা ওয়েল কোম্পানির লিটার প্রতি জেট ফুয়েল বিতরণ চার্জ ৫০ পয়সায় তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ জমেছে ২ হাজার ১’শ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম ও ঢাকার পরিবাগে নির্মাণাধীন ১৪ তলা বিশিষ্ট দু‘টি বাণিজ্যিক ভবন। এরপরও বিইআরসি তাদের মার্জিন লিটার প্রতি ৫০ পয়সা থেকে বৃদ্ধি করে ৮৮ পয়সা করে লুণ্ঠনের মাত্রা বাড়িয়ে অসাধু ব্যবসা সংরক্ষণ করেছে। জনগণ জ্বালানি সুবিচার বঞ্চিত হয়েছে।
আমাদের জ্বালানি খাতের আজকের এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হলো ২০১০ সালে প্রণীত ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন’। সংকট নিরসনের অজুহাত দেখিয়ে দুই বছরের জন্য এই আইন করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বারবার এর মেয়াদ বাড়ানো হয় এবং মেয়াদ যত বেড়েছে, সংকট তত ঘনীভূত হয়। গত ৫ আগস্ট যখন পূর্বতন সরকারের পতন হয়, তখন দেখা যায় বিদ্যুৎ খাতে ঘাটতি প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। অথচ অবাক করার বিষয় হলো, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই বিশেষ আইনটি অধ্যাদেশ জারি করে বাতিল করলেও, এই আইনের আওতায় অতীতে হওয়া সব কার্যক্রমকে অধ্যাদেশে সংযোজিত দু‘টি উপধারায় ‘দায়মুক্তি’ বা প্রোটেকশন দিয়েছে। আরও হতাশাজনক বিষয়, বর্তমান সংসদ সেই সুরক্ষামূলক ২টি উপধারা বাতিল না করেই অধ্যাদেশটি অনুমোদন দিয়েছে। এই নীতিগত, আদর্শগত ও দর্শনগত বিপর্যয় দেশের রাজনীতির জন্য একটি বড় অশনিসংকেত।
সংকটের সময় যখন দাম বাড়ানো হয়নি, তখন বেসরকারি রিফাইনারিগুলোর অকটেন-পেট্রোলের কোনো খোঁজ ছিল না। কিন্তু যেই মুহূর্তে দাম বাড়ল, অমনি তাদের ট্যাংক কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেল! এমনকি তারা সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে বলছে, তাদের তেল উপচে পড়ছে, সরকার কিনছে না। দাম বাড়ার অপেক্ষায় তেল মজুত ও অধিক দামে তেল বিক্রির লক্ষ্যে কালোবাজার তৈরির এই যে দুরভিসন্ধি—এর বিচার করার কোনো সক্ষমতা কি সরকারের নেই? বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসা গণতান্ত্রিক সরকার যদি এসব সিন্ডিকেটের কাছে নতজানু হয়, তাহলে রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতাই অকার্যকর হয়ে পড়ে। এই দৃষ্টান্তে বুঝা যায়, আমাদের জ্বালানি সংকটের কারণ ইরান-ইসরাইল-আমেরিকা যুদ্ধ নয়, পতিত সরকারের তৈরি কাঠামোগত লুণ্ঠনমুলক জ্বালানিতন্ত্র।
দেশে উৎপাদিত পেট্রোলিয়াম পণ্য এবং আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য এক হতে পারে না। সরকারি ও বেসরকারি এলপিজির দামের তারতম্য এর বড় প্রমাণ। অথচ বেসরকারি খাতের মুনাফাকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে সরকার নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করে ফেলেছে। শোনা যাচ্ছে একমাত্র ইস্টার্নরিফাইনারিটি বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ ব্যক্তি মালিকানাধীন রিফাইনারির তেল উপচে পড়ছে। সরকার কিনছে না। জনগণ কি অদ্ভুত নির্মম পরিহাসের শিকার! বিআরটিএ, বিইআরসি, বিপিসি, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, প্রতিযোগিতা কমিশন—এরাই তো সরকারের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। এরা যদি লুণ্ঠনকারীদের প্রশ্রয় দেয় ও নতজানু হয়, তাহলে খোদ সরকারই অকার্যকর হয়ে পড়ে। বাস্তবে তাই হয়েছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার প্রমাণ গণপরিবহণ ভাড়াবৃদ্ধির প্রস্তাব। ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ১০০ টাকা থেকে ১১৫ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। অর্থাৎ ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। গণপরিবহণে এই তেল অধিক পরিমাণে ব্যবহার হয়। এই তেলের দাম ১৫ শতাংশ বৃদ্ধির অজুহাতে পরিবহন মালিকরা ৪০ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। বিদ্যমান ভাড়া কিলোমিটার প্রতি ঢাকা শহরে ২.৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ২.২০ টাকা। প্রস্তাব অনুযায়ী বর্ধিত ভাড়া হবে ঢাকা শহরে ৩.৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩.০৮ টাকা। এখন বিবেচ্য বিষয়, এই প্রস্তাব ন্যায্য ও যৌক্তিক কিনা?
জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধিতে গণপরিবনের ভাড়া কি পরিমাণ বৃদ্ধি হবে তা বিবেচনার ভিত্তি জ্বালানি বাবদ ব্যয় ভাড়ার কত শতাংশ। জেট ফুয়েল মূল্য নির্ধারণ প্রস্তাব গণশুনানিতে আনা হয় এবং বিমানযাত্রীর ভাড়ায় কি পরিবর্তন হতে পারে, তা আলোচিত হয়। ক্যাব ভারতীয় বিমানের এক যাত্রীর টিকিট গণশুনানিতে উপস্থাপন করে। তাতে দেখা যায়, নির্ধারিত বিমানভাড়ার বিভাজিত ব্যয়ে জ্বালানি ব্যয় মোট ভাড়ার ২০ শতাংশ। বাংলাদেশে এই ব্যয় বিভাজন বিমান বা গণপরিবহণে দেখানো হয় না। যা অন্যায় ও অযৌক্তিক এবং জ্বালানি সুবিচারের সাথে সাংঘর্ষিক। জ্বালানি বাবদ ব্যয় একটি গণপরিবহণ পরিচালন ব্যয়ের কত শতাংশ? বিমানের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ। যদি তেলের দাম ১৫ শতাংশ বাড়ে, তবে মোট ভাড়ার ওপর তার প্রভাব হওয়া উচিত ভাড়ার ২০ শতাংশের ১৫ শতাংশ (অর্থাৎ খুবই নগণ্য)।
১৫ শতাংশ বৃদ্ধিতে ডিজেলের মূল্যহার ১০০ টাকা থেকে বেড়ে হলো ১১৫ টাকা। প্রতি কিলোমিটারে বিদ্যমান গণপরিবহণ ভাড়া ঢাকায় ২.৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ২.২০ টাকা। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সমন্বয় করা হলে উক্ত ভাড়া বেড়ে হবে ঢাকায় ২.৫৮ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ২.২৭ টাকা। অথচ এই সহজ হিসাব নিয়ে মালিক সমিতির সামনে দাঁড়ানোর ক্ষমতা বিআরটিএ-এর নেই। অর্থাৎ সরকারের নেই। গণপরিবহণ মালিক সমিতি ভাড়া ৪০ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। তাতে ভাড়া বেড়ে ঢাকায় হবে ৩.৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩.০৮ টাকা। জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়ে সরকারের যে লাভ হবে, পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির চিত্রে বুঝা যায়, এর চেয়ে বহুগুণ বেশি নানা পণ্য ও সেবার মূল্য বৃদ্ধি হবে এবং জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় কত বেশি বাড়বে। সরকারের কোন প্রতিষ্ঠান —এর কোন বিচার-বিশ্লেষণ করে না।
বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর তদন্তে উঠে এসেছে, পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত অন্যায় ও যৌক্তিক ব্যয় সমন্বয় করে তা লুণ্ঠন করা হয়। আদানির সঙ্গে অসম বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তির কারণে প্রতিবছর ৫০০ মিলিয়ন ডলার লুট হচ্ছে। ২০ বছর মেয়াদে এই লুণ্ঠনের পরিমাণ হবে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার! এমন সব লুণ্ঠন ও অর্থ পাচারের কারণে সৃষ্ট ঘাটতির বোঝা সরকার যদি মূল্যবৃদ্ধি করে জনগণের কাঁধে চাপায়, তাহলে জ্বালানি নিরাপত্তা কখনোই নিশ্চিত হবে না।
আমি যদি সরকার হতাম, তাহলে প্রথমেই এ-খাতকে বাণিজ্যিক খাত থেকে আবার সেবা খাতে ফিরিয়ে আনতাম এবং সরকারকে মুনাফাভোগীর কলঙ্ক থেকে মুক্তি দিতাম। জ্বালানি সেবা প্রদানে প্রকৃত খরচ যতটুকু, ততটুকু সমন্বয় করে মূল্যহার নির্ধারণ হতো। মূল্যবৃদ্ধির পরিবর্তে গণশুনানীর ভিত্তিতে লুন্ঠনমূলক ব্যয় ও মুনাফা কমিয়ে ঘাটতি সমন্বয়ের একটি কর্মপরিকল্পনা সরকারি নিকট দাখিল করার জন্য বিইআরসি-কে নির্দেশ দিতাম। সে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতাম। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থিতিশীলতা মোকাবেলার জন্য একটি ‘প্রাইস স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড’ বা মূল্য স্থিতিশীলতা তহবিল গঠন করতাম; যেখানে দাম কম থাকাকালে উদ্বৃত্ত অর্থ জমা হতো এবং দাম বাড়লে সেখান থেকে ভর্তুকি দেয়া হতো। ফলে মূল্য স্থিতিশীল থাকতো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হতো।
সর্বোপরি, দুর্নীতি, লুণ্ঠন, আত্মসাৎ ও পাচারের মাধ্যমে যারা দেশের জ্বালানি খাতকে বিপর্যস্ত করেছে, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে তাদের ‘জ্বালানি অপরাধী’ হিসেবে বিচার করাতাম। ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাদের দেশ-বিদেশে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে সরকারি কোষাগারে জমা দিতাম এবং এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতাম, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো লুটেরা চক্রের জন্ম হতো না।
অতএব, সরকার যদি অবিলম্বে এই দর্শনগত ও নীতিগত বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে এসে জ্বালানি সুবিচার নিশ্চিত করতে না পারে, তবে জনগণের ক্ষয়ক্ষতি ও ভোগান্তি কেবল বাড়তেই থাকবে। দেশ এক দীর্ঘস্থায়ী ও অমোচনীয় সংকটের দিকে ধাবিত হবে।
এম শামসুল আলম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন।
.png)

নদীর বুক থেকে উঠে আসা একটি বিশাল পাঙাশ আমাদের একই সঙ্গে আনন্দিত ও অস্বস্তিতে ফেলে। আনন্দিত—কারণ এত বড় মাছ এখনো আমাদের নদীতে বেঁচে থাকতে পারে। অস্বস্তিতে—কারণ আমরা নিশ্চিত নই, সেটি দেশীয় পাঙাশের প্রত্যাবর্তন, খামার থেকে পালানো এক অতিথি, নাকি বহু বছরের সংরক্ষণ ব্যবস্থার অপ্রত্যাশিত সহফল।
২ ঘণ্টা আগে
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীর ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হতে হবে অন্তত স্নাতক। গত ২১ জুলাই এমন একটি রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট—যেখানে ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ২৬ ধারার অধীনে ইউপি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নি
৬ ঘণ্টা আগে
হালে চট্টগ্রাম বিভাগের বিরাট অঞ্চল আক্রান্ত হয় অতিবৃষ্টিজনিত বন্যায়। এতে বন্দরনগরীও কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের আলোচনা জোরদার না হতেই ওই নগরীর একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে চাঁদার দাবিতে হামলার ঘটনা বড় খবর হয়।
১৯ ঘণ্টা আগে
গত এক দশক ধরে ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে 'Mann Ki Baat' ছিল সরকারের একমুখী যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। এবার সেই ভাষাকেই উল্টে দিয়ে আন্দোলনকারী তরুণরা জানিয়ে দিল, এবার তারা কথা বলতে চায়, আর সেই কথাই সবাইকে শুনতে হবে।
২০ ঘণ্টা আগে