leadT1ad

আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস

আশ্রয়হীন পৃথিবীতে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি কি কেবলই ফাঁপা বুলি

প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৬, ১১: ০৬
স্ট্রিম গ্রাফিক

শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক অঙ্গীকার শুরু হয় ১৯৫১ সালে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই সমগ্র পৃথিবীতে নানাবিধ বাস্তুচ্যুতের ঘটনা ঘটতে থাকে।

এমন একটি প্রেক্ষাপটে শরণার্থীদের সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে ১৯৫১-এর রেফিউজি কনভেনশন তৈরি করা হয়। এর মূলনীতি ছিল কী করে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শরণার্থীদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা, মৌলিক অধিকার এবং সম্মানের সঙ্গে নিজ দেশে ফেরানোর ব্যাপারে কাজ করে যাওয়া। বিশ্বের অনেক দেশ এই কনভেনশনে স্বাক্ষর করলেও বাংলাদেশ এখনো স্বাক্ষর করেনি।

এই কনভেনশনে স্বাক্ষর না করলেই যে একটি দেশ শরণার্থীদের সুরক্ষার জন্য এবং তাঁদের নিরাপত্তার জন্য কাজ করতে পারবে না বা তাদের আশ্রয় দিতে পারবেন বিষয়টি তেমন নয়। অনেক উন্নত দেশ কনভেনশনের সদস্য হলেও তাঁদের অনেকেই খুব সীমিত সংখ্যক শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়, অথচ বাংলাদেশ কনভেনশনের সদস্য না হয়েও বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে কেবল মানবিক কারণে।

সেই বৈশ্বিক অঙ্গীকারের ৭৫ বছর পার হয়ে গেলেও বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়ছে না। ইউএনএইচসিআর এর বিগত এক দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে এসে বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য অনুসারে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে শরণার্থীদের সংখ্যা ছিল ৪১ দশমিক ৬ মিলিয়ন, যা ২০১৫ সালে ছিল ২১ দশমিক ৩ মিলিয়ন। এই পরিসংখানের সঙ্গে শরণার্থী ব্যতীতও বিশ্বের সমগ্র বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠী যারা নানা কারণে নিজ দেশেই বাস্তুচ্যুত হয়ে পরে (আইডিপি) এবং বিভিন্ন দেশে যারা শরণার্থী হিসেবে এসাইলাম বা আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছেন তাঁদের সকল পরিসংখ্যান যোগ করা হয় তাহলে সেই হিসাবটি আরও অনেক বেশি। এমন জনগোষ্ঠী ২০১৫ সালে ছিল ৬৫ দশমিক ৩ মিলিয়ন যা ২০২৫ সালে এসে দাঁড়ায় ১১৭ দশমিক ৮ মিলিয়নে।

তবে আমরা দেখতে পাই, ২০২৫ সালে এসে সামগ্রিকভাবে শরণার্থী কিংবা বাস্তুচ্যুত সংখ্যাটা কিছুটা কমেছে অনেক শরণার্থীদের নিজ দেশে ফেরত যাবার কারণে। অনেকেই আবার বাধ্য হয়েই তুলনামূলকভাবে নিরাপদ আশ্রয় ছেড়েছে। যেমন পাকিস্তানে বসবাসরত আফগান শরণার্থীদের অনেককেই বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে যেতে হয়, পাকিস্তানের প্রশাসনের চাপে। যদিও ইউএনএইচসিআর-এর রিপোর্ট তুলে ধরেছে এই ধরনের প্রেক্ষাপটে শরণার্থীদের দেশের ফেরা অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা জনিত ঝুঁকি রয়েছে অর্থাৎ যারা ফেরত এসেছেন এদের অনেকেই সেই নিরাপত্তা ঝুঁকি মাথায় রেখেই নিজ দেশে ফেরত এসেছেন।

এত বিপুলসংখ্যক শরণার্থীদের যারা জায়গা দিয়েছেন, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশের জায়গা হয়েছে তুলনামূলকভাবে নিম্ন এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মধ্যে যে দেশগুলো মূলত আফ্রিকা এবং এশিয়া মহাদেশে অবস্থিত এবং ৬৫% তাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রে। ১৯৫১ এর রেফিউজি কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী না হয়েও অনেক দেশ কেবলমাত্র মানবাধিকারের জায়গা থেকে শরণার্থীদের আশ্রয় দিচ্ছে। অথচ বিশ্বের সম্পদশালী এবং অনেক উন্নত দেশই এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে অবস্থিত শরণার্থীদের জন্য যে বার্ডেন শেয়ারিং এর ধারণার কথা আমরা জানি তা কোন কোন ক্ষেত্রে নিলেও এই বিপুল সংখ্যক শরণার্থীদের ব্যবস্থাপনার দায় দায়িত্ব মূলত আশ্রয়দাতা দেশের উপরেই থেকে যাচ্ছে। তবে শরণার্থীদের দেখভালের মতো জটিল দায়-দায়িত্বের সাথে বিত্তবান দেশগুলোর বিদ্যমান অল্প বিস্তর বার্ডেন শেয়ারিং বিষয়টা খুব একটা তুলনাযোগ্য নয় বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকার শরণার্থীদের বেলায়।

শরণার্থী ব্যবস্থাপনা

শরণার্থীদের ব্যবস্থাপনায় যখন আমরা বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর দায়ের দিকে তাকাই তখন আসলে একটি উভয় সংকটের মতো অবস্থা লক্ষ্য করি। স্বল্পোন্নত কিংবা মধ্যম আয়ের এই দেশগুলো তখন না পারে আন্তর্জাতিক মান এবং প্রত্যাশা বজায় রেখে শরণার্থীদের যথাযথ দেখভাল করতে, না পারে আশ্রিত শরণার্থীদের সম্মানের সাথে নিজ দেশে প্রত্যাবাসন করতে, কিংবা না পারে তাঁদের জোরপূর্বক আবারও বিতাড়িত করতে। তবে কোনো কোনো দেশ যে এমনটা করছে না, সেটি বোধহয় বলা যাবে না। যেমন সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কিছু রোহিঙ্গা শরণার্থী যারা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল, তাঁদেরকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর প্রবণতা দেখি। পাকিস্তানে বসবাসরত আফগান শরণার্থীদেরও নিজ দেশে যাওয়ার জন্য বাধ্য করে। আবার কোনো কোনো দেশ নতুন শরণার্থীদের আশ্রয় দিতেও অস্বীকার করে। যেমন কয়েক বছর আগে ইন্দোনেশিয়ার আচেহ নামক একটি এলাকায় এক দল রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় চাইলেও তাঁদের প্রবেশ করতে দেয়নি বলে অনেক বিতর্ক তৈরি হয়।

ঠিক এমন একটা পরিস্থিতিতে এ বছরের শরণার্থী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারিত হয় ‘যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ’ (আনটিল এভরিওয়ান ইস সেইফ)। ১৯৫১ সালের কনভেনশনের ৭৫ বছর পার হলেও, শরণার্থীদের বৃদ্ধির যে প্রবণতা দেখতে পাই তা বিশ্বমানবতার জন্য একটি আশঙ্কাজনক বিষয়। শরণার্থী নিয়ে কাজ করা নানা ধরনের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা থাকার পরেও কেন বিভিন্ন দেশের জাতিগোষ্ঠীর মধ্যকার আন্তঃকোন্দল কিংবা সংখ্যালঘু নিধনের মধ্য দিয়ে তাদেরকে বিতাড়িত করার চেয়ে প্রবণতা দিন দিন বেড়ে চলছে, সে বিষয়ে ক্রমাগত আলাপ জারি রাখতে হবে। এর সাথে আমাদের খুঁজে দেখতে হবে কেন বিশ্বব্যাপী শরণার্থী সমাধান দেখতে পাচ্ছি না।

তহবিল সংকট স্বল্পোন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশের জন্য কঠিন বাস্তবতা

শরণার্থীদের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংকট হলো প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাব। যদিও তহবিল সংগ্রহ কিংবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা নানাভাবে কাজ করে আসছে বিগত সময় ধরে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত। যে সংকটটি আমরা বিশেষভাবে দেখি, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে তাঁদের ব্যবস্থাপনাও তাই এক বিরাট চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে করে আসতে হচ্ছে এবং প্রতিবছরই আগের বছরের তুলনায় কম তহবিলের সংস্থান হচ্ছে। ফলে এর ভুক্তভোগী হচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা।

আশ্রয় দাতা দেশ নানাভাবে শরণার্থীদের ব্যবস্থাপনার জন্য বৈশ্বিক পরিসরে সম্পদশালী দেশগুলোর কাছে তহবিল ও অন্যান্য সাহায্যের জন্য অ্যাডভোকেসি করে থাকে। কিন্তু এখানে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যে প্রবণতাটি আশ্রয়দাতা দেশের জন্য খুবই হতাশাজনক সেটি হল, শরণার্থীদের ব্যবস্থাপনার পুরো দায় যেন আশ্রয়দাতা দেশেরই। অথচ সকল শরণার্থী সংকটই বলা যায় এক ধরনের আন্তর্জাতিক বিষয়। তাই যথাযথ তহবিলসহ অন্যান্য ব্যবস্থা বিশেষ করে তাদের প্রত্যাবাসনের জন্য সহায়তার জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশেষ করে জাতিসংঘের আরো জোরালো ভূমিকা পালন করা ব্যতীত অন্য কোন বিকল্প নেই।

স্বভাবতই এইসব স্বল্পোন্নত দেশগুলো নিজেরাই তাদের নানাবিধ উন্নয়ন সংকট এবং সমস্যা নিয়ে নাজেহাল, এমন একটি প্রেক্ষাপটে তাদের কাছে যখন আন্তর্জাতিকভাবে বিধিসম্মত শরণার্থী ব্যবস্থাপনার প্রত্যাশা থাকে তখন সেই দেশটির উপরেই নানারকম আন্তর্জাতিক চাপ থাকে। আর এ ধরনের প্রেক্ষাপটে হোস্ট বা আশ্রয়দাতা দেশের সাথে শরণার্থীর দেশের কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনা চালানো তাদের জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়ে, যা আমরা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখি। কুটনৈতিক কোন আলোচনাই যেন কোন ইতিবাচক জায়গায় যাচ্ছে না। ফলে তাঁদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আমরা খুব একটা অগ্রগতিও দেখতে পাই না।

এভাবে লম্বা সময় আশ্রয়দাতা দেশের মধ্যে শরণার্থীদের নানাবিধ সংকট, সমস্যা ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যার মধ্যে প্রতিদিনকার মৌলিক চাহিদা পূরণ একটি বড় বিষয়। এমন পরিস্থিতিতে সম্মানজনক জীবনযাপন শরণার্থী হিসেবে প্রত্যাশা করা অনেকটা আকাশকুসুম কল্পনা বিশেষ করে বাংলাদেশ এবং আফ্রিকার শরণার্থী শিবিরের মত জায়গায়। এভাবে লম্বা সময় সীমিত সুযোগ সুবিধার মধ্যে বসবাসের মাধ্যমে শরনার্থী শিবিরের আসেপাশের এলাকার ভিন্ন আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় নানা ঝুঁকি তৈরি হয়। এর মধ্যে রয়েছে মাদক ও মানব পাচারসহ আরো নানা রকম অপরাধমূলক সমস্যা। তার সাথে যুক্ত হয় স্থানীয় ও শরণার্থীদের দৈনন্দিন টানাপোড়েন।

বিশ্বজুড়ে উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান ও শরণার্থী সংকট

শরণার্থী সংকট ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধির পিছনে বিশ্বজুড়ে উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থানকেও একটি কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চল জুড়ে যখন উগ্র জাতীয়তাবাদী ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল কিংবা বিশ্বাসীগণ রাষ্ট্র পরিচালনায় আসছেন আর তখনই আমরা দেখতে পাই সংখ্যালঘু কিংবা জাতিগত নিধনের নামে তাদের নাগরিকত্ব বাতিলের মধ্য দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে একদল মানুষকে দেশহীন করে ফেলা হচ্ছে। যা আমাদেরকে একটি ভয়ংকর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে আমরা সাম্প্রতিক বাংলাদেশ এবং ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় ক্রমাগত ভারত থেকে একদল মানুষকে বাংলাদেশী পরিচিতি নির্মাণের মাধ্যমে তাঁদেরকে বাংলাদেশে জোরপূর্বক প্রবেশের ক্রমাগত প্রচেষ্টা দেখতে পাই।

এ ধরনের ঘটনা দুই দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও সম্পর্কে যেমন প্রভাব ফেলছে ঠিক তেমনি সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষজনকেও নানাবিধ জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। কেননা দুটি দেশের সীমান্তবর্তী এলাকার একটি ভিন্ন ধরনের আর্থ-সামাজিক ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা-ভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যে সম্পর্কগুলো এ ধরনের টানাপোড়েন আরো ঝুঁকির মুখে ফেলে। এ ধরনের প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে তার পাশের দেশ থেকে শক্তিশালী দেশটিই এ ধরনের কাজ করে থাকে যা বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তের একটি ঐতিহাসিক সত্য।

একই ধরনের প্রবণতা আমরা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও দেখতে পেয়েছি। ‍সত্তরের দশকের শেষভাগ থেকে প্রায় একটি নিয়মিত বিরতিতেই মিয়ানমারের এসকল ভাগ্যহীন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে এক প্রকার বাধ্য হয়েই বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে দেখি মিয়ানমারে তাঁদের প্রতি নিপীড়নের কারণে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নিধন প্রক্রিয়া এবং তা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য প্রায় এক মিলিয়ন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। কিন্তু এত বছর হয়ে যাওয়ার পরেও মিয়ানমার সরকার কোনভাবেই রোহিঙ্গাদের তাদের অধিবাসী কিংবা নাগরিক হিসেবে মেনে নেয়ার মত কোন ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেনি। উপরন্তু আমরা দেখতে পাই যে বিগত এক বছরে আরো লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এখানে উল্লেখ্য যে, ইউএনএইচসিআর এর তথ্য অনুসারে ৩১ মে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ১,১৯৭,৪১১ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় পেয়েছে।

এ ধরনের আঞ্চলিক পরিসরের সমস্যার বাইরেও আমরা দেখতে পাই যখন বিশ্বের প্রবল পরাক্রমশালী দেশগুলো ছোট ছোট দেশের ওপর আগ্রাসন চালায় তার মধ্য দিয়ে অনেক দেশের অনেক নাগরিক জীবন বাঁচাতে আশেপাশের দেশে স্থানান্তরিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত তাদের আশ্রয় হয় শরণার্থী শিবিরে। যেমন প্রেক্ষাপট আমরা দেখতে পাই আফগানিস্তান, সিরিয়া, প্যালেস্টাইনসহ ইউক্রেইনের ক্ষেত্রে। তবে বৈশ্বিক পরিসরে শরণার্থীদের সহযোগিতার ক্ষেত্রে আমরা এক ধরনের একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গিও দেখতে পাই। যেমন ইউরোপের ইউক্রেন সংকটের ফলে তৈরি হওয়া শরণার্থীদের পশ্চিমা দেশগুলো যেভাবে সহযোগিতা করে আসছে সেই ধরনের সহযোগিতা আমরা এশিয়া কিংবা আফ্রিকার শরণার্থীর ক্ষেত্রে দেখতে পাই না। যা আমাদের স্বভাবতই হতাশ করে।

শরণার্থীদের নিরাপদ রাখা কি কেবলই স্লোগান

যখন আমরা এ বছরের শরণার্থী দিবসের প্রতিপাদ্য অর্থাৎ ‘যতক্ষণ না সবাই নিরাপদ’ (আনটিল এভরিওয়ান ইস সেইফ) এর কথা বলছি ঠিক তখনই বিশ্বে কত মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে শরণার্থীতে রূপান্তরিত হচ্ছে। তবে সত্যিকার অর্থেই যদি শরণার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়, তাহলে তাকে নিরাপদ রাখতে কেবল তার শারীরিক ‍সুরক্ষার বাইরেও আরো অন্যান্য মৌলিক চাহিদার আলোকে একটি বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। কেননা নিরাপদ থাকা কিংবা নিরাপত্তা কেবল বেঁচে থাকার নিরাপত্তা নয়। একজন ব্যক্তি তখনই নিরাপদ হবে যখন সে সামগ্রিকভাবে নিরাপদ বোধ করবেন। যেখানে সে স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারবে যেখানে সে একটি দেশের নাগরিক হিসেবে জীবন যাপন করতে পারবে, যেখানে সে একটি দেশের সকল ধরনের মৌলিক সুযোগ সুবিধা পেয়ে তাঁর সন্তানদেরকে বড় করতে পারবে।

বাংলাদেশের মতো জায়গায় আমরা দেখে থাকি যে, কি করে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কেবলই বেঁচে আছে। যখন গবেষণার জন্য তাদের সাথে কথা বলি তারা বলেন, আমরা কেবলই না মরে বেঁচে আছি, একে বেঁচে থাকা বলে না। শরনার্থীদের জন্য যতদিন না সেই স্বাধীনতা না নিশ্চিত করা যাবে আদতে তারা নিরাপদ নয় এবং তাঁদের নিরাপত্তাও আরো জটিলতার দিকে যাবে।

শরণার্থীদের সংকট সমাধান এবং তাদের নিরাপদ রাখার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে আরো বেশি শক্তিশালী অবস্থান নেয়া জরুরী। এবং সেই শক্ত অবস্থানের সাথে সাথে জাতিসংঘকেও আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে। কেননা একটি দেশ যখন একটি জনগোষ্ঠীকে অন্য দেশে ঠেলে পাঠায় তখন যদি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দুর্বল পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয় তাহলে তা এমন সংকটকে আরো ভয়াবহ করে ফেলে যা আমরা প্যালেস্টাইনের উপর ইসরাইলের ভয়াবহ হামলার পরিপ্রেক্ষিতেও দেখেছি।

সমস্যা আরো জটিল হয়ে পরে যখন আন্তর্জাতিক পরিসর নির্ধারিত হয় গুটিকয়েক পশ্চিমা দেশের স্বার্থের মাধ্যমে যার মাধ্যমে আশ্রয়হীন ও দেশহীন মানুষের ভাগ্যও এক প্রকারে নির্ধারিত হয়ে পরে। তারপরও আমাদের প্রত্যাশা করে যেতে হবে যেন সেই আন্তর্জাতিক পরিসরের চাপ যেন থাকে কেননা তা ব্যতীত এই ধরনের ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা এবং যার বলি হচ্ছে এই শরণার্থীরা, সেই সমস্যার সমাধান আশা করা খুব কঠিন।

শরণার্থী দিবসের প্রতিপাদ্য যেন কেবলই একটি বিশেষ দিনের কর্মকাণ্ডে আটকে না থেকে বাস্তবিক অর্থেই শরণার্থীদের জীবন-মানের উপর ইতিবাচক প্রভাব রাখে সেই প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আর একজন মানুষ তখনই পরিপূর্ণ নিরাপদ বোধ করে যখন সে তার নিজ ঘরে থাকে, তাই শরণার্থীদের নিজ দেশে সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের কোন বিকল্প নেই।

  • বুলবুল সিদ্দিকী: নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250

সম্পর্কিত