মাহিসুন রাশ্তি

২০০৬ সালের কোনো এক অলস দুপুর। নানুর কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আমি ‘পান্তা বুড়ি’র গল্প শুনছিলাম।
হঠাৎ বাইরে এক তুমুল শোরগোল কানে এল। তাকিয়ে দেখি উঠানে আমাদের এক ভাড়াটে দম্পতি ঝগড়া করছে। স্বামীটি তার স্ত্রীর কাছে টাকা চাচ্ছে। মেয়েটি গার্মেন্টসে কাজ করত। সে সাফ জানিয়ে দিল টাকা দেবে না। কারণ আমরাও জানতাম। মেয়েটার কষ্টের রোজগারের টাকা দিয়ে লোকটা নেশা করবে নয়তো অন্য মেয়েমানুষের পেছনে ওড়াবে।
মুহূর্তের মধ্যেই কথা কাটাকাটি চরমে পৌঁছাল। এক পর্যায়ে স্বামীটি তাকে মারতে শুরু করল। মারছে আর চিৎকার করছে—যেসব মেয়ে ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করে, নিশ্চয়ই তারা কোনো না কোনো ‘অসৎ’ উপায়ে টাকা কামায়।
শেষমেশ নানু গিয়ে থামানোতে ঝগড়াটা মিটল। কিন্তু সেই মারধরের চেয়েও যে আমার মনে অনেকদিন গেঁথে ছিল লোকটার চিৎকার করে বলা কথাগুলো।
ঝগড়া থামার পর শুরু হল আশে-পাশের আলোচনা। আমাদের এক প্রতিবেশী বলেই বসলেন, ‘বউ যদি বাইরে কাজ করে, তবে তো স্বামীর মনে অশান্তি হবেই। স্বামী যদি তখন অন্য মেয়ের কাছে যায়, তাহলে তাকে কি আর দোষ দেওয়া যায়?’
আসমার মা—যাঁর আসল নাম কখনো জানা হয়নি—যোগ করলেন, ‘বউ দুটো টাকা কামাতে শিখে এখন নিজেকে কর্ত্রী ভাবতে শুরু করেছে। বউয়ের উচিত সব কামাই স্বামীর হাতে তুলে দেওয়া।’
আমি বুঝতে পারলাম, ঘরের বাইরে কাজ করা মানেই সে মেয়ে ‘সন্দেহজনক’। আর স্বামী যদি তার সাথে খারাপ ব্যবহার করে, তবে দিনশেষে দোষটা ঘুরেফিরে ওই মেয়েরই।
একই সুরের কথাবার্তা আমি নিজের ঘরের ভেতরেও শুনেছি। আমার মা ছিলেন একজন কর্মজীবী নারী। একা হাতেই সংসার টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। মায়ের মামাতো-চাচাতো ভাইয়েরা বেড়াতে আসতেন। তাদের আলাপ কোনো না কোনোভাবে গিয়ে ঠেকত আমার বাবার আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রসঙ্গে। আর অবধারিতভাবে তাঁরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতেন যে—সব দোষ আসলে আমার মায়েরই।
নানুর এক জা একবার বললেন, ‘বউ যদি স্বামীকে ধরে রাখতে না পারে, তবে সেটা বউয়েরই ব্যর্থতা।’
মায়ের এক খালাতো ভাই একবার নানুকে বললেন, ‘আপনার মেয়ে তো অফিসে পুরুষদের সাথে মেলামেশা করে। জামাই কেন তাকে ছেড়ে গেছে সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখুন, ৪৫ বছর ধরে সংসার করছি।’
কথাগুলো ছিল ভয়াবহ নিষ্ঠুর। আমার মায়ের জন্য সহ্য করা ছিল ভীষণ কঠিন। কিন্তু নানু অসীম ধৈর্য নিয়ে সব মুখ বুজে সয়ে যেতেন। তিনি মাকে কখনো বলেননি যে এতে তাঁর কোনো দোষ আছে। তবে ওই আত্মীয়দের মুখের ওপর প্রতিবাদ করার মতো সামাজিক শক্তি তখন তাঁর ছিল না।
মা সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকতেন। আমি বড় হয়েছি নানুর কাছেই। যখনই মনে হাজারটা প্রশ্ন ভিড় করত, আমি নানুর কাছে যেতাম। তিনি সবসময় একই পরামর্শ দিতেন—পড়াশোনায় মন দাও আর লোকে কী বলল তাতে কান দিও না। নানু প্রায়ই কিশোর কুমারের সেই বিখ্যাত গানের কলিটি গুনগুন করতেন: ‘কুছ তো লোগ কহেঙ্গে, লোগো কা কাম হ্যায় ক্যাহনা’—লোকে তো অনেক কিছুই বলবে, বলাটাই তাদের কাজ। আমিও খুব অল্প বয়সেই আমি শিখে গিয়েছিলাম কোন কথাগুলো কানে তুলতে হয় না।
ছোটবেলার সেইসব স্মৃতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও ব্যপ্ত হল। আমি একটা ব্যপার লক্ষ্য করলাম। নারীর সাথে যখনই কিছু ঘটে, সে নিজে কোনো অন্যায়ের শিকার হোক কিংবা তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠুক, সমাজ সবার আগে তার ‘চরিত্র’ নিয়ে বিচার শুরু করে। অথচ পুরুষের ক্ষেত্রে বিচারটা হয় শুধুই তার ‘কাজ’ দিয়ে।
২৪ ফেব্রুয়ারি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র তরিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাভারের একটি ফ্ল্যাটে এক ছাত্রীকে ধর্ষণ ও অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। ব্লাকমেইল করে তাকে ফ্ল্যাটে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। এরপর ফোন কেড়ে নিয়ে হাত-পা বেঁধে, মুখে টেপ এঁটে তাকে মারধর করা হয়। সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া ছাড়াও তার ক্ষতস্থানে গরম পানি আর রাবিং অ্যালকোহল ঢেলে দেওয়া হয়। প্রতিবেশীরা চিৎকার শুনে এগিয়ে এলে তরিকুল পালিয়ে যায়।
আশুলিয়া থানায় তার বিরুদ্ধে মামলাও হয়। কিন্তু কয়েক দিন যেতে না যেতেই এই ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার চেয়ে অন্য এক আলোচনা বড় হয়ে দাঁড়াল। তরিকুল একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে সেই ছাত্রীর সাথে তার সম্পর্কের কিছু নথিপত্র ও ছবি ছড়িয়ে দেয়। তরিকুলের উদ্দেশ্য ছিল মেয়েটাকে ‘স্বৈরিণী’ হিসেবে প্রমাণ করা। এমনকি ক্যামেরার সামনে মেয়েটিকে দিয়ে বলিয়ে নেওয়া হয়েছিল যে, তার ব্যক্তিগত ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে তরিকুল দায়ী থাকবে না। তরিকুলের দাবি ছিল, মেয়েটি তাকে ছেড়ে যেতে চেয়েছিল বলেই এই নির্যাতন ‘যৌক্তিক’ ছিল।
এরপর মুহূর্তেই জনপরিসরে আলোচনার মোড় ঘুরে গেল। মেয়েটি যে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে, সেই ব্যাপারটাই চাপা পড়ে গেল। সবাই মেতে উঠল সে ‘ভালো মেয়ে’ কি না, সেই বিতর্কে। শিক্ষক আর হলের সহপাঠীরা তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখা শুরু করলেন। অনেকে তো আবার বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে পরিবারকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকলেন। তরিকুলের অপরাধটি ঢাকা পড়ে গেল আড়ালে। বিচারের কাঠগড়ায় তোলা হল মেয়েটির ‘চরিত্র’কে।
এমনকি যখন কোনো নারী অপরাধী সাব্যস্ত হন, তখনও এই একই ধরণ দেখা যায়। বছরের শুরুতে একটি ওয়েবসাইটে এক নারীর চ্যাটের স্ক্রিনশট প্রকাশ পায়, যেখানে তিনি দাবি করেছিলেন যে ‘ঢাকা স্ট্রিম’-এর এক সাবেক কর্মী তাঁর সহকর্মীর আত্মহত্যার পেছনে দায়ী। অথচ আলোচনার সিংহভাগজুড়েই ছিল সেই নারীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক। তাঁর চরিত্রের ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে মূল অভিযোগটিই যেন গৌণ হয়ে পড়ল।
এমনকি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই ধরনের আলোচনা থেকে রেহাই পাননি। তাঁর স্বৈরশাসন নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি মৃণাল কান্তি দাসের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে মুখরোচক সব কথা চলল। যেন তাঁর রাজনৈতিক অপরাধ নিয়ে আলোচনার সময় একটা ‘স্ক্যান্ডাল’ টেনে আনা খুব জরুরি ছিল।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই একই কৌশল—নারীর ‘চরিত্র’কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা, তা দিয়ে তাকে অপমান করা, লজ্জিত করা কিংবা তার ওপর হওয়া অপরাধকে বৈধতা দেওয়া।
১৪ জানুয়ারি চুয়াডাঙ্গায় এক নারী ও পুরুষকে গাছের সাথে বেঁধে চুল কেটে দেওয়া হয়। গলায় জুতোর মালা পরিয়ে সেই লাঞ্ছনার ভিডিও করা হয়। দাবি করা হয় যে—‘অনৈতিক সম্পর্কের’ শাস্তি হিসেবেই এমনটা করা হয়েছে।
২ মার্চ নারায়ণগঞ্জে একটা স্বর্ণের হার চুরির অভিযোগে তিন নারীকে বেঁধে মারধর করা হয়। এরপর এক ব্যক্তি তাদের মাথার চুল কেটে দেন। নারীরা আকুতি-মিনতি করছিলেন যেন তাদের চুল কাটা না হয়।
এই দুই ক্ষেত্রেই সমবেত জনতা নিজেই বিচারক আর জল্লাদের ভূমিকা নিয়েছে। তাদের এই ক্ষমতার উৎস আইন নয়। এর উৎস সামাজিকভাবে স্বীকৃত এই ধারণা যে ‘চরিত্র’ হারানো নারীর কন রকম মানবিক অধিকার নেই। সেই প্রতি কোন রকম সম্মান দেখানোর দায় সমাজের নেই।
এই ঘটনাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে কীভাবে ‘চরিত্র’-এর দোহাই দিয়ে সমাজ নিজের আধিপত্য বজায় রাখে। সমাজই ঠিক করে দেয় কার জন্য কোন ধরনের শাস্তি গ্রহণযোগ্য।
এমনকি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও একই চিত্র ফুটে ওঠে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘সিপি গ্যাং’ নামের একটি অনলাইন গোষ্ঠী নারী সমালোচকদের মানহানি করার জন্য নিয়মিত হয়রানি চালাত। বর্তমানের নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও বিভিন্ন নেটওয়ার্ক আর বট-চালিত ক্যাম্পেইনগুলো একই পথ বেছে নিয়েছে। নারীদের গায়ে ‘শাহবাগী’, ‘বেশ্যা’ বা এই জাতীয় নানা অপমানজনক তকমা সেঁটে দেওয়া হচ্ছে। কুশীলবরা বদলালেও কৌশলটা একই রয়ে গেছে। যখনই কোনো নারীর কোন কাজ বা আচরণ পছন্দ হবে না, তখন সেই কাজের বা কথার জবাব দেওয়ার দরকার নেই। সোজা তাকে চরিত্রহীন বেশ্যা বানিয়ে দাও। সবাই সেটা নিয়েই মজে যাবে।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন যে এবার হয়তো সমাজে বড় কোনো পরিবর্তনের দুয়ার খুলে যাবে। কিন্তু আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি কি আদৌ বদলেছে?
নারীর পোশাক-আশাক, চলাফেরা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক আর স্বাধীনতাকে আজও নৈতিকতার মাপকাঠি হিসেবে আতশি কাঁচের নিচে রাখা হয়। এই ব্যবস্থায় নারীরা যেন একেকটি ‘সামাজিক টেস্ট কেইস’। এই টেস্টের ওপর ভিত্তি করে সমাজ নিজের নৈতিকতার সীমানা মেপে নেয়।
একজন নারী যখনই ঘরের বাইরে কাজ করে, প্রকাশ্যে নিজের মতামত জানায় কিংবা নিজের স্বাধীনতার দাবি তোলে—অর্থাৎ প্রচলিত জেন্ডার ভূমিকার বাইরে পা রাখে—ঠিক তখনই তাঁর ‘চরিত্র’ হয়ে ওঠে বিচার্য বিষয়। আর একবার যখন তাঁর চরিত্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়, তখন তাঁর ওপর করা যেকোনো অন্যায়কে জায়েজ করা খুব সহজ হয়ে পড়ে।
কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ দেখেছে যে নারীরা রাজনীতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছেন। লাখ লাখ নারী কর্মক্ষেত্রে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন। অথচ দৃশ্যমান এই অর্জনের পাশেই এমন এক সমাজ বাস করে, যারা নারীর এই আত্মনির্ভরশীলতাকে আজও সহজভাবে মেনে নিতে চরম অস্বস্তি বোধ করে।
নারীর ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার বদলে সমাজ বারবার সেই পুরনো মাপকাঠিতেই ফিরে যায়। তার কাজ, অর্জন অথবা নিছক মানুষ হওয়ার সুবাদে যে অধিকার তার প্রাপ্য, সেইসবের বদলে বিচার্য হয় তাঁর চরিত্র, তাঁর চলাফেরা, তাঁর পোশাক আর তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ।
আর এই পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোতে একজন নারী যখনই নির্ধারিত নিয়মের বাইরে এক কদম পা রাখেন, সমাজ তাকে এমন এক অপরাধ হিসেবে গণ্য করে, যা জামিন অযোগ্য।

২০০৬ সালের কোনো এক অলস দুপুর। নানুর কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আমি ‘পান্তা বুড়ি’র গল্প শুনছিলাম।
হঠাৎ বাইরে এক তুমুল শোরগোল কানে এল। তাকিয়ে দেখি উঠানে আমাদের এক ভাড়াটে দম্পতি ঝগড়া করছে। স্বামীটি তার স্ত্রীর কাছে টাকা চাচ্ছে। মেয়েটি গার্মেন্টসে কাজ করত। সে সাফ জানিয়ে দিল টাকা দেবে না। কারণ আমরাও জানতাম। মেয়েটার কষ্টের রোজগারের টাকা দিয়ে লোকটা নেশা করবে নয়তো অন্য মেয়েমানুষের পেছনে ওড়াবে।
মুহূর্তের মধ্যেই কথা কাটাকাটি চরমে পৌঁছাল। এক পর্যায়ে স্বামীটি তাকে মারতে শুরু করল। মারছে আর চিৎকার করছে—যেসব মেয়ে ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করে, নিশ্চয়ই তারা কোনো না কোনো ‘অসৎ’ উপায়ে টাকা কামায়।
শেষমেশ নানু গিয়ে থামানোতে ঝগড়াটা মিটল। কিন্তু সেই মারধরের চেয়েও যে আমার মনে অনেকদিন গেঁথে ছিল লোকটার চিৎকার করে বলা কথাগুলো।
ঝগড়া থামার পর শুরু হল আশে-পাশের আলোচনা। আমাদের এক প্রতিবেশী বলেই বসলেন, ‘বউ যদি বাইরে কাজ করে, তবে তো স্বামীর মনে অশান্তি হবেই। স্বামী যদি তখন অন্য মেয়ের কাছে যায়, তাহলে তাকে কি আর দোষ দেওয়া যায়?’
আসমার মা—যাঁর আসল নাম কখনো জানা হয়নি—যোগ করলেন, ‘বউ দুটো টাকা কামাতে শিখে এখন নিজেকে কর্ত্রী ভাবতে শুরু করেছে। বউয়ের উচিত সব কামাই স্বামীর হাতে তুলে দেওয়া।’
আমি বুঝতে পারলাম, ঘরের বাইরে কাজ করা মানেই সে মেয়ে ‘সন্দেহজনক’। আর স্বামী যদি তার সাথে খারাপ ব্যবহার করে, তবে দিনশেষে দোষটা ঘুরেফিরে ওই মেয়েরই।
একই সুরের কথাবার্তা আমি নিজের ঘরের ভেতরেও শুনেছি। আমার মা ছিলেন একজন কর্মজীবী নারী। একা হাতেই সংসার টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। মায়ের মামাতো-চাচাতো ভাইয়েরা বেড়াতে আসতেন। তাদের আলাপ কোনো না কোনোভাবে গিয়ে ঠেকত আমার বাবার আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রসঙ্গে। আর অবধারিতভাবে তাঁরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতেন যে—সব দোষ আসলে আমার মায়েরই।
নানুর এক জা একবার বললেন, ‘বউ যদি স্বামীকে ধরে রাখতে না পারে, তবে সেটা বউয়েরই ব্যর্থতা।’
মায়ের এক খালাতো ভাই একবার নানুকে বললেন, ‘আপনার মেয়ে তো অফিসে পুরুষদের সাথে মেলামেশা করে। জামাই কেন তাকে ছেড়ে গেছে সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখুন, ৪৫ বছর ধরে সংসার করছি।’
কথাগুলো ছিল ভয়াবহ নিষ্ঠুর। আমার মায়ের জন্য সহ্য করা ছিল ভীষণ কঠিন। কিন্তু নানু অসীম ধৈর্য নিয়ে সব মুখ বুজে সয়ে যেতেন। তিনি মাকে কখনো বলেননি যে এতে তাঁর কোনো দোষ আছে। তবে ওই আত্মীয়দের মুখের ওপর প্রতিবাদ করার মতো সামাজিক শক্তি তখন তাঁর ছিল না।
মা সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকতেন। আমি বড় হয়েছি নানুর কাছেই। যখনই মনে হাজারটা প্রশ্ন ভিড় করত, আমি নানুর কাছে যেতাম। তিনি সবসময় একই পরামর্শ দিতেন—পড়াশোনায় মন দাও আর লোকে কী বলল তাতে কান দিও না। নানু প্রায়ই কিশোর কুমারের সেই বিখ্যাত গানের কলিটি গুনগুন করতেন: ‘কুছ তো লোগ কহেঙ্গে, লোগো কা কাম হ্যায় ক্যাহনা’—লোকে তো অনেক কিছুই বলবে, বলাটাই তাদের কাজ। আমিও খুব অল্প বয়সেই আমি শিখে গিয়েছিলাম কোন কথাগুলো কানে তুলতে হয় না।
ছোটবেলার সেইসব স্মৃতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও ব্যপ্ত হল। আমি একটা ব্যপার লক্ষ্য করলাম। নারীর সাথে যখনই কিছু ঘটে, সে নিজে কোনো অন্যায়ের শিকার হোক কিংবা তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠুক, সমাজ সবার আগে তার ‘চরিত্র’ নিয়ে বিচার শুরু করে। অথচ পুরুষের ক্ষেত্রে বিচারটা হয় শুধুই তার ‘কাজ’ দিয়ে।
২৪ ফেব্রুয়ারি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র তরিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে সাভারের একটি ফ্ল্যাটে এক ছাত্রীকে ধর্ষণ ও অমানুষিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। ব্লাকমেইল করে তাকে ফ্ল্যাটে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। এরপর ফোন কেড়ে নিয়ে হাত-পা বেঁধে, মুখে টেপ এঁটে তাকে মারধর করা হয়। সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া ছাড়াও তার ক্ষতস্থানে গরম পানি আর রাবিং অ্যালকোহল ঢেলে দেওয়া হয়। প্রতিবেশীরা চিৎকার শুনে এগিয়ে এলে তরিকুল পালিয়ে যায়।
আশুলিয়া থানায় তার বিরুদ্ধে মামলাও হয়। কিন্তু কয়েক দিন যেতে না যেতেই এই ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার চেয়ে অন্য এক আলোচনা বড় হয়ে দাঁড়াল। তরিকুল একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে সেই ছাত্রীর সাথে তার সম্পর্কের কিছু নথিপত্র ও ছবি ছড়িয়ে দেয়। তরিকুলের উদ্দেশ্য ছিল মেয়েটাকে ‘স্বৈরিণী’ হিসেবে প্রমাণ করা। এমনকি ক্যামেরার সামনে মেয়েটিকে দিয়ে বলিয়ে নেওয়া হয়েছিল যে, তার ব্যক্তিগত ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়লে তরিকুল দায়ী থাকবে না। তরিকুলের দাবি ছিল, মেয়েটি তাকে ছেড়ে যেতে চেয়েছিল বলেই এই নির্যাতন ‘যৌক্তিক’ ছিল।
এরপর মুহূর্তেই জনপরিসরে আলোচনার মোড় ঘুরে গেল। মেয়েটি যে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে, সেই ব্যাপারটাই চাপা পড়ে গেল। সবাই মেতে উঠল সে ‘ভালো মেয়ে’ কি না, সেই বিতর্কে। শিক্ষক আর হলের সহপাঠীরা তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখা শুরু করলেন। অনেকে তো আবার বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে পরিবারকে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকলেন। তরিকুলের অপরাধটি ঢাকা পড়ে গেল আড়ালে। বিচারের কাঠগড়ায় তোলা হল মেয়েটির ‘চরিত্র’কে।
এমনকি যখন কোনো নারী অপরাধী সাব্যস্ত হন, তখনও এই একই ধরণ দেখা যায়। বছরের শুরুতে একটি ওয়েবসাইটে এক নারীর চ্যাটের স্ক্রিনশট প্রকাশ পায়, যেখানে তিনি দাবি করেছিলেন যে ‘ঢাকা স্ট্রিম’-এর এক সাবেক কর্মী তাঁর সহকর্মীর আত্মহত্যার পেছনে দায়ী। অথচ আলোচনার সিংহভাগজুড়েই ছিল সেই নারীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক। তাঁর চরিত্রের ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে মূল অভিযোগটিই যেন গৌণ হয়ে পড়ল।
এমনকি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই ধরনের আলোচনা থেকে রেহাই পাননি। তাঁর স্বৈরশাসন নিয়ে সমালোচনার পাশাপাশি মৃণাল কান্তি দাসের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে মুখরোচক সব কথা চলল। যেন তাঁর রাজনৈতিক অপরাধ নিয়ে আলোচনার সময় একটা ‘স্ক্যান্ডাল’ টেনে আনা খুব জরুরি ছিল।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই একই কৌশল—নারীর ‘চরিত্র’কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা, তা দিয়ে তাকে অপমান করা, লজ্জিত করা কিংবা তার ওপর হওয়া অপরাধকে বৈধতা দেওয়া।
১৪ জানুয়ারি চুয়াডাঙ্গায় এক নারী ও পুরুষকে গাছের সাথে বেঁধে চুল কেটে দেওয়া হয়। গলায় জুতোর মালা পরিয়ে সেই লাঞ্ছনার ভিডিও করা হয়। দাবি করা হয় যে—‘অনৈতিক সম্পর্কের’ শাস্তি হিসেবেই এমনটা করা হয়েছে।
২ মার্চ নারায়ণগঞ্জে একটা স্বর্ণের হার চুরির অভিযোগে তিন নারীকে বেঁধে মারধর করা হয়। এরপর এক ব্যক্তি তাদের মাথার চুল কেটে দেন। নারীরা আকুতি-মিনতি করছিলেন যেন তাদের চুল কাটা না হয়।
এই দুই ক্ষেত্রেই সমবেত জনতা নিজেই বিচারক আর জল্লাদের ভূমিকা নিয়েছে। তাদের এই ক্ষমতার উৎস আইন নয়। এর উৎস সামাজিকভাবে স্বীকৃত এই ধারণা যে ‘চরিত্র’ হারানো নারীর কন রকম মানবিক অধিকার নেই। সেই প্রতি কোন রকম সম্মান দেখানোর দায় সমাজের নেই।
এই ঘটনাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে কীভাবে ‘চরিত্র’-এর দোহাই দিয়ে সমাজ নিজের আধিপত্য বজায় রাখে। সমাজই ঠিক করে দেয় কার জন্য কোন ধরনের শাস্তি গ্রহণযোগ্য।
এমনকি রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও একই চিত্র ফুটে ওঠে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘সিপি গ্যাং’ নামের একটি অনলাইন গোষ্ঠী নারী সমালোচকদের মানহানি করার জন্য নিয়মিত হয়রানি চালাত। বর্তমানের নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও বিভিন্ন নেটওয়ার্ক আর বট-চালিত ক্যাম্পেইনগুলো একই পথ বেছে নিয়েছে। নারীদের গায়ে ‘শাহবাগী’, ‘বেশ্যা’ বা এই জাতীয় নানা অপমানজনক তকমা সেঁটে দেওয়া হচ্ছে। কুশীলবরা বদলালেও কৌশলটা একই রয়ে গেছে। যখনই কোনো নারীর কোন কাজ বা আচরণ পছন্দ হবে না, তখন সেই কাজের বা কথার জবাব দেওয়ার দরকার নেই। সোজা তাকে চরিত্রহীন বেশ্যা বানিয়ে দাও। সবাই সেটা নিয়েই মজে যাবে।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন যে এবার হয়তো সমাজে বড় কোনো পরিবর্তনের দুয়ার খুলে যাবে। কিন্তু আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি কি আদৌ বদলেছে?
নারীর পোশাক-আশাক, চলাফেরা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক আর স্বাধীনতাকে আজও নৈতিকতার মাপকাঠি হিসেবে আতশি কাঁচের নিচে রাখা হয়। এই ব্যবস্থায় নারীরা যেন একেকটি ‘সামাজিক টেস্ট কেইস’। এই টেস্টের ওপর ভিত্তি করে সমাজ নিজের নৈতিকতার সীমানা মেপে নেয়।
একজন নারী যখনই ঘরের বাইরে কাজ করে, প্রকাশ্যে নিজের মতামত জানায় কিংবা নিজের স্বাধীনতার দাবি তোলে—অর্থাৎ প্রচলিত জেন্ডার ভূমিকার বাইরে পা রাখে—ঠিক তখনই তাঁর ‘চরিত্র’ হয়ে ওঠে বিচার্য বিষয়। আর একবার যখন তাঁর চরিত্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়, তখন তাঁর ওপর করা যেকোনো অন্যায়কে জায়েজ করা খুব সহজ হয়ে পড়ে।
কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ দেখেছে যে নারীরা রাজনীতির সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছেন। লাখ লাখ নারী কর্মক্ষেত্রে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন। অথচ দৃশ্যমান এই অর্জনের পাশেই এমন এক সমাজ বাস করে, যারা নারীর এই আত্মনির্ভরশীলতাকে আজও সহজভাবে মেনে নিতে চরম অস্বস্তি বোধ করে।
নারীর ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলার বদলে সমাজ বারবার সেই পুরনো মাপকাঠিতেই ফিরে যায়। তার কাজ, অর্জন অথবা নিছক মানুষ হওয়ার সুবাদে যে অধিকার তার প্রাপ্য, সেইসবের বদলে বিচার্য হয় তাঁর চরিত্র, তাঁর চলাফেরা, তাঁর পোশাক আর তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ।
আর এই পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোতে একজন নারী যখনই নির্ধারিত নিয়মের বাইরে এক কদম পা রাখেন, সমাজ তাকে এমন এক অপরাধ হিসেবে গণ্য করে, যা জামিন অযোগ্য।

একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক। মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো অস্থিরতা মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেয়। বর্তমানে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘাত একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারে
৩৬ মিনিট আগে
আজ ৮ই মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিনটির ঐতিহাসিক ও বৈশ্বিক তাৎপর্যের আলোকে যদি আমরা বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারীর অবস্থান মূল্যায়ন করি, তবে একটি দ্বিমুখী চিত্র আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। একদিকে যেমন নারীর অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি রয়ে গেছে চরম অবনতি ও হতাশার জায়গা।
৩ ঘণ্টা আগে
৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। পৃথিবীর বহু দেশের মতো বাংলাদেশেও দিনটি নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, এই দিবসটি কি কেবল ফুল, ব্যানার, আর শুভেচ্ছা বার্তার মধ্যে দিয়ে আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে?
৪ ঘণ্টা আগে
তুরস্ক ও ইরান আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি নিয়ে শতাব্দীপ্রাচীন বোঝাপড়ার মধ্যে আছে। মধ্যপ্রাচ্যে এই দুই দেশের সীমান্তই হলো সবচেয়ে পুরোনো ও স্বীকৃত সীমান্ত। ১৬৩৯ সাল থেকে দুই দেশ একে অপরের পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করছে।
১৯ ঘণ্টা আগে