সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন মানহানি দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। একসময় কারও সুনাম নষ্ট করতে হলে সংবাদপত্র, সম্পাদক, যাচাই-বাছাই এবং সময়ের প্রয়োজন হতো। আজ একটি টুইট, একটি বিকৃত স্ক্রিনশট, একটি বিভ্রান্তিকর ভিডিও ক্লিপ কিংবা একটি বেপরোয়া অভিযোগই যথেষ্ট। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একজন মানুষের বহু বছরের অর্জিত সম্মান ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। সত্য যতক্ষণে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ পায়নি, মিথ্যা তখন বহু দূর এগিয়ে যায়।
এই বাস্তবতার শিকার কেবল রাজনীতিবিদ, কর্মকর্তা বা সেলিব্রিটিরা নন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব—এমনকি সাধারণ মানুষও হঠাৎ করে কোনো অনলাইন জনতার ক্রোধের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারেন। কখনো একটি অপ্রস্তুত ছবি, কখনো প্রসঙ্গবিচ্ছিন্ন একটি বক্তব্য, আবার কখনো কারও ব্যক্তিগত হিংসা-বিদ্বেষই যথেষ্ট হয় একটি ডিজিটাল বিচারসভা বসানোর জন্য।
এরপর প্রায় একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। অভিযুক্ত ব্যক্তি মরিয়া হয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চান। তিনি দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেন, নথিপত্র প্রকাশ করেন, মন্তব্যের পর মন্তব্য লিখে প্রতিটি অভিযোগের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেন। অর্থাৎ অজান্তেই তিনি সেই কাদার মাঠে নেমে পড়েন, যেখানে খেলার নিয়মই এমন যে পরিষ্কার হয়ে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব।
আর সেখানেই লুকিয়ে থাকে আসল ফাঁদ। কিছু সংঘাত এমনভাবে তৈরি করা হয় যেখানে কেউই প্রকৃত অর্থে বিজয়ী হতে পারে না। সেখানে সত্য বা ন্যায়বিচার মূল বিষয় নয়; মূল বিষয় হলো উত্তেজনা, প্রতিক্রিয়া এবং কোলাহল। যে ব্যক্তি অপবাদ ছড়ায়, সে প্রায়শই সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায় না; বরং চায় আপনাকে উত্তেজিত করতে, আবেগপ্রবণ করে তুলতে এবং একটি প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে টেনে আনতে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবসায়িক মডেলও এই প্রবণতাকে উৎসাহিত করে। অ্যালগরিদম ক্ষোভকে পুরস্কৃত করে, কারণ ক্ষোভ মানুষকে বেশি ক্লিক করতে, বেশি শেয়ার করতে এবং বেশি মন্তব্য করতে উদ্বুদ্ধ করে। শান্ত, ভারসাম্যপূর্ণ ও যুক্তিনিষ্ঠ ব্যাখ্যা খুব কমই ভাইরাল হয়। কিন্তু রাগ, তর্ক এবং নাটক মুহূর্তের মধ্যেই লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
ফলে অনেক সময় সবচেয়ে সুন্দরভাবে লেখা আত্মপক্ষসমর্থনও প্রত্যাশিত ফল দেয় না। বরং বিতর্ককে আরও দীর্ঘায়িত করে। বাইরে থেকে যারা দেখেন, তারা প্রায়ই কে সঠিক আর কে ভুল, তা নির্ধারণের চেষ্টা করেন না। তারা কেবল কোলাহল দেখেন। তাদের চোখে শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষই সমানভাবে জড়িত বলে মনে হয়।
অন্যদিকে যে ব্যক্তি অপবাদের সূচনা করেছিল, তার খুব একটা ক্ষতি হয় না। অনেক ক্ষেত্রে সে উল্টো বেশি মনোযোগ, বেশি অনুসারী এবং বেশি প্রভাব অর্জন করে। কারণ আধুনিক ডিজিটাল পরিবেশে মনোযোগই সবচেয়ে মূল্যবান মুদ্রা। সত্যের প্রয়োজন নেই; প্রতিক্রিয়া পেলেই উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে যায়।
এখানেই এক অদ্ভুত ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। আপনি যদি নীরব থাকেন, কেউ কেউ ধরে নেবে আপনি দোষী। আপনি যদি আবেগ নিয়ে জবাব দেন, বলা হবে আপনি ভারসাম্য হারিয়েছেন। আপনি যদি প্রমাণ উপস্থাপন করেন, বলা হবে আপনি মরিয়া হয়ে নিজেকে বাঁচাতে চাইছেন। আপনি যদি আইনের আশ্রয় নেন, বলা হবে আপনি সমালোচনা বন্ধ করতে চাইছেন। অর্থাৎ আপনি যা-ই করুন না কেন, খেলার নিয়ম যেন আগেই আপনার বিরুদ্ধে লেখা।
এই কারণেই ইন্টারনেট কোনো আদালত নয়। এখানে বিচার হয় না; এখানে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এটি অনেকটা স্টেডিয়ামের মতো, যেখানে দর্শকরা তাৎক্ষণিক আবেগে হাততালি দেয়, শিস দেয়, উল্লাস করে কিংবা বিদ্রুপ ছুড়ে দেয়। সেখানে সত্যের চেয়ে বিনোদনের মূল্য প্রায়ই বেশি।
সম্মানে আঘাত লাগলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই প্রতিক্রিয়া জানাতে চায়। কারণ সুনাম মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। প্রকাশ্য অপমান ভয়, ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই অনুভূতিকে আরও তীব্র করে তোলে, কারণ মনে হয় যেন অসংখ্য মানুষের সামনে এই আক্রমণ সংঘটিত হচ্ছে।
কিন্তু ডিজিটাল বাস্তবতার সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো—সব আক্রমণের জবাব জনসমক্ষে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
আজকের অনলাইন জগতে এমন এক শ্রেণির মানুষ তৈরি হয়েছে, যাদের প্রধান উদ্দেশ্য বিতর্ক সৃষ্টি করা। তারা জানে যে রাগ বিক্রি হয়। ক্ষোভ মনোযোগ আনে। আর মনোযোগ প্রভাব তৈরি করে। ফলে তাদের লক্ষ্য কোনো গঠনমূলক আলোচনা নয়; তাদের লক্ষ্য হলো আপনাকে আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়ায় বাধ্য করা।
এক পর্যায়ে মূল অভিযোগটিই গৌণ হয়ে যায়। যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তা হলো দ্বন্দ্বটিকে বাঁচিয়ে রাখা। আপনি যত বেশি জড়াবেন, তত বেশি কনটেন্ট তৈরি হবে। আপনার ক্ষোভ, আপনার ব্যথা, আপনার হতাশা—সবকিছুই জনসমক্ষে প্রদর্শিত এক নতুন বিনোদনে পরিণত হবে।
এই প্রবণতার সামাজিক মূল্যও কম নয়। যে সমাজে নিয়মিত প্রকাশ্য কাদা ছোড়াছুড়ি স্বাভাবিক হয়ে যায়, সেখানে মানুষ ধীরে ধীরে একে অপরের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করে। চরিত্র, সততা, সেবা এবং দীর্ঘদিনের অবদান দিয়ে যে সুনাম গড়ে ওঠে, তা একটি বিকেলেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
আর ক্ষতিটা প্রায়ই দীর্ঘস্থায়ী হয়। পোস্ট মুছে ফেলা যায়, কিন্তু স্ক্রিনশট থেকে যায়। অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হতে পারে, কিন্তু সেই সংশোধন সবার চোখে পৌঁছায় না। অনেক মানুষ কেলেঙ্কারির কথা মনে রাখে, কিন্তু তার খণ্ডনের কথা আর মনে রাখে না। ফলে দাগটি থেকে যায়।
এর পরিণতিতে মানুষ ক্রমশ সতর্ক হয়ে ওঠে। অনেকে নিজের মতামত প্রকাশ করতে ভয় পায়। কেউ কেউ অযথা বিতর্ক এড়াতে নীরবতা বেছে নেয়। ধীরে ধীরে একটি সন্দেহপ্রবণ, উদ্বিগ্ন এবং আত্মরক্ষামূলক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। অবশ্যই আইন প্রয়োজন। প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা প্রয়োজন। ডিজিটাল সাক্ষরতারও প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এই সমস্যার একটি গভীর ব্যক্তিগত মাত্রাও আছে।
প্রতিটি উস্কানির জবাব দিতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আধুনিক ডিজিটাল সংস্কৃতিতে দৃশ্যমানতাই শক্তি। আপনি যত বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাবেন, তত বেশি সেই সংঘাতের মূল্য বাড়বে। এর অর্থ এই নয় যে মিথ্যাকে মেনে নিতে হবে কিংবা সত্যকে বিসর্জন দিতে হবে। গুরুতর অভিযোগের মোকাবিলা অবশ্যই করতে হবে—তবে সঠিক জায়গায়। আদালত, পেশাগত প্রতিষ্ঠান, বিশ্বস্ত সামাজিক পরিসর এবং সরাসরি মানবিক যোগাযোগ এখনো সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ইন্টারনেটের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।
কারণ ইন্টারনেটের নকশা মূলত সমাধানের জন্য নয়; এটি সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করার জন্য বেশি উপযোগী। আমাদের সময়ের সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যগুলোর একটি হলো—কিছু অনলাইন যুদ্ধ এমনভাবেই তৈরি করা হয়, যাতে আপনাকে কাদায় নামানো যায়। সেখানে উদ্দেশ্য বোঝাপড়া নয়, চরিত্রহনন; উদ্দেশ্য সত্য অনুসন্ধান নয়, বরং মনোযোগ দখল।
ইন্টারনেট মানুষকে তাৎক্ষণিক, আবেগপ্রবণ এবং প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। এটি ক্ষোভকে পুরস্কৃত করে, সংযমকে নয়। কিন্তু মানুষের মর্যাদা, মনোযোগ এবং মানসিক শক্তি সীমিত; পক্ষান্তরে কাদার কোনো শেষ নেই।
ডিজিটাল দুনিয়া আপনাকে রাগান্বিত দেখতে চায়। এটি চায় আপনি লড়াই করুন। এটি চায় আপনি মাঝরাতে নোটিফিকেশন স্ক্রল করতে করতে অপরিচিত মানুষের মন্তব্যের জবাব দিন। আর যখন সেই জনতা অন্য কোনো নতুন নাটকের দিকে চলে যাবে, তখন আপনার হাতে থাকবে শুধু মানসিক ক্লান্তি।
তাই জর্জ বার্নার্ড শ-এর উপদেশ ‘শূকরের সঙ্গে কুস্তি লড়তে যেয়ো না; এতে তুমি যেমন নোংরা হবে, শূকরও ব্যাপারটি উপভোগ করবে’ এখানে প্রাসঙ্গিক। এই লড়তে না যাওয়াটা কাপুরুষতা নয়; এটি প্রজ্ঞা। কিছু যুদ্ধ সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, আপনাকে কাদায় নামানোর জন্য তৈরি করা হয়। সেই যুদ্ধে অংশ না নেওয়াই কখনো কখনো সবচেয়ে বড় বিজয়।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন মানহানি দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। একসময় কারও সুনাম নষ্ট করতে হলে সংবাদপত্র, সম্পাদক, যাচাই-বাছাই এবং সময়ের প্রয়োজন হতো। আজ একটি টুইট, একটি বিকৃত স্ক্রিনশট, একটি বিভ্রান্তিকর ভিডিও ক্লিপ কিংবা একটি বেপরোয়া অভিযোগই যথেষ্ট। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একজন মানুষের বহু বছরের অর্জিত সম্মান ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। সত্য যতক্ষণে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ পায়নি, মিথ্যা তখন বহু দূর এগিয়ে যায়।
এই বাস্তবতার শিকার কেবল রাজনীতিবিদ, কর্মকর্তা বা সেলিব্রিটিরা নন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব—এমনকি সাধারণ মানুষও হঠাৎ করে কোনো অনলাইন জনতার ক্রোধের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারেন। কখনো একটি অপ্রস্তুত ছবি, কখনো প্রসঙ্গবিচ্ছিন্ন একটি বক্তব্য, আবার কখনো কারও ব্যক্তিগত হিংসা-বিদ্বেষই যথেষ্ট হয় একটি ডিজিটাল বিচারসভা বসানোর জন্য।
এরপর প্রায় একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। অভিযুক্ত ব্যক্তি মরিয়া হয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চান। তিনি দীর্ঘ ব্যাখ্যা দেন, নথিপত্র প্রকাশ করেন, মন্তব্যের পর মন্তব্য লিখে প্রতিটি অভিযোগের জবাব দেওয়ার চেষ্টা করেন। অর্থাৎ অজান্তেই তিনি সেই কাদার মাঠে নেমে পড়েন, যেখানে খেলার নিয়মই এমন যে পরিষ্কার হয়ে ফিরে আসা প্রায় অসম্ভব।
আর সেখানেই লুকিয়ে থাকে আসল ফাঁদ। কিছু সংঘাত এমনভাবে তৈরি করা হয় যেখানে কেউই প্রকৃত অর্থে বিজয়ী হতে পারে না। সেখানে সত্য বা ন্যায়বিচার মূল বিষয় নয়; মূল বিষয় হলো উত্তেজনা, প্রতিক্রিয়া এবং কোলাহল। যে ব্যক্তি অপবাদ ছড়ায়, সে প্রায়শই সত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায় না; বরং চায় আপনাকে উত্তেজিত করতে, আবেগপ্রবণ করে তুলতে এবং একটি প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে টেনে আনতে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবসায়িক মডেলও এই প্রবণতাকে উৎসাহিত করে। অ্যালগরিদম ক্ষোভকে পুরস্কৃত করে, কারণ ক্ষোভ মানুষকে বেশি ক্লিক করতে, বেশি শেয়ার করতে এবং বেশি মন্তব্য করতে উদ্বুদ্ধ করে। শান্ত, ভারসাম্যপূর্ণ ও যুক্তিনিষ্ঠ ব্যাখ্যা খুব কমই ভাইরাল হয়। কিন্তু রাগ, তর্ক এবং নাটক মুহূর্তের মধ্যেই লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
ফলে অনেক সময় সবচেয়ে সুন্দরভাবে লেখা আত্মপক্ষসমর্থনও প্রত্যাশিত ফল দেয় না। বরং বিতর্ককে আরও দীর্ঘায়িত করে। বাইরে থেকে যারা দেখেন, তারা প্রায়ই কে সঠিক আর কে ভুল, তা নির্ধারণের চেষ্টা করেন না। তারা কেবল কোলাহল দেখেন। তাদের চোখে শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষই সমানভাবে জড়িত বলে মনে হয়।
অন্যদিকে যে ব্যক্তি অপবাদের সূচনা করেছিল, তার খুব একটা ক্ষতি হয় না। অনেক ক্ষেত্রে সে উল্টো বেশি মনোযোগ, বেশি অনুসারী এবং বেশি প্রভাব অর্জন করে। কারণ আধুনিক ডিজিটাল পরিবেশে মনোযোগই সবচেয়ে মূল্যবান মুদ্রা। সত্যের প্রয়োজন নেই; প্রতিক্রিয়া পেলেই উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে যায়।
এখানেই এক অদ্ভুত ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। আপনি যদি নীরব থাকেন, কেউ কেউ ধরে নেবে আপনি দোষী। আপনি যদি আবেগ নিয়ে জবাব দেন, বলা হবে আপনি ভারসাম্য হারিয়েছেন। আপনি যদি প্রমাণ উপস্থাপন করেন, বলা হবে আপনি মরিয়া হয়ে নিজেকে বাঁচাতে চাইছেন। আপনি যদি আইনের আশ্রয় নেন, বলা হবে আপনি সমালোচনা বন্ধ করতে চাইছেন। অর্থাৎ আপনি যা-ই করুন না কেন, খেলার নিয়ম যেন আগেই আপনার বিরুদ্ধে লেখা।
এই কারণেই ইন্টারনেট কোনো আদালত নয়। এখানে বিচার হয় না; এখানে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এটি অনেকটা স্টেডিয়ামের মতো, যেখানে দর্শকরা তাৎক্ষণিক আবেগে হাততালি দেয়, শিস দেয়, উল্লাস করে কিংবা বিদ্রুপ ছুড়ে দেয়। সেখানে সত্যের চেয়ে বিনোদনের মূল্য প্রায়ই বেশি।
সম্মানে আঘাত লাগলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই প্রতিক্রিয়া জানাতে চায়। কারণ সুনাম মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। প্রকাশ্য অপমান ভয়, ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সেই অনুভূতিকে আরও তীব্র করে তোলে, কারণ মনে হয় যেন অসংখ্য মানুষের সামনে এই আক্রমণ সংঘটিত হচ্ছে।
কিন্তু ডিজিটাল বাস্তবতার সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো—সব আক্রমণের জবাব জনসমক্ষে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
আজকের অনলাইন জগতে এমন এক শ্রেণির মানুষ তৈরি হয়েছে, যাদের প্রধান উদ্দেশ্য বিতর্ক সৃষ্টি করা। তারা জানে যে রাগ বিক্রি হয়। ক্ষোভ মনোযোগ আনে। আর মনোযোগ প্রভাব তৈরি করে। ফলে তাদের লক্ষ্য কোনো গঠনমূলক আলোচনা নয়; তাদের লক্ষ্য হলো আপনাকে আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়ায় বাধ্য করা।
এক পর্যায়ে মূল অভিযোগটিই গৌণ হয়ে যায়। যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তা হলো দ্বন্দ্বটিকে বাঁচিয়ে রাখা। আপনি যত বেশি জড়াবেন, তত বেশি কনটেন্ট তৈরি হবে। আপনার ক্ষোভ, আপনার ব্যথা, আপনার হতাশা—সবকিছুই জনসমক্ষে প্রদর্শিত এক নতুন বিনোদনে পরিণত হবে।
এই প্রবণতার সামাজিক মূল্যও কম নয়। যে সমাজে নিয়মিত প্রকাশ্য কাদা ছোড়াছুড়ি স্বাভাবিক হয়ে যায়, সেখানে মানুষ ধীরে ধীরে একে অপরের ওপর আস্থা হারাতে শুরু করে। চরিত্র, সততা, সেবা এবং দীর্ঘদিনের অবদান দিয়ে যে সুনাম গড়ে ওঠে, তা একটি বিকেলেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
আর ক্ষতিটা প্রায়ই দীর্ঘস্থায়ী হয়। পোস্ট মুছে ফেলা যায়, কিন্তু স্ক্রিনশট থেকে যায়। অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হতে পারে, কিন্তু সেই সংশোধন সবার চোখে পৌঁছায় না। অনেক মানুষ কেলেঙ্কারির কথা মনে রাখে, কিন্তু তার খণ্ডনের কথা আর মনে রাখে না। ফলে দাগটি থেকে যায়।
এর পরিণতিতে মানুষ ক্রমশ সতর্ক হয়ে ওঠে। অনেকে নিজের মতামত প্রকাশ করতে ভয় পায়। কেউ কেউ অযথা বিতর্ক এড়াতে নীরবতা বেছে নেয়। ধীরে ধীরে একটি সন্দেহপ্রবণ, উদ্বিগ্ন এবং আত্মরক্ষামূলক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। অবশ্যই আইন প্রয়োজন। প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা প্রয়োজন। ডিজিটাল সাক্ষরতারও প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এই সমস্যার একটি গভীর ব্যক্তিগত মাত্রাও আছে।
প্রতিটি উস্কানির জবাব দিতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আধুনিক ডিজিটাল সংস্কৃতিতে দৃশ্যমানতাই শক্তি। আপনি যত বেশি প্রতিক্রিয়া দেখাবেন, তত বেশি সেই সংঘাতের মূল্য বাড়বে। এর অর্থ এই নয় যে মিথ্যাকে মেনে নিতে হবে কিংবা সত্যকে বিসর্জন দিতে হবে। গুরুতর অভিযোগের মোকাবিলা অবশ্যই করতে হবে—তবে সঠিক জায়গায়। আদালত, পেশাগত প্রতিষ্ঠান, বিশ্বস্ত সামাজিক পরিসর এবং সরাসরি মানবিক যোগাযোগ এখনো সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ইন্টারনেটের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।
কারণ ইন্টারনেটের নকশা মূলত সমাধানের জন্য নয়; এটি সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করার জন্য বেশি উপযোগী। আমাদের সময়ের সবচেয়ে অস্বস্তিকর সত্যগুলোর একটি হলো—কিছু অনলাইন যুদ্ধ এমনভাবেই তৈরি করা হয়, যাতে আপনাকে কাদায় নামানো যায়। সেখানে উদ্দেশ্য বোঝাপড়া নয়, চরিত্রহনন; উদ্দেশ্য সত্য অনুসন্ধান নয়, বরং মনোযোগ দখল।
ইন্টারনেট মানুষকে তাৎক্ষণিক, আবেগপ্রবণ এবং প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। এটি ক্ষোভকে পুরস্কৃত করে, সংযমকে নয়। কিন্তু মানুষের মর্যাদা, মনোযোগ এবং মানসিক শক্তি সীমিত; পক্ষান্তরে কাদার কোনো শেষ নেই।
ডিজিটাল দুনিয়া আপনাকে রাগান্বিত দেখতে চায়। এটি চায় আপনি লড়াই করুন। এটি চায় আপনি মাঝরাতে নোটিফিকেশন স্ক্রল করতে করতে অপরিচিত মানুষের মন্তব্যের জবাব দিন। আর যখন সেই জনতা অন্য কোনো নতুন নাটকের দিকে চলে যাবে, তখন আপনার হাতে থাকবে শুধু মানসিক ক্লান্তি।
তাই জর্জ বার্নার্ড শ-এর উপদেশ ‘শূকরের সঙ্গে কুস্তি লড়তে যেয়ো না; এতে তুমি যেমন নোংরা হবে, শূকরও ব্যাপারটি উপভোগ করবে’ এখানে প্রাসঙ্গিক। এই লড়তে না যাওয়াটা কাপুরুষতা নয়; এটি প্রজ্ঞা। কিছু যুদ্ধ সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, আপনাকে কাদায় নামানোর জন্য তৈরি করা হয়। সেই যুদ্ধে অংশ না নেওয়াই কখনো কখনো সবচেয়ে বড় বিজয়।

গ্রাম এখন আর সেই শান্ত, নির্ভার জায়গা নয়; বরং নানা সামাজিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট হলো মাদক—একটি নীরব, কিন্তু দ্রুত বিস্তারমান মহামারী, যা গ্রামীণ সমাজকে ভেতর থেকে ক্ষয় করছে।
৪ ঘণ্টা আগে
দীর্ঘ ১৭ বছরের একপাক্ষিক নতজানু পররাষ্ট্রনীতি এবং রাজনৈতিক দাসত্বের চাদর ভেঙে গত ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি সম্পূর্ণ নতুন, স্বাধীন এবং বাংলাদেশপন্থী সরকার গঠিত হয়েছে। জনগণের পরিচ্ছন্ন ও শক্তিশালী ম্যান্ডেটের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই নির্বাচিত স
১৯ ঘণ্টা আগে
২০২১ সালে বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপন করেছে। ইসলামাবাদে ঘটনাটি সাধারণত ‘ঢাকা পতন’ হিসেবে পরিচিত হলেও, ঢাকায় এটি ‘বাংলাদেশের মুক্তি’ বা স্বাধীনতা অর্জন হিসেবে স্মরণ করা হয়। সে সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল এবং বছরব্যাপী নানা আয়োজন, অনুষ্ঠান ও কর্মসূচির মাধ্যমে দিব
২০ ঘণ্টা আগে
এখন কেবল সংবাদপত্র আর রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত রেডিও-টিভির যুগ নয়। কালক্রমে একগুচ্ছ ইলেকট্রনিক মিডিয়ার জন্ম হয়েছে বেসরকারি খাতে। বেড়েছে সংবাদপত্রের সংখ্যাও। অনলাইন আর ডিজিটাল মিডিয়ার উপস্থিতিও গণমাধ্যমের দিগন্ত বদলে দিচ্ছে।
২১ ঘণ্টা আগে