আবু তাহের খান

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতে আক্রান্ত হওয়ার পর যুদ্ধ-কৌশলের অংশ হিসেবে ইরান খুব স্বাভাবিকভাবেই হরমুজ প্রণালিতে অন্যান্য দেশের জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। তবে গত ২৬ মার্চ রাশিয়া, ভারত, ইরাক ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশকে হরমুজ অতিক্রমের অনুমতি দেওয়া হয়, যা ছিল এই দেশগুলোর প্রতি ইরানের শুভেচ্ছার প্রতীক। বিশ্বব্যাপী বিরাজমান জ্বালানি সঙ্কটের এ কঠিন মুহূর্তে এই দেশগুলোর জন্য এ অনুমতি ছিল ‘মহার্ঘ্যের’ চেয়েও বেশি কিছু। আর সেটি উপলব্ধি করে বাংলাদেশ ছাড়া তালিকার সব দেশই ইরানের প্রতি ‘কৃতজ্ঞতাপূর্ণ’ আচরণ অব্যাহত রাখে।
এরই ধারাবাহিকতায় চীন ও রাশিয়া গত ৮ এপ্রিল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে হরমুজ প্রণালি প্রশ্নে উত্থাপিত ইরানবিরোধী একটি প্রস্তাবে ভেটো প্রদান করে। তবে ইসলামি সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) সদস্য এবং হালে ইসলামি উম্মাহর অন্যতম প্রবক্তা হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বর্বর হামলার নিন্দা জানায়নি; এমনকি এ ব্যাপারে গত ১ এপ্রিল ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন ডেকে ইরান বিষয়টি উত্থাপন করার পরও না।
এদিকে গত ৮ এপ্রিল দু’সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর সেটিকে একেবার প্রথম সারিতে থেকে স্বাগত জানিয়েছিল বাংলাদেশ, যদিও যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরায়েল প্রথম দিনেই লেবাননে আক্রমণ চালায় এবং সেই ধারা অব্যাহত থাকে।
অন্যদিকে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ১২ এপ্রিলের শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর নতুন করে ২০ এপ্রিল ইসলামাবাদে আলোচনায় বসার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। কিন্তু নিরাপত্তার শঙ্কা দেখিয়ে তাতে যোগ দিচ্ছেন না মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। যুক্তরাষ্ট্র ঘোষিত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা না হলে ইরানও তাতে যোগ না দেয়ার কথা জানিয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, যুদ্ধবিরতিকে বাংলাদেশ শুরুতেই স্বাগত জানালেও গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এ যুদ্ধের যখন সূচনা ঘটে, তখন এগিয়ে থেকে না হোক– অন্তত পেছনে থেকে হলেও নিন্দা জানায়নি কেন? ইরানের বৈধ সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্যে সেদিন যে আক্রমণ চালানো হয়েছিল, তা ছিল স্পষ্টতই জঘন্য আগ্রাসন। অধিকাংশ দেশ এর নিন্দা জানালেও বাংলাদেশ জানায়নি। এর মানে, ইরানের কাছে কৌশলগতভাবে হেরে যাওয়ার মুখে যুক্তরাষ্ট্র যখন যুদ্ধবিরতির পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে, তখনই কেবল বাংলাদেশ সরব হওয়ার প্রয়োজন বোধ করেছে; তার আগে নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণের ঘটনায় বাংলাদেশ নিন্দা না জানানোয় ইরান স্বাভাবিকভাবেই রুষ্ট হয়েছে, যে কথা ঢাকাস্থ ইরানি রাষ্ট্রদূত ১ এপ্রিলের সংবাদ সম্মেলনে খোলাসা করেছেন। তারপরও শুধু বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য ইরান গত ২৬ মার্চ অন্য পাঁচ দেশের সাথে বাংলাদেশকে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করে, যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে।
সত্যি বলতে, চলমান কঠিন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারে ইরানের কাছ থেকে অনুমতি পাওয়া ছিল বাংলাদেশের জন্য এক ব্যতিক্রমী সুযোগ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ইরানের বন্ধুত্বসুলভ সহযোগিতাকে বাংলাদেশ সরকার সম্মানটুকুও জানায়নি। অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ নৈতিকতা ও মানবতার পক্ষে দাঁড়ায়নি। অথচ পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ (ক) অনুচ্ছেদে স্পষ্টতই বলা আছে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শক্তি প্রয়োগের নীতি পরিহার করে চলবে।
সংবিধানের উল্লিখিত অঙ্গীকার মানতে হলে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানে আক্রমণ চালিয়ে শত শত শিশু শিক্ষার্থী, বেসামরিক নাগরিক ও শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করতে থাকে, তখনই বাংলাদেশের উচিৎ ছিল হামলাটির নিন্দা জানানো। ইরানকে সমর্থন করার জন্য নয়, বরং বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার পক্ষে দাঁড়ানোর জন্যই এটি ছিল অপরিহার্য। অন্যান্য দেশের পাশাপাশি দীর্ঘকাল ন্যাটো জোটে থাকা মিত্ররাও এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়ায়নি। তাদের মধ্যকার অনেকে এর বিরোধিতা শুরু করেছে এবং এর পরিসর দিন দিনই বাড়ছে।
১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাজ্য তাৎক্ষণিকভাবে বলে দিয়েছে, হরমুজ অবরোধে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দেবে না। সর্বশেষ হরমুজ প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রকে এড়িয়ে ৪০ দেশকে নিয়ে স্বতন্ত্র ভার্চ্যুয়াল সভা করেছে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স।
মোট কথা, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল মধ্যপ্রাচ্যের রাজা-বাদশাহশাসিত কতিপয় দেশ ছাড়া আর কেউ এ যুদ্ধকে সমর্থন করছে না। করার কোনো কারণও নেই। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের নিন্দা না জানিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, যা কার্যত আগ্রাসনকে সমর্থন করার সামিল। কিন্তু এমন অবস্থানের কারণে হরমুজে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচলের অনুমতি যে মাঝপথে আটকে গেল, তার দায় কে নেবে? হরমুজে বাংলাদেশি জাহাজের চলাচল এরই মধ্যে দুই দফা বাধার মুখে পড়েছে। এ ধরনের বাধা না দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ইরানকে দুই দফা অনুরোধ করলেও ২০ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত ইরান কোনো সাড়া দেয়নি। এ অবস্থায় সৃষ্ট জটিলতার দায় বাংলাদেশের ওপর বর্তায় না কি?
ইরান একটি মুসলিম দেশ বলেই যে তার ওপর পরিচালিত আগ্রাসী হামলার নিন্দা জানাতে হবে, বিষয়টি মোটেও তা নয়। বরং, হামলাটি বিশ্বশান্তির পরিপন্থী বলেই নিন্দা জানানো জরুরি উক্ত। এ ক্ষেত্রে স্বীকার্য, ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নানা হিসাব-নিকাশ সব দেশকেই কমবেশি করতে হয়। তাই বলে কোনো দেশ যদি অন্য দেশের বৈধ সরকারকে উৎখাতের উদ্দেশ্যে সে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা, বিদ্যালয়ে পাঠরত শিশু শিক্ষার্থী, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী ও অন্যান্য বেসামরিক নাগরিককে নির্বিচারে হত্যা করে, তাহলেও কি বাংলাদেশ এর নিন্দা জানাবে না?
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গত ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি, যেটিকে অনেকেই ‘বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বে আঘাতকারী চুক্তি’ বলে গণ্য করছেন, সেখানেও কিন্তু বলা নেই, যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশে আক্রমণ চালালে বাংলাদেশ নিন্দা জানাতে পারবে না। তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরান আক্রমণের বিষয়ে বাংলাদেশ কেন তা জানালো না?
ধারণা করা যায়, এমন মার্কিন তোষণনীতির কারণেই ইরান তার পূর্ব-ঘোষণা থেকে সরে এসে পরপর দুই দফা ‘বাংলার জয়যাত্রা’কে হরমুজে আটকে দিয়েছে। এ ব্যাপারে ইরান যখন তার অসন্তুষ্টির কথা খোদ সংবাদ সম্মেলনে ব্যক্ত করে, তখনই বোঝা গিয়েছিল, তারা হয়তো শিগগিরই বাংলাদেশের ব্যাপারে অবস্থান পর্যালোচনা করবে। কিন্তু সাধারণ মানুষ বুঝলেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি আমলে নেয়নি। উক্ত সংবাদ সম্মেলনের পর বাংলাদেশ যদি ইরানের সাথে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি ঘটানোর চেষ্টা করত, তাহলেও হয়তো হরমুজে বাংলার জয়যাত্রাকে দ্বিতীয়বার বাধার মুখে পড়তে হতো না।
তাই বলব, বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্কের ধরন এবং যুদ্ধের মতো ঘটনায় অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অনেক বেশি বিচক্ষণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হতে হবে। বিষয়টির সাথে অর্থনীতি জড়িত থাকলে সে ক্ষেত্রে দূরদৃষ্টি হওয়া উচিৎ অধিক গভীরতাপূর্ণ। কিছুটা কৌশলগত কারণে ও বাকিটা মুসলিম দেশ হওয়ার সুবাদে হরমুজ ব্যবহারে রাশিয়া, চীন ও ভারতের সাথে ইরান বাংলাদেশকে যে সুবিধাটুকু দিয়েছিল, সেটিকে চিরস্থায়ী ভাবাও ঠিক হয়নি। বাংলাদেশের উপলব্ধি করা উচিত ছিল, একটি দেশ অন্য দেশের আচরণে প্রচণ্ড অসন্তুষ্ট না হলে কখনোই সংবাদ সম্মেলন ডেকে বক্তব্য দেয় না।
পরিশেষে বলব, বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দুর্বলতাপূর্ণ নীতি সামনের দিনগুলোতেও একই ধারায় অব্যাহত রাখে, তাহলে ইরানের পাশাপাশি চীন, রাশিয়াসহ অনেক দেশই হয়তো তাদের বাংলাদেশ-নীতি পর্যালোচনা করতে বাধ্য হবে। কারণ আপনি বন্ধুত্ব করবেন একজনের সাথে; আর সুযোগ চাইবেন বন্ধু দ্বারা আক্রান্ত দেশের কাছে– এটি কোনো যৌক্তিক প্রত্যাশা হতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ তার মার্কিন-নীতি পর্যালোচনায় উদ্যোগী হবে, সেটিই প্রত্যাশা। আর তা করতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অনুমতি বাতিলের মতো সমস্যায় অন্যত্র, অন্য দেশের সাথেও পড়তে হতে পারে– যা কারও কাম্য নয়।
আবু তাহের খান: অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি; সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতে আক্রান্ত হওয়ার পর যুদ্ধ-কৌশলের অংশ হিসেবে ইরান খুব স্বাভাবিকভাবেই হরমুজ প্রণালিতে অন্যান্য দেশের জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। তবে গত ২৬ মার্চ রাশিয়া, ভারত, ইরাক ও পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশকে হরমুজ অতিক্রমের অনুমতি দেওয়া হয়, যা ছিল এই দেশগুলোর প্রতি ইরানের শুভেচ্ছার প্রতীক। বিশ্বব্যাপী বিরাজমান জ্বালানি সঙ্কটের এ কঠিন মুহূর্তে এই দেশগুলোর জন্য এ অনুমতি ছিল ‘মহার্ঘ্যের’ চেয়েও বেশি কিছু। আর সেটি উপলব্ধি করে বাংলাদেশ ছাড়া তালিকার সব দেশই ইরানের প্রতি ‘কৃতজ্ঞতাপূর্ণ’ আচরণ অব্যাহত রাখে।
এরই ধারাবাহিকতায় চীন ও রাশিয়া গত ৮ এপ্রিল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে হরমুজ প্রণালি প্রশ্নে উত্থাপিত ইরানবিরোধী একটি প্রস্তাবে ভেটো প্রদান করে। তবে ইসলামি সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) সদস্য এবং হালে ইসলামি উম্মাহর অন্যতম প্রবক্তা হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বর্বর হামলার নিন্দা জানায়নি; এমনকি এ ব্যাপারে গত ১ এপ্রিল ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন ডেকে ইরান বিষয়টি উত্থাপন করার পরও না।
এদিকে গত ৮ এপ্রিল দু’সপ্তাহের সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর সেটিকে একেবার প্রথম সারিতে থেকে স্বাগত জানিয়েছিল বাংলাদেশ, যদিও যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরায়েল প্রথম দিনেই লেবাননে আক্রমণ চালায় এবং সেই ধারা অব্যাহত থাকে।
অন্যদিকে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ১২ এপ্রিলের শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার পর নতুন করে ২০ এপ্রিল ইসলামাবাদে আলোচনায় বসার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। কিন্তু নিরাপত্তার শঙ্কা দেখিয়ে তাতে যোগ দিচ্ছেন না মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। যুক্তরাষ্ট্র ঘোষিত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার করা না হলে ইরানও তাতে যোগ না দেয়ার কথা জানিয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, যুদ্ধবিরতিকে বাংলাদেশ শুরুতেই স্বাগত জানালেও গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এ যুদ্ধের যখন সূচনা ঘটে, তখন এগিয়ে থেকে না হোক– অন্তত পেছনে থেকে হলেও নিন্দা জানায়নি কেন? ইরানের বৈধ সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্যে সেদিন যে আক্রমণ চালানো হয়েছিল, তা ছিল স্পষ্টতই জঘন্য আগ্রাসন। অধিকাংশ দেশ এর নিন্দা জানালেও বাংলাদেশ জানায়নি। এর মানে, ইরানের কাছে কৌশলগতভাবে হেরে যাওয়ার মুখে যুক্তরাষ্ট্র যখন যুদ্ধবিরতির পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছে, তখনই কেবল বাংলাদেশ সরব হওয়ার প্রয়োজন বোধ করেছে; তার আগে নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণের ঘটনায় বাংলাদেশ নিন্দা না জানানোয় ইরান স্বাভাবিকভাবেই রুষ্ট হয়েছে, যে কথা ঢাকাস্থ ইরানি রাষ্ট্রদূত ১ এপ্রিলের সংবাদ সম্মেলনে খোলাসা করেছেন। তারপরও শুধু বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য ইরান গত ২৬ মার্চ অন্য পাঁচ দেশের সাথে বাংলাদেশকে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের অনুমতি প্রদান করে, যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে।
সত্যি বলতে, চলমান কঠিন পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারে ইরানের কাছ থেকে অনুমতি পাওয়া ছিল বাংলাদেশের জন্য এক ব্যতিক্রমী সুযোগ। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ইরানের বন্ধুত্বসুলভ সহযোগিতাকে বাংলাদেশ সরকার সম্মানটুকুও জানায়নি। অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ নৈতিকতা ও মানবতার পক্ষে দাঁড়ায়নি। অথচ পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ (ক) অনুচ্ছেদে স্পষ্টতই বলা আছে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শক্তি প্রয়োগের নীতি পরিহার করে চলবে।
সংবিধানের উল্লিখিত অঙ্গীকার মানতে হলে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানে আক্রমণ চালিয়ে শত শত শিশু শিক্ষার্থী, বেসামরিক নাগরিক ও শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করতে থাকে, তখনই বাংলাদেশের উচিৎ ছিল হামলাটির নিন্দা জানানো। ইরানকে সমর্থন করার জন্য নয়, বরং বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার পক্ষে দাঁড়ানোর জন্যই এটি ছিল অপরিহার্য। অন্যান্য দেশের পাশাপাশি দীর্ঘকাল ন্যাটো জোটে থাকা মিত্ররাও এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দাঁড়ায়নি। তাদের মধ্যকার অনেকে এর বিরোধিতা শুরু করেছে এবং এর পরিসর দিন দিনই বাড়ছে।
১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাজ্য তাৎক্ষণিকভাবে বলে দিয়েছে, হরমুজ অবরোধে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দেবে না। সর্বশেষ হরমুজ প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রকে এড়িয়ে ৪০ দেশকে নিয়ে স্বতন্ত্র ভার্চ্যুয়াল সভা করেছে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স।
মোট কথা, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল মধ্যপ্রাচ্যের রাজা-বাদশাহশাসিত কতিপয় দেশ ছাড়া আর কেউ এ যুদ্ধকে সমর্থন করছে না। করার কোনো কারণও নেই। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের নিন্দা না জানিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, যা কার্যত আগ্রাসনকে সমর্থন করার সামিল। কিন্তু এমন অবস্থানের কারণে হরমুজে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচলের অনুমতি যে মাঝপথে আটকে গেল, তার দায় কে নেবে? হরমুজে বাংলাদেশি জাহাজের চলাচল এরই মধ্যে দুই দফা বাধার মুখে পড়েছে। এ ধরনের বাধা না দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ইরানকে দুই দফা অনুরোধ করলেও ২০ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত ইরান কোনো সাড়া দেয়নি। এ অবস্থায় সৃষ্ট জটিলতার দায় বাংলাদেশের ওপর বর্তায় না কি?
ইরান একটি মুসলিম দেশ বলেই যে তার ওপর পরিচালিত আগ্রাসী হামলার নিন্দা জানাতে হবে, বিষয়টি মোটেও তা নয়। বরং, হামলাটি বিশ্বশান্তির পরিপন্থী বলেই নিন্দা জানানো জরুরি উক্ত। এ ক্ষেত্রে স্বীকার্য, ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নানা হিসাব-নিকাশ সব দেশকেই কমবেশি করতে হয়। তাই বলে কোনো দেশ যদি অন্য দেশের বৈধ সরকারকে উৎখাতের উদ্দেশ্যে সে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা, বিদ্যালয়ে পাঠরত শিশু শিক্ষার্থী, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী ও অন্যান্য বেসামরিক নাগরিককে নির্বিচারে হত্যা করে, তাহলেও কি বাংলাদেশ এর নিন্দা জানাবে না?
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে গত ৯ ফেব্রুয়ারি স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি, যেটিকে অনেকেই ‘বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বে আঘাতকারী চুক্তি’ বলে গণ্য করছেন, সেখানেও কিন্তু বলা নেই, যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশে আক্রমণ চালালে বাংলাদেশ নিন্দা জানাতে পারবে না। তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক ইরান আক্রমণের বিষয়ে বাংলাদেশ কেন তা জানালো না?
ধারণা করা যায়, এমন মার্কিন তোষণনীতির কারণেই ইরান তার পূর্ব-ঘোষণা থেকে সরে এসে পরপর দুই দফা ‘বাংলার জয়যাত্রা’কে হরমুজে আটকে দিয়েছে। এ ব্যাপারে ইরান যখন তার অসন্তুষ্টির কথা খোদ সংবাদ সম্মেলনে ব্যক্ত করে, তখনই বোঝা গিয়েছিল, তারা হয়তো শিগগিরই বাংলাদেশের ব্যাপারে অবস্থান পর্যালোচনা করবে। কিন্তু সাধারণ মানুষ বুঝলেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি আমলে নেয়নি। উক্ত সংবাদ সম্মেলনের পর বাংলাদেশ যদি ইরানের সাথে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি ঘটানোর চেষ্টা করত, তাহলেও হয়তো হরমুজে বাংলার জয়যাত্রাকে দ্বিতীয়বার বাধার মুখে পড়তে হতো না।
তাই বলব, বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্কের ধরন এবং যুদ্ধের মতো ঘটনায় অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অনেক বেশি বিচক্ষণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হতে হবে। বিষয়টির সাথে অর্থনীতি জড়িত থাকলে সে ক্ষেত্রে দূরদৃষ্টি হওয়া উচিৎ অধিক গভীরতাপূর্ণ। কিছুটা কৌশলগত কারণে ও বাকিটা মুসলিম দেশ হওয়ার সুবাদে হরমুজ ব্যবহারে রাশিয়া, চীন ও ভারতের সাথে ইরান বাংলাদেশকে যে সুবিধাটুকু দিয়েছিল, সেটিকে চিরস্থায়ী ভাবাও ঠিক হয়নি। বাংলাদেশের উপলব্ধি করা উচিত ছিল, একটি দেশ অন্য দেশের আচরণে প্রচণ্ড অসন্তুষ্ট না হলে কখনোই সংবাদ সম্মেলন ডেকে বক্তব্য দেয় না।
পরিশেষে বলব, বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দুর্বলতাপূর্ণ নীতি সামনের দিনগুলোতেও একই ধারায় অব্যাহত রাখে, তাহলে ইরানের পাশাপাশি চীন, রাশিয়াসহ অনেক দেশই হয়তো তাদের বাংলাদেশ-নীতি পর্যালোচনা করতে বাধ্য হবে। কারণ আপনি বন্ধুত্ব করবেন একজনের সাথে; আর সুযোগ চাইবেন বন্ধু দ্বারা আক্রান্ত দেশের কাছে– এটি কোনো যৌক্তিক প্রত্যাশা হতে পারে না। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ তার মার্কিন-নীতি পর্যালোচনায় উদ্যোগী হবে, সেটিই প্রত্যাশা। আর তা করতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অনুমতি বাতিলের মতো সমস্যায় অন্যত্র, অন্য দেশের সাথেও পড়তে হতে পারে– যা কারও কাম্য নয়।
আবু তাহের খান: অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি; সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়

মানুষ যেন বুঝতে পারে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো নয় বরং নিরাপদে পৌঁছানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে শাস্তি কঠোর না হলেও তা নিশ্চিতভাবে প্রয়োগ করা হবে- এই বিশ্বাস তৈরি করতে হবে।
১৯ ঘণ্টা আগে
আব্দুল মোনায়েম মুন্না বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি। প্রায় চার দশক ধরে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় তিনি। ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ লড়াই, কারাবরণ, সংগঠন পরিচালনা—সব মিলিয়ে তিনি এখন বিএনপির অন্যতম নির্ভরযোগ্য অঙ্গসংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বে।
১ দিন আগে
বর্তমান এই জ্বালানিমূল্য বৃদ্ধির ফলে সরকারের যে সামান্য লাভ হবে, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ক্ষতি হবে জনগণের। বিশাল এই বোঝার ফায়দা লুটছে মূলত তৃতীয় পক্ষ অর্থাৎ অসাধু ব্যবসায়ীরা। পুরো সুবিধাটাই তারা নিজেদের পকেটে ভরছে।
২ দিন আগে
চাঁদের চারপাশ প্রদক্ষিণ শেষে গত ১১ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে যেদিন নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন আমেরিকার নভোচারীরা, সেদিনই কোরআন অবমাননার অভিযোগ তুলে একজন পীরকে পিটিয়ে হত্যা করেছে বাংলাদেশের কিছু লোক।
২ দিন আগে