বাংলাদেশে হাইকমিশনার নিয়োগে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিতে নতুন কী আছে

প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২: ৫০
স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মাকে পরবর্তী মিশনে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে আগেই, যেখান থেকে তিনি সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাভার করবেন। এদিকে গত ২৭ জানুয়ারি নয়াদিল্লিতে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক অর্থনৈতিক সমঝোতা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। চুক্তিটিকে ভারতীয় সরকারি মহল ‘মাদার অব দ্য অল ট্রেড ডিলস’ বলে অভিহিত করছে। চুক্তিটিকে দুই বাজারের প্রায় ২০০ কোটি মানুষের সংযোগকারী হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করে। সেই হিসাবে প্রণয় ভার্মার এই পোস্টিং তাঁর ক্যারিয়ার এবং সর্বশেষ কর্মস্থল, মানে বাংলাদেশে তাঁর পারফরম্যান্সের ফসল ভাবা যেতে পারে।

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনাররা

ভারত বলতে গেলে সবসময় তার মেধাবী ও উদীয়মান কূটনীতিকদের বাংলাদেশে পাঠিয়েছে, যারা কালক্রমে ভারতের পররাষ্ট্র বিভাগকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের প্রথম ভারতীয় হাইকমিশনার সুবিমল দত্ত (১৯৭২-১৯৭৪) ভারতের তৃতীয় পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সমর সেন (১৯৭৪-১৯৭৬) বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনের পর অস্ট্রেলিয়ায় হাইকমিশনার হন। কে পি এস মেনন জুনিয়র (১৯৭৭-১৯৭৯) প্রথমে মিসরে রাষ্ট্রদূত, পরে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুচকুন্দ দুবে (১৯৭৯-১৯৮২) ভারতের ১৭তম ও কৃষ্ণন শ্রীনিবাসন (১৯৮৯-১৯৯২) ভারতের ১৯তম পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কে রঘুনাথ (১৯৯২-১৯৯৫) ভারতের ২১তম পররাষ্ট্র সচিব ও রাশিয়ায় রাষ্ট্রদূত। বীণা সিক্রি (২০০৩-২০০৬) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সচিব এবং পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী (২০০৭-২০০৯) প্রথমে থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত ও পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে কাজ করেছেন। পঙ্কজ শরণ (২০১২-২০১৫ ) রাশিয়ায় রাষ্ট্রদূত ও বর্তমান ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার হিসেবে কর্মরত। হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা (২০১৬-২০১৯) বাংলাদেশ মিশন শেষে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত ও ভারতের ৩৩তম পররাষ্ট্র সচিব এবং রিভা গাঙ্গুলী দাস (২০১৯-২০২০) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব) হিসেবে কাজ করেছেন। আর বিক্রম দোরাইস্বামী (২০২০-২০২২) বাংলাদেশে দায়িত্ব শেষে যুক্তরাজ্যে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে কাজ করছেন।

ভারত কেন তার সেরা কূটনীতিকদের বাংলাদেশে পাঠায়

ইতিহাসের নিরিখে বলা যেতে পারে, ভারত তার সেরা ও প্রতিশ্রুতিশীল কূটনীতিকদের বাংলাদেশে পাঠিয়েছিল এবং প্রায় সবাই কর্তব্য শেষে পুরস্কৃত হয়েছেন। এতে বোঝা যায়, ভারত তার প্রতিবেশি দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে খুবই গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। এটি শুধু রাষ্ট্রাচারে সীমাবদ্ধ থেকে প্রতিবেশি দেশে দায়িত্ব পালন নয়; বরং ভূ-রাজনৈতিকভাবে প্রতিবেশিকে এক ধরনের নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি হাইকমিশনারদের কর্মক্ষেত্রে নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে উপযুক্ত করে তোলাও এর লক্ষ্য। তারা সেসব দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করেছেন, যথেষ্ট অভিজ্ঞ হয়েছেন বলে পরে তাদের যথাযথভাবে পুরস্কৃত করা হয়।

ভারত কেন বাংলাদেশকে প্রতিবেশীর চেয়ে বেশি কিছু ভাবে

ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান অনন্য এবং কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল। প্রতিরক্ষা ও ভূ-রাজনীতির ভাষায় একে অনেক সময় ‘ইন্ডিয়া-লকড’ বা ‘ইন্ডিয়া সারাউন্ডেড’ অবস্থা বলা হয়। এটি ভারতের জন্য বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো ল্যান্ড-লকড বা ভূ-বেষ্টিত, যেখানে বাংলাদেশ হলো এগুলোর ‘ইকোনমিক লাইফলাইন’। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করতে পারায় ভারতের কয়েক হাজার কিলোমিটার পথ ও বিশাল পরিবহন খরচ সাশ্রয় হয়। অন্যদিকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও পূর্ব ভারতের জন্য বাংলাদেশ একটি বিশাল, ক্রমবর্ধমান বাজার। ভৌগোলিক সান্নিধ্যের কারণে ভারতের পণ্য খুব কম খরচে বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারে, যা ভারতীয় ব্যবসার জন্য লাভজনক।

সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশে যদি কোনো ভারতবিরোধী শক্তি ক্ষমতায় আসে বা দেশটিতে চরমপন্থা বাড়ে, তবে ভারতের দীর্ঘ সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দিল্লির জন্য প্রায় অসম্ভব ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়াবে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের (সেভেন সিস্টার্স) বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো একসময় বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করত বলে ভারত মাঝে মাঝেই অভিযোগ করে। এছাড়া ভারতের ভয়– বাংলাদেশ যদি তার ভূখণ্ডে কোনো তৃতীয় শক্তিকে (যেমন চীন বা অন্য কোনো বৈরী দেশ) সামরিক বা গোয়েন্দা কার্যক্রমের সুযোগ দেয়, তবে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অরক্ষিত হয়ে পড়বে। বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিকে তার নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে বলে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক ভারতের জন্য সবসময়ই উদ্বিগ্নের কারণ।

বাংলাদেশের রাজনীতিকে অনুকূলে রাখার চেষ্টা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে রাখার জন্য ভারত সবসময় আগ্রহী ছিল। এটি যে কোন পর্যায়ে গিয়েছিল, তা ভারতের ২৯তম পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের কার্যক্রম দেখলেই বোঝা যায়। ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর সুজাতা সিংয়ের দুদিনের সফর ছিল ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির একটি আক্রমণাত্মক প্রয়োগ, যেখানে তারা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ধারার ধারাবাহিকতা রক্ষাকেই জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য মনে করেছিল। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে জাতীয় পার্টির তৎকালীন চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিলে সুজাতা সিং ঢাকা সফরে আসেন এবং এরশাদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। সুজাতা সিং যুক্তি দিয়েছিলেন, জাতীয় পার্টি নির্বাচনে না গেলে জামায়াত-বিএনপি জোটের ‘মৌলবাদী শক্তি’ ক্ষমতায় আসার সুযোগ পাবে, যা এই অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। বৈঠকের পর এরশাদকে ধরপাকড়, হয়রানি এবং তার নাটকীয় অসুস্থতার মধ্যে জাতীয় পার্টির একটি অংশ নির্বাচনে অংশ নেয়, যা ওই নির্বাচনকে এক রকম প্রতিযোগিতামূলক রূপ দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখা হয়। তার সফরের পর ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন এবং ভারতের পছন্দের রাজনৈতিক দলটি ক্ষমতা দখল করে, যা অচিরেই দমন-পীড়নমূলক শাসনে পরিণত হয়। এ সময় কর্মরত ভারতীয় কূটনীতিকরা বেপরোয়া আচরণ করেন, যা বাংলাদেশিদের বিক্ষুব্ধ করে তোলে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতনের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মী ভারতে আশ্রয় নেন। এটি প্রমাণ করে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি নির্দিষ্ট দলের সম্পর্ক।

কেন বাংলাদেশ ভারতের কূটনীতিকদের জন্য উত্তম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র

একজন রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনারের মূল কাজ হলো সেই দেশে নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করা। মোটা দাগে আর যা যা দায়িত্ব আছে, তা হলো– জাতীয় স্বার্থ রক্ষা ও দরকষাকষি, তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণ, যার ভিত্তিতে নিজ দেশের সরকার পরবর্তী পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করে; নাগরিক সেবা ও কনস্যুলার সহায়তা ও সফট পাওয়ার বা সাংস্কৃতিক কূটনীতি। সহজ কথায় বললে, কূটনীতিকরা হলেন একটি দেশের ‘শান্তি সময়ের যোদ্ধা’– যাদের কাজ রক্তপাত ছাড়াই নিজ দেশের জন্য সর্বোচ্চ সুবিধা আদায়। এসবই জেনেভা কনভেনশন তথা প্রচলিত প্রথা।

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনারদের কার্যক্রম পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভারতের প্রতিরক্ষা কৌশল বা ‘সিকিউরিটি ডকট্রিন’ বাস্তবায়নে তারা বিভিন্ন সময়ে এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের প্রথাগত গণ্ডি ছাড়িয়ে ‘আগ্রাসী’ বা ‘নির্ণায়ক’ বলে বিবেচিত হয়েছে। নিচে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হলো:

এক. ২০০০ সালের শেষভাগে এবং ২০১০-এর শুরুতে ভারতের হাইকমিশনারদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর (যেমন উলফা, এনএসসিএন) নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বাংলাদেশের মাটি ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করা। সে সময়ে কর্মরত হাইকমিশনাররা কেবল আলোচনার টেবিলে না থেকে সরাসরি গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং তৎকালীন সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। ফলে উলফা নেতা অরবিন্দ রাজখোয়া বা রণজয় সিংহের মতো ব্যক্তিদের আটক করে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল, যা ভারতের দীর্ঘ প্রতিরক্ষা উদ্বেগের সমাধান করে।

দুই. ২০১৭ সালে হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলার সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। এর মধ্যে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ঋণ ও উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো ছিল। ভারতের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কেনাকাটায় চীনের একাধিপত্য কমানো এবং বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে ভারতের প্রতিরক্ষা ইকোসিস্টেমে নিবিড়ভাবে যুক্ত করা।

তিন. ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা কৌশল ছিল বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে করিডোর বা ট্রানজিট সুবিধা পাওয়া, যাতে যুদ্ধের সময় বা জরুরি অবস্থায় দ্রুত মূল ভূখণ্ড থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতে সৈন্য ও রসদ পাঠানো যায়। হাইকমিশনাররা বিভিন্ন সময়ে উন্নয়ন সহায়তা বা ঋণের শর্ত হিসেবে কানেক্টিভিটি ইস্যুটি সামনে এনেছেন। আশুগঞ্জ বন্দর ব্যবহার করে ত্রিপুরার পালাটানা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ভারি যন্ত্রপাতি পরিবহন ছিল এর বড় উদাহরণ, যা আদতে ভারতের ‘লজিস্টিক কানেক্টিভিটি’ পরীক্ষারই একটি অংশ ছিল।

চার. সুজাতা সিংয়ের ২০১৪ সালের পদাঙ্ক অনুসরণ করে পরবর্তী হাইকমিশনাররাও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নির্ধারণে পরোক্ষ কিন্তু প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছেন। পশ্চিমা দেশগুলো (বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র) যখন বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে কঠোর অবস্থান নিত, তখন ভারতীয় হাইকমিশনাররা প্রায়ই দিল্লিতে রিপোর্ট পাঠাতেন এই মর্মে যে– বাংলাদেশে বড় কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে। এ অবস্থায় ভারত আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের বিদ্যমান ধারার পক্ষে জোরালো লবিং করেছে। পঙ্কজ শরণ কিংবা ভারতীয় কূটনীতিকদের স্মৃতিচারণ ও নথিপত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে দায়িত্বরত আমেরিকান রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনাকে ভারতে নিয়ে ভর্ৎসনা করা হয়েছিল বলে কথিত আছে।

উপরোল্লিখিত ঘটনাগুলো সাধারণ নয়। বরং এসব কিছুই মেধাবী মানুষদের গবেষণাপ্রসূত কার্যক্রম। এদের প্রণীত বয়ান বা ন্যারেটিভ বাস্তবায়নের জন্য ততোধিক মেধাবী রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের প্রয়োজন। এরা দীর্ঘদিন ধরে সুনিপুণভাবে তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে নিজ দেশের জন্য সুফল বয়ে নিয়ে গেছেন। আর এখানে অর্জিত বাস্তবিক জ্ঞান তারা পরবর্তী কর্মক্ষেত্রে ব্যবহার করে উৎকর্ষ লাভ করেছেন এবং শেষ জীবনে পররাষ্ট্র সচিব হিসেবেও সন্মানিত হয়েছেন।

বাংলাদেশের জনগণ কী চায়

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের সমীকরণ আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম ভারতকে ‘বড় ভাই’ হিসেবে নয়; বরং সমমর্যাদার ‘অংশীদার’ হিসেবে দেখতে চায়। ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপ বন্ধ হবে– এমনটাই এখনকার বাংলাদেশের প্রধান চাওয়া। গত ১৫ বছর ভারতের নীতি ছিল মূলত একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এবং বর্তমান সরকার আশা করে, ভারত এখন থেকে ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক সম্পর্কের বদলে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সম্পর্কের দিকে মনোনিবেশ করবে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানানোই হবে নতুন সম্পর্কের প্রথম ধাপ। আধিপত্যবাদের বদলে অংশীদারিত্ব, সীমান্ত হত্যার অবসান, নিরাপত্তা ও প্রত্যর্পণ ইস্যু, পানি বণ্টন ও অভিন্ন নদী ব্যবহার, বাণিজ্যিক ভারসাম্য ও ট্রানজিট পুনর্মূল্যায়ন ইত্যাদি বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করা উচিত বলে প্রতিটি বাংলাদেশি মনে করে।

ভারত কী করছে

ভারত বর্তমানে বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক, পর্যবেক্ষণমূলক এবং কিছুটা রক্ষণশীল অবস্থানে রয়েছে। দিল্লি এখন গভীরভাবে উপলব্ধি করছে, গত ১৫ বছর কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির ওপর বাজি ধরা তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত ভুল ছিল। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ কমিয়ে পুনরায় একটি ‘রাষ্ট্র-টু-রাষ্ট্র’ সম্পর্ক স্থাপন করা যায়– এমনটিই তারা ভাবছে বলে মনে হচ্ছে।

৫ আগস্টের পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে ‘আস্থার ঘাটতি’ তৈরি হয়, তা মেটাতে দিল্লি একজন বড় মাপের ব্যক্তিকে পাঠাতে চায় বলে খবর বেরিয়েছিল। এক্ষেত্রে আরিফ মোহাম্মদ খানের নাম ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছিল। তিনি ভারতের ঝানু রাজনীতিক; যিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং কেরালা ও বিহারের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ভারতের নীতিনির্ধারকরা উপলব্ধি, বর্তমান জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পেশাদার কূটনীতিকের চেয়ে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিকের ‘পলিটিক্যাল ডিলিং’ করার ক্ষমতা বেশি। তবে সর্বশেষ প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, বাংলাদেশে ভারতের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন সাবেক এমপি, মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদী। আরিফ মোহাম্মদ খানের মতো আলোচিত না হলেও প্রবীণ রাজনীতিক মি. ত্রিবেদী বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে নতুন মাত্রা যোগ করে নবতর উচ্চতায় নিয়ে যাবেন, এটাই প্রত্যাশা। ভারতের মতো দেশে পেশাদার কূটনীতিকের অভাব ছিল বলা যাবে না। তবে দেশটির নীতিনির্ধারকরা হয়তো ভাবছেন, বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিকে নতুনভাবে বিন্যস্ত করার সময়টায় একজন সিনিয়র রাজনীতিকের পক্ষেই সম্ভব এর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত হয়ে দেশের স্বার্থে কাজ করা। ৭৫ বছর বয়সী দীনেশ ত্রিবেদী একাধিক রাজনৈতিক দলে কাজ করেছেন। এক সময় তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দূত’ বলে পরিচিত ছিলেন। এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ। অবাঙালি হলেও ভালো বাংলা বলতে পারেন। বাঙালি সংস্কৃতি বিষয়েও অবহিত। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নব অধ্যায়ে তাঁর ভূমিকাটি দেখার জন্য আমরা গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করব আপাতত।

  • মো. সোহেল রানা: অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ

সম্পর্কিত