২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষভাগে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে উপনীত। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা, অন্যদিকে ইরানের কয়েক দশকের সুসংগঠিত প্রস্তুতি—‘মোজাইক ডিফেন্স’।
এই সমরকৌশল ইরানকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে গেছে যেখানে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বিকেন্দ্রীভূত কমান্ডের মাধ্যমে পাল্টা আঘাত অব্যাহত রয়েছে। যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল প্রচলিত সামরিক শক্তির লড়াই নয়, বরং এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে টিকে থাকার এক চরম স্নায়ুযুদ্ধ। মার্কিন প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্ব বনাম ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের প্রাচুর্য এই লড়াইকে এক অনিশ্চিত পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ এখন ড্রোনের গুঞ্জনে প্রকম্পিত, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ফেলেছে।
ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ‘ডিক্যাপিটেশন’ কৌশল: লক্ষ্য ও বাস্তবতা
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অপারেশন শুরু হওয়ার পর ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর ‘ডিক্যাপিটেশন’ কৌশলের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে সমূলে উৎপাটন করে শাসনব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া। তবে খামেনি পরবর্তী চার স্তরের বিকল্প নেতৃত্ব এবং বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড ব্যবস্থা এই পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে দিয়ে দ্রুত পাল্টা আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। ফলে শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে চালানো এই হামলা ইরানকে দুর্বল করার পরিবর্তে উল্টো এক দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ সংঘাতের পথে ঠেলে দিয়েছে।
সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যু
১ মার্চ ২০২৬-এ ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করে যে, তেহরানের কম্পাউন্ডে এক ভয়াবহ হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। এই মৃত্যুর মাধ্যমে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু তাদের ‘ডিক্যাপিটেশন’ কৌশলের চূড়ান্ত পর্যায় সফল করার দাবি করলেও বাস্তব পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।
খামেনির প্রয়াণ ইরানকে নেতৃত্বহীন করার বদলে বরং কয়েক দশকের সুপ্ত ‘মোজাইক ডিফেন্স’ সিস্টেমকে সক্রিয় করার সংকেত হিসেবে কাজ করে। এর ফলে মাত্র আধা ঘণ্টার ব্যবধানেই শুরু হয় ইরানের নজিরবিহীন পাল্টা আক্রমণ, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাপ্রলয়ের মুখে ঠেলে দেয়।
নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা
মার্কিন দাবি অনুযায়ী, প্রথম দফার নিখুঁত হামলায় ইরানের অন্তত ৪৯ জন উচ্চপদস্থ সামরিক ও রাজনৈতিক নেতাকে হত্যা করা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রকাঠামোকে পঙ্গু করে দেওয়া। তবে পেন্টাগন ও ইজরায়েলি গোয়েন্দাদের এই ‘নেতৃত্বশূন্য করার’ প্রচেষ্টা বাস্তবে বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে। ইরানের পূর্ব-পরিকল্পিত চার স্তরের উত্তরসূরি ব্যবস্থা এবং বিকেন্দ্রীভূত কমান্ড কাঠামোর কারণে এই বিশাল ক্ষতি সত্ত্বেও তাদের সামরিক কার্যক্রম সচল থাকে। শীর্ষ নেতাদের হারিয়েও ইরান মাত্র ৩০ মিনিটের মাথায় সংগঠিত পাল্টা আঘাত শুরু করে পশ্চিমা রণকৌশলকে স্তম্ভিত করে দেয়।
ভুল হিসাব
ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মারাত্মক ভুল হিসাবে ধারণা করেছিল যে, খামেনির পতনের সাথে সাথেই ইরানি জনগণ রাস্তায় নেমে উল্লাস করবে এবং পুরো শাসনব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। কিন্তু সেই পশ্চিমা মনস্তাত্ত্বিক ছক বাস্তবে চরমভাবে ব্যর্থ হয়, যখন দেখা যায় লাখ লাখ শোকার্ত মানুষ শোককে শক্তিতে পরিণত করে রাজপথে নেমে এসেছে।
জনগণের এই অভূতপূর্ব সংহতি এবং তীব্র প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা মূলত ইরানকে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ করেছে, যা ইজরায়েলি কৌশলবিদদের সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত করে দেয়। এই ভুল হিসাবের কারণে 'রেজিম চেঞ্জ'-এর স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যুদ্ধের মোড় এক অনিশ্চিত ও দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের দিকে ঘুরে যায়।
ইরানের ‘মোজাইক ডিফেন্স’: একটি অপ্রতিরোধ্য জাল
ইরান গত কয়েক দশক ধরে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তাদের 'মোজাইক ডিফেন্স' বা বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা মূলত যেকোনো আধুনিক সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি অপ্রতিরোধ্য জাল। এই কৌশলের মূলে রয়েছে যুদ্ধের সক্ষমতাকে কোনো একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রের ওপর নির্ভর না রেখে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া, যাতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রতিরোধ থমকে না যায়। এর ফলে তেহরানে হামলা হলেও আঞ্চলিক কমান্ডাররা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে কয়েক বছর ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে।
বিকেন্দ্রীকরণ
ইরানের সমরকৌশলের মূল স্তম্ভ হলো সামরিক শক্তির সুনিপুণ বিকেন্দ্রীকরণ, যেখানে ৩১টি প্রদেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ সামরিক সেক্টরে রূপান্তর করা হয়েছে। প্রতিটি সেক্টরের কমান্ডারের হাতে স্বাধীনভাবে যুদ্ধ পরিচালনার চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকায় তারা কোনো কেন্দ্রীয় অনুমোদনের অপেক্ষা না করেই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারেন। এর ফলে তেহরানের কেন্দ্রীয় চেইন-অফ-কমান্ড বা শীর্ষ নেতৃত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মাঠপর্যায়ের প্রতিরোধব্যবস্থা মোটেই ভেঙে পড়ে না। এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কারণেই খামেনির মৃত্যুর পরও ইরানের সামরিক যন্ত্রটি আরও বেশি ক্ষিপ্র ও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে।
পাল্টা আঘাতের গতি
আয়াতুল্লাহ খামেনির ওপর হামলার মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যেই ইরান যে নজিরবিহীন পাল্টা আক্রমণ শুরু করে, তার গতি ও তীব্রতা পেন্টাগনকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। বাহরাইনে মার্কিন ৫ম নৌবহরের সদর দপ্তর, কুয়েতের আরিফজান ঘাঁটি এবং কাতারের বিশাল আল-উদিদ বিমান ঘাঁটিতে শত শত ইরানি ড্রোন ও মিসাইল বৃষ্টির মতো আছড়ে পড়ে। এই ত্বরিত প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে যে, ইরান কেবল প্রস্তুতই ছিল না, বরং তাদের 'মোজাইক ডিফেন্স' প্রতিটি মার্কিন লক্ষ্যবস্তুকে আগে থেকেই লক করে রেখেছিল। কাতারের আকাশসীমা পার হওয়ার আগেই কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করা হলেও, অনেক স্থাপনায় ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। এই ক্ষিপ্র প্রত্যাঘাত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক আধিপত্য এখন সরাসরি অস্তিত্বের সংকটে।
পরিসংখ্যান
৩ মার্চের যুদ্ধকালীন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইরান গত ৭২ ঘণ্টায় সংযুক্ত আরব আমিরাত লক্ষ্য করে ১৬৫টি শক্তিশালী মিসাইল ও ৫৪১টি সুইসাইড ড্রোন নিক্ষেপ করে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা বেষ্টনীকে তছনছ করে দিয়েছে। কুয়েতের মার্কিন স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ছোঁড়া হয়েছে আরও ৯৭টি ক্ষেপণাস্ত্র, যার ফলে অঞ্চলটি কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অস্ত্রের ব্যবহার প্রমাণ করে যে, ইরানের কাছে প্রায় ২.৫ লক্ষ মিসাইলের যে বিশাল মজুদ রয়েছে, তা দিয়ে তারা অন্তত পাঁচ বছর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে। এই বিধ্বংসী পরিসংখ্যান কেবল সামরিক শক্তিমত্তাই নয়, বরং পশ্চিমা ইন্টারসেপ্টরগুলোর মজুদ দ্রুত শেষ করে দেওয়ার এক পরিকল্পিত রণকৌশলকেও ফুটিয়ে তোলে।
প্রযুক্তির লড়াই: আয়রন ডোম বনাম হাইপারসনিক
২০২৬ সালের এই সংঘাতের ময়দানে দীর্ঘদিনের অপ্রতিরোধ্য দাবি করা পশ্চিমা সামরিক প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্ব এখন এক বিশাল অস্তিত্ব সংকটের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে ইজরায়েলের বহুমুখী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের অত্যাধুনিক হাইপারসনিক মিসাইল এবং পরিবর্তনশীল গতিপথের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো রুখতে গিয়ে চরম হিমশিম খাচ্ছে। এই প্রযুক্তিগত লড়াই প্রমাণ করছে যে, কেবল ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ইরানের সুপরিকল্পিত ও বহুমুখী আক্রমণ প্রতিহত করা প্রায় অসম্ভব।
ইন্টারসেপ্টর সংকট
ইজরায়েলের গর্বের প্রতীক 'অ্যারো' এবং 'আয়রন ডোম' সিস্টেম বর্তমানে এক ভয়াবহ গাণিতিক সংকটের মুখোমুখি। ইরানের প্রতিটি সস্তা অথচ কার্যকর মিসাইল প্রতিহত করতে ইজরায়েলকে গড়ে ৮ থেকে ১২টি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টর নিক্ষেপ করতে হচ্ছে, যা তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে দ্রুত নিঃশেষ করছে। ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে একটি মাত্র লক্ষ্যবস্তু ঠেকাতে ডজনখানেক ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেও অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতা আসছে, কারণ ইরানি মিসাইলগুলো মাঝপথে দিক পরিবর্তন করতে সক্ষম।
এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবহারের ফলে ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা মিসাইলের মজুদ এখন বিপজ্জনক স্তরে নেমে এসেছে, যা দেশটিকে আকাশপথে প্রায় অরক্ষিত করে তুলছে। পেন্টাগনের গোপন নথিতেও এই দ্রুত ফুরিয়ে আসা মজুদের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, কারণ উৎপাদন ক্ষমতার চেয়ে ব্যবহারের হার বহুগুণ বেশি।
F-15 ট্র্যাজেডি
কুয়েতের আকাশে তিনটি অত্যাধুনিক মার্কিন F-15E স্ট্রাইক ইগল বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা পেন্টাগনের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের দম্ভে এক বিশাল কুঠারাঘাত। পেন্টাগন তড়িঘড়ি করে একে 'ফ্রেন্ডলি ফায়ার' বা নিজেদের ভুল বলে প্রচার করলেও সামরিক বিশ্লেষকরা এই অজুহাত মানতে নারাজ। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক জ্যামিং অথবা নতুন কোনো অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট প্রযুক্তি এই অপরাজেয় বিমানগুলোকে নিমিষেই ধ্বংস করে দিয়েছে। এই ট্র্যাজেডি কেবল মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কাই নয়, বরং বিশ্ববাজারে মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের নির্ভরযোগ্যতাকেও বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
হাইপারসনিক ও দিক পরিবর্তন
ইরানের নতুন প্রজন্মের হাইপারসনিক মিসাইলগুলো বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে অত্যন্ত উচ্চগতিতে উড়তে পারে এবং মাঝপথে নাটকীয়ভাবে দিক পরিবর্তন করতে সক্ষম। এই 'ম্যানুভারেবিলিটি' ক্ষমতার কারণে ইজরায়েল ও আমেরিকার আধুনিক রাডার ব্যবস্থাগুলো মিসাইলের পরবর্তী অবস্থান অনুমান করতে হিমশিম খাচ্ছে। প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো সাধারণত নির্দিষ্ট ব্যালিস্টিক ট্র্যাজেক্টরি অনুসরণ করে ইন্টারসেপ্টর ছোড়ে, কিন্তু ইরানের এই পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি সেই হিসাবকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে দিচ্ছে। এরফলে অতি উন্নত আইরন ডোম বা প্যাট্রিয়ট সিস্টেমও এই মিসাইলগুলোকে ট্র্যাক ও ধ্বংস করতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকম্প
এই যুদ্ধ কেবল ইরান-ইসরায়েলের ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর বিধ্বংসী প্রভাব দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বজুড়ে। হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ হওয়ায় বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা আজ চরম হুমকির মুখে। এটি এখন আর কোনো আঞ্চলিক সংঘাত নয়, বরং এক বিশ্বব্যাপী ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকম্পে পরিণত হয়েছে।
জ্বালানি সংকট
কাতারের গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস রিফাইনারিগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালীতে যুদ্ধের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে এক নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। কাতার বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহকারী হওয়ায় তাদের উৎপাদন বন্ধের খবর বিশ্ব অর্থনীতিতে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে, যার ফলে তেল ও গ্যাসের দাম হুহু করে বাড়ছে।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের একটি বড় অংশ যাতায়াত করে, যা এখন ইরানি নৌবাহিনীর কঠোর নজরদারিতে থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমেরিকা ও ইউরোপের সাধারণ মানুষের ওপর, যেখানে পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন ও আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই জ্বালানি যুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং পুরো বিশ্বের শিল্প উৎপাদন ও জীবনযাত্রার ব্যয়কে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মিত্রদের বিভাজন
ব্রিটেন এই সরাসরি অভিযানে অংশ নিতে অস্বীকার করার পর পশ্চিমা সামরিক জোটে এক গভীর ফাটল দৃশ্যমান হয়েছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার স্পষ্ট করেছেন যে ইংল্যান্ড নিজ থেকে কোনো হামলায় জড়াবে না। অন্যদিকে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের নিজেদের মাটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত ও জানমালের ক্ষতির জন্য মার্কিনীদের ওপর চাপা ক্ষোভ ও তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করছে। এই দেশগুলোর অভিযোগ—আমেরিকা ইসরায়েলকে পূর্ণ সুরক্ষা দিলেও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের মার্কিন মিত্রতার ভিত্তি নাড়িয়ে দিচ্ছে। এই কূটনৈতিক দূরত্ব প্রমাণ করে যে, ট্রাম্পের যুদ্ধকালীন কৌশলের সাথে তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররাও একমত হতে পারছে না।
দুবাই মডেলের পতন
দুবাইয়ের দীর্ঘদিনের সুখ্যাতি ছিল বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ ব্যবসায়িক এবং পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে, যা এখন ইরানি ড্রোনের আওতায় চলে আসায় চরম হুমকির মুখে। আকর্ষণীয় আর্থিক সুবিধা এবং করমুক্ত নিরাপত্তার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে দুবাই বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করত, গত কয়েক ঘণ্টার সিরিজ হামলার পর তা কার্যত ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। এই আকস্মিক নিরাপত্তাহীনতার ফলে বিদেশি বিশেষজ্ঞ এবং বড় বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে শহর ছাড়তে শুরু করেছেন, যা দেশটির ৮৮ শতাংশ প্রবাসীকেন্দ্রিক অর্থনীতিকে পতনের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। ট্রাম্প-নেতানিয়াহু যুদ্ধের এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় দুবাইয়ের চিরচেনা গ্ল্যামারাস ব্যবসায়িক মডেলটি এখন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
লক্ষ্য পরিবর্তন: পরাজয় নাকি পিছুটান?
যুদ্ধের তৃতীয় দিনে এসে ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধংদেহী মনোভাবে বড় ধরনের ফাটল ও সুর নরম হওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হামলার শুরুতে হোয়াইট হাউসের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ইরানের 'রেজিম চেঞ্জ' বা সরকার উৎখাত, কিন্তু বর্তমানে মার্কিন ডিফেন্স সেক্রেটারি বলছেন যে তাদের মূল লক্ষ্য কেবল ইরানের মিসাইল ও নিউক্লিয়ার সক্ষমতা সীমিত করা। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ চলার স্বীকারোক্তি মূলত ইরানের 'মোজাইক ডিফেন্স' এবং তীব্র পাল্টা আঘাতের মুখে মার্কিনীদের পিছুটান হিসেবেই দেখছেন সামরিক বিশ্লেষকরা।
কুয়েতে মার্কিন বিমান বিধ্বস্ত হওয়া এবং ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভঙ্গুর দশা ওয়াশিংটনকে রণকৌশল পুনঃমূল্যায়নে বাধ্য করেছে। একদিকে মিত্র দেশগুলোর অনীহা এবং অন্যদিকে বিশ্ববাজারে তেলের আকাশচুম্বী দাম ট্রাম্প প্রশাসনকে এক ভয়াবহ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে ফেলেছে। এই লক্ষ্য পরিবর্তন কি কেবল রণকৌশলগত পিছুটান, নাকি এক আসন্ন পরাজয়ের আগাম সংকেত, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে এখন তুমুল বিতর্ক চলছে। ইরান যদি আর কয়েকদিন তাদের প্রতিরোধ ও মিসাইল বৃষ্টি চালিয়ে যেতে পারে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের চূড়ান্ত পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
যান্ত্রিক শক্তির বিচারে আমেরিকা ও ইসরায়েল অনেক এগিয়ে থাকলেও, ইরান তাদের 'মোজাইক ডিফেন্স' ও প্রক্সি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই সংঘাতকে একটি ‘War of Attrition’ বা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে পরিণত করেছে। ইরানের লক্ষ্য এখন সরাসরি বিজয় নয়, বরং শত্রুপক্ষকে ক্লান্ত করা এবং তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ব্যয়বহুল ইন্টারসেপ্টরগুলো শেষ করে দেওয়া। যদি ইরান আগামী এক সপ্তাহ এই প্রতিরোধ টিকিয়ে রাখতে পারে এবং তাদের ২.৫ লক্ষ মিসাইলের বিশাল মজুদ ব্যবহার অব্যাহত রাখে, তবে ট্রাম্পের এই অভিযান আমেরিকার জন্য আরও একটি ‘ভিয়েতনাম’ বা ‘ইরাক’ ট্র্যাজেডি হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হবে।
হাইপারসনিক প্রযুক্তির আঘাত এবং মিত্রদের অনীহা ওয়াশিংটনকে এক চরম ভূ-রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় ফেলে দিয়েছে, যেখানে প্রতিটি নিখুঁত আক্রমণই মার্কিন অর্থনীতির ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের বুকে এই অসম লড়াই প্রমাণ করছে যে, কেবল অত্যাধুনিক অস্ত্র দিয়ে একটি আদর্শিক ও বিকেন্দ্রীভূত বাহিনীকে দমন করা অসম্ভব। দিনশেষে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম এবং নিজ দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ট্রাম্প প্রশাসনকে টেবিলের ওপারে বসতে বাধ্য করতে পারে। এই যুদ্ধের পরিণাম কেবল তেহরানের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, বরং এটি হতে পারে বিশ্বমঞ্চে মার্কিন একচ্ছত্র আধিপত্যের চূড়ান্ত সূর্যাস্ত। এই যুদ্ধ এখন কেবল টিকে থাকার লড়াই নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীর নতুন বিশ্বব্যবস্থা নির্ধারণের এক অগ্নিপরীক্ষা।