রাজীব নন্দী

একসময় মানুষ বিশ্বাস করত, ঈশ্বর সব দেখেন। এখন মানুষ জানে, গুগলও দেখে। পার্থক্য হলো, ঈশ্বর অন্তত আমাদের সার্চ হিস্ট্রি দিয়ে বিজ্ঞাপন বানাতেন না। স্কট গ্যালওয়ের ‘গুগল ইজ গড’ মন্তব্যটি তাই নিছক প্রযুক্তিপ্রেমী রসিকতা নয়। এটি আমাদের সময়ের এক গভীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সত্য। কারণ আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এখন প্রায় ঈশ্বরসুলভ—সর্বজ্ঞ, সর্বব্যাপী এবং অদৃশ্য।
আজকের মানুষ পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় যাওয়ার আগে গুগল ম্যাপ দেখে, সম্পর্কের সমস্যায় ইউটিউব দেখে, অসুখে গুগলে সার্চ করে এবং একাকিত্বে ইনস্টাগ্রামে স্ক্রল করে। ফলে প্রযুক্তি শুধু তথ্যের উৎস নয়, আচরণের গাইডেও পরিণত হয়েছে। আগে ধর্ম মানুষকে নৈতিকতা শেখাত, এখন অ্যালগরিদম শেখায় কী দেখব, কী ভাবব, এমনকি কাকে আকর্ষণীয় মনে হবে।
রাষ্ট্রীয় নজরদারি অবশ্য নতুন কিছু নয়। ইতিহাসে সব রাষ্ট্রই নাগরিকদের পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছে। রাজারা গুপ্তচর রাখতেন, ঔপনিবেশিক সরকার তথ্যভাণ্ডার বানাত, আধুনিক রাষ্ট্র ফোন ট্যাপ করত। কিন্তু ডিজিটাল যুগে নজরদারির প্রকৃতি পাল্টে গেছে। আগে নজরদারি হতো নির্দিষ্ট সন্দেহভাজনদের ওপর। এখন সবাই সম্ভাব্য ডেটা।
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো সর্বদৃষ্টি কারাগার ধারণা ব্যবহার করে দেখিয়েছিলেন, আধুনিক ক্ষমতা এমনভাবে কাজ করে যাতে মানুষ সবসময় মনে করে, কেউ তাকে দেখছে। ফলে মানুষ নিজেই নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। আগে এই ব্যবস্থা ছিল কারাগারে; এখন সেটি স্মার্টফোনে। আজ মানুষ পুলিশের ভয় যতটা পায়, তার চেয়ে বেশি অস্বস্তি বোধ করে ‘সিন’ হয়ে রিপ্লাই না দিলে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ায় নজরদারির এই বাস্তবতা আরও জটিল। কারণ এখানে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক রক্ষণশীলতা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—তিনটি শক্তিই একসঙ্গে কাজ করে। ফলে নজরদারি শুধু প্রযুক্তিগত নয়; সাংস্কৃতিকও।
বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (পরে সাইবার নিরাপত্তা আইন) নিয়ে বিতর্ক তার বড় উদাহরণ। রাষ্ট্রের দাবি ছিল, এটি সাইবার অপরাধ ও গুজব ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু সমালোচকেরা দেখিয়েছেন, এই আইনের মাধ্যমে অনলাইন মতপ্রকাশের ওপর এক ধরনের অদৃশ্য নজরদারি তৈরি হয়েছে। মানুষ অনেক সময় পোস্ট দেওয়ার আগে ভাবে—‘এটা নিয়ে সমস্যা হবে না তো?’ অর্থাৎ ফুকোর ‘প্যানোপটিকন’ এখানে খুব বাস্তব। কারও হয়তো সরাসরি নজরদারি হচ্ছে না, কিন্তু নজরদারির সম্ভাবনাই আচরণ নিয়ন্ত্রণ করছে।
বাংলাদেশে ফেসবুকের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমে যেখানে টুইটার বা রেডিট রাজনৈতিক বিতর্কের জায়গা, বাংলাদেশে ফেসবুক প্রায় সমান্তরাল জনপরিসর। রাজনৈতিক প্রচারণা, গুজব, ধর্মীয় উত্তেজনা, ব্যবসা, প্রেম—সবই এখানে ঘটে। ফলে ফেসবুক শুধু সামাজিক মাধ্যম নয়; এটি সামাজিক বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতাকে নজরদারি করা মানে নাগরিক জীবনের বড় অংশকে পর্যবেক্ষণ করা।
ভারতে আধার প্রকল্প নিয়ে বিতর্কও নজরদারির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বৃহত্তম বায়োমেট্রিক ডেটাবেইস হিসেবে এটি রাষ্ট্রকে নাগরিকের পরিচয়, ব্যাংকিং, মোবাইল, স্বাস্থ্যসেবা—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষমতা দিয়েছে। সমর্থকেরা বলেন, এটি প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়িয়েছে। সমালোচকেরা বলেন, এটি ‘ডিজিটাল নাগরিকত্ব’-এর নামে নজরদারির নতুন অবকাঠামো তৈরি করেছে। বিশেষ করে যখন রাষ্ট্রীয় ডেটাবেইস ফাঁস বা অপব্যবহারের খবর সামনে আসে, তখন প্রশ্ন ওঠে—রাষ্ট্র কি নাগরিককে সেবা দিচ্ছে, নাকি নাগরিককে ডেটায় রূপান্তর করছে?
পাকিস্তানে সামাজিক মাধ্যম পর্যবেক্ষণ এবং ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের ঘটনাও নিয়মিত। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় টুইটার বা ইউটিউব বন্ধ হয়ে যাওয়া সেখানে প্রায় পরিচিত দৃশ্য। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ায় নজরদারি শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়; তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণও।
আরেকটি বিষয় হলো, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যবিত্ত সমাজ নজরদারিকে প্রায়ই ‘নৈতিকতা রক্ষার’ উপায় হিসেবে দেখে। পরিবারের লোকজন একে অন্যের ফেসবুক স্টক করে, প্রেমিক-প্রেমিকা ‘লাস্ট সিন’ বিশ্লেষণ করে, বাবা-মা সন্তানের লোকেশন ট্র্যাক করে। ফলে এখানে নজরদারি শুধু রাষ্ট্র বা কর্পোরেশনের বিষয় নয়; পারিবারিক ও সামাজিক সংস্কৃতিরও অংশ। দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ তাই এক অদ্ভুত বাস্তবতায় বাস করে—একদিকে রাষ্ট্র তাকে পর্যবেক্ষণ করছে, অন্যদিকে পরিবারও করছে, আর মাঝখানে অ্যালগরিদম তার মনোযোগ কিনে নিচ্ছে। অর্থাৎ এখানে ‘বিগ ব্রাদার’ একা নয়; পুরো আত্মীয়স্বজন মিলে অনলাইনে সক্রিয়।
রাষ্ট্রীয় নজরদারির ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয় এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা তথ্যগুলোতে। সেখানে দেখা যায়, নিরাপত্তার নামে গোটা পৃথিবীর যোগাযোগব্যবস্থাকে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়েছিল। “জাতীয় নিরাপত্তা” শব্দবন্ধটি আধুনিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে কার্যকর পাসওয়ার্ডে পরিণত হয়েছে। নাগরিকেরা নিরাপত্তা চায়, আর রাষ্ট্র সেই চাহিদার বিনিময়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে নেয়।
তবে রাষ্ট্র অন্তত নজরদারি করতে গিয়ে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করে। সামাজিক মাধ্যমের সেই সংকোচও নেই। ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব বা ইনস্টাগ্রাম আমাদের শুধু পর্যবেক্ষণ করে না; আমাদের মনোযোগ, পছন্দ এবং আবেগও বিশ্লেষণ করে। শোশানা জুবফ এই ব্যবস্থাকে বলেছেন ‘Surveillance Capitalism’ বা নজরদারিভিত্তিক পুঁজিবাদ। এখানে ব্যবহারকারী কোনো গ্রাহক নয়; বরং তার আচরণই আসল পণ্য।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই নজরদারিতে আমরা জোর করে অংশ নিই না; স্বেচ্ছায় অংশ নিই। আমরা নিজেরাই লোকেশন অন করি, নিজেরাই মাইক্রোফোনের অনুমতি দিই, নিজেরাই প্রতিদিন ছবি আপলোড করি। একসময় রাষ্ট্র মানুষকে জেরা করত। এখন মানুষ নিজেই স্টোরি দিয়ে জানায়—“Having coffee alone and healing.” হয়তো এই পুরো পরিস্থিতিকে সবচেয়ে ভালো বোঝানো যায় গ্রিক পুরাণের আর্গাসের গল্প দিয়ে। আর্গাস ছিল শতচক্ষু এক দানব—তার একশটি চোখের অন্তত কিছু সবসময় খোলা থাকত। ফলে তাকে ফাঁকি দেওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। দেবতারা তাকে নিখুঁত প্রহরী হিসেবে ব্যবহার করত। আধুনিক ডিজিটাল সভ্যতাও যেন সেই আর্গাসের নতুন সংস্করণ। শুধু পার্থক্য হলো, আজকের আর্গাসের চোখগুলো ক্যামেরা, অ্যালগরিদম, সার্চ ইঞ্জিন, সিসিটিভি এবং স্মার্টফোনে ছড়িয়ে আছে।
কিন্তু পুরাণের গল্পে একটি মজার বিষয় ছিল—আর্গাস নিজে কখনও বুঝতে পারেনি, সে কাকে রক্ষা করছে আর কাকে বন্দি করছে। আমাদের ডিজিটাল বাস্তবতাও ঠিক তেমন। আমরা ভাবি প্রযুক্তি আমাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে, সুবিধা দিচ্ছে, সংযোগ তৈরি করছে। বাস্তবেও তা করছে। কিন্তু একই সঙ্গে সেটি আমাদের প্রতিটি অভ্যাস, দুর্বলতা, ভয় এবং আকাঙ্ক্ষাকেও পর্যবেক্ষণ করছে।
সমস্যা সম্ভবত নজরদারির অস্তিত্বে নয়; সমস্যা হলো, আমরা ধীরে ধীরে এটিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছি। আর্গাসের শত চোখ এখন আর দূরের কোনো দানব নয়; সেটি আমাদের পকেটেই থাকে। আমরা প্রতিদিন সেটিকে চার্জ দিই, আপডেট করি, ভালোবাসি—এবং স্বেচ্ছায় নিজেদের জীবন তার সামনে খুলে দিই। সম্ভবত এ কারণেই স্কট গ্যালওয়ের “Google is God” মন্তব্যটি এত অস্বস্তিকরভাবে সত্য শোনায়। কারণ আধুনিক মানুষ আর সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে ভয় পায় না; সে ভয় পায় ওয়াই-ফাই চলে গেলে। নজরদারির এই নতুন সংস্কৃতি আসলে খুব সুবিধাজনক বলেই টিকে আছে। মানুষ স্বাধীনতার জন্য বিপ্লব করেছে, যুদ্ধ করেছে, জেল খেটেছে। অথচ এখন সামান্য “Recommended for You” বা “Free Delivery”-এর বিনিময়ে ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে দেয়। আগে মানুষ ডায়েরি লুকিয়ে রাখত; এখন “Memories from 7 years ago” দেখে আবেগপ্রবণ হয়।
স্কট গ্যালওয়ের “Google is God” ধারণার গভীরতা এখানেই। ঈশ্বরের মতোই গুগল সর্বত্র উপস্থিত, সব জানে, সব মনে রাখে। আপনি কোথায় গিয়েছিলেন, কী খুঁজেছেন, কখন ঘুমিয়েছেন, কোন বিষয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন—সবকিছুই ডেটায় পরিণত হচ্ছে। এমনকি অনেক সময় গুগল আমাদের নিজেদের চেয়েও ভালো জানে আমরা কী চাই। তবে ধর্মের ঈশ্বর অন্তত আত্মার মুক্তি চাইতেন। ডিজিটাল ঈশ্বর চায় এনগেজমেন্ট রেট। এই বাস্তবতায় মানুষ নিজের পরিচয়ও নতুনভাবে তৈরি করছে। আগে মানুষ নিজেকে নাগরিক, পাঠক বা শ্রমিক হিসেবে ভাবত। এখন মানুষ নিজেকে “ইউজার” হিসেবে চিনে। মজার ব্যাপার হলো, “ইউজার” শব্দটি প্রযুক্তি ও মাদক—দুই জগতেই সমানভাবে ব্যবহৃত হয়। হয়তো এটি নিছক কাকতাল নয়।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে ফোন জানে লোকেশন, ঘড়ি জানে হার্টবিট, ইউটিউব জানে রাজনৈতিক ঝোঁক, আর বিজ্ঞাপন জানে রাত ২টায় কেন হঠাৎ পুরোনো প্রেমিকার প্রোফাইলে ঢুকেছিলেন। নজরদারির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক সম্ভবত এটাই—এটি এখন আর অস্বাভাবিক লাগে না।
তাহলে কি মুক্তির কোনো পথ নেই? আছে, তবে সেটি প্রযুক্তি ছেড়ে পাহাড়ে চলে যাওয়া নয়। বরং প্রযুক্তিকে প্রশ্ন করা, ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো এবং “ফ্রি” জিনিসের প্রকৃত মূল্য বোঝা। কারণ ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে বড় মিথ সম্ভবত এটিই—যদি কোনো সেবা বিনামূল্যে হয়, তাহলে আপনি গ্রাহক নন; আপনিই পণ্য।
সম্ভবত ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন হবে—রাষ্ট্র আমাদের কতটা নজরদারি করতে পারবে, সেটি নয়; বরং আমরা কত আনন্দের সঙ্গে নজরদারিতে অংশ নেব। কারণ আধুনিক নজরদারির সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, এটি মানুষকে বন্দি করেনি; মানুষকে অভ্যস্ত করেছে।
হয়তো এই সময়কে সবচেয়ে ভালো বোঝানো যায় মহাভারতের সঞ্জয় দিয়ে। কুরুক্ষেত্রে উপস্থিত না থেকেও সঞ্জয় সব দেখতে পেতেন। ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ ছিলেন, কিন্তু সঞ্জয়ের “দিব্যদৃষ্টি” তাকে যুদ্ধের প্রতিটি মুহূর্ত জানিয়ে দিত। আজকের রাষ্ট্র, গুগল, ফেসবুক কিংবা অ্যালগরিদমও যেন সেই আধুনিক সঞ্জয়। তারা জানে আমরা কোথায় যাই, কী ভাবি, কী কিনি, এমনকি কখন মন খারাপ করি। পার্থক্য শুধু একটাই—মহাভারতের সঞ্জয় রাজাকে যুদ্ধের খবর দিতেন, আর আজকের ডিজিটাল সঞ্জয়রা বিজ্ঞাপনদাতাকে আমাদের জীবনের খবর দেয়। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কুরুক্ষেত্রে মানুষ অন্তত জানত যুদ্ধ চলছে। আমরা অনেক সময় সেটিও বুঝতে পারি না।
লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক

একসময় মানুষ বিশ্বাস করত, ঈশ্বর সব দেখেন। এখন মানুষ জানে, গুগলও দেখে। পার্থক্য হলো, ঈশ্বর অন্তত আমাদের সার্চ হিস্ট্রি দিয়ে বিজ্ঞাপন বানাতেন না। স্কট গ্যালওয়ের ‘গুগল ইজ গড’ মন্তব্যটি তাই নিছক প্রযুক্তিপ্রেমী রসিকতা নয়। এটি আমাদের সময়ের এক গভীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সত্য। কারণ আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো এখন প্রায় ঈশ্বরসুলভ—সর্বজ্ঞ, সর্বব্যাপী এবং অদৃশ্য।
আজকের মানুষ পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় যাওয়ার আগে গুগল ম্যাপ দেখে, সম্পর্কের সমস্যায় ইউটিউব দেখে, অসুখে গুগলে সার্চ করে এবং একাকিত্বে ইনস্টাগ্রামে স্ক্রল করে। ফলে প্রযুক্তি শুধু তথ্যের উৎস নয়, আচরণের গাইডেও পরিণত হয়েছে। আগে ধর্ম মানুষকে নৈতিকতা শেখাত, এখন অ্যালগরিদম শেখায় কী দেখব, কী ভাবব, এমনকি কাকে আকর্ষণীয় মনে হবে।
রাষ্ট্রীয় নজরদারি অবশ্য নতুন কিছু নয়। ইতিহাসে সব রাষ্ট্রই নাগরিকদের পর্যবেক্ষণ করতে চেয়েছে। রাজারা গুপ্তচর রাখতেন, ঔপনিবেশিক সরকার তথ্যভাণ্ডার বানাত, আধুনিক রাষ্ট্র ফোন ট্যাপ করত। কিন্তু ডিজিটাল যুগে নজরদারির প্রকৃতি পাল্টে গেছে। আগে নজরদারি হতো নির্দিষ্ট সন্দেহভাজনদের ওপর। এখন সবাই সম্ভাব্য ডেটা।
ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো সর্বদৃষ্টি কারাগার ধারণা ব্যবহার করে দেখিয়েছিলেন, আধুনিক ক্ষমতা এমনভাবে কাজ করে যাতে মানুষ সবসময় মনে করে, কেউ তাকে দেখছে। ফলে মানুষ নিজেই নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। আগে এই ব্যবস্থা ছিল কারাগারে; এখন সেটি স্মার্টফোনে। আজ মানুষ পুলিশের ভয় যতটা পায়, তার চেয়ে বেশি অস্বস্তি বোধ করে ‘সিন’ হয়ে রিপ্লাই না দিলে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ায় নজরদারির এই বাস্তবতা আরও জটিল। কারণ এখানে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক রক্ষণশীলতা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—তিনটি শক্তিই একসঙ্গে কাজ করে। ফলে নজরদারি শুধু প্রযুক্তিগত নয়; সাংস্কৃতিকও।
বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (পরে সাইবার নিরাপত্তা আইন) নিয়ে বিতর্ক তার বড় উদাহরণ। রাষ্ট্রের দাবি ছিল, এটি সাইবার অপরাধ ও গুজব ঠেকানোর জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু সমালোচকেরা দেখিয়েছেন, এই আইনের মাধ্যমে অনলাইন মতপ্রকাশের ওপর এক ধরনের অদৃশ্য নজরদারি তৈরি হয়েছে। মানুষ অনেক সময় পোস্ট দেওয়ার আগে ভাবে—‘এটা নিয়ে সমস্যা হবে না তো?’ অর্থাৎ ফুকোর ‘প্যানোপটিকন’ এখানে খুব বাস্তব। কারও হয়তো সরাসরি নজরদারি হচ্ছে না, কিন্তু নজরদারির সম্ভাবনাই আচরণ নিয়ন্ত্রণ করছে।
বাংলাদেশে ফেসবুকের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমে যেখানে টুইটার বা রেডিট রাজনৈতিক বিতর্কের জায়গা, বাংলাদেশে ফেসবুক প্রায় সমান্তরাল জনপরিসর। রাজনৈতিক প্রচারণা, গুজব, ধর্মীয় উত্তেজনা, ব্যবসা, প্রেম—সবই এখানে ঘটে। ফলে ফেসবুক শুধু সামাজিক মাধ্যম নয়; এটি সামাজিক বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতাকে নজরদারি করা মানে নাগরিক জীবনের বড় অংশকে পর্যবেক্ষণ করা।
ভারতে আধার প্রকল্প নিয়ে বিতর্কও নজরদারির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বৃহত্তম বায়োমেট্রিক ডেটাবেইস হিসেবে এটি রাষ্ট্রকে নাগরিকের পরিচয়, ব্যাংকিং, মোবাইল, স্বাস্থ্যসেবা—সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষমতা দিয়েছে। সমর্থকেরা বলেন, এটি প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়িয়েছে। সমালোচকেরা বলেন, এটি ‘ডিজিটাল নাগরিকত্ব’-এর নামে নজরদারির নতুন অবকাঠামো তৈরি করেছে। বিশেষ করে যখন রাষ্ট্রীয় ডেটাবেইস ফাঁস বা অপব্যবহারের খবর সামনে আসে, তখন প্রশ্ন ওঠে—রাষ্ট্র কি নাগরিককে সেবা দিচ্ছে, নাকি নাগরিককে ডেটায় রূপান্তর করছে?
পাকিস্তানে সামাজিক মাধ্যম পর্যবেক্ষণ এবং ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের ঘটনাও নিয়মিত। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় টুইটার বা ইউটিউব বন্ধ হয়ে যাওয়া সেখানে প্রায় পরিচিত দৃশ্য। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ায় নজরদারি শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়; তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণও।
আরেকটি বিষয় হলো, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যবিত্ত সমাজ নজরদারিকে প্রায়ই ‘নৈতিকতা রক্ষার’ উপায় হিসেবে দেখে। পরিবারের লোকজন একে অন্যের ফেসবুক স্টক করে, প্রেমিক-প্রেমিকা ‘লাস্ট সিন’ বিশ্লেষণ করে, বাবা-মা সন্তানের লোকেশন ট্র্যাক করে। ফলে এখানে নজরদারি শুধু রাষ্ট্র বা কর্পোরেশনের বিষয় নয়; পারিবারিক ও সামাজিক সংস্কৃতিরও অংশ। দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ তাই এক অদ্ভুত বাস্তবতায় বাস করে—একদিকে রাষ্ট্র তাকে পর্যবেক্ষণ করছে, অন্যদিকে পরিবারও করছে, আর মাঝখানে অ্যালগরিদম তার মনোযোগ কিনে নিচ্ছে। অর্থাৎ এখানে ‘বিগ ব্রাদার’ একা নয়; পুরো আত্মীয়স্বজন মিলে অনলাইনে সক্রিয়।
রাষ্ট্রীয় নজরদারির ভয়াবহতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয় এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা তথ্যগুলোতে। সেখানে দেখা যায়, নিরাপত্তার নামে গোটা পৃথিবীর যোগাযোগব্যবস্থাকে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা হয়েছিল। “জাতীয় নিরাপত্তা” শব্দবন্ধটি আধুনিক রাষ্ট্রের সবচেয়ে কার্যকর পাসওয়ার্ডে পরিণত হয়েছে। নাগরিকেরা নিরাপত্তা চায়, আর রাষ্ট্র সেই চাহিদার বিনিময়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে নেয়।
তবে রাষ্ট্র অন্তত নজরদারি করতে গিয়ে কিছুটা অস্বস্তি বোধ করে। সামাজিক মাধ্যমের সেই সংকোচও নেই। ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউব বা ইনস্টাগ্রাম আমাদের শুধু পর্যবেক্ষণ করে না; আমাদের মনোযোগ, পছন্দ এবং আবেগও বিশ্লেষণ করে। শোশানা জুবফ এই ব্যবস্থাকে বলেছেন ‘Surveillance Capitalism’ বা নজরদারিভিত্তিক পুঁজিবাদ। এখানে ব্যবহারকারী কোনো গ্রাহক নয়; বরং তার আচরণই আসল পণ্য।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই নজরদারিতে আমরা জোর করে অংশ নিই না; স্বেচ্ছায় অংশ নিই। আমরা নিজেরাই লোকেশন অন করি, নিজেরাই মাইক্রোফোনের অনুমতি দিই, নিজেরাই প্রতিদিন ছবি আপলোড করি। একসময় রাষ্ট্র মানুষকে জেরা করত। এখন মানুষ নিজেই স্টোরি দিয়ে জানায়—“Having coffee alone and healing.” হয়তো এই পুরো পরিস্থিতিকে সবচেয়ে ভালো বোঝানো যায় গ্রিক পুরাণের আর্গাসের গল্প দিয়ে। আর্গাস ছিল শতচক্ষু এক দানব—তার একশটি চোখের অন্তত কিছু সবসময় খোলা থাকত। ফলে তাকে ফাঁকি দেওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। দেবতারা তাকে নিখুঁত প্রহরী হিসেবে ব্যবহার করত। আধুনিক ডিজিটাল সভ্যতাও যেন সেই আর্গাসের নতুন সংস্করণ। শুধু পার্থক্য হলো, আজকের আর্গাসের চোখগুলো ক্যামেরা, অ্যালগরিদম, সার্চ ইঞ্জিন, সিসিটিভি এবং স্মার্টফোনে ছড়িয়ে আছে।
কিন্তু পুরাণের গল্পে একটি মজার বিষয় ছিল—আর্গাস নিজে কখনও বুঝতে পারেনি, সে কাকে রক্ষা করছে আর কাকে বন্দি করছে। আমাদের ডিজিটাল বাস্তবতাও ঠিক তেমন। আমরা ভাবি প্রযুক্তি আমাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে, সুবিধা দিচ্ছে, সংযোগ তৈরি করছে। বাস্তবেও তা করছে। কিন্তু একই সঙ্গে সেটি আমাদের প্রতিটি অভ্যাস, দুর্বলতা, ভয় এবং আকাঙ্ক্ষাকেও পর্যবেক্ষণ করছে।
সমস্যা সম্ভবত নজরদারির অস্তিত্বে নয়; সমস্যা হলো, আমরা ধীরে ধীরে এটিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছি। আর্গাসের শত চোখ এখন আর দূরের কোনো দানব নয়; সেটি আমাদের পকেটেই থাকে। আমরা প্রতিদিন সেটিকে চার্জ দিই, আপডেট করি, ভালোবাসি—এবং স্বেচ্ছায় নিজেদের জীবন তার সামনে খুলে দিই। সম্ভবত এ কারণেই স্কট গ্যালওয়ের “Google is God” মন্তব্যটি এত অস্বস্তিকরভাবে সত্য শোনায়। কারণ আধুনিক মানুষ আর সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে ভয় পায় না; সে ভয় পায় ওয়াই-ফাই চলে গেলে। নজরদারির এই নতুন সংস্কৃতি আসলে খুব সুবিধাজনক বলেই টিকে আছে। মানুষ স্বাধীনতার জন্য বিপ্লব করেছে, যুদ্ধ করেছে, জেল খেটেছে। অথচ এখন সামান্য “Recommended for You” বা “Free Delivery”-এর বিনিময়ে ব্যক্তিগত তথ্য দিয়ে দেয়। আগে মানুষ ডায়েরি লুকিয়ে রাখত; এখন “Memories from 7 years ago” দেখে আবেগপ্রবণ হয়।
স্কট গ্যালওয়ের “Google is God” ধারণার গভীরতা এখানেই। ঈশ্বরের মতোই গুগল সর্বত্র উপস্থিত, সব জানে, সব মনে রাখে। আপনি কোথায় গিয়েছিলেন, কী খুঁজেছেন, কখন ঘুমিয়েছেন, কোন বিষয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন—সবকিছুই ডেটায় পরিণত হচ্ছে। এমনকি অনেক সময় গুগল আমাদের নিজেদের চেয়েও ভালো জানে আমরা কী চাই। তবে ধর্মের ঈশ্বর অন্তত আত্মার মুক্তি চাইতেন। ডিজিটাল ঈশ্বর চায় এনগেজমেন্ট রেট। এই বাস্তবতায় মানুষ নিজের পরিচয়ও নতুনভাবে তৈরি করছে। আগে মানুষ নিজেকে নাগরিক, পাঠক বা শ্রমিক হিসেবে ভাবত। এখন মানুষ নিজেকে “ইউজার” হিসেবে চিনে। মজার ব্যাপার হলো, “ইউজার” শব্দটি প্রযুক্তি ও মাদক—দুই জগতেই সমানভাবে ব্যবহৃত হয়। হয়তো এটি নিছক কাকতাল নয়।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে ফোন জানে লোকেশন, ঘড়ি জানে হার্টবিট, ইউটিউব জানে রাজনৈতিক ঝোঁক, আর বিজ্ঞাপন জানে রাত ২টায় কেন হঠাৎ পুরোনো প্রেমিকার প্রোফাইলে ঢুকেছিলেন। নজরদারির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক সম্ভবত এটাই—এটি এখন আর অস্বাভাবিক লাগে না।
তাহলে কি মুক্তির কোনো পথ নেই? আছে, তবে সেটি প্রযুক্তি ছেড়ে পাহাড়ে চলে যাওয়া নয়। বরং প্রযুক্তিকে প্রশ্ন করা, ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো এবং “ফ্রি” জিনিসের প্রকৃত মূল্য বোঝা। কারণ ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে বড় মিথ সম্ভবত এটিই—যদি কোনো সেবা বিনামূল্যে হয়, তাহলে আপনি গ্রাহক নন; আপনিই পণ্য।
সম্ভবত ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন হবে—রাষ্ট্র আমাদের কতটা নজরদারি করতে পারবে, সেটি নয়; বরং আমরা কত আনন্দের সঙ্গে নজরদারিতে অংশ নেব। কারণ আধুনিক নজরদারির সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, এটি মানুষকে বন্দি করেনি; মানুষকে অভ্যস্ত করেছে।
হয়তো এই সময়কে সবচেয়ে ভালো বোঝানো যায় মহাভারতের সঞ্জয় দিয়ে। কুরুক্ষেত্রে উপস্থিত না থেকেও সঞ্জয় সব দেখতে পেতেন। ধৃতরাষ্ট্র অন্ধ ছিলেন, কিন্তু সঞ্জয়ের “দিব্যদৃষ্টি” তাকে যুদ্ধের প্রতিটি মুহূর্ত জানিয়ে দিত। আজকের রাষ্ট্র, গুগল, ফেসবুক কিংবা অ্যালগরিদমও যেন সেই আধুনিক সঞ্জয়। তারা জানে আমরা কোথায় যাই, কী ভাবি, কী কিনি, এমনকি কখন মন খারাপ করি। পার্থক্য শুধু একটাই—মহাভারতের সঞ্জয় রাজাকে যুদ্ধের খবর দিতেন, আর আজকের ডিজিটাল সঞ্জয়রা বিজ্ঞাপনদাতাকে আমাদের জীবনের খবর দেয়। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কুরুক্ষেত্রে মানুষ অন্তত জানত যুদ্ধ চলছে। আমরা অনেক সময় সেটিও বুঝতে পারি না।
লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট হলো প্রতিহিংসার রাজনীতি। ক্ষমতার পালাবদলে প্রতিপক্ষকে দমন, নিগ্রহ এবং প্রতিশোধ গ্রহণের চক্র আমাদের রাজনীতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। আমরা এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
৫ মিনিট আগে
এটা এখন অনেকেরই জানা, পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ ঘিরে দেশের বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় ও সফল ব্যাংকটিতে চলমান সংকট নিরসনে পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
১ ঘণ্টা আগে
আমরা এমন এক সময়ের মধ্যে বাস করছি, যখন মানহানি আলোর গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। একসময় কারও সুনাম নষ্ট করতে হলে সংবাদপত্র, সম্পাদক, যাচাই-বাছাই এবং সময়ের প্রয়োজন হতো। আজ একটি টুইট, একটি বিকৃত স্ক্রিনশট, একটি বিভ্রান্তিকর ভিডিও ক্লিপ কিংবা একটি বেপরোয়া অভিযোগই যথেষ্ট।
৪ ঘণ্টা আগে
গ্রাম এখন আর সেই শান্ত, নির্ভার জায়গা নয়; বরং নানা সামাজিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট হলো মাদক—একটি নীরব, কিন্তু দ্রুত বিস্তারমান মহামারী, যা গ্রামীণ সমাজকে ভেতর থেকে ক্ষয় করছে।
৬ ঘণ্টা আগে