মতামত

জলবায়ু-সহনশীল কৃষিই আগামীর বাংলাদেশের জীবনরেখা

প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৬, ১৭: ৩৯
স্ট্রিম গ্রাফিক

আজ ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস। বিশ্বমঞ্চে এবারের সতর্কবার্তা হলো— ‘#NowForClimate’ বা ‘জলবায়ু নিয়ে ভাবার এখনই সময়’। এটি এখন আর ভবিষ্যতের কোনো তাত্ত্বিক বিতর্ক নয়, বরং বর্তমানের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বিপজ্জনক সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে। বাংলাদেশের মতো বদ্বীপের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন শুধু কোনো পরিসংখ্যান নয়। এটি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় অস্তিত্বের ওপর সরাসরি এক বহুমুখী আঘাত।

এই জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে বড় আঘাতটি আসছে আমাদের কৃষির প্রাণ—মাটির ওপর। আমরা এখন দ্বৈত বিপর্যয়ের শিকার। একদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে উপকূলের প্রায় ১০ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি আজ লবণাক্ত। অন্যদিকে, সমতলের মাটির ‘স্বাস্থ’ নীরবে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভয়াবহ তথ্য—দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষিজমি এখন মারাত্মকভাবে অম্লীয় (এসিডিক)। তীব্র দাবদাহ এবং অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার এর মূল কারণ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ। এই বিষাক্ত মিশ্রণের কারণে মাটির উপকারী অণুজীব বা ‘সয়েল মাইক্রোবায়োম’ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, ফলন ঠিক রাখতে গিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফাঁদে আটকে গেছে। এর মাধ্যমে আমাদের খাদ্যচক্রে বিষ ঢুকছে এবং জনস্বাস্থ্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকির মুখে পড়ছে। শুধু রাসায়নিক দিয়ে এই পরিবেশগত বিপর্যয় থেকে মুক্তি মিলবে না। জাতীয় খাদ্য সংকট এড়াতে আমাদের প্রতিরক্ষাকৌশল বদলাতে হবে। আগামীর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ হলো—বায়োটেকনোলজি, ন্যানোটেকনোলজি, আইওটি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ‘ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি’ বা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দ্রুত ব্যবহার।

জলবায়ু, খাদ্যনিরাপত্তা এবং নিরাপদ খাদ্যের ত্রিমাত্রিক সংকট

বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান প্রায় ১১.৫ শতাংশ। দেশের ৪০ শতাংশের বেশি মানুষ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এই অর্থনৈতিক ইঞ্জিন আজ চরম পরিবেশগত হুমকির মুখে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমাদের জমি যেমন উর্বর, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের কাছে চরম ঝুঁকিপূর্ণ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রের স্তর এক মিটার বাড়লে উপকূলের ১৭ শতাংশ তলিয়ে যেতে পারে। তবে সেই চিরস্থায়ী ডুবে যাওয়ার আগেই ‘লবণাক্ততা’ নামের নীরব ঘাতক হানা দিয়েছে। উপকূলের ব্যাপক এলাকা লবণাক্ত হওয়ায় অনেক জায়গায় ফসলের ফলন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কমে গেছে।

খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি ‘নিরাপদ খাদ্য’ নিশ্চিত করাও জরুরি। ২০২৬ সালের এই বৈরী আবহাওয়ায় তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তনে ফসলে পোকামাকড় ও রোগবালাই মারাত্মকভাবে বেড়েছে। ফসল বাঁচাতে কৃষকরা বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত কীটনাশক দিচ্ছেন। ফলে আমাদের রোজকার খাবারে বিষাক্ত রাসায়নিক মিশে যাচ্ছে।

সংকট এখানেই শেষ নয়। তীব্র গরমে আমাদের ফসল সংরক্ষণের দুর্বল কাঠামো ভেঙে পড়ছে। নিরবচ্ছিন্ন কোল্ড চেইন বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহনের অভাবে মাছ, মাংস, দুধ ও সবজি দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। দেশে কৃষিপণ্যের প্রায় ৪০ শতাংশই ফসল কাটার পর নষ্ট হয়ে যায়। এটি ঠেকাতে আমাদের কৃষি-লজিস্টিকস ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বড় বিনিয়োগ করতে হবে।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশ

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ভারত ‘ডিজিটাল কৃষি মিশন’ নিয়ে এগোলেও তারা মাটি ও পানির সংকটে ভুগছে। পাকিস্তান এখনো বন্যার ধাক্কা সামলাচ্ছে। বাংলাদেশ জলবায়ু-সহনশীল বেশ কিছু ধানের জাত উদ্ভাবনে দারুণ সফল। তবে প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে ড্রোন বা আইওটি-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো ২ শতাংশেরও নিচে।

এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম আমাদের জন্য দারুণ এক আদর্শ হতে পারে। মেকং ব-দ্বীপের চরম বৈরী পরিবেশেও তারা স্বয়ংক্রিয় সেচ ও স্মার্ট লবণাক্ততা মাপার যন্ত্র ব্যবহার করে হেক্টরে প্রায় ছয় টন ধান উৎপাদন করছে।

নেদারল্যান্ডস থেকেও আমরা শিখতে পারি। আয়তনে ছোট হয়েও তারা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃষি রপ্তানিকারক দেশ। তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ‘নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ কৃষি’ (ইনডোর ফার্মিং) ব্যবহার করে ঝড়-বৃষ্টির প্রভাব থেকে ফসলকে দূরে রাখে। খোলা মাঠে এটি ব্যয়বহুল হলেও, দেশের পোলট্রি, ডেইরি বা দামি অর্থকরী ফসলের ক্ষেত্রে আমরা এই প্রযুক্তি কাজে লাগাতে পারি।

স্মার্ট কৃষির নতুন রক্ষাকবচ: ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি

সনাতন পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে এই বহুমুখী সংকট মোকাবিলা করা যাবে না। আমাদের প্রযুক্তি-নির্ভর আধুনিক কৃষির দিকে দ্রুত ঝুঁকতে হবে। বাংলাদেশে খনিজ সম্পদ কম থাকলেও আমাদের বিশাল জীববৈচিত্র্য ও অণুজীবের এক গুপ্তধন রয়েছে, যাকে আমি বলি "বায়োগোল্ড" বা জৈব-স্বর্ণ। এটি কাজে লাগিয়ে দারুণ এক সবুজ ও সুনীল (ব্লু) অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।

সনাতন পদ্ধতিতে একটি নতুন জাত তৈরি করতে প্রায় এক দশক সময় লাগে। কিন্তু ‘ক্রিসপার-ক্যাস৯’ (CRISPR-Cas9) এর মতো আধুনিক জিনোম-এডিটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুব দ্রুত ফসলের কাঙ্ক্ষিত জাত তৈরি করা সম্ভব। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যে লবণ ও জলমগ্নতা-সহনশীল ধানের জাত তৈরি করেছে। এখন বায়োটেকনোলজির সাহায্যে এমন ফসলও তৈরি করা সম্ভব যা টানা চার সপ্তাহ পানির নিচে টিকে থাকতে পারে।

কৃষিতে ন্যানোটেকনোলজি এবং আইওটি-র ব্যবহার যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। ন্যানো-সেন্সরের মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা ও পুষ্টি সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য পাওয়া সম্ভব। এতে বরেন্দ্র অঞ্চলের মতো জায়গায় ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় ঠেকানো যাবে। অন্যদিকে, পুরো মাঠে রাসায়নিক না ছিটিয়ে ন্যানো-সার ও ন্যানো-কীটনাশক সরাসরি গাছের কোষে প্রয়োগ করা যায়। ড্রোনের মাধ্যমে মাঠের নির্দিষ্ট জায়গায় রোগ বা পোকার আক্রমণ শনাক্ত করে সেখানেই শুধু ওষুধ দেওয়া সম্ভব।

ফসল কাটার পর গ্রাহকের প্লেট পর্যন্ত তা সতেজ রাখতে ন্যানো-প্যাকেজিং, আইওটি এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তি দারুণ কার্যকর। খুলনার চিংড়ি বা সাতক্ষীরার আম কীভাবে ঢাকার সুপারমার্কেটে আসছে, তা ব্লকচেইনের মাধ্যমে নজরদারি করা যায়। মাঝপথে তাপমাত্রা কমবেশি হলে সেন্সর তা জানিয়ে দেবে। এতে খাদ্যের মান ঠিক থাকবে এবং রপ্তানির দুয়ার খুলবে।

নীতিনির্ধারকদের জন্য সুপারিশ

২০৩০ সালের মধ্যে জলবায়ু-সহনশীল বাংলাদেশ গড়তে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প দিয়ে কাজ হবে না। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে আমাদের সমন্বিত কৌশল নিতে হবে।

প্রথমত, সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবনগুলো যেন সহজে কৃষকের কাছে পৌঁছায়, সেজন্য কার্যকর ‘টেকনোলজি ট্রান্সফার অফিস’ চালু করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, একটি ‘সেন্ট্রাল রিয়েল-টাইম ডিজিটাল কৃষি ডেটাবেজ’ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। যেখানে মাটির অবস্থা, পানির স্তর এবং আবহাওয়ার নিখুঁত তথ্য এক জায়গায় থাকবে।

তৃতীয়ত, প্রান্তিক কৃষকরা যাতে এসব প্রযুক্তি সহজে পায়, সে জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক মিলে একটি 'গ্রিন অ্যাগ্রি-টেক ফান্ড' গঠন করতে পারে। আইওটি সেন্সর বা স্মার্ট সেচযন্ত্র আমদানিতে করছাড় বা বিনা সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা উচিত।

চতুর্থত, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে (বিএফএসএ) ব্লকচেইন ও কিউআর কোডভিত্তিক ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬-এর বার্তা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কাছে হাত গুটিয়ে বসে থাকার কোনো সুযোগ আর নেই। এটি আমাদের অস্তিত্বের লড়াই। তবে এই সংকটকে আমরা সবচেয়ে বড় সুযোগে রূপান্তর করতে পারি।

আমাদের কৃষকদের অদম্য সাহসের সাথে এআই, জিনোম এডিটিং, ন্যানো ও ব্লকচেইন প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে হবে। এর জন্য দরকার সঠিক তথ্য, যুগোপযোগী নীতিমালা এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ। এই পথে দৃঢ়তার সাথে হাঁটলে বাংলাদেশ শুধু নিজের ভবিষ্যৎই সুরক্ষিত করবে না, বরং পুরো বিশ্বের বুকে ‘স্মার্ট ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি’র এক অনন্য রোল মডেল হয়ে উঠবে। সমাধান আমাদের হাতের মুঠোতেই; এখন শুধু প্রয়োজন রাষ্ট্রের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং তার নিরলস বাস্তবায়ন।

তোফাজ্জল ইসলাম: অধ্যাপক ও প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (আইবিজিই); ডিন, ফ্যাকাল্টি অব গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়; এবং ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

লেখক: ডিন, গ্রাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত