ধানের আবাদ যেন নিরুৎসাহিত না হয়

প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬, ২১: ৩৯
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

‘ধানে লাভ নগণ্য, আবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন নওগাঁর কৃষক’ শিরোনামে স্ট্রিমে যে প্রতিবেদন এসেছে, সেটা কমবেশি সারা দেশেরই চিত্র হলে তাতে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে।

দেশের প্রধান ফসল বোরোর উত্তোলন শেষ হয়ে এসেছে বলা যায়। হাওরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও দেশব্যাপী ফলন সন্তোষজনক বলেই দাবি করা হচ্ছে। যারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত, তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা রয়েছে। তবে প্রকৃতির বিরূপতার শিকার যারা হননি, তারাও ধানের লাভজনক দাম পাচ্ছেন না বলেই অভিযোগ। হাওর অঞ্চলের বাইরের চিত্রও খুব একটা ভিন্ন নয় বলেই স্ট্রিমে আসা প্রতিবেদনে মনে হচ্ছে।

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তার বক্তব্যও প্রণিধানযোগ্য। উত্তোলনের পরই ধান বেচে না দিয়ে সংরক্ষণ করা গেলে ভালো দাম পাওয়ার আশা থাকে। উৎপাদকদের মধ্যে বিক্রির চাপ বেড়ে গেলে পণ্যের দাম কমে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। ধান উত্তোলন মৌসুমে সরকার তাই ক্রেতা হিসেবে হাজির হয়। ধানের দামে অতিমাত্রায় পতন রোধই এ ক্ষেত্রে প্রধান লক্ষ্য। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে ধান-চাল সংগ্রহ করে রাখাটাও জরুরি। হাতে পর্যাপ্ত মজুত থাকলে যেকোনো সংকট মোকাবিলা সহজ হয়। এ কারণে ধানের উৎপাদন যাতে কোনোভাবে ব্যাহত কিংবা নিরুৎসাহিত না হয়, সেদিকেও দৃষ্টি রাখা জরুরি। খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা থাকলে সীমিতভাবে চাল আমদানির অনুমতিও দেওয়া হয়ে থাকে। তবে কৃষকের হাতে ধান থাকার সময় স্বভাবতই বন্ধ থাকে আমদানি। এ অবস্থায় কৃষকের লাভজনক দাম পাওয়ারই সম্ভাবনা। তবে স্ট্রিমসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে কৃষককে ধান বেচতে হচ্ছে লোকসানে।

লাভজনক দামে বিক্রির ক্ষেত্রেও প্রকৃত হিসাবায়নে কৃষক লাভের মুখ দেখছেন না। কৃষিপণ্য উৎপাদন করে কোনোমতে টিকে থাকার দিন গত হয়েছে। মুনাফার যুগে কৃষক এখন লাভজনক দামে বিক্রিতে ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় চিন্তায় মেতে উঠবে, এটাই স্বাভাবিক। স্ট্রিমের প্রতিবেদনেও একাধিক কৃষক বলেছেন, নামমাত্র লাভে তাঁরা আর ধান চাষে আগ্রহী নন। দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক কৃষক এমন চিন্তার দিকে চলে গেলে কী বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, তা সহজে অনুমেয়। তবে সিংহভাগ কৃষক মূলত পরিবারের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে ধান চাষ করে যাচ্ছেন বলে রক্ষা। কৃষির আধুনিকায়নের ফলেও ধান-চালের উৎপাদন বিপুলভাবে বেড়েছে। কিন্তু খোদ উৎপাদক যদি লোকসান দেন কিংবা প্রকৃত বিচারে লাভবান হতে না পারেন, তাহলে সব উন্নয়নই মাটি।

হালে কৃষকরা আলু উৎপাদন করেও বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ভোক্তারা অবশ্য কম দামে আলু কিনতে পারছেন দীর্ঘদিন ধরে। চালের জন্য অবশ্য তাদের উত্তরোত্তর বেশি দাম দিতে হচ্ছে। বোরো উত্তোলনের সময়ও বাজার থেকে মিলছে চালের দাম বৃদ্ধির খবর। এর বিচিত্র কারণও উল্লেখ করা হচ্ছে। এ অবস্থায় কৃষক মুনাফা করতে পারলে বেশি দাম জোগানো ভোক্তারাও খুশি হতেন। চালের বাজারে মিলারসহ মধ্যস্বত্বভোগীরাই লাভবান বলে অভিযোগ কিন্তু পুরোনো। পরিস্থিতিটা বিপরীতমুখি করা প্রয়োজন বললেও কম বলা হয়। জরুরি এ কাজে নতুন সরকারকে দৃষ্টি দিতে হবে। ধান-চালের লাভজনক দাম না পাওয়ার বাস্তবতা না বদলানোর প্রকৃত কারণগুলো চিহ্নিত করার উদ্যোগ প্রয়োজন। কৃষক কার্ডের মাধ্যমে তাদের অর্থ সহায়তা জোগানোর উদ্যোগ প্রশংসনীয় বটে। সুদসহ নির্দিষ্ট পরিমাণ ঋণ মওকুফেরও কম প্রশংসা হয়নি। এ ক্ষেত্রে আরও বেশি প্রয়োজন ধান-চালের সন্তোষজনক দাম নিশ্চিত হওয়া। সেই লক্ষ্য অর্জনে কৃষিতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখাটাও জরুরি বলে বিবেচিত হবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত