leadT1ad

রাষ্ট্রীয় স্থাপনার নামকরণে স্থায়ী নীতিমালার অনুসরণ জরুরি

প্রকাশ : ২০ জুন ২০২৬, ১৭: ৪৮
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

একটি রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে মানুষ রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখতে চায়। বিশেষ করে সরকারি অর্থ ও ক্ষমতায় ব্যক্তিস্বার্থ বা পারিবারিকীকরণের যে সংস্কৃতি কয়েক দশকে জেঁকে বসেছিল, তার অবসান জরুরি।

সম্প্রতি বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার চারটি নতুন ইউনিয়নের নামকরণ নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আমাদের সেই পুরনো ও বাতিলযোগ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথাই মনে করিয়ে দেয়। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম তাঁর দুই পুত্র ও নিজ বংশের নামে তিনটি ইউনিয়নের নামকরণ করেন। তবে আশার কথা, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কিছুটা দেরিতে হলেও এই বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন এবং প্রতিমন্ত্রীর পুত্রদের নামে করা নামগুলো পরিবর্তনের নির্দেশনা দিয়েছেন।

এর আগে কেরানীগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নাম সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামে করার প্রস্তাবটি প্রধানমন্ত্রী নাকচ করে দিয়েছিলেন। রাষ্ট্রীয় স্থাপনার নামকরণে ব্যক্তিপূজা পরিহারের এ ভঙ্গিটি প্রশংসনীয় এবং একটি সুস্থ রাজনৈতিক ধারার ইঙ্গিতবাহী। আমরা অতীতে দেখেছি, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামোকে অনেক ক্ষেত্রেই পারিবারিক সম্পদে রূপান্তর করেছিল। কেবল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে রাজধানীর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম পরিবর্তন করতে গিয়ে রাষ্ট্রের প্রায় ১২০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে, যাতে কারও কোনো কল্যাণ নেই। এমন কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমনকি নেওয়া হয়েছে গ্রাম্য চতুরতার আশ্রয়।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নামকরণের উগ্র রাজনীতি দেখা গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা ও জায়গার সুপ্রতিষ্ঠিত নাম পাল্টে ফেলেছে বিজেপি সরকার। এ নিয়ে সেই দেশেও সমালোচনা রয়েছে।

উন্নত বিশ্বে রাষ্ট্রীয় স্থাপনার নামকরণে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসৃত হয়। কানাডা, যুক্তরাজ্যের মতো দেশে কোনো রাস্তা বা স্থাপনার নাম দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার ইতিহাস-ঐতিহ্য কিংবা জাতীয় পর্যায়ে অবদান রাখা মৃত ব্যক্তি বা সমাজসেবকের নাম বিবেচনায় নেওয়া হয়। ব্রিটিশ কাউন্সিলের নীতিমালায় বলা আছে, জীবিত কোনো ব্যক্তির নামে রাস্তার নাম দেওয়া যাবে না। মৃত ব্যক্তির নাম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও অনেক বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়।

বাংলাদেশেও সময় এসেছে নামকরণের নৈরাজ্য বন্ধের। কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল না থেকে একটি স্বতন্ত্র জাতীয় কমিশন গঠন কিংবা একটি স্থায়ী আইনি কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এ সংক্রান্ত একটি কমিটি গঠন করেছিল, যার কাজ ছিল নামকরণের আইনি কাঠামো প্রণয়ন। সেই কমিটির কার্যক্রম কোন পর্যায়ে আছে, তা এখন জানাতে পারে সরকার।

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের মানুষ আর ব্যক্তিপূজার রাজনীতি দেখতে চায় না। রাষ্ট্রীয় অর্থে নির্মিত প্রতিটি স্থাপনা জনগণের সম্পদ; কোনো নেতার পারিবারিক উত্তরাধিকার নয়। নামকরণের অরাজকতা বন্ধ করে সরকার যদি এ ক্ষেত্রে ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিবেচনাকে প্রাধান্য দেয়, তবে সেটা সবার কাছেই গ্রহণযোগ্য হবে। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো সেই বার্তা দিচ্ছে বলেই আমরা বিশ্বাস করতে চাই। এখন প্রয়োজন এর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদান।

Ad 300x250

সম্পর্কিত