চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা

বৃষ্টিকে দোষারোপ নয়, প্রয়োজন প্রকৃত প্রকৌশলগত সমাধান

ড. আইনুন নিশাত
ড. আইনুন নিশাত

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৬, ১৬: ০২
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

আষাঢ়ের শেষ সপ্তাহে কিংবা শ্রাবণের শুরুতে আকাশজুড়ে মেঘ আর মুষলধারে বৃষ্টি—বাংলার প্রকৃতির জন্য এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক চিত্র। কিন্তু এই কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির কারণেই যখন চট্টগ্রামের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী ভয়াবহ বন্যা ও জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যায়, তখন অবলীলায় সব দায় চাপানো হয় বৃষ্টির ওপর। অথচ বৃষ্টি না হলেই বরং আমাদের চিন্তিত হওয়া উচিত ছিল। এই স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতকে খলনায়ক বানানোর প্রবণতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

ইদানীং অনেক আবহাওয়া বিশ্লেষককে বলতে শোনা যায়, ‘চট্টগ্রামে ৩৯৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা গত ৪৩ বছরে সর্বোচ্চ’। এমন নিখুঁত সংখ্যা ও পরিসংখ্যান দিয়ে জনমনে একধরনের আতঙ্ক তৈরি করা হয়, যার খুব একটা যৌক্তিক ভিত্তি নেই।

একটি শহরের এক প্রান্তে বৃষ্টির পরিমাণ যা হয়, অন্য প্রান্তে তা ২০-৩০ মিলিমিটার কমবেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। ঢাকার আগারগাঁও, বনানী বা উত্তরার বৃষ্টিপাতের পার্থক্যের দিকে তাকালেই তা স্পষ্ট হয়। তাই ৩৯০ নাকি ৩৮০ মিলিমিটার—সেই তর্কে না গিয়ে এটিকে একটি রেঞ্জ (যেমন ৩৫০-৪০০ মি.মি.) হিসেবে ধরাই বিজ্ঞানসম্মত। আর প্রকৃতির নিয়মে প্রতি ২-৩ বছর, ১০-১৫ বছর বা ৪০-৫০ বছর পরপর এমন ভারী বৃষ্টিপাত ঐতিহাসিকভাবেই হয়ে আসছে। এটি কোনো আকস্মিক বিপর্যয় নয়।

চট্টগ্রামের এই ডুবন্ত দশার অন্যতম প্রধান কারণ হলো, প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আমরা নিজ হাতে ধ্বংস করেছি। চট্টগ্রামের পাহাড় থেকে নেমে আসা যেসব জলপ্রবাহকে স্থানীয়রা 'খাল' বলে থাকেন, সেগুলো মানুষের খনন করা কোনো খাল নয়, বরং প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট নদী। তথাকথিত এই ৫, ৬ বা ১০ নম্বর খালগুলো আজ হয় ভরাট হয়ে গেছে, নয়তো এর মুখে গড়ে তোলা হয়েছে অপরিকল্পিত অবকাঠামো। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেখানে ৫ ফুট বাই ৫ ফুটের ছোট ছোট স্লুইসগেট বানিয়েছে। এমন অবাস্তব ও অপর্যাপ্ত হিসাব-নিকাশ দিয়ে কি একটি মহানগরীর বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি বের করা সম্ভব? চট্টগ্রামের পানি নিষ্কাশনের যে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ব্যবস্থা ছিল, তার সর্বনাশ আমরা নিজেরাই করেছি।

চট্টগ্রামের এই ডুবন্ত দশার অন্যতম প্রধান কারণ হলো, প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা আমরা নিজ হাতে ধ্বংস করেছি। তথাকথিত খালগুলো আজ হয় ভরাট হয়ে গেছে, নয়তো এর মুখে গড়ে তোলা হয়েছে অপরিকল্পিত অবকাঠামো। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেখানে ৫ ফুট বাই ৫ ফুটের ছোট ছোট স্লুইসগেট বানিয়েছে। এমন অবাস্তব ও অপর্যাপ্ত হিসাব-নিকাশ দিয়ে কি একটি মহানগরীর বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি বের করা সম্ভব?

এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের রূঢ় বাস্তবতাও আমাদের মাথায় রাখতে হবে। আগামী ১০-২০ বছরে আবহাওয়ার এই চরমভাবাপন্ন আচরণ আরও বাড়বে। ভারী বৃষ্টির তীব্রতা যেমন বাড়বে, তেমনি হঠাৎ অতিবৃষ্টির ঘটনাও ঘন ঘন ঘটবে। আবার কোনো কোনো বছর হয়তো একেবারেই খরা দেখা দেবে। এছাড়া কৃষিব্যবস্থাতেও পরিবর্তন এসেছে। আগে এই সময়ে বোনা আমন ধানের চাষ হতো, যা পানিতে ডুবে থাকলেও টিকে থাকতে পারত। এখন আমরা উচ্চফলনশীল ধানের চাষ করি, যা জলাবদ্ধতা একদমই সহ্য করতে পারে না। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করছে।

তবে জনমনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকার মেগাপ্রকল্পের পরও কেন এই দশা?

গত ৮-১০ বছর ধরে চারটি বড় প্রকল্পের কাজ চলছে এবং গত মার্চ পর্যন্ত এসব প্রকল্পে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। ২০১৭ সালে একনেকে অনুমোদিত ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ প্রকল্পটির ৩ বছরের কাজ ৯ বছরেও শেষ হয়নি। ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার মূল বাজেট, কাজের পরিমাণ কমানোর পরও সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের পর চলতি বছর আমরা চট্টগ্রামের সবচেয়ে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখলাম। তাহলে এতগুলো টাকা খরচ করে আসলে কী করা হলো?

নিজেদের অপরিকল্পিত কাজের দায় আর কতদিন আমরা বৃষ্টির ওপর চাপাব? এই সমস্যার সমাধান কোনো জাদুমন্ত্রে হবে না। এর জন্য প্রয়োজন ‘পিওর ইঞ্জিনিয়ারিং সলিউশন’ বা নিখুঁত প্রকৌশলগত সমাধান। পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ (সিডিএ) সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থাকে অবিলম্বে নিজেদের কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অবৈজ্ঞানিক খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ করে বিজ্ঞানভিত্তিক ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।

  • লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ
Ad 300x250

সম্পর্কিত