সম্পাদকীয়

পৃথিবী সতর্ক করছে, বাংলাদেশ কি প্রস্তুত

প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৬, ১৯: ৩৫
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি এবার থিম নির্ধারণ করেছে– ‘প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণায়। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য।’ সংস্থাটি স্পষ্টভাবে বলেছে, গত ১১ বছর ছিল ইতিহাসে উষ্ণতম। এখনই সতর্ক না হলে উষ্ণতা আমাদের আরও ঝুঁকিতে ফেলবে।

বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি অস্তিত্বেরও বটে। ৮০ শতাংশ ভূমি বন্যাপ্রবণ এবং সমুদ্রের কাছে থাকা এই ব-দ্বীপ বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনে শূন্য দশমিক ৩৫ শতাংশ অবদান রাখলেও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় বারবার শীর্ষ দশে থাকছে।

এদিকে বাংলাদেশে নদী শুধু ভূগোল নয়—আত্মপরিচয়ের চিহ্ন। অথচ সেটি আজ ক্ষতবিক্ষত। ২০১৯ সালে হাইকোর্ট নদীকে জীবন্ত সত্তা ও আইনি ব্যক্তির মর্যাদা দিয়েছিলেন। ২০২৬ সালে এসেও সেই রায় কাগজে সীমাবদ্ধ। উচ্ছেদ অভিযানের পর দখলদাররা স্বগৌরবে ফিরছে। চলছে দূষণ। রাজধানীর পাশে বুড়িগঙ্গার পানিতে ক্রোমিয়াম নিরাপদ মাত্রার বহুগুণ বেশি। ওদিকে ফারাক্কা চালুর পর থেকে পদ্মার বুকের ক্ষত ছড়িয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমের নদী-খাল-বিলে। লাখ লাখ কৃষকের জমিও হচ্ছে অনুর্বর।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে বর্তমান সরকার পুনরুজ্জীবিত করেছে পুরনো স্বপ্ন—পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প। এটি আসলে এই ব-দ্বীপের আত্মরক্ষার গল্প। এসব ক্ষেত্রে আবার থাকছে বাস্তবায়নের অগ্নিপরীক্ষা। প্রকল্পটি পরিবেশগত সতর্কতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা না গেলে ওই অঞ্চলে অন্যবিধ সংকট হবে ঘনীভূত।

সরকার খাল পুনর্খনন ও বনায়নকে কেন্দ্রীয় পরিবেশ নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে, যা প্রশংসনীয়। তবে অভিজ্ঞতা বলছে, বার্ষিক বৃক্ষরোপণের সংখ্যা সাড়ম্বরে ঘোষিত হলেও এর টিকে থাকার হার পরিমাপ করা হয় না। আবার খাল খনন হলেও দুই বর্ষায় তা ভরে যায় পলিতে। নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পও তখনই দীর্ঘস্থায়ী হয়, যখন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতামুক্ত তদারকি থাকে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী এতে সত্যিকারের অংশীদার হয়।

২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা শূন্য দশমিক ৬ থেকে ১ মিটার বাড়তে পারে বলে গবেষণা জানাচ্ছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর কোটির বেশি মানুষের বাস্তুভিটা তখন জলের নিচে থাকবে। বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা আগামী দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলেও অনুমান। গবেষণায় জানা যাচ্ছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বায়ু দূষণের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় কর্মক্ষমতা ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। বাংলাদেশেও থাকবে এর অভিঘাত। এদিকে বন্যা প্রতিবছর দেশের ২০-২৫ শতাংশ ভূমি ডুবিয়ে দিচ্ছে। চরম বছরগুলোয় সেটা ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।

পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন আমাদের দক্ষিণ-পশ্চিমের জন্য প্রকৃতির সুরক্ষাদেয়াল। ফারাক্কার কারণে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সেখানে লবণাক্ততা ক্রমে বাড়ছে, মূল্যবান গাছ মারা যাচ্ছে; রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও ইরাবতী ডলফিনের আবাস ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে।

দিবসের মঞ্চসজ্জা আর ব্যানারের বাইরে বাংলাদেশের এখন দরকার কাঠামোগত সংস্কার এবং সেটি দ্রুত। প্রথমত, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে শক্তিশালী করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কার্যকর বর্জ্য শোধনাগার ছাড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রতিটি বড় প্রকল্পে পরিবেশের প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। চতুর্থত, আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে পরিবেশ রক্ষায় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

প্রকৃতির সতর্কবার্তা শুনতে হলে আমাদের থামতে হবে– থামাতে হবে দখল, শিল্পের বিষ ঢালা এবং প্রকৃতি ও পরিবেশকে ‘উন্নয়নের শত্রু’ ভাবা। পদ্মা ব্যারেজ অনুমোদন, খাল খনন কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ পরিকল্পনা আশার আলো দেখাচ্ছে। তবে আলো তখনই পথ দেখায়, যখন লণ্ঠনটি সত্যিকারের হয়। বাংলাদেশের পরিবেশ বাঁচবে আইনের শাসনে, বিজ্ঞানসম্মত নির্দেশনা ও জবাবদিহিতায়।

সম্পর্কিত