মূল্যস্ফীতি কমানো সহজ হবে না

সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

বাজেট ঘোষণার পর নিত্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়নি বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তাতে সত্যতা থাকলেও ভোক্তাসাধারণের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ রয়ে গেছে বলতে হবে। প্রায় চার বছর ধরে উচ্চমাত্রার মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণকে। এর চেয়ে নিচে রয়েছে মজুরি বৃদ্ধির হার। চিত্রটি বিপরীত হওয়াই প্রত্যাশিত ছিল। আয় কম হারে বাড়লে মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রকৃত আয় কমলে হ্রাস পায় ক্রয়ক্ষমতা; এর প্রভাব পড়ে পুষ্টি ও দারিদ্র্য পরিস্থিতিতে।

নতুন অর্থবছরে পা রাখার সময় মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা নিয়ে আলোচনা হবে, এটাই স্বাভাবিক। স্ট্রিমে এ বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অর্থনীতিবিদদের অভিমত—শুধু বাজেটীয় পদক্ষেপে মূল্যস্ফীতি কমানো যাবে না। নতুন সরকার তার প্রথম বাজেটে স্বভাবতই চেষ্টা করেছে নিত্যপণ্যের বাজার শান্ত করার কিছু পদক্ষেপ নিতে। ৬০টি পণ্যে উৎসে কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর পদক্ষেপ বহুল আলোচিত। এতে ভোক্তা পর্যায়ে কতটা প্রভাব পড়ে, সেটাও দেখতে হবে। এদিকে মুদি দোকানিদের বিক্রির ওপর আরোপিত কর প্রত্যাহার হবে বলে শোনা যাচ্ছে। বাজেট পাসের আগে ‘অজনপ্রিয়’ কিছু কর প্রস্তাব প্রত্যাহারের রীতি রয়েছে। সরকারকে আবার বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে। এ ক্ষেত্রে উচ্চাভিলাষী হওয়ারও সুযোগ নেই। এনবিআর সংস্কারে অগ্রগতি হলেও না হয় কথা ছিল। সামনে সরকারের বড় ব্যয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যাংকঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হতে হবে। এটা বেসরকারি খাতে ঋণ গ্রহণের সুযোগ কমিয়ে উৎপাদন ব্যাহত করলে মূল্যস্ফীতি কমানো যাবে না।

বহিঃস্থ কারণেও কমতে থাকা মূল্যস্ফীতি পুনরায় বাড়তে দেখা যায়। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মাঝে জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়ানোয় মূল্যস্ফীতি কীভাবে বেড়েছিল, সেটা সবার জানা। অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে আবার বিশ্ববাজারে দাম কমলেও আমদানিকৃত পণ্যসামগ্রীর দাম সহসা কমে না। বাজেটে করা কর প্রস্তাবও নিত্যপণ্যের দামে কত দিনে কতখানি প্রভাব রাখবে, সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে।

মূল্যস্ফীতিতে মুদ্রানীতির প্রভাবের কথাও জানা। অন্তর্বর্তী শাসনামলে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির প্রভাবেই মূলত মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমিয়ে আনা হয়েছিল। তাতে সুদের হার আবার উচ্চস্তরেই থেকে যায়। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে বেসরকারি বিনিয়োগে। জ্বালানি সরবরাহেও সীমাবদ্ধতা কাটছে না। এ অবস্থায় কাজের সুযোগ আরও কমেছে বলেই ধারণা। অথচ এখন এটা বাড়ানো জরুরি। নতুন সরকারও কর্মসংস্থান বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছে। দেশের বাইরেও এটা বাড়ানোর কথা। দেশে-বিদেশে কাজের সুযোগ বাড়লে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতেও ‘নাক ভাসিয়ে’ থাকা যায়। নইলে ডুবে মরার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়ে থাকে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতিতে সরকার সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম আরও জোরদার করতে উদ্যোগী হয়েছে। নতুন কিছু কর্মসূচির কথাও সবার জানা। কিন্তু কর্মসংস্থান বাড়াতে না পারলে এগুলোর প্রয়োগ বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেড়ে ওঠা দগদগে ঘা সারাতে কতটা সহায়ক হবে, সে প্রশ্ন রয়েছে।

কৃষি উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা গেলেও খাদ্য নিরাপত্তাসহ মূল্যস্ফীতি সহনীয় রাখাটা সহজ হবে। বোরো উত্তোলনের সময়ও চালের দাম বৃদ্ধির প্রবণতা বলে দেয়, এ খাতে ব্যবস্থাপনাগত সংকট রয়েছে। এদিকে মুরগি ও ডিমের দাম কমে আসতে দেখে ভোক্তা খুশি হলেও উৎপাদক অখুশি হতে পারে। সামনে বৃষ্টিবাদল আরও বাড়লে এর প্রভাব থাকবে কৃষিতে। জ্বালানির দাম কমানো গেলে কৃষির সঙ্গে পরিবহন খাতেও ব্যয় কমানো যেত। সেটা করা গেলে তার প্রভাব থাকত ভোগ্যপণ্যের দামে। খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও কমানো প্রয়োজন। এ খাতে মানুষের ব্যয় অব্যাহতভাবে বাড়ছে। খাদ্য বহির্ভূত খাতে লোকে বেশি কাটছাঁট করে চলতে থাকলে তাতে আবার বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে। বিনিয়োগ ও ব্যবসা না বাড়লে জনজীবনে স্বাভাবিকতা আনা কঠিন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত