ড. জিন্নাত আরা নাজনীনের সাক্ষাৎকার/‘বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নেতাকর্মীদের সংযত রাখা’

দীর্ঘ ১৯ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর নতুন বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে বিএনপি। ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রেক্ষাপটে দলটির সামনে এখন কী ধরনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে, নতুন প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ, দক্ষ নেতৃত্ব তৈরি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পিছিয়ে থাকা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার ঘাটতি—এসব বিষয়ে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিরহাজুল শিবলী

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

স্ট্রিম: ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে বিএনপি। দীর্ঘ সময় দলটিকে আন্দোলন-সংগ্রামের রাজনীতিতে দেখা গেছে। এখন তারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে। এই নতুন বাস্তবতায় বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?

ড. দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন: আমার কাছে মনে হয়, বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দলটির নেতাকর্মীদের সংযত রাখা। একেবারে তৃণমূল থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সবাইকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

পত্র-পত্রিকা খুললেই দেখা যায়, প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ঢাকা শহর পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, বিভিন্ন জায়গায় চাপ সৃষ্টি এবং টাকা-পয়সার লেনদেনের নানা অভিযোগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এসব বিষয় ব্যাপকভাবে আলোচনা হচ্ছে। ফলে দলটির সর্বনিম্ন থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত নেতাকর্মীদের আচরণ ও কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা বিএনপির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

স্ট্রিম: বিএনপি এখন সরকার পরিচালনা করছে। আন্দোলন-সংগ্রামের একটি দল থেকে সরকারি দলে রূপান্তরের যে পরিবর্তন, তা কতটা সামলাতে পেরেছে বিএনপি? ছয় মাসে জনআস্থা অর্জনের ক্ষেত্রেই বা তাদের অবস্থান কী?

ড. নাজনীন: বিএনপিকে কাছ থেকে দেখলে তাদের ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার বিষয়টি আচার-আচরণে বোঝা যায়। তারা চেষ্টা করছে, কিন্তু সরকার পরিচালনার সঙ্গে দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত না থাকার কারণে এই পরিবর্তনের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারছে বলে মনে হয় না।

বিভিন্ন পর্যায় থেকে এমন অনেক সিদ্ধান্ত ও বক্তব্য আসছে, যেখানে দেখা যায় আজ একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, পরদিন সেটি পরিবর্তন করা হচ্ছে। এতে মনে হয়, সবকিছু খুব সুচিন্তিতভাবে বা বুঝেশুনে করা হচ্ছে না।

তারেক রহমানের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি কিছু পরিবর্তন করতে চান। কিন্তু একজন ব্যক্তি একা কিছু করতে পারেন না। একটি দল, একটি দক্ষ ও কার্যকর টিম প্রয়োজন। আমার মনে হয়, তাঁর সঙ্গে যারা কাজ করছেন, তাঁরা সবাই তাঁর চিন্তা ও স্পিরিটকে যথাযথভাবে ধারণ করতে পারছেন না। নেতৃত্বের চিন্তাভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে পুরো টিমকেই দক্ষ ও কার্যকর হতে হবে।

স্ট্রিম: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। অপতথ্য ও গুজব মোকাবিলা এবং প্রতিপক্ষের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় বিএনপি কতটা প্রস্তুত?

ড. নাজনীন: বিএনপির সব সময়ের দুর্বল জায়গা ছিল মিডিয়া। মিডিয়ায় দলটি কখনো খুব শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। আওয়ামী লীগ এ ক্ষেত্রে অনেক বেশি কার্যকর ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হোক বা প্রচলিত গণমাধ্যম—তারা সব ক্ষেত্রেই সক্রিয় ছিল। জামায়াতে ইসলামীও মিডিয়ায় যথেষ্ট সক্রিয়।

বিএনপি এ জায়গায় পিছিয়ে আছে। তাদের অনেক কাজ করতে হবে। এখন রাজনীতিতে যোগাযোগ এবং তথ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বিএনপিকে আরও সংগঠিতভাবে কাজ করতে হবে।

স্ট্রিম: বিএনপিতে এখন দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতৃত্ব সামনে আসছে। একই সঙ্গে মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিন রাজনীতি করা নেতাদের অনেকে মনে করেন, উত্তরাধিকারসূত্রে রাজনীতিতে আসা ব্যক্তিদের কারণে তাঁদের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?

ড. নাজনীন: এটি তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর রাজনীতিতে খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতৃত্ব সাধারণত কিছুটা এগিয়েই থাকে। বাংলাদেশেও সেটি দেখা যায়।

তবে এটাও সত্য যে, যারা দীর্ঘদিন মাঠে কাজ করেছেন, আন্দোলন করেছেন এবং দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, তাঁদের অনেকে কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। এই বাস্তবতা থেকে বের হয়ে আসতে সময় লাগবে।

তবে বিএনপিতে দক্ষ নেতার অভাব নেই। সমস্যা হলো, অনেককে সঠিক জায়গায় সঠিকভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে না। যোগ্য ব্যক্তিরা সব সময় তাঁদের উপযুক্ত অবস্থানে যেতে পারছেন না।

স্ট্রিম: নতুন নেতৃত্ব তৈরি ও দক্ষ ব্যক্তিদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিএনপি কী করতে পারে?

ড. নাজনীন: দলীয় নেতৃত্বের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছানো খুব জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, প্রিন্ট মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্য সংগ্রহের কার্যকর ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।

তারেক রহমানের নিজের এমন একটি তথ্য সংগ্রহের মাধ্যম থাকা দরকার, যার মাধ্যমে তিনি জানতে পারবেন কে আসলে কী কাজ করছেন এবং কতটা করছেন। শুধু কারও সম্পর্কে অন্যের দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করলে সঠিক মূল্যায়ন করা কঠিন।

বিভিন্ন পর্যায়ে অনেকেই ভালো কাজ করছেন। তাঁদের সেই কাজের মূল্যায়ন করতে হবে। নিজস্ব ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা গেলে যোগ্য মানুষকে সঠিক জায়গায় কাজে লাগানো সহজ হবে।

স্ট্রিম: জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুন প্রজন্মের রাজনীতি নিয়ে প্রত্যাশা বদলেছে। এই তরুণ প্রজন্মের কাছে বিএনপি কতটা গ্রহণযোগ্য? তাদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে দলটির কী করা উচিত?

ড. নাজনীন: নতুন প্রজন্মের আশা-আকাঙ্ক্ষা, চাহিদা এবং কাজের স্পিরিট আমাদের পরিচিত রাজনৈতিক প্রজন্মের চেয়ে ভিন্ন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে আমরা দেখেছি, তরুণরা কতটা নির্ভীক এবং নিজেদের বিশ্বাসের জন্য কতটা দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে পারে।

তাদের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষার জায়গাটি বিএনপি এখনো পুরোপুরি ধরতে পারছে না। তাদের সঙ্গে যোগাযোগেও একটি ঘাটতি রয়েছে। বিএনপিকে জেন-জির মধ্য থেকে সম্ভাবনাময় তরুণদের সামনে আনতে হবে এবং তাদের চিন্তা ও স্পিরিট বুঝতে হবে।

এটি শুধু বিএনপির জন্য নয়, যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তরুণ প্রজন্মই ভবিষ্যৎ। তারা কী চায়, সেটি বুঝে রাজনৈতিক দলগুলোকে কাজ করতে হবে।

বিএনপি এ জায়গায় এখনো কিছুটা পিছিয়ে আছে। এর একটি কারণ হতে পারে, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে বিএনপির অনেক নেতাকর্মী অংশ নিলেও দল হিসেবে তারা সরাসরি সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল না। ফলে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে একটি দূরত্ব তৈরি হয়ে থাকতে পারে। আমার মনে হয়, এই দূরত্ব দ্রুত কমানো জরুরি। তা করতে পারলে বিএনপি ভবিষ্যতে আরও শক্ত অবস্থানে যেতে পারবে।

স্ট্রিম: বিএনপির বিরুদ্ধে একটি সমালোচনা হলো, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও গবেষণার ক্ষেত্রে দলটি পিছিয়ে। এ বিষয়ে আপনার পরামর্শ কী?

ড. নাজনীন: বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গায় বিএনপি আগেও কিছুটা পিছিয়ে ছিল। এখন আরও পিছিয়ে গেছে বলে আমার মনে হয়। বিশেষ করে যাঁদের এখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।

এই জায়গায় বিএনপিকে সতর্ক হতে হবে। সঠিক ও যোগ্য মানুষকে খুঁজে বের করে তাঁদের যথাযথভাবে কাজে লাগাতে না পারলে দলটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। গবেষণা, নীতিনির্ধারণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জন্য যোগ্য মানুষকে বেছে নেওয়া এখন বিএনপির জন্য অত্যন্ত জরুরি।

সর্বাধিক পঠিত
লেটেস্ট
Ad 300x250

সম্পর্কিত