অধ্যাপক জামাল উদ্দিন রুনুর সাক্ষাৎকার

প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

মো. জামাল উদ্দিন রুনু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। পরিবেশগত ভূতত্ত্ব, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ), পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (ইএমপি) এবং ভূমি ব্যবহার ও উন্নয়ন পরিকল্পনা বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণায় যুক্ত আছেন। জাতীয় পর্যায়ে প্লাস্টিক বর্জ্যের ভয়াবহতা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যে এর প্রভাব এবং টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুজাহিদুল ইসলাম।

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দিন রুনু
অধ্যাপক মো. জামাল উদ্দিন রুনু

স্ট্রিম: জাতীয় পর্যায়ে বর্তমানে প্লাস্টিক বর্জ্যের যে ভয়াবহতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, পরিবেশের ভারসাম্য এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এটিকে আপনি কতটা বড় হুমকি বলে মনে করেন?

জামাল উদ্দিন রুনু: প্রথমেই আমাদের বুঝতে হবে, প্লাস্টিক বর্জ্য আর দশটা সাধারণ জৈব বা অর্গানিক বর্জ্যের মতো নয়। জৈব বর্জ্য প্রকৃতিতে সহজেই মিশে যায়, কিন্তু প্লাস্টিক সহজে পচে না বা ডিগ্রেডেড হয় না। এটি পরিবেশে যুগের পর যুগ, এমনকি আজীবন থেকে যায়। ফলে যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলার কারণে তা আমাদের মাটি, পানি এবং বাতাসকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। এই দূষণের ব্যাপ্তি কৃষিজমি থেকে শুরু করে খাল-বিল, নদী-নালা হয়ে শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে। এর ফলে জলজ এবং স্থলজ—উভয় পরিবেশের প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য চরম ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

একইভাবে মাটিতে দীর্ঘসময় পড়ে থাকা প্লাস্টিক মাটির পুষ্টিগুণের সাথে মিশে উদ্ভিদের মাধ্যমে আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রবেশ করছে। এছাড়া যেখানে-সেখানে গড়ে ওঠা বর্জ্য ফেলার স্থানগুলো (ডাম্পিং প্লেস) থেকেও মারাত্মক দূষণ ছড়াচ্ছে। প্লাস্টিক বর্জ্য মাটির উপরিভাগের পানিকে ভূগর্ভে প্রবেশে বাধাগ্রস্ত করে, ফলে গ্রাউন্ড ওয়াটার রিচার্জ বা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পূরণের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। সার্বিকভাবে, প্লাস্টিক আমাদের খাদ্যশৃঙ্খল এবং পুরো ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্রের জন্য একটি বড় বিপর্যয় ডেকে আনছে।

স্ট্রিম: প্লাস্টিক বর্জ্য সমূহ কি আকারে পরিবেশে থাকে এবং এর শেষ গন্তব্য আসলে কোথায়?

জামাল উদ্দিন রুনু: প্লাস্টিক দূষণের ক্ষেত্রে কণাগুলোকে আকার অনুযায়ী প্রধানত ৩ ভাগে দেখা যায়। ক) মাইক্রোপ্লাস্টিক: আকার ৫ মিমি-এর কম-পলিথিন (পিই), পলিপ্রোপিলিন (পিপি), পলিস্টাইরিন (পিএস), পিইটি (পলিইথিন টেরেফথালেট), পিভিসি (পলিভিনাইল ক্লোরাইড) ও নাইলন/পলিমাইড (পিএ)। খ) ন্যানোপ্লাস্টিক: সাধারণত ১ মাইক্রোমিটারের কম; অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। এগুলো মূলত উপরের পলিমারগুলোর ভাঙনের ফলে তৈরি হয় এবং পানি, মাটি ও জীবদেহে প্রবেশ করতে পারে। গ) ম্যাক্রোপ্লাস্টিক: ৫ মিমি-এর বেশি আকারের প্লাস্টিক বর্জ্য—যেমন বোতল, পলিথিন ব্যাগ, প্যাকেজিং, মাছ ধরার জাল ইত্যাদি। এগুলো ক্ষয় ও ভাঙনের মাধ্যমে পরে মাইক্রো/ন্যানোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়।

বাংলাদেশে মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম হলেও অপর্যাপ্ত সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের কারণে প্লাস্টিক দূষণের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। বাংলাদেশ মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহারে বিশ্বের শীর্ষ দেশ নয়; কিন্তু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে প্লাস্টিক দূষণের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ।

পরিবেশে প্রধান প্লাস্টিক পলিমার হলো পিই, পিপি, পিএস, পিইটি, পিভিসি ও পিএ (নাইলন); এগুলোর বড় বর্জ্য থেকে ধীরে ধীরে মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিক কণা তৈরি হয়।

স্ট্রিম: প্লাস্টিক দূষণের কারণে আমাদের অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও মানুষের জীবন-জীবিকায় কী ধরনের প্রভাব পড়ছে?

জামাল উদ্দিন রুনু: প্লাস্টিক দূষণ শুধু পরিবেশের ক্ষতি করছে না, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করছে। ড্রেন ও নদী-নালা বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে, ফলে অবকাঠামো ও নগর ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। প্লাস্টিক দূষণ নদী, খাল, সমুদ্র, মাটি ও কৃষিজমিতে জমে বাস্তুসংস্থার স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। প্লাস্টিক ও মাইক্রোপ্লাস্টিক জলজ ও স্থলজ প্রাণীর খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে জীববৈচিত্র্য কমায় এবং মাছ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর ক্ষতি করে। এর ফলে মৎস্যসম্পদ, কৃষি, বনজ সম্পদ ও জলজ পরিবেশের উৎপাদনশীলতা কমে যেতে পারে, যা জেলে, কৃষকসহ প্রকৃতিনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকায় সরাসরি প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি দূষিত পানি ও খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং চিকিৎসা ব্যয় বাড়তে পারে। অতএব, প্লাস্টিক দূষণ শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়; এটি খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, জীবিকা ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুতর হুমকি।

জনস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব আরও ভয়াবহ। পরিবেশ ও খাদ্যে প্লাস্টিক প্রবেশের ফলে ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগ বাড়ছে। স্বাস্থ্য খাতে রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই চিকিৎসা ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। অন্যদিকে এর প্রভাবে মানুষের গড় আয়ু বা লাইফটাইম এক্সপেকটেন্সি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে।

স্ট্রিম: প্লাস্টিক ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে বিশ্বে আমাদের অবস্থান কোথায়?

জামাল উদ্দিন রুনু: বাংলাদেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে, তবে মাথাপিছু ব্যবহারের দিক থেকে বাংলাদেশ এখনো বিশ্বের উচ্চ ব্যবহারকারী দেশ নয়। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার ২০০৫ সালের ৩ কেজি থেকে ২০২০ সালে ৯ কেজিতে—১৫ বছরে তিনগুণ হয়েছে। ঢাকায় তা প্রায় ২২–২৪ কেজি/বছর। বিপরীতে ইউরোপের দেশগুলোতে গড় মাথাপিছু ব্যবহার ১০০ কেজির বেশি। দক্ষিণ এশিয়ার তুলনায়ও বাংলাদেশ মাঝামাঝি অবস্থানে—২০২১ সালের একটি বিশ্বব্যাংক হিসাব অনুযায়ী মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার বাংলাদেশে ১১.৯ কেজি, ভারতের ১৫.৯ কেজি, শ্রীলঙ্কার ১৬.৬ কেজি এবং মালদ্বীপের ৫৩.৫ কেজি।

বাংলাদেশে মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম হলেও অপর্যাপ্ত সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের কারণে প্লাস্টিক দূষণের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। বাংলাদেশ মাথাপিছু প্লাস্টিক ব্যবহারে বিশ্বের শীর্ষ দেশ নয়; কিন্তু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে প্লাস্টিক দূষণের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ।

আমরা যদি এখনই সচেতন না হই এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় মনোযোগী না হই, তবে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি আমাদের নগর ও গ্রামীণ জীবন চরম ভাবে বিপর্যস্ত হবে।

স্ট্রিম: প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমাদের সক্ষমতা কেমন? ঘাটতির জায়গাগুলো কোথায়?

জামাল উদ্দিন রুনু: বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো অপর্যাপ্ত ও অনেকাংশে অনানুষ্ঠানিক খাতনির্ভর। বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য যথাযথভাবে সংগ্রহ ও পৃথকীকরণ না হয়ে খোলা স্থানে, নদী-খাল ও ডাম্পিং এলাকায় জমা হচ্ছে বা পোড়ানো হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক হিসাবে, বাংলাদেশে বছরে আনুমানিক ৯.৭৭ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে প্রায় ৩১% পুনর্ব্যবহার (রিসাইক্লিং) করা হয়—অর্থাৎ আনুমানিক ৩ লাখ টন। বাকি প্রায় ৬৯–৭০% প্লাস্টিক যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যায় এবং খোলা স্থানে ফেলা, পোড়ানো বা নদী-খালসহ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। তবে বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের মাধ্যমে সংগ্রহ, বাছাই ও পুনর্ব্যবহার কার্যক্রমও চলছে। দেশে প্রায় ৫,০০০টি প্লাস্টিক রিসাইক্লিং কারখানা থাকলেও মাত্র প্রায় ৩০০টি নিবন্ধিত—যা খাতটির প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নির্দেশ করে। ঢাকায় পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও, দৈনিক সংগৃহীত প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রায় ৩৭% রিসাইক্লিং হয়।

প্লাস্টিক বর্জ্য রিসাইক্লিং বর্তমানে একটি বড় জাতীয় ইস্যু। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের মূল কাজটি করছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা ভাঙ্গারি শ্রেণি। প্রান্তিক পর্যায়ের এই মানুষেরা যত্রতত্র, বাসাবাড়ির আশেপাশে অত্যন্ত অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য সংগ্রহ করে প্লাস্টিকের দানা তৈরি করছে। এর ফলে আবাসিক এলাকায় আগুন লাগার ঝুঁকি বাড়ছে, মারাত্মক শব্দ ও পরিবেশ দূষণ হচ্ছে।

সারকথা হলো বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ধীরে ধীরে উন্নত হলেও উৎসে বর্জ্য পৃথকীকরণ, সংগ্রহব্যবস্থা, আধুনিক রিসাইক্লিং, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদকদের দায়বদ্ধতা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো উৎসে পৃথকীকরণ, সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের কার্যকর রিসাইক্লিং ব্যবস্থা। সরকারের ২০২৫ সালের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের হার ৫০%-এ উন্নীত করা।

এখানে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, রিসাইক্লিং হওয়া পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই হলো 'সিঙ্গেল ইউজ' বা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য। ফলে রিসাইক্লিং হওয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এগুলো পুনরায় বর্জ্য হিসেবে পরিবেশে ফিরে আসছে। অর্থাৎ, চক্রাকার অর্থনীতির উপকার হলেও বাস্তবিক চিত্র বলে প্রকৃতি থেকে আমরা যে প্লাস্টিক কমাচ্ছি, তা আবার দ্রুতই প্রকৃতিতে ফিরে গিয়ে দূষণের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

স্ট্রিম: এই ত্রুটিপূর্ণ রিসাইক্লিং প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে এসে একটি কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে আপনার সুনির্দিষ্ট পরামর্শগুলো কী থাকবে?

জামাল উদ্দিন রুনু: এই সংকট মোকাবিলায় আমি প্রধানত তিনটি পদক্ষেপের কথা বলব:

প্রথমত, প্লাস্টিকের বিকল্প পণ্যের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। আমাদের এমন কার্যপদ্ধতি ও পলিসি গ্রহণ করতে হবে যাতে দৈনন্দিন জীবনে প্লাস্টিকের ব্যবহার ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনা যায়। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই বিষয়ে সুস্পষ্ট কমিটমেন্ট থাকতে হবে এবং বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, যেটুকু প্লাস্টিক আমরা ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছি, তার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজটি শুরু করতে হবে একেবারে উৎস থেকে। বাসাবাড়ি বা প্রতিষ্ঠান থেকেই প্লাস্টিক বর্জ্যকে আলাদা করতে হবে। আমরা যদি মোট প্লাস্টিক বর্জ্যের ৮০ থেকে ৯০ ভাগ উৎপত্তিস্থলেই আলাদা করে রিসাইকেল বা রিইউজ ফরমেটে পাঠাতে পারি, তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এক বিশাল বিপ্লব ঘটবে।

তৃতীয়ত, আমাদের রিসাইক্লিং শিল্পের ধরনে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। বর্জ্য থেকে আমরা কী বানাচ্ছি, সেটি অত্যন্ত জরুরি। সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক না বানিয়ে দীর্ঘমেয়াদী পণ্য বানাতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা যদি প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে ইট বানাই, তবে সেটি একটি ভবনে ৫০ থেকে ১০০ বছরের জন্য আটকে বা 'সিংক' হয়ে যাবে। একইভাবে প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে বাগানের টার্ফ, ফুটপাতের ব্লক, ফেন্সিং, পার্কের বেঞ্চ বা রেলিং বানানো যেতে পারে। রাস্তা মেরামতের কাজেও নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক সতর্কতা অবলম্বন করে প্লাস্টিকের ব্যবহার করা যায়। এতে করে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক পরিবেশ থেকে সরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদের জন্য আটকা পড়বে।

স্ট্রিম: প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনায় সাধারণ জনগণ এবং কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে বলে মনে করেন?

জামাল উদ্দিন রুনু: এখানে 'এক্সটেন্ডেড প্রোডিউসার রেসপন্সিবিলিটি' বা 'উৎপাদকের সম্প্রসারিত দায়বদ্ধতা' নীতি প্রয়োগ করা যেতে পারে। যে কোম্পানিগুলো প্লাস্টিকের বোতলে পানীয় বিক্রি করছে, ব্যবহৃত খালি বোতল ফিরিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব তাদেরই নিতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি পানির বোতলের দাম যদি ১৫ টাকা হয়, তবে কোম্পানি সেটি ২০ টাকায় বিক্রি করবে। গ্রাহক পানি পানের পর খালি বোতলটি ফেরত দিলে তাকে ৫ বা ৮ টাকা ফেরত দেওয়া হবে। বিদেশে এই পদ্ধতিটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। নরওয়েতে আমি দেখেছি, চেইন শপগুলোর পাশে স্বয়ংক্রিয় মেশিন বসানো থাকে। মানুষ সেখানে খালি বোতল জমা দিলে মেশিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি রসিদ দেয়, যা ভাঙিয়ে টাকা পাওয়া যায়।

আমাদের দেশেও প্রতিটি বাজারে, পৌরসভায় বা জনপদে এমন কালেকশন সেন্টার তৈরি করা যেতে পারে। মোবাইল অপারেটররা যেমন টাওয়ার শেয়ার করে, তেমনি প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে এ ধরনের সেন্টার করতে পারে। শুধু বোতল নয়, চিপস বা অন্যান্য পণ্যের মোড়কের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে। পণ্যের দাম ২ টাকা বাড়িয়ে মোড়ক ফেরত দিলে সেই ২ টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করলে, রাস্তাঘাটে আর প্লাস্টিক পড়ে থাকবে না।

রিসাইক্লিং হওয়া পণ্যের প্রায় ৮০ শতাংশই হলো 'সিঙ্গেল ইউজ' বা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পণ্য। ফলে রিসাইক্লিং হওয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এগুলো পুনরায় বর্জ্য হিসেবে পরিবেশে ফিরে আসছে। অর্থাৎ, চক্রাকার অর্থনীতির উপকার হলেও বাস্তবিক চিত্র বলে প্রকৃতি থেকে আমরা যে প্লাস্টিক কমাচ্ছি, তা আবার দ্রুতই প্রকৃতিতে ফিরে গিয়ে দূষণের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

পাশাপাশি সরকারও একটি উদ্যোগ নিতে পারে। যেমন, সরকার ঘোষণা করতে পারে যে যেকোনো পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বা পলিথিন নির্দিষ্ট কেন্দ্রে জমা দিলে প্রতি কেজিতে ২০০ টাকা দেওয়া হবে। এতে ছিন্নমূল বা নিম্ন আয়ের মানুষরা চারপাশ থেকে প্লাস্টিক কুড়িয়ে এনে জমা দেবে। এই সংগৃহীত প্লাস্টিক পুনরায় রিসাইকেল করে সরকার সেই খরচ সহজেই উঠিয়ে আনতে পারবে। দীর্ঘমেয়াদে এতে সরকারের কোনো লোকসান তো হবেই না, উল্টো দেশ প্লাস্টিকমুক্ত হবে।

স্ট্রিম: প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে, যেমন বিশ্ববিদ্যালয় বা লোকালয়ে এই ধরনের মডেল কীভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে?

জামাল উদ্দিন রুনু: প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এটি বাস্তবায়ন করা সবচেয়ে সহজ। আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ দিয়েই বলি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি কঠোর পলিসি গ্রহণ করতে পারে যে, কোনো বিভাগ, হল বা প্রশাসনিক অনুষ্ঠানে কোনো ধরনের 'সিঙ্গেল ইউজ' প্লাস্টিক বোতল বা প্লাস্টিকের প্লেট ব্যবহার করা যাবে না। ছাত্র-শিক্ষকদের সব প্রোগ্রামে কাঁচের জগ ও গ্লাস ব্যবহার করা হবে।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয়ে তো প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী বা ভিজিটর আসেন, তাদের কী হবে? এরও একটি সুন্দর সমাধান আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশদ্বার বা সিকিউরিটি পয়েন্টগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সিলযুক্ত কাঁচের বোতলের পানির ব্যবস্থা থাকবে। দর্শনার্থীদের জানানো হবে যে, ক্যাম্পাসে বাইরের কোনো প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে প্রবেশ করা যাবে না। তারা চাইলে গেট থেকে ২০ টাকা জমা দিয়ে কাঁচের বোতলের পানি কিনে নিতে পারবেন। ক্যাম্পাস ভ্রমণ শেষে বের হওয়ার সময় খালি বোতলটি গেটে ফেরত দিলেই তারা তাদের জমা রাখা ১০ বা ১৫ টাকা ফেরত পেয়ে যাবেন। এভাবেই খুব সহজে একটি প্রতিষ্ঠানকে সম্পূর্ণ প্লাস্টিকমুক্ত বা 'জিরো প্লাস্টিক জোন' হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। আমাদের শুধু সদিচ্ছা আর সঠিক ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে।

স্ট্রিম: সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণায় খাদ্যদ্রব্য ও নিত্যব্যবহার্য পণ্যে, এমনকি টুথপেস্টেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির কথা উঠে আসছে। মানবস্বাস্থ্যের জন্য এটি কতটুকু মাত্রা পর্যন্ত সহনীয় এ বিষয়ে আমাদের দেশে কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে কি?

জামাল উদ্দিন রুনু: বর্তমানে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন গবেষণায় আমাদের খাদ্যপণ্য ও নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্রে, যেমন- টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির কথা উঠে আসছে। কিন্তু আমাদের দেশের প্রধান সমস্যা হলো, একটি পণ্যে ঠিক কী পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে, তার কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক মানদণ্ড বা মাত্রা নির্ধারণ করা হয়নি। বিএসটিআই বা খাদ্য নিরাপত্তা তদারককারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ‘ফুড গ্রেড’ বা অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে এর গ্রহণযোগ্য মাত্রার কোনো সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন নেই।

সম্প্রতি টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার খবরে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। এর মূল কারণ হলো, কোন মাত্রায় থাকলে এটি মানুষের জন্য নিরাপদ এবং কোন মাত্রায় পৌঁছালে তা চরম বিপজ্জনক হবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মাধ্যমে কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি হয়নি। ফলে আমরা সুনির্দিষ্টভাবে কোনো পণ্যকে ঝুঁকিপূর্ণ বলতে পারছি না।

বাতাসের ক্ষেত্রে যেমন আমরা বলতে পারি যে, দূষণের মাত্রা একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পার হলে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর; মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষেত্রেও ঠিক একই রকম মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন। তাই জাতীয় পর্যায়ে সঠিক তদারকি ও গবেষণার মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিকের গ্রহণযোগ্য ও ক্ষতিকর মাত্রা নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এ বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি করতে হবে, যাতে আমরা স্বাস্থ্যঝুঁকি সঠিকভাবে নিরূপণ করে জনসুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারি।

স্ট্রিম: সিঙ্গেল ইউজ বা একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও পলিথিন নিষিদ্ধের বিদ্যমান আইনগুলো কার্যকর করার ক্ষেত্রে ঘাটতিটা আসলে কোথায়? এ বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন?

জামাল উদ্দিন রুনু: আইন কার্যকর করার ক্ষেত্রে মূলত দুটি বড় জায়গায় ঘাটতি রয়েছে। প্রথমত, বাজারে প্লাস্টিক বা পলিথিনের কার্যকর ও সাশ্রয়ী বিকল্পের অভাব। আমরা কথায় কথায় বায়োডিগ্রেডেবল বা পচনশীল বিকল্পের কথা বলি, কিন্তু বাস্তবতা হলো সেগুলো এখনো পুরোপুরি ব্যবহারোপযোগী বা ফিজিবল হয়ে ওঠেনি। দ্বিতীয়ত, মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। একসময় মানুষ ছালার বস্তা বা পাটের ব্যাগ নিয়ে বাজারে যেত, কিন্তু এখন আর কেউ সেটি করে না। দৈনন্দিন জীবনে, বিশেষ করে নগর জীবনে ফ্রিজে মাংস বা অন্যান্য খাবার সংরক্ষণে পলিথিন একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। উন্নত বিশ্বেও পলিথিনের ব্যবহার আছে, কিন্তু তাদের ব্যবস্থাপনা আলাদা।

জাতীয় পর্যায়ে সঠিক তদারকি ও গবেষণার মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিকের গ্রহণযোগ্য ও ক্ষতিকর মাত্রা নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এ বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি করতে হবে, যাতে আমরা স্বাস্থ্যঝুঁকি সঠিকভাবে নিরূপণ করে জনসুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারি।

এই পরিস্থিতি উত্তরণে আমরা দুটি পদক্ষেপ নিতে পারি। প্রথমত, পলিথিনের ওপর অতিরিক্ত কর বা ট্যারিফ আরোপ করে এর দাম বাড়িয়ে দেওয়া। দাম বেশি হলে মানুষ বাধ্য হয়ে এর যথেচ্ছ ব্যবহার কমাবে এবং পুনরায় ব্যবহার করতে উৎসাহিত হবে।

দ্বিতীয়ত, কমিউনিটি বা ওয়ার্ডভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। প্রতিটি পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ডগুলোতে বাসাবাড়ির সংখ্যা অনুযায়ী বর্জ্য পৃথকীকরণ বা 'সেগ্রিগেশন সেন্টার' তৈরি করতে হবে। এখানে নজরদারির জন্য আমরা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের খণ্ডকালীন (পার্ট-টাইম) কাজের সুযোগ দিতে পারি। একজন শিক্ষার্থীকে হয়তো ১০০টি বাড়ির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হলো। সে সপ্তাহে দু-তিনদিন ওই বাড়িগুলো পরিদর্শন করবে, বর্জ্য সংগ্রহকারীদের কাজ মনিটর করবে এবং গৃহস্থালি পর্যায়ে মানুষকে বর্জ্য আলাদা করার বিষয়ে সচেতন করবে। এর বিনিময়ে তাকে মাসিক একটি সম্মানী দেওয়া যেতে পারে, যা তার টিউশনির চেয়েও ভালো বিকল্প হতে পারে। পাশাপাশি যেসব বাড়ি সফলভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করবে, তাদেরকে 'গ্রিন লেভেল' বা এ ধরনের কোনো শংসাপত্র ও প্রণোদনা দিয়ে উৎসাহিত করা যেতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় তরুণেরা যেমন নগর ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হবে, তেমনি সামাজিকভাবেও বড় ধরনের সচেতনতা তৈরি হবে।

স্ট্রিম: যেসব বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণে 'সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক' উৎপাদন ও বাজারজাত করছে, তাদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র কীভাবে কাজ করতে পারে?

জামাল উদ্দিন রুনু: এক্ষেত্রে বিএসটিআই-এর মতো তদারককারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক বা ব্যবহৃত প্লাস্টিক বর্জ্য রিসাইকেল করে প্রচুর পরিমাণে শিশুদের খেলনা, প্লেট, গ্লাস বা খাদ্য পরিবেশনের পাত্র তৈরি হচ্ছে। বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব রিসাইকেলড পণ্য 'ফুড গ্রেড' বা স্বাস্থ্যসম্মত কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে না। ফুড গ্রেড না হওয়া সত্ত্বেও এসব পণ্য দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত হওয়ায় তা জনস্বাস্থ্যে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।

তাই যারা সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক তৈরি করছেন বা বর্জ্য রিসাইকেল করে নতুন পণ্য বানাচ্ছেন, তাদের প্রতিটি পণ্য ফুড গ্রেড এবং পরিবেশগত মানদণ্ড বজায় রাখছে কি না, তা কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে। এজন্য উন্নত টেস্টিং ল্যাব, অ্যাক্রিডিটেশন এবং বাধ্যতামূলক সার্টিফিকেশনের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব।

স্ট্রিম: জাতীয় পর্যায়ে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও রিসাইক্লিং ব্যবস্থা জোরদার করতে সরকারের কী ধরনের অবকাঠামোগত উদ্যোগ নেওয়া উচিত?

জামাল উদ্দিন রুনু: প্লাস্টিক বর্জ্য রিসাইক্লিং বর্তমানে একটি বড় জাতীয় ইস্যু। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে প্লাস্টিক রিসাইক্লিংয়ের মূল কাজটি করছে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা ভাঙ্গারি শ্রেণি। প্রান্তিক পর্যায়ের এই মানুষেরা যত্রতত্র, বাসাবাড়ির আশেপাশে অত্যন্ত অপরিকল্পিতভাবে বর্জ্য সংগ্রহ করে প্লাস্টিকের দানা তৈরি করছে। এর ফলে আবাসিক এলাকায় আগুন লাগার ঝুঁকি বাড়ছে, মারাত্মক শব্দ ও পরিবেশ দূষণ হচ্ছে।

এজন্য সরকারের উচিত রিসাইক্লিং শিল্পের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও রোডম্যাপ প্রণয়ন করা। যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব ক্ষুদ্র কারখানাকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে এনে 'ইন্টিগ্রেটেড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন' বা সমন্বিত শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে হবে। এই ডেলিগেটেড জোনে যদি সব প্রসেসিং ও রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠানকে একত্রিত করা যায়, তবে উৎপাদিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। একইসঙ্গে সরকার সেখানে পরিবেশ রক্ষায় কমন সার্ভিস বা সাধারণ অবকাঠামোগত সুবিধা দিতে পারবে। ব্যক্তিপর্যায়ের ছোট উদ্যোক্তাদের পরিবেশ রক্ষার জন্য বড় বিনিয়োগ করার সামর্থ্য থাকে না; ক্লাস্টার বা জোনভিত্তিক উন্নয়ন হলে পরিবেশের ক্ষতিও কমবে এবং মানসম্মত রিসাইকেলড পণ্যও পাওয়া যাবে।

স্ট্রিম: পলিথিন বা প্লাস্টিক পণ্যের যেসব পরিবেশবান্ধব বিকল্প আবিষ্কার হয়েছে, সেগুলোর ব্যবহার এখনো ব্যাপক আকারে দেখা যাচ্ছে না কেন?

জামাল উদ্দিন রুনু: এর প্রধান কারণ হলো ব্যবহারিক সুবিধা এবং উৎপাদন খরচ। প্লাস্টিক অত্যন্ত সহজলভ্য, সস্তা এবং সহজে বহনযোগ্য। বাজারে যতদিন প্লাস্টিকের মতো সস্তা ও সুবিধাজনক পণ্য থাকবে, মানুষ সেদিকেই ঝুঁকবে।

দ্বিতীয়ত, পরিবেশবান্ধব বা বায়োডিগ্রেডেবল পণ্যগুলো এখনো অনেকটাই গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। বাজারে আমরা বিভিন্ন ওজনের (৫ কেজি, ১০ কেজি বা ২০ কেজি) জিনিস বহনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন শক্তির পলিথিন পাই। কিন্তু বায়োডিগ্রেডেবল পলিথিনের ক্ষেত্রে এই ধারণক্ষমতা বা শক্তির বৈচিত্র্য এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। তাছাড়া ব্যাপক চাহিদা মেটানোর মতো বিপুল পরিমাণ বায়োডিগ্রেডেবল পণ্য উৎপাদনের কাঁচামাল ও শিল্প সক্ষমতাও আমাদের নেই।

সরকারের উচিত রিসাইক্লিং শিল্পের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও রোডম্যাপ প্রণয়ন করা। যত্রতত্র গড়ে ওঠা এসব ক্ষুদ্র কারখানাকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে এনে 'ইন্টিগ্রেটেড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন' বা সমন্বিত শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে হবে। এই ডেলিগেটেড জোনে যদি সব প্রসেসিং ও রিসাইক্লিং প্রতিষ্ঠানকে একত্রিত করা যায়, তবে উৎপাদিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে।

পাটের ব্যাগের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো এর দাম এবং মানুষের বদলে যাওয়া অভ্যাস। পাটের তৈরি বিকল্প পণ্যের দাম সাধারণ পলিথিনের চেয়ে বেশি। এছাড়া এখনকার মানুষ বাসা বা অফিস থেকে বের হওয়ার সময় সাথে করে বাজারের ব্যাগ বহন করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। জীবনযাত্রার এই পরিবর্তনের কারণে পাটের ব্যবহার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ছে না।

স্ট্রিম: প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও অভ্যাস পরিবর্তনে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?

জামাল উদ্দিন রুনু: আমাদের দেশে সচেতনতা বৃদ্ধি ও অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য বিচ্ছিন্নভাবে প্রচুর কাজ করা হয়েছে। কিন্তু দেখা গেছে, মানুষ সেভাবে সচেতন হচ্ছে না। প্রকৃতপক্ষে, সচেতনতা বৃদ্ধি বা অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম হলো একটি সহায়ক পদক্ষেপ। এর মূল শর্ত হলো, বাজারে সহজলভ্য বিকল্প থাকতে হবে এবং পর্যাপ্ত আইনি ব্যবস্থা থাকতে হবে। মানুষ সচেতন হওয়ার পরও যদি আবার অসচেতন আচরণ করে, তবে তাদের পুনরায় সতর্ক ও জবাবদিহি করার মতো কার্যকর প্রয়োগ-ব্যবস্থা থাকতে হবে।

অবশ্যই সচেতনতামূলক কার্যক্রমের প্রয়োজন আছে; প্লাস্টিকের ব্যবহার ও এর ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে মানুষকে জানাতে হবে। তবে সমস্যা হলো, আমরা অনেক কিছু জেনেও বাস্তবে তা মানি না। এর মূল কারণ হচ্ছে জবাবদিহির অভাব—দায়বদ্ধতার জায়গায় আমাদের কাউকে জবাবদিহি করতে হচ্ছে না। তাছাড়া, ধরা যাক আমি সচেতন, কিন্তু আমার কাছে কোনো বিকল্প নেই। বাজারে যদি প্লাস্টিকের বিকল্পই না থাকে, তাহলে আমি কী করব?

এ কারণেই আমি মনে করি, সচেতনতা অবশ্যই জরুরি এবং দেশে কমবেশি এর চর্চাও আছে। কিন্তু এর পাশাপাশি আমাদের আইনের যথাযথ প্রয়োগ নেই এবং বাজারে পর্যাপ্ত বিকল্প পণ্য নেই। এছাড়া, প্রাতিষ্ঠানিক বা অভিভাবকত্বের জায়গা থেকে মানুষকে বিকল্প অভ্যাসে গড়ে তোলার জন্য যে অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন, সেটিরও অভাব রয়েছে।

সুতরাং, বাজারে সহজলভ্য বিকল্প, আইনের কঠোর প্রয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক দিকনির্দেশনা এবং জবাবদিহি—এই কয়েকটি বিষয়ের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই আমরা সচেতনতামূলক কার্যক্রমগুলোকে সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারব।

স্ট্রিম: আগামী ৫ বছরে প্লাস্টিক দূষণ কমাতে জাতীয় পর্যায়ে সরকারের প্রধান ৩টি অগ্রাধিকারমূলক কাজ কী হওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

জামাল উদ্দিন রুনু: আমার মতে সরকারের প্রধান তিনটি কাজ হওয়া উচিত:

প্রথমত, সরকারকে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদের বিদ্যমান যেসব আইন ও বিধিবিধান রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা প্রতিটি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সক্রিয় করতে হবে। তাদের অনুপ্রাণিত করার পাশাপাশি সরকারকেও নিজ অবস্থান থেকে আন্তরিক ও সচেষ্ট হতে হবে। এটিই সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক সদিচ্ছা জাগ্রত করা এবং তাকে কার্যকর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। যেহেতু সরকার একটি রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তাই জাতীয় পর্যায়ে সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি সম্মেলন বা সংলাপের আয়োজন করা যেতে পারে। একটি রাজনৈতিক দল সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। তাই রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে যদি দলগুলোর নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে প্লাস্টিক বর্জনের অভ্যাস গড়ে তোলা যায়, তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ব্যক্তি পর্যায় থেকে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত একটি জবাবদিহির পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে।

তৃতীয়ত, বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যে প্লাস্টিক পণ্যের পর্যাপ্ত বিকল্প নিয়ে আসা। এর জন্য প্রয়োজন হলে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। পাশাপাশি, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও উন্নয়ন খাতগুলোতে প্লাস্টিকমুক্ত ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে একটি নীতিগত বাধ্যবাধকতা প্রণয়ন করতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব ক্ষেত্রে এর বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট কর্মকৌশল তৈরি করতে হবে।

সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই কেবল আমরা প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা পেতে পারি। আর এর জন্য আমাদের সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

স্ট্রিম: ঢাকা স্ট্রিমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

জামাল উদ্দিন রুনু: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সর্বাধিক পঠিত
লেটেস্ট
Ad 300x250

সম্পর্কিত