মাহফুজ আলম জুলাই বিপ্লবের অন্যতম সংগঠক ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা। বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন, রাজনৈতিক দলের ভূমিকা ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন দ্য উইকের নম্রতা বিজি আহুজা।
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রশ্ন: ড. মুহাম্মদ ইউনূস আপনাকে ‘জুলাই বিপ্লবের মস্তিষ্ক’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। আপনি অন্তর্বর্তী সরকারের অংশও ছিলেন। দেড় বছরে এমন কী ঘাটতি ছিল যা মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়াল?
মাহফুজ আলম: জুলাই বিপ্লবে আমাদের সবার যে আবেগ জড়িত ছিল, তা থেকে আমাদের বিশ্বাস হয়েছিল সত্যিই নতুন কিছু আসছে। ৮ আগস্টের পর থেকে মানুষের আশা ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে। সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চেষ্টা করেছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলারও প্রয়াস ছিল। তবে বাস্তবতা হলো, ৮ আগস্টের পর থেকে পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলো আবার সংগঠিত হতে শুরু করে। এর মধ্যে রয়েছে সিভিল ও মিলিটারি আমলাতন্ত্র, বড় বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং গণমাধ্যমের কিছু অংশ। সুশীল সমাজের কিছু অংশও এর বাইরে ছিল না। এরা মূলত আগের সরকারগুলোর অবশিষ্টাংশ। এরা এক হয়ে পরিবর্তনের গতি রুদ্ধ করে দেয়।
প্রশ্ন: এই পরিস্থিতির জন্য কাকে দায়ী করবেন?
মাহফুজ আলম: আসলে বাংলাদেশ আজ সেই পুরোনো চক্রে আটকা পড়ে গেছে। সবাই এখন কেবল দোষ দেওয়ার মতো কাউকে খুঁজছে। যেকোনো গণ-অভ্যুত্থানের পরই এমনটা ঘটে। আমি ২৮ আগস্ট সরকারে যোগ দিই। প্রথম কয়েক সপ্তাহ আমি দেশের নানা প্রান্তে ঘুরেছি। বিশেষ করে সংখ্যালঘু নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের আশ্বস্ত করতে হয়েছে যে, জুলাই বিপ্লবের ছাত্র-জনতার সমর্থনে গড়া সরকার তাদের নিরাপত্তা দেবে। আমরা সংস্কারের চেয়ে আগুন নেভাতেই ব্যস্ত ছিলাম। সেই সময়টা ছিল খুবই উত্তেজনাপূর্ণ। সরকারের ভেতর থেকেই আমি বুঝেছিলাম পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো বা ‘ওল্ড পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট’ আসলে কোনো পরিবর্তন চায় না।
প্রশ্ন: ‘ক্ষমতার কাঠামো’ বা পাওয়ার ব্লক বলতে আপনি কি শুধু আওয়ামী লীগকে বোঝাচ্ছেন, নাকি বিএনপি ও জামায়াতকেও এর অন্তর্ভুক্ত করছেন?
মাহফুজ আলম: আমি সবাইকেই এর মধ্যে ফেলছি। তাদের মধ্যে আসলে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। সরকারে থাকার সময় আমি এমন অনেক প্রশাসনিক কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করেছি যারা এক সময় জামায়াত-বিএনপি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছিলেন। কিন্তু তারাও পুরোনো কাঠামোরই অংশ। একবার একটি পদে পৌঁছানোর পর তারা আর পরিবর্তন চান না। তাদের মনে হয়, ‘আমরা তো ক্ষমতায় এসেছি, সংস্কারের কাজ পরের সরকারের জন্য তোলা থাক।’
প্রশ্ন: কিন্তু জুলাই বিপ্লবে তো এরাই রাস্তায় ছিল। তাহলে কারা আসলেই পরিবর্তন চেয়েছিল?
মাহফুজ আলম: এটাই আসল সমস্যা। জুলাই বিপ্লবের চালিকাশক্তি ছিল তরুণ প্রজন্ম। কিন্তু তাদের হাতে প্রশাসন, সামরিক বাহিনী বা গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ নেই। তাদের হাতে কোনো বড় ব্যবসা বা শিল্প প্রতিষ্ঠানও নেই। এনসিপির (জাতীয় নাগরিক পার্টি) কথাই ধরুন। এটি ছিল আট-দশ মাসের একটি সাময়িক উদ্যোগ। সেখানে তারুণ্যের কণ্ঠস্বর ছিল ঠিকই। কিন্তু তাদের সীমাবদ্ধতা অনেক। তাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নেই।
প্রশ্ন: এই তরুণদের তো আপনার সমর্থন প্রয়োজন ছিল। আপনি এনসিপিতে যোগ দিলেন না কেন?
মাহফুজ আলম: আমি সেই প্রজন্মের মানুষ যাদের কোনো পুরোনো অভিভাবক নেই। তবে এনসিপির রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে আমি একমত হতে পারিনি। আমরা নতুন একটি রাজনৈতিক কাঠামোর ধারণা দিতে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা এমন এক সমাজের কথা বলেছিলাম যা হবে সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে। কিন্তু বাস্তবে জামায়াতকে তাদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। রাজনীতিকে আবারও ‘সেক্যুলার বনাম ইসলামিস্ট’ এই পুরোনো বাইনারি বা বিভাজনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আমরা জাতি গঠনে মনোযোগ দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আজ আবার ১৯৭১-এর পুরোনো বয়ানেই রাজনীতি ঘুরপাক খাচ্ছে। ২০২৪-এর আকাঙ্ক্ষা আজ কোথাও নেই।
প্রশ্ন: শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড জাতিকে নাড়া দিয়েছে। আপনি কি এটাকে কোনো ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বা মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা মনে করেন?
মাহফুজ আলম: এটি একটি আবেগের স্মৃতি হয়ে থাকবে। কিন্তু এর ফলে বড় কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন হবে না। জুলাই বিপ্লবে প্রায় ২ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু তাতে সমাজের কাঠামো বদলায়নি। হাদির পরিষ্কার ভিশন বা দূরদৃষ্টি ছিল। তার মৃত্যু হয়তো আলোচনার জন্ম দেবে, কিন্তু সেটাও মিলিয়ে যাবে। আজ পর্যন্ত অনেক পরিবার ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে জানতে পারছে তাদের নিখোঁজ স্বজনেরা জুলাইয়ে গণকবরে শায়িত হয়েছে। শুধু আবেগ দিয়ে পরিবর্তন আসে না। পরিবর্তনের জন্য ক্ষমতার কাঠামো বদলানো দরকার।
প্রশ্ন: আপনি বলেছেন ছাত্রদের পরিকল্পিতভাবে ভিলেন বানানো হচ্ছে। কেন এমন বলছেন?
মাহফুজ আলম: খুব নগণ্য একটি অংশ হয়তো বা এক-দুই শতাংশ ছাত্র কিছু বাজে কাজ করেছে। কিন্তু গণমাধ্যম এমনভাবে দেখাচ্ছে যেন পুরো প্রজন্মটাই সহিংস ও দুর্নীতিবাজ। তারা নাকি দেশ লুটে নিচ্ছে। সাধারণ মানুষ সহজাতভাবে এটা বিশ্বাস করে না। কিন্তু মিডিয়া বারবার একই কথা বললে মানুষের মনে একটা ধারণা তৈরি হয়। এদিকে বিএনপি ও জামায়াত ক্ষমতায় না থেকেও সব প্রতিষ্ঠান দখল করে ফেলেছে। আমি সরকারে থাকার সময় এটা নিজের চোখে দেখেছি।
প্রশ্ন: আপনি তথ্য উপদেষ্টা ছিলেন। আপনি কি মনে করেন সরকার গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ বা ন্যারেটিভ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে?
মাহফুজ আলম: যার মালিকানা আপনার নয়, তা আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। বাংলাদেশের গণমাধ্যম বড় বড় ব্যবসায়ীদের দখলে। সরকার কি তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে? নেয়নি। কারণ সামরিক ও বেসামরিক স্বার্থ তাদের রক্ষা করে চলেছে। আগের সরকারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হলেও, যারা দুর্নীতির ক্ষেত্র তৈরি করেছিল, সেই বড় অংশটি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। রাজনীতি ও মিডিয়া—সব জায়গাতেই তাদের আধিপত্য বজায় আছে।
প্রশ্ন: প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারে হামলাকে আপনি কীভাবে দেখেন? এগুলো কি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত নয়?
মাহফুজ আলম: অবশ্যই। আমি সেই রাতে সেখানে গিয়ে সম্পাদকদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তবে এটা কোনো সাধারণ উগ্রবাদী হামলা ছিল না। এর পেছনে অনেক স্তর ছিল। কিছু ছাত্রকে ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু তারা মূল চালিকাশক্তি ছিল না। বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহল এবং সরকারের ভেতরের ও বাইরের কিছু অংশ এতে ভূমিকা রেখেছে। হামলাকারীর অনেকেই ঢাকার বাসিন্দা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে তাদের কে আনল। হাদির হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা থেকে নজর সরাতেই এমনটা করা হয়েছে। মিডিয়া আক্রান্ত—এই গল্পটি ফাঁদা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ মিডিয়ার ওপর হামলা সমর্থন করে না। ছাত্ররা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে, যদিও কিছু মিডিয়ার অতীতে স্বৈরাচারকে সমর্থন দেওয়া নিয়ে তাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে।
প্রশ্ন: একাত্তর প্রসঙ্গ আজকের রাজনীতিতেও প্রাধান্য পাচ্ছে বলে আপনি হতাশ। আপনি কি একাত্তরকেই অস্বীকার করতে চাইছেন?
মাহফুজ আলম: মোটেও না। ১৯৭১ আমাদের প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি। ১৯৭১ পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান একজন জাতীয় বীর। কিন্তু আমরা যেটা বিরোধিতা করি তা হলো একাত্তরকে একান্তই পারিবারিক সম্পদে পরিণত করা। মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনগণের সংগ্রাম। এটি কোনো একক দল বা পরিবারের নয়। লাখ লাখ মানুষ কষ্ট করেছে। ইতিহাসে সেটার প্রতিফলন থাকতে হবে।
প্রশ্ন: অন্তর্বর্তী সরকার পাঠ্যপুস্তক ও ইতিহাস নিয়ে যে পরিবর্তন এনেছে, পরবর্তী সরকার কি তা উল্টে দেবে বলে মনে করেন?
মাহফুজ আলম: পাঠ্যবই থেকে শেখ মুজিবকে সরানো হয়নি। ছয় দফার আন্দোলন এখনো সেখানে আছে। আমরা কেবল প্রশ্ন তুলেছি দলীয় বয়ানকে সাংবিধানিক রূপ দেওয়া নিয়ে। কীভাবে একটি পরিবারকে সামষ্টিক সংগ্রামের চেয়ে বড় করে দেখানো হয়েছে তা নিয়ে আমরা কাজ করেছি। ভবিষ্যতের যেকোনো সরকার হয়তো সংস্কার করবে, কিন্তু ইতিহাস মুছে ফেলবে না।
প্রশ্ন: আপনি জামায়াত নিয়ে হতাশ। এনসিপি নিয়েও আপনার আস্থা নেই। তাহলে জনগণের জন্য আশার আলো কে?
মাহফুজ আলম: বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলেরই বিশ্বাসযোগ্যতা যেমন আছে, তেমনি দুর্বলতাও আছে। আসল প্রশ্ন দল নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো পরিবর্তন আসবে কি না। এনসিপির বাইরেও জুলাই বিপ্লব থেকে উঠে আসা অনেক মঞ্চ আছে। আমাদের চেতনা এক। আমরা কোনো দলে যোগ দিই বা না দিই, কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য আমরা চাপ দিয়ে যাব। রাজনীতি, প্রতিষ্ঠান ও সংবিধানে পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত এই লড়াই আজীবন চলবে।
প্রশ্ন: আপনি বিএনপিতে যোগ দিলেন না কেন? বিশেষ করে আপনার এলাকা তো বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
মাহফুজ আলম: আমি নতুন শক্তির একটি বৃহত্তর জোটের অপেক্ষায় ছিলাম। পুরোনো দলের সঙ্গে মিশে যেতে চাইনি। যখন এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোট করল, তখন আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল তাদের কোনো দূরদৃষ্টি বা কৌশল নেই। এমন কোনো জোটে জামায়াতই শেষ পর্যন্ত কর্তৃত্ব করবে। পদত্যাগের পর আমি বিএনপির সঙ্গে কথা বলেছিলাম। কিন্তু ততদিনে তাদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল।
প্রশ্ন: সবশেষে, আজকের দিনে বাংলাদেশের বন্ধু কে? ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক পুনরায় স্থাপনে কী করা উচিত?
মাহফুজ আলম: পররাষ্ট্রনীতিতে বন্ধুত্ব কখনোই চিরস্থায়ী নয়। স্বার্থ বদলায়। ভারতকে সবার আগে স্বীকার করতে হবে জুলাই বিপ্লব একটি সত্যিকারের গণজাগরণ ছিল। একে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কোনো ‘জুলাই-আগস্ট ইভেন্ট’ হিসেবে দেখলে হবে না। পাকিস্তানের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত যে, অস্বীকার করে কোনো লাভ হয় না। ভারতের উচিত কেবল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা না বলে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা। তারা এখনো ১৯৬০ বা ৭০ দশকের লেন্স দিয়ে বাংলাদেশকে দেখছে। নতুন প্রজন্মকে তারা উপেক্ষা করছে। ভারতীয় গণমাধ্যমকে অবশ্যই বাংলাদেশকে প্রপাগান্ডার বিষয়বস্তু বানানো বন্ধ করতে হবে। এখানে আসুন। মানুষের সঙ্গে কথা বলুন। বাস্তবতা তুলে ধরুন। স্বীকৃতি, জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা—এই তিনটি পদক্ষেপ এখন অপরিহার্য।

মাহফুজ আলম জুলাই বিপ্লবের অন্যতম সংগঠক ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা। বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন, রাজনৈতিক দলের ভূমিকা ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন দ্য উইকের নম্রতা বিজি আহুজা।
প্রশ্ন: ড. মুহাম্মদ ইউনূস আপনাকে ‘জুলাই বিপ্লবের মস্তিষ্ক’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। আপনি অন্তর্বর্তী সরকারের অংশও ছিলেন। দেড় বছরে এমন কী ঘাটতি ছিল যা মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়াল?
মাহফুজ আলম: জুলাই বিপ্লবে আমাদের সবার যে আবেগ জড়িত ছিল, তা থেকে আমাদের বিশ্বাস হয়েছিল সত্যিই নতুন কিছু আসছে। ৮ আগস্টের পর থেকে মানুষের আশা ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে। সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার চেষ্টা করেছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তোলারও প্রয়াস ছিল। তবে বাস্তবতা হলো, ৮ আগস্টের পর থেকে পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলো আবার সংগঠিত হতে শুরু করে। এর মধ্যে রয়েছে সিভিল ও মিলিটারি আমলাতন্ত্র, বড় বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং গণমাধ্যমের কিছু অংশ। সুশীল সমাজের কিছু অংশও এর বাইরে ছিল না। এরা মূলত আগের সরকারগুলোর অবশিষ্টাংশ। এরা এক হয়ে পরিবর্তনের গতি রুদ্ধ করে দেয়।
প্রশ্ন: এই পরিস্থিতির জন্য কাকে দায়ী করবেন?
মাহফুজ আলম: আসলে বাংলাদেশ আজ সেই পুরোনো চক্রে আটকা পড়ে গেছে। সবাই এখন কেবল দোষ দেওয়ার মতো কাউকে খুঁজছে। যেকোনো গণ-অভ্যুত্থানের পরই এমনটা ঘটে। আমি ২৮ আগস্ট সরকারে যোগ দিই। প্রথম কয়েক সপ্তাহ আমি দেশের নানা প্রান্তে ঘুরেছি। বিশেষ করে সংখ্যালঘু নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের আশ্বস্ত করতে হয়েছে যে, জুলাই বিপ্লবের ছাত্র-জনতার সমর্থনে গড়া সরকার তাদের নিরাপত্তা দেবে। আমরা সংস্কারের চেয়ে আগুন নেভাতেই ব্যস্ত ছিলাম। সেই সময়টা ছিল খুবই উত্তেজনাপূর্ণ। সরকারের ভেতর থেকেই আমি বুঝেছিলাম পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো বা ‘ওল্ড পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট’ আসলে কোনো পরিবর্তন চায় না।
প্রশ্ন: ‘ক্ষমতার কাঠামো’ বা পাওয়ার ব্লক বলতে আপনি কি শুধু আওয়ামী লীগকে বোঝাচ্ছেন, নাকি বিএনপি ও জামায়াতকেও এর অন্তর্ভুক্ত করছেন?
মাহফুজ আলম: আমি সবাইকেই এর মধ্যে ফেলছি। তাদের মধ্যে আসলে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। সরকারে থাকার সময় আমি এমন অনেক প্রশাসনিক কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করেছি যারা এক সময় জামায়াত-বিএনপি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছিলেন। কিন্তু তারাও পুরোনো কাঠামোরই অংশ। একবার একটি পদে পৌঁছানোর পর তারা আর পরিবর্তন চান না। তাদের মনে হয়, ‘আমরা তো ক্ষমতায় এসেছি, সংস্কারের কাজ পরের সরকারের জন্য তোলা থাক।’
প্রশ্ন: কিন্তু জুলাই বিপ্লবে তো এরাই রাস্তায় ছিল। তাহলে কারা আসলেই পরিবর্তন চেয়েছিল?
মাহফুজ আলম: এটাই আসল সমস্যা। জুলাই বিপ্লবের চালিকাশক্তি ছিল তরুণ প্রজন্ম। কিন্তু তাদের হাতে প্রশাসন, সামরিক বাহিনী বা গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ নেই। তাদের হাতে কোনো বড় ব্যবসা বা শিল্প প্রতিষ্ঠানও নেই। এনসিপির (জাতীয় নাগরিক পার্টি) কথাই ধরুন। এটি ছিল আট-দশ মাসের একটি সাময়িক উদ্যোগ। সেখানে তারুণ্যের কণ্ঠস্বর ছিল ঠিকই। কিন্তু তাদের সীমাবদ্ধতা অনেক। তাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নেই।
প্রশ্ন: এই তরুণদের তো আপনার সমর্থন প্রয়োজন ছিল। আপনি এনসিপিতে যোগ দিলেন না কেন?
মাহফুজ আলম: আমি সেই প্রজন্মের মানুষ যাদের কোনো পুরোনো অভিভাবক নেই। তবে এনসিপির রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের সঙ্গে আমি একমত হতে পারিনি। আমরা নতুন একটি রাজনৈতিক কাঠামোর ধারণা দিতে ব্যর্থ হয়েছি। আমরা এমন এক সমাজের কথা বলেছিলাম যা হবে সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে। কিন্তু বাস্তবে জামায়াতকে তাদের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। রাজনীতিকে আবারও ‘সেক্যুলার বনাম ইসলামিস্ট’ এই পুরোনো বাইনারি বা বিভাজনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। আমরা জাতি গঠনে মনোযোগ দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আজ আবার ১৯৭১-এর পুরোনো বয়ানেই রাজনীতি ঘুরপাক খাচ্ছে। ২০২৪-এর আকাঙ্ক্ষা আজ কোথাও নেই।
প্রশ্ন: শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড জাতিকে নাড়া দিয়েছে। আপনি কি এটাকে কোনো ‘টার্নিং পয়েন্ট’ বা মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা মনে করেন?
মাহফুজ আলম: এটি একটি আবেগের স্মৃতি হয়ে থাকবে। কিন্তু এর ফলে বড় কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন হবে না। জুলাই বিপ্লবে প্রায় ২ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু তাতে সমাজের কাঠামো বদলায়নি। হাদির পরিষ্কার ভিশন বা দূরদৃষ্টি ছিল। তার মৃত্যু হয়তো আলোচনার জন্ম দেবে, কিন্তু সেটাও মিলিয়ে যাবে। আজ পর্যন্ত অনেক পরিবার ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে জানতে পারছে তাদের নিখোঁজ স্বজনেরা জুলাইয়ে গণকবরে শায়িত হয়েছে। শুধু আবেগ দিয়ে পরিবর্তন আসে না। পরিবর্তনের জন্য ক্ষমতার কাঠামো বদলানো দরকার।
প্রশ্ন: আপনি বলেছেন ছাত্রদের পরিকল্পিতভাবে ভিলেন বানানো হচ্ছে। কেন এমন বলছেন?
মাহফুজ আলম: খুব নগণ্য একটি অংশ হয়তো বা এক-দুই শতাংশ ছাত্র কিছু বাজে কাজ করেছে। কিন্তু গণমাধ্যম এমনভাবে দেখাচ্ছে যেন পুরো প্রজন্মটাই সহিংস ও দুর্নীতিবাজ। তারা নাকি দেশ লুটে নিচ্ছে। সাধারণ মানুষ সহজাতভাবে এটা বিশ্বাস করে না। কিন্তু মিডিয়া বারবার একই কথা বললে মানুষের মনে একটা ধারণা তৈরি হয়। এদিকে বিএনপি ও জামায়াত ক্ষমতায় না থেকেও সব প্রতিষ্ঠান দখল করে ফেলেছে। আমি সরকারে থাকার সময় এটা নিজের চোখে দেখেছি।
প্রশ্ন: আপনি তথ্য উপদেষ্টা ছিলেন। আপনি কি মনে করেন সরকার গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ বা ন্যারেটিভ ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে?
মাহফুজ আলম: যার মালিকানা আপনার নয়, তা আপনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। বাংলাদেশের গণমাধ্যম বড় বড় ব্যবসায়ীদের দখলে। সরকার কি তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে? নেয়নি। কারণ সামরিক ও বেসামরিক স্বার্থ তাদের রক্ষা করে চলেছে। আগের সরকারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হলেও, যারা দুর্নীতির ক্ষেত্র তৈরি করেছিল, সেই বড় অংশটি এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। রাজনীতি ও মিডিয়া—সব জায়গাতেই তাদের আধিপত্য বজায় আছে।
প্রশ্ন: প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারে হামলাকে আপনি কীভাবে দেখেন? এগুলো কি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত নয়?
মাহফুজ আলম: অবশ্যই। আমি সেই রাতে সেখানে গিয়ে সম্পাদকদের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। তবে এটা কোনো সাধারণ উগ্রবাদী হামলা ছিল না। এর পেছনে অনেক স্তর ছিল। কিছু ছাত্রকে ব্যবহার করা হয়েছে, কিন্তু তারা মূল চালিকাশক্তি ছিল না। বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহল এবং সরকারের ভেতরের ও বাইরের কিছু অংশ এতে ভূমিকা রেখেছে। হামলাকারীর অনেকেই ঢাকার বাসিন্দা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে তাদের কে আনল। হাদির হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা থেকে নজর সরাতেই এমনটা করা হয়েছে। মিডিয়া আক্রান্ত—এই গল্পটি ফাঁদা হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ মিডিয়ার ওপর হামলা সমর্থন করে না। ছাত্ররা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে, যদিও কিছু মিডিয়ার অতীতে স্বৈরাচারকে সমর্থন দেওয়া নিয়ে তাদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে।
প্রশ্ন: একাত্তর প্রসঙ্গ আজকের রাজনীতিতেও প্রাধান্য পাচ্ছে বলে আপনি হতাশ। আপনি কি একাত্তরকেই অস্বীকার করতে চাইছেন?
মাহফুজ আলম: মোটেও না। ১৯৭১ আমাদের প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি। ১৯৭১ পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান একজন জাতীয় বীর। কিন্তু আমরা যেটা বিরোধিতা করি তা হলো একাত্তরকে একান্তই পারিবারিক সম্পদে পরিণত করা। মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনগণের সংগ্রাম। এটি কোনো একক দল বা পরিবারের নয়। লাখ লাখ মানুষ কষ্ট করেছে। ইতিহাসে সেটার প্রতিফলন থাকতে হবে।
প্রশ্ন: অন্তর্বর্তী সরকার পাঠ্যপুস্তক ও ইতিহাস নিয়ে যে পরিবর্তন এনেছে, পরবর্তী সরকার কি তা উল্টে দেবে বলে মনে করেন?
মাহফুজ আলম: পাঠ্যবই থেকে শেখ মুজিবকে সরানো হয়নি। ছয় দফার আন্দোলন এখনো সেখানে আছে। আমরা কেবল প্রশ্ন তুলেছি দলীয় বয়ানকে সাংবিধানিক রূপ দেওয়া নিয়ে। কীভাবে একটি পরিবারকে সামষ্টিক সংগ্রামের চেয়ে বড় করে দেখানো হয়েছে তা নিয়ে আমরা কাজ করেছি। ভবিষ্যতের যেকোনো সরকার হয়তো সংস্কার করবে, কিন্তু ইতিহাস মুছে ফেলবে না।
প্রশ্ন: আপনি জামায়াত নিয়ে হতাশ। এনসিপি নিয়েও আপনার আস্থা নেই। তাহলে জনগণের জন্য আশার আলো কে?
মাহফুজ আলম: বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলেরই বিশ্বাসযোগ্যতা যেমন আছে, তেমনি দুর্বলতাও আছে। আসল প্রশ্ন দল নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো পরিবর্তন আসবে কি না। এনসিপির বাইরেও জুলাই বিপ্লব থেকে উঠে আসা অনেক মঞ্চ আছে। আমাদের চেতনা এক। আমরা কোনো দলে যোগ দিই বা না দিই, কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য আমরা চাপ দিয়ে যাব। রাজনীতি, প্রতিষ্ঠান ও সংবিধানে পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত এই লড়াই আজীবন চলবে।
প্রশ্ন: আপনি বিএনপিতে যোগ দিলেন না কেন? বিশেষ করে আপনার এলাকা তো বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
মাহফুজ আলম: আমি নতুন শক্তির একটি বৃহত্তর জোটের অপেক্ষায় ছিলাম। পুরোনো দলের সঙ্গে মিশে যেতে চাইনি। যখন এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোট করল, তখন আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল তাদের কোনো দূরদৃষ্টি বা কৌশল নেই। এমন কোনো জোটে জামায়াতই শেষ পর্যন্ত কর্তৃত্ব করবে। পদত্যাগের পর আমি বিএনপির সঙ্গে কথা বলেছিলাম। কিন্তু ততদিনে তাদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল।
প্রশ্ন: সবশেষে, আজকের দিনে বাংলাদেশের বন্ধু কে? ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক পুনরায় স্থাপনে কী করা উচিত?
মাহফুজ আলম: পররাষ্ট্রনীতিতে বন্ধুত্ব কখনোই চিরস্থায়ী নয়। স্বার্থ বদলায়। ভারতকে সবার আগে স্বীকার করতে হবে জুলাই বিপ্লব একটি সত্যিকারের গণজাগরণ ছিল। একে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কোনো ‘জুলাই-আগস্ট ইভেন্ট’ হিসেবে দেখলে হবে না। পাকিস্তানের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত যে, অস্বীকার করে কোনো লাভ হয় না। ভারতের উচিত কেবল প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা না বলে বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা। তারা এখনো ১৯৬০ বা ৭০ দশকের লেন্স দিয়ে বাংলাদেশকে দেখছে। নতুন প্রজন্মকে তারা উপেক্ষা করছে। ভারতীয় গণমাধ্যমকে অবশ্যই বাংলাদেশকে প্রপাগান্ডার বিষয়বস্তু বানানো বন্ধ করতে হবে। এখানে আসুন। মানুষের সঙ্গে কথা বলুন। বাস্তবতা তুলে ধরুন। স্বীকৃতি, জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা—এই তিনটি পদক্ষেপ এখন অপরিহার্য।

নিবন্ধটি লেখার সময় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলপিজি) সরকার নির্ধারিত নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। ১২ কেজি ওজনের সিলিন্ডার যা গৃহস্থালি কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়—গত মাসের তুলনায় এবার তার দাম বাড়ানো হয়েছে ৫০ টাকা। কী কারণে দাম বাড়ানো হচ্ছে, নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে এর ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে।
৪ ঘণ্টা আগে
২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫। সাভার থেকে ঢাকার পথে রওনা হয়েছিলাম। সেই দিনটি ছিল রাজনৈতিকভাবে উত্তাল। দীর্ঘ ১৭ বছর পর নিজ দেশে ফেরা তারেক রহমান জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসছিলেন। তাকে একনজর দেখার জন্য রাস্তার দুই পাশে হাজার হাজার মানুষের ভিড়। গণপরিবহন বলতে গেলে অচল।
৬ ঘণ্টা আগে
শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রধান তিন এজেন্ডা নিয়ে এগোয়, তার একটি হলো সংস্কার। ধারাবাহিকভাবে বললে, বিচার অর্থাৎ ক্ষমতাচ্যুতদের অপরাধী অংশের বিচার; সংস্কার, মূলত রাষ্ট্রকাঠামোর সংস্কার ও নির্বাচন অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচন।
৭ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শুধু সরকার পতনের দিন নয়, এটি একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ। ফ্যাসিবাদী রেজিমের পতনের বছর দেড়েকের মধ্যেই যদিও অনেক স্বপ্ন ফিকে হয়ে এসেছে। তবু এই অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক পরিসরে বহু পরিবর্তন আর নতুন আলোচনা, পরিবর্তনের বাসনা, সংস্কারের প্
৭ ঘণ্টা আগে