নিবন্ধটি লেখার সময় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলপিজি) সরকার নির্ধারিত নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। ১২ কেজি ওজনের সিলিন্ডার যা গৃহস্থালি কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়—গত মাসের তুলনায় এবার তার দাম বাড়ানো হয়েছে ৫০ টাকা। কী কারণে দাম বাড়ানো হচ্ছে, নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে এর ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতে এই গ্যাসের দাম ঘিরে জনমনে যে অসন্তোষ বিদ্যমান, তা বিন্দুমাত্র কমবে বলে মনে হয় না। কারণ পণ্যটির বাজারে সরকার যে ঠিকমতো তদারকি করতে পারছে না, তা সুস্পষ্ট ছিল সংকটের শুরু থেকেই।
চাহিদা একই রকম থাকা অবস্থায় কোনো পণ্যের জোগানে ঘাটতি হলে তার দাম বাড়ে স্বাভাবিক নিয়মে। এলপিজির ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছে। আশ্চর্যের বিষয়, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ নিত্যপণ্যের সিংহভাগ আমদানিতে রয়েছে বেসরকারি খাত নির্ভরতা। বাজারে তদারকি যখন দুর্বল, তখন বেসরকারি খাতের আমদানিকারকরা যে সুযোগ পেলেই তা কাজে লাগাবে, এটা সহজে অনুমেয়। নীতিনির্ধারকদেরও বিষয়টি জানা থাকার কথা। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, পণ্যটি ঘিরে এমন অবস্থা যে সৃষ্টি হতে পারে, জ্বালানি খাতের নীতিনির্ধারকরা কি তা অনুমান করতে পারেননি? নাকি সুস্পষ্ট তথ্য থাকা সত্ত্বেও তারা ছিলেন নির্বিকার? জ্বালানির জন্য যারা তরলীকৃত গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, পণ্যটি কেনার লক্ষ্যে গত কিছুদিনের মধ্যে তাদের পকেট থেকে বাড়তি টাকা বেরিয়ে গেছে এবং তার অঙ্কটাও যে বড়, সেটা লক্ষ করা গেছে সংবাদ মাধ্যমে সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে। উপযুক্ত পদক্ষেপ না নিয়ে এতদিন যারা নির্বিকার ছিলেন, এই টাকা কি যাচ্ছে তাদেরও কারও কারও পকেটে?
এলপিজি গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পর মানুষ যখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎচালিত চুলা কেনা শুরু করল, তখন সেটিরও দাম বৃদ্ধি শুরু হলো লাফিয়ে। আশা করা হয়েছিল, জনসাধারণ যাতে স্বস্তি পায় এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি সামলে নিয়ে জীবনযাপন করতে পারে, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কিন্তু সেরকম কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। জাতীয় নির্বাচন সংক্রান্ত নানা ইস্যু ও প্রচারণার মধ্যে কোনো পক্ষ জ্বালানি ঘিরে এই অরাজকতাকে ‘ইস্যু’ করতেও পারেনি। দলীয় সরকারের আমলে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সেটা সামলানো কঠিন হতো বৈকি। আর যে জিনিস দল-মত নির্বিশেষে সব মানুষের প্রয়োজন, সেটা ইস্যু হতে পারে যেকোনো সময়। বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষে নির্বাচিত যে সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবে, তাদেরকেও বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে স্বভাবতই। আর কিছু না হোক, অন্তত মৌলিক চাহিদা পূরণে আবাসিক কাজে সাপ্লাই গ্যাস এখনও যারা ব্যবহার করছেন, তারাও কিন্তু স্বস্তিতে নেই। সময়মতো এবং কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে গ্যাসের চাপ না থাকাসহ রয়েছে আরও অভিযোগ। আগের সরকারের আমলেই অবশ্য জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আবাসিক কাজে ব্যবহারের জন্য নতুন লাইন সংযোগ আর দেওয়া হবে না। এও ঠিক, বিদ্যমান ব্যবহারকারীদের জন্য দাম বাড়ানো হয়েছে সময়ে সময়ে। সেবার মান না বাড়িয়ে দাম বাড়ানো হলে সেটাও জনমনে তৈরি করে অসন্তোষ। এই ক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকারকে তাদের নীতি সুস্পষ্ট করতে হবে। কাঙ্ক্ষিত চাপে গ্যাস সরবরাহ করা যদি আসলে আর কখনও সম্ভব না হয়, তাহলে বিকল্প ব্যবস্থাও দেখাতে হবে সরকারকে।
বস্তুত এলপিজি সংকট উদ্ভূত হওয়ার পর এর আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাজারে এর সুফল দৃশ্যমান করতে মার্চ পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। এর মধ্যে উদযাপিত হবে রমজান। এ মাসে অন্যান্য নিত্যপণ্যের মতো জ্বালানিরও বাড়তি কিছু চাহিদা তৈরি হয়। সেটা কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে অবশ্য তেমন কিছু শোনা যায়নি। এরই মধ্যে রমজানের আগে নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে বর্তমান সরকারকে আর এ পরিস্থিতি সামলাতে হবে না। কিন্তু মানুষের যে ভোগান্তি হবে, সেটা এড়ানো যাবে কীভাবে? আমাদের আশা থাকবে, সরকারে যে-ই থাকুক, তদারকি জোরদার করে স্বস্তিতে রোজা ও ঈদ উদযাপন নিশ্চিত করা হবে।
এমন ধারণা স্বভাবতই করা যায়, সরকার এলপিজি গ্যাসের যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, পণ্যটি পেতে হলে তার চেয়েও বাড়তি কিছু টাকা পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু সেটা কত? আগের মাসেও দেখা গেছে, এলপিজি খুচরা দোকানে বিক্রি হচ্ছে সরকারের নির্ধারণ করা দামের প্রায় দ্বিগুণে। এবারও যে তার ব্যতিক্রম হবে, সেরকম লক্ষণ দৃশ্যমান নয়। আর বাড়তি টাকা যদি কেউ না দিতে চান, তিনি কোথায় কিংবা কার কাছে গেলে প্রতিকার পাবেন, সে ব্যাপারে নেই সুস্পষ্ট নির্দেশনা।
রমজান মাস ঘিরে রাজধানীসহ জেলা শহরের অলিগলিতে ইফতার সামগ্রী বিক্রি উপলক্ষে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়। লক্ষ করা যায় কিছু নতুন উদ্যোক্তা। এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নাগালের মধ্যে না থাকলে এবার তারা কি উৎসাহ দেখাবেন এ ধরনের কার্যক্রমে?
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কোনো কোনো বিক্রেতা বরং যুক্তি দেখাতে চাইবেন, পণ্যটির দাম বাড়ানো হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। তারই ধারাবাহিকতায় বাড়তি দাম নিচ্ছেন তারা। কিন্তু বাড়তি টাকা যাবে কার পকেটে, এর সদুত্তর সম্ভবত কারও কাছে পাওয়া যাবে না। তবে মনে রাখতে হবে, নির্ধারণ করা এ দাম এখন থেকে খুচরা পর্যায়ে কার্যকর করা না গেলে দলীয় সরকারের আমলে বিশৃঙ্খলা যে আরও বাড়ার শঙ্কা থাকবে, সেটিও রাখতে হবে বিবেচনায়।
এটা অজানা নয়, কোনো নীতি বাস্তবায়ন করতে চাইলে সংশ্লিষ্টদের সদিচ্ছা থাকাটাও সমান জরুরি। সংকট মোকাবিলায় সরকারি পর্যায়ে নতুনভাবে দাম নির্ধারণের মতো উদ্যোগ দেখা গেলেও খুচরা পর্যায়ে সেটি কার্যকর হচ্ছে কিনা, তা তদারকির ব্যাপারে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ কি লক্ষ করা গেছে? রমজানের আগে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর নানা অজুহাত থাকে ব্যবসায়ীদের। জ্বালানির মতো নিত্যপণ্য ঘিরে এমন সংকটময় অবস্থা অতীতে রোজার আগে অবশ্য দেখা যায়নি। এর দাম যখন বাড়ে, তারপর প্রভাব পড়ে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পণ্যেও। রমজানে ব্যবহৃত নিত্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক রাখার ক্ষেত্রে সরকারের কিছু উদ্যোগ থাকে সব সময়। এবারও তার ব্যতিক্রম নেই। এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে অন্যান্য পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ কি কার্যকর করা যাবে?
এলপিজির ব্যবহার এখন শুধু শহরের বহুতল ভবনে সীমাবদ্ধ নেই। এর বিস্তার ঘটেছে শহরের ফুটপাতের দোকান থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত। খুচরা পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত দাম কার্যকর করা না গেলে নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ জ্বালানির জন্য বাড়তি ব্যয়ের সম্মুখীন হবেন। এই চাপ অনেকে সামলাতে পারবে না। অন্যদিকে যারা আয়ের জন্য এ গ্যাস ব্যবহারের ওপর নির্ভরশীল, তাদের প্রফিট মার্জিন কমে যাবে। রমজান মাস ঘিরে রাজধানীসহ জেলা শহরের অলিগলিতে ইফতার সামগ্রী বিক্রি উপলক্ষে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হয়। লক্ষ করা যায় কিছু নতুন উদ্যোক্তা। এলপিজি সিলিন্ডারের দাম নাগালের মধ্যে না থাকলে এবার তারা কি উৎসাহ দেখাবেন এ ধরনের কার্যক্রমে?
এও মনে রাখা দরকার, মাসব্যাপী সিয়াম সাধনার প্রস্তুতি শুরু হয় শবে বরাত থেকে। উদ্যোক্তাদের বাইরে রোজা উপলক্ষে ব্যক্তিগত প্রস্তুতিও শুরু হয় এ সময় থেকে। এ অবস্থায় খুচরা পর্যায়ে নির্ধারিত দাম কার্যকর রাখার জন্য কঠোর তদারকির উদ্যোগ শুধু মানুষকে স্বস্তিতে রাখার জন্যই প্রয়োজনীয় নয়; এই গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল বিদ্যমান ও নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহ ধরে রাখার জন্যও জরুরি।
দেশে গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসছে। নতুন কূপের সন্ধান ও উত্তোলনে সহসা কোনো সুখবর মিলবে বলেও মনে হয় না। রান্নার জ্বালানি ঘিরে মানুষকে স্বস্তিতে রাখতে হলে সরকারকে অবশ্যই নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ। আর তা বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, সে ব্যাপারেও থাকতে হবে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যাদের হাতে অপশন রয়েছে—এলপিজির বিকল্প হিসেবে বিদ্যুতের চুলায় স্থায়ীভাবে চলে যাচ্ছে তারা। দাম বৃদ্ধির কারণে এসব চুলা ক্রয়ের ক্ষমতাও চলে গেছে অনেকের নাগালের বাইরে। সরকার কি পারে না অন্তত নিম্ন আয়ের মানুষদের সাশ্রয়ী মূল্যে এমন চুলা সরবরাহের উদ্যোগ নিতে? রান্নার কাজে সৃষ্ট সামষ্টিক চাহিদার প্রেক্ষিতে বিদ্যুতেরও বাড়তি কিছু চাহিদা তৈরি হবে। বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদার চাপ সামলাতে না পারার কারণে যেসব এলাকায় ঘন ঘন লোডশেডিং হয়, কী উদ্যোগ থাকবে তাদের জন্য? নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এসব বিষয় অবশ্যই রাখতে হবে বিবেচনায়।
রান্না ছাড়াও এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার ব্যবহার হয় আরও নানা কাজে। খাদ্যকে যদি মৌলিক চাহিদা হিসেবে গণ্য করা হয়, তাহলে এর প্রক্রিয়াকরণে যে জ্বালানি ব্যবহার হয় তার গুরুত্বকে কোনোভাবে অস্বীকার করা যাবে না। বিপুল সংখ্যক জনসাধারণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংঘটিত একটি অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের কাছে ‘রাষ্ট্র সংস্কারের’ প্রত্যাশাও ছিল মানুষের। গত দেড় বছরে তার কতটুকু পূরণ হয়েছে, সেটা অন্য আলোচনা। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরেও স্বপ্ন দেখছে মানুষ। আর কিছু না হোক, অন্তত মৌলিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে একে কিন্তু ‘বাড়তি’ প্রত্যাশা বলা যাচ্ছে না।
লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা