বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শুধু সরকার পতনের দিন নয়, এটি একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ। ফ্যাসিবাদী রেজিমের পতনের বছর দেড়েকের মধ্যেই যদিও অনেক স্বপ্ন ফিকে হয়ে এসেছে। তবু এই অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক পরিসরে বহু পরিবর্তন আর নতুন আলোচনা, পরিবর্তনের বাসনা, সংস্কারের প্রস্তাব সামনে এনেছে। বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর বড় হয়েছে।
এই সময় থেকে জনপরিসরে একটি শব্দ বেশ জনপ্রিয় হয়েছে, তা হলো ‘নয়া বন্দোবস্ত’। যে শব্দটি মোটের ওপর বুদ্ধিজীবী মহলের দখলে ছিল, তা অনেকটাই সাধারণ মানুষের কাছাকাছি চলে এসেছে। জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতায় অভ্যুত্থানের নেতাদের মুখে মুখে ফেরায় অনেকে এ নিয়ে আগ্রহীও হয়েছেন। ‘নয়া বন্দোবস্ত’ অনেকটা বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো, সংবিধান ও নাগরিকদের মধ্যে সম্পর্কের ব্যর্থতার বিপরীতে এক নতুন সামাজিক চুক্তির প্রস্তাব। এটি কেবল ক্ষমতার হাতবদল নয়, বরং ক্ষমতার উৎসের আমূল রূপান্তর; যেখানে রাষ্ট্র আর নাগরিকের প্রভু থাকবে না, থাকবে সেবক হিসেবে।
‘নয়া বন্দোবস্ত’ ধারণাটি বৈশ্বিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রেক্ষাপটে ‘সামাজিক চুক্তি’র একটি সংস্করণ। তবে বাংলাদেশের বিশেষ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এর একটি নিজস্ব বয়ান তৈরি করা হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের ‘নিউ ডিল’-এর আদলে এটি হলেও তাঁরটি মূলত অর্থনৈতিক মহামন্দা কাটিয়ে ওঠার কর্মসূচি। কিন্তু বাংলাদেশের ‘নয়া বন্দোবস্ত’ মূলত রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক। ওই অর্থে এটি কোনো পশ্চিমা মডেলের অন্ধ অনুকরণ নয়, বাংলাদেশের গত ৫৩ বছরের ‘সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্রের’ অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন প্রস্তাব। যেখানে রাষ্ট্র নিজেই শোষকের ভূমিকা নিয়েছে, সেখানে এই নতুন বন্দোবস্ত হলো নাগরিকের সুরক্ষার এক ঢাল।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেলেও আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রটি রয়ে গেছে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলের ঔপনিবেশিক কাঠামোর ভেতরেই। এই কাঠামোটিই মূলত শাসককে স্বৈরাচারী হওয়ার আইনি বৈধতা দেয়, করে তোলে ফ্যাসিবাদী। ফলে রাষ্ট্রকাঠামোটির অল্পবিস্তর সংস্কার নয়, একে ঢেলে সাজানোই ‘নয়া বন্দোবস্ত’র দাবি। এই ঔপনিবেশিক প্রেতাত্মা তাড়ানো ছাড়া প্রকৃত গণতন্ত্রের আস্বাদন অসম্ভব।
বাংলাদেশে এই চিন্তার প্রসারের পেছনে দুটি ধারা কাজ করেছে: বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা এবং রাজপথের রাজনৈতিক ধারা। ফরহাদ মজহার ও তাঁর চিন্তা পাঠচক্র এবং মাহফুজ আলমদের ‘গুরুবার আড্ডা’ এই ধারণাগুলোর তাত্ত্বিক কারিগর হিসেবে অনেকে সামনের দিকে রাখেন। তারা অনেক দিন ধরেই বিদ্যমান সংবিধানের সমালোচনা করে আসছেন। ১৯৭২-এর সংবিধান মূলত একটি ‘ফ্যাসিবাদী দলিল’ বলে আসছেন। এ ছাড়া ‘রাষ্ট্র চিন্তা’র সঙ্গে যুক্ত তরুণদের একটি বড় অংশও ‘নয়া বন্দোবস্ত’ শব্দটা ব্যবহার না করলেও সাংবিধানিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে কথা ও তাত্ত্বিক আলোচনা করছে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ প্রমাণ করে যে, চব্বিশের বিপ্লব কেবল আবেগের ফসল ছিল না, এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি। আগস্ট-পরবর্তী তৎপরতায় শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ‘নয়া বন্দোবস্তে’র প্রবক্তারা আর কেবল তাত্ত্বিক অবস্থানে সীমাবদ্ধ থাকেননি। বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থানের পর সংস্কার হয় না, হয় পুনর্গঠন। তাঁদের কথার মূল সুর ছিল, ‘আপনি যদি পুরোনো পচা খুঁটির ওপর নতুন দালান তুলতে চান, তবে তা ধসে পড়বে। আমাদের কাজ হলো সংবিধান সভা গঠন করে গোড়া থেকে রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজানো।’
তবে এসব বাস্তবায়নের প্রশ্নে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য ১০টি আলাদা কমিশন গঠন করেছে। বিশেষ করে ‘সংবিধান সংস্কার কমিশন’ এবং ‘নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন’-এর কাজ সরাসরি নয়া বন্দোবস্তের সঙ্গে যুক্ত। ড. আলী রীয়াজের নেতৃত্বে সংবিধান সংস্কার কমিশনের কাজ শুরু হওয়াটি এই চিন্তার একটি বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। যদিও কমিশন দায়িত্ব শেষ করেছে শুধু প্রস্তাব প্রস্তুত করার মধ্য দিয়েই। আদতে তা কাগুজে বাঘ এবং তা নির্ভর করে আছে ভবিষ্যৎ সরকারের দিকে। সংস্কার যখন কেবল সদিচ্ছা থেকে দাফতরিক রুটিনে পরিণত হয়, তখন তার বৈপ্লবিক ধার ফিকে হয়ে আসে।
প্রকৃত নয়া বন্দোবস্ত তখনই সফল হবে যখন রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে এবং সাম্য ও মানবিক মর্যাদা কেবল কাগজে নয়, বাস্তবে রূপ পাবে। যদি এই প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়, তবে ‘নয়া বন্দোবস্ত’ নামের শব্দবন্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে আরও একটি ব্যর্থ বাগাড়ম্বর হিসেবে থেকে যাবে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে আমরা যে রাষ্ট্র কাঠামো পেয়েছি, সেখানেও আমরা আগের মতোই কর্তৃত্ববাদী কাঠামো রেখে দিয়েছি। নতুন করে আমরা মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে, মানুষের পক্ষে আইন-সংবিধান করতে পারিনি। এবারের ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়েও বাংলাদেশ রাষ্ট্র গণবান্ধব কিছু বাস্তবায়ন করতে পেরেছে? এর উত্তরের অনেকটা জায়গা গ্রে-জোন বা ধূসর হয়ে আছে। সাদা-কালো দিয়ে উত্তর করা কঠিন।
নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে। বড় দল বিএনপি তার মেনিফেস্টো ৩১ দফায় জুলাইকে প্রাধান্য দিয়ে করলেও তারা ৭টি মৌলিক বিষয়ে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে। ‘নয়া বন্দোবস্ত’ বাস্তবায়নের বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যমান আইনি কাঠামো। সরকার চাইলেই একদিনে সব বদলে ফেলতে পারছে না, কারণ তাদের কার্যক্রমের জন্য একটি আইনি ধারাবাহিকতা প্রয়োজন হয়, যা শেষ পর্যন্ত সেই পুরোনো সংবিধানের ওপরই নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতার প্রতি পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোও নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে ‘পুরোনো বন্দোবস্ত’র প্রতি দায়বদ্ধতাই দেখাল আদতে। দলগুলোর এই কৌশলগত পিছুটান প্রমাণ করে যে, ক্ষমতার স্বাদ যারা আগে পেয়েছে, তারা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের চেয়ে ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণে বেশি আগ্রহী।
রাজনৈতিক জায়গায় দেখলে ফ্যাসিবাদী শক্তি আওয়ামী লীগ নেই; অন্যদিকে সিস্টেমের ভেতরে থাকা পুরোনো আমলাতান্ত্রিক শক্তির প্রতিরোধও ‘দৃশ্যত’ প্রবল না হলেও খেয়াল করবেন, এই সরকার যেসব কমিশন কাজ করেছে, তারা প্রচলিত আমলাতন্ত্রের ‘কিছুই করতে পারে নাই’। আগের মতোই আছে। গত তিন নির্বাচনে প্রধান কোলেবোরেটর আমলাতন্ত্র হলেও তারা প্রায় আগের মতোই অধরা। কিন্তু আমলাতন্ত্র বহাল রেখে যেকোনো সংস্কার বা এর চেয়ে বড় ‘নয়া বন্দোবস্ত’ কায়েম অসম্ভব। লৌহ-কাঠামো (Iron Cage) আমলাতন্ত্রকে অক্ষত রেখে ডেমোক্রেসির দালান তোলা আর বালির ওপর প্রাসাদ নির্মাণ একই কথা। ‘নয়া বন্দোবস্ত’ একটি চমৎকার স্বপ্ন হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের কাছে ধরা দিয়েছিল। এটি ছিল একধরনের আকাঙ্ক্ষা, যেখানে রাষ্ট্র হবে নাগরিকের খাদেম, কোনো এক ব্যক্তি বা পরিবারের একক সম্পত্তি নয়। জুলাইয়ের তরুণ তুর্কিরা যে স্বপ্ন দেখিয়েছেন, তা বাস্তবায়ন কেবল সংবিধানের কয়েকটি ধারা বদলানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। অন্যদিকে ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে জুলাইয়ের সৈনিকদের ওপরে অনেকে ভরসা হারিয়েছেন। অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে ডানপন্থার যে উত্থান দৃশ্যমান হয়েছিল আরও ভীতিকর হয়েছে এনসিপি জামায়াতসহ ডানপন্থীদের সঙ্গে নির্বাচনী জোটে যাওয়ায়। এই মেরুকরণ উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়া বন্দোবস্তের মূল আত্মাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।
প্রকৃত নয়া বন্দোবস্ত তখনই সফল হবে যখন রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে এবং সাম্য ও মানবিক মর্যাদা কেবল কাগজে নয়, বাস্তবে রূপ পাবে। যদি এই প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়, তবে ‘নয়া বন্দোবস্ত’ নামের শব্দবন্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে আরও একটি ব্যর্থ বাগাড়ম্বর হিসেবে থেকে যাবে। রাষ্ট্র পুনর্গঠনের যে মহাযজ্ঞের কথা বলা হয়েছিল, তা বাগচাতুর্যেই মিলাবে। কবি সাজ্জাদ শরিফ লিখেছিলেন, ৫ আগস্ট দুইটি টার্গেট সামনে নিয়ে এগিয়েছিল বাংলাদেশ—পতন ও পত্তন। আমরা পতন ঘটিয়েছি ফ্যাসিস্ট আইকনের। পত্তনের পথ অনেক বন্ধুর। সেই পথ নয়া বন্দোবস্তের। পত্তনের সেই পথ ভুলে গেলে ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না; চব্বিশের রক্ত তখন কেবল এক ট্র্যাজিক স্মৃতি হয়েই রয়ে যাবে।