ভাষা মানে শুধু বাক্য নয়, দার্শনিক চিন্তাও: সাখাওয়াত টিপু

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সাখাওয়াত টিপু। তিনি কবি, প্রাবন্ধিক ও শিল্প সমালোচক। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ আট। শিল্প সমালোচনার বই ‘নভেরার রূপ’ প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালে। স্প্যানিশ, ইতালিয়ান, গ্রিক, স্লোভেনিয়ান, সার্বিয়ান, চীনা, ইংরেজিসহ বেশ কয়েকটি এশীয় ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর লেখা। ‘প্রতিধ্বনি’ পত্রিকার সাবেক সম্পাদক। লেখালেখি ও জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন সাখাওয়াত টিপু । তাঁর সঙ্গে আলাপ করেছেন হুমায়ূন শফিক।

সাখাওয়াত টিপু

স্ট্রিম: সাংবাদিকতা ও লেখালেখির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এখন আপনি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালকের দায়িত্বে। এই নতুন পরিচয় এবং প্রশাসনিক জীবনকে আপনি কীরকম উপভোগ করছেন?

সাখাওয়াত টিপু : সাংবাদিকতা ও লেখালেখির ক্ষেত্রে তিন দশকেরও কম-বেশি সময়ে আমি যুক্ত থেকে কাজ করে গিয়েছি। ধরন ভিন্ন হলেও সাংবাদিকতা ও লেখালেখি অনেকটা কাছাকাছি পর্যায়ের। লেখালেখির বিষয়টা লেখকের নিজস্ব স্বাধীনতার বিষয়। লেখকের মুক্ত ইচ্ছা-বাসনা এখানে প্রধান ব্যাপার। কিন্তু জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে প্রশাসনিক বিধিমালা মেনেই কাজ সম্পন্ন করতে হয়। ফলে লেখালেখি সাংবাদিকতার কাজ থেকে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কর্ম পদ্ধতি ভিন্ন। কর্ম জীবনে আমার যখন যে দায়িত্ব এসেছে, আমি নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে শেখা, বোঝা ও সম্পাদন করার চেষ্টা করেছি। কাজকে আমি নিজের আনন্দের জায়গা থেকে দেখি। ছোটবেলা থেকে ‘বই’ জিনিসটা আমাকে মোহিত করত। কোনো নতুন বই কিনলে আমি অনেকক্ষণ ধরে সেটার গন্ধ শুকতাম। নতুন বইয়ের একটা মৌ মৌ সৌরভ আছে। ভীষণ ভাল লাগত। এখনো আমার স্বস্তি বা আনন্দের জায়গা বই।

স্ট্রিম : আপনি দায়িত্ব নেওয়ার পর গত দুই-তিন মাসে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

টিপু: জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। বয়সও কম নয়। গ্রন্থকেন্দ্র ‘বই নিয়ে গবেষণা; দেশে-বিদেশে বইমেলার আয়োজন ও অংশগ্রহণ; বেসরকারি প্রন্থাগার, গ্রন্থাগারপঞ্জি, গ্রন্থাগারিক, বৃহত্তর পাঠক সৃষ্টি, গ্রন্থ-প্রকাশনার মানোন্নয়নের জন্য নিয়মিত আলোচনা প্রশিক্ষণের বিষয়াদি’সহ নানা কাজ করে থাকে। জ্ঞানগত উৎকর্ষ সাধনে বই বান্ধব সমাজ বিনির্মাণের ক্ষেত্রে কাজের ধরন ও উদ্দেশ্যাবলি খুব সুন্দর। তবে প্রতিষ্ঠানের কাঠামো অনুযায়ী জনবল কম। ফলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রবৃদ্ধির হার ধীর গতির। ইতোমধ্যে নিয়মিত কাজের পাশাপাশি বই ও গ্রন্থাগার নিয়ে বেশকিছু কর্মসূচিসহ নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছি আমরা। এই কয়দিনের মধ্যে আলোচনা বৈঠকির আয়োজন করেছি; বই পত্রিকা প্রকাশ করেছি; বইমেলায় প্রদর্শনী ও তথ্যপঞ্জি নিয়ে কাজ করেছি; একটি বেসরকারি গ্রন্থাগারপঞ্জি প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছি। আগামীতে আপনারা আরো কার্যক্রম নিয়মিত দেখতে পাবেন।

স্ট্রিম : জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রকে নিয়ে আপনার স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাগুলো কী কী? প্রতিষ্ঠানটিকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও জনপ্রিয় করতে কোনো বিশেষ উদ্যোগ নিচ্ছেন কি?

টিপু: আমি যোগদান করেছি মাত্র দু’মাসের অধিক সময় অতিবাহিত হয়েছে। ইতোমধ্যে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র থেকে ৬ মাস, একবছর ও পাঁচ বছরের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে বেশ কিছু পরিকল্পনার প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। অবশ্যই প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে সে কার্যক্রম সফল করতে আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকবে। বর্তমান সরকার ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ও বিষয়গুলো নিয়ে যথেষ্ট আন্তরিক। তাতে সবার সার্বিক সহযোগিতা আমাদের একান্ত কাম্য।

স্ট্রিম: ডিজিটাল যুগে মানুষের বই পড়ার অভ্যাস কমে যাচ্ছে বলে একটা সাধারণ অভিযোগ আছে। তরুণ প্রজন্মকে বইমুখী করতে কী ধরনের ভূমিকা পালন করা দরকার?

টিপু: ‘ডিজিটাল যুগে মানুষের বই পড়ার অভ্যাস কমে যাচ্ছে’—কথাটার সঙ্গে একমত নই। কারণ দুনিয়া জুড়ে বইয়ের প্রকাশনা জগতের আধুনিকায়নে অনেক গুণগত পরিবর্তন এসেছে। আগে যেমন—বই প্রকাশনার একমাত্র উপায় ছিল ছাপা বই প্রকাশ। আধুনিকায়নের ফলে এখন সেখানে যুক্ত হয়েছে—ই-বুক, অডিও বুক আর ভিডিও বুক। পশ্চিমের দেশগুলোতে ই-বুক, অডিও বুক আর ভিডিও বুক ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। পশ্চিমে যেমন ওরা শুধু ছাপা বই প্রকাশ করে না, অনলাইন পরিসরে একই বইয়ের ই-বুকও প্রকাশ করে। তারা বইকে পাঠকের দোরগোড়ায় হাতের নাগালে পৌঁছাতে নানা পদ্ধতির উদ্যোগ নেয়।

কিছু কিছু ব্যতিক্রম বাদে, বাংলাদেশে এমনটা খুব একটা সহজে দেখা যায় না। দেশে ছাপা বইয়ের ক্ষেত্রে প্রকাশনার অগ্রগতি হলেও নতুন মাধ্যমে বই প্রকাশের পদ্ধতি অনেকটা পিছিয়ে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের জীবনধারাকে বদলে দিয়েছে। বদলে দিয়েছে রুচি ও পাঠাভ্যাস। এখন তো অনলাইনে পাঠক কম নয়। তরুণরাই অনলাইনে সরব বেশি। বদলে যাওয়া পরিস্থিতিতে প্রকাশনা শিল্প বা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রসরমান অনলাইন মাধ্যমে ই-বুক, অডিও বুক আর ভিডিও বুক প্রকাশের দিকে দ্রুত নজর দিতে হবে। প্রকাশনা শিল্পের পরিসর বাড়াতে এটার কোনো বিকল্প নেই। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রও এসব নিয়ে চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে অগ্রসর হচ্ছে। যেমন—আমরা দূর-দুরান্তের লেখক, গ্রস্থাগার, পাঠকদের নিয়ে অনলাইন বৈঠক/আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছি। শিগগির এটা শুরু হবে।

স্ট্রিম: পাড়া-মহল্লার পাঠাগারগুলো আগের মতো প্রাণবন্ত নেই। তৃণমূল পর্যায়ে লাইব্রেরি আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করার কোনো পরিকল্পনা আপনাদের আছে কি?

টিপু: কথাটা অনেকাংশে ঠিক। পাড়া-মহল্লার পাঠাগারগুলো আগের মতো প্রাণবন্ত নেই। ছোটবেলায় আমরা দেখেছি পাঠাগারগুলো ‘রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত জয়ন্তী’র অনুষ্ঠান পালন করতে। দেয়ালিকা প্রকাশ করতে। তবে ‘কেন প্রাণবন্ত নেই’—এর উত্তর স্বল্প পরিসরে বলা সম্ভব নয়। গ্রন্থকেন্দ্রের আওতাধীন গ্রাম বা শহরের অনেক পাঠাগার বই পাঠ, আলোচনাসহ নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করে। পাঠাগার নিয়ে আমাদের কাজের পরিসর ক্রমশ বাড়ছে। তবে সত্য এই, বইকে সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রূপ দিলেই পাঠাগার আন্দোলন জোরদার করা সম্ভব।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের অন্যতম কাজের এলাকা বেসরকারি গ্রন্থাগার। কেন্দ্রের আওতাধীন শতবর্ষী পাঠাগার, বিদ্যমান রেজিস্ট্রিকৃত পাঠাগার নিয়ে নানা কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি নতুন পাঠাগার নিবন্ধনের কাজটিও চলছে। কেন্দ্রের বর্তমান কর্মরত জনবল মাত্র ৪০ জন। সারাদেশে নিবন্ধিত বেসরকারি গ্রন্থাগার নিয়ে কাজের আওতা বিবেচনা করে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ মেধা ও শ্রম দিয়ে কাজটা করার চেষ্টা করছি। যদিও প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে বই সংশ্লিষ্ট সকলের প্রত্যাশা অনেক। আমরা এমন প্রত্যাশাকে সাধুবাদ জানাই।

স্ট্রিম: বইমেলাকেন্দ্রিক পাঠাভ্যাসকে সারা বছরব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কোনো কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করছেন?

টিপু: জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র চলতি অর্থবছরে ৫টি বিভাগীয় শহরে বইমেলা সম্পন্ন করেছে। আগামী অর্থবছরে অন্যান্য বিভাগীয়/জেলা শহরেও বইমেলার পরিসর বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে। বিদেশে দুটো আন্তর্জাতিক বইমেলায় অংশগ্রহণের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এটার পরিসর আরো বাড়বে।

স্ট্রিম: আপনার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন আপনার বর্তমান দায়িত্ব পালনে কতটা সহায়ক হচ্ছে? সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা কি প্রশাসনিক জটিলতা মোকাবিলায় সাহায্য করে?

টিপু: সাংবাদিকতা ও প্রশাসনিক কাজ দুটো দুই ধরনের। এতে সাংবাদিকতা এটুকুই সাহায্য করে, যা শুধু তথ্যে মেলে। এর বাইরে কাজের সহায়ক পরিসর ক্ষীণ। প্রশাসনিক কাজ আমার জন্য অন্য এক নতুন অধ্যায়।

স্ট্রিম: একজন কবি যখন প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকেন, তখন কি তার সৃজনশীল সত্তা কোনো চাপে পড়ে? আপনি নিজের লেখালেখির সময় কীভাবে বের করছেন?

টিপু: লেখক হিসেবে আমি এমনিতেই লিখি কম। পড়া বা চিন্তা-ভাবনা করি বেশি। যা লিখি তার সবকিছু যে প্রকাশ করি, তেমনও নয়। অনেক অসমাপ্ত বাক্যগুচ্ছ বা লেখা দিনের পর দিন ফেলে রাখি। বিচিত্র আইডিয়া, বিচিত্র বিষয়ে আমার চিন্তা করতে ভাল লাগে। চিন্তার ভেতর দিয়ে নানা বিষয়-আশয়ের সৃষ্টি হয়। মনে নানা প্রশ্ন জাগে। আমি তার নিরন্তর উত্তর খুঁজি। মূলত লেখার আগে আমি ভাবিত বিষয়ের এক ধরনের নন্দনতাত্ত্বিক ইমেজ দেখি। তাতে ভাষার সৌকর্য খেলা করে। এমন কি—কোনো পত্রিকা বা বই প্রকাশের আগে তার আদ্যোপান্ত দৃশ্য চোখের সামনে ভাসতে থাকে। ভাবি—কাজটা কিভাবে সুন্দর ও সহজ হয়। দৃশ্যকে বস্তু বা ভাষায় বাগে আনি। আর ভাষার সৃজনে সেটা মাধুর্য রূপে ধরা যায়।

কোনো কিছু লেখার আগে আমি চিন্তা করি বেশি। তবে লিখতে সময় লাগে কম। কবিতা জিনিসটা আমার স্বভাবজাত। আর গদ্য অবসর পেলে লিখি। বিষয়টা আমি ওভাবে ভাবি না। ‘প্রশাসনিক চাপ’ না থাকলেও তো সত্যিকার একজন লেখক নিয়মিত লেখার তাগিদ অনুভব করেন। লেখাটা একজন সৃষ্টিশীল মানুষের অন্তর্গত সত্তার জগৎ। সৃজনের এই লীলা প্রকৃতিগত। প্রশাসনিক কাজটা আরেক জগৎ। একটা আরেকটার বিকল্প নয়।

স্ট্রিম: আপনার কবিতা বিদেশি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং সমাদৃত হয়েছে। বিশ্বসাহিত্যের দরবারে বাংলা কবিতাকে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রধান বাধাগুলো আপনার দৃষ্টিতে কী কী?

টিপু: নানা সময়ে নিজের লেখা নিয়ে আমার নানা প্রশ্ন, সংশয় ও দ্বিধা কাজ করে। ফলে বই প্রকাশের ক্ষেত্রে সংযত থেকেছি। একটা সময় মনে হলো—এতদিন আমি কী লিখেছি? একটু বাজিয়ে দেখি না অন্যকোথাও! সে সুবাদে নানা বিদেশি পত্রিকায় লেখা সাবমিট করতে থাকি। ব্যর্থ হতে হতে অনেক কিছু শিখেছি, জেনেছি ও বুঝেছি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো সামান্য গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। আমাদের দেশে হয়তো অনেকেই ভাল লিখছেন। অনেকের লেখা নিজের স্থানিকতা, সময় চিন্তা, বিশ্ব পরিসরে যাওয়ার মতো সৃষ্টিশীল উপাদান আছে। তবে এখানে বড় বাধা পেশাগত দক্ষতা, পেশাদারত্ব, ভাল অনুবাদ, অনুবাদক ও সম্পাদনার অভাব। যেমন—বিদেশে পেশাদার প্রকাশনায় বই প্রকাশের ক্ষেত্রে নানাধাপ পেরিয়ে যেতে হয়, যার অনেককিছু এখানকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নাই। বাংলাদেশে বইয়ের বাজার বিবেচনা করলে প্রকাশকদের তরফ থেকে এসব বিষয়-আশয় বাস্তবায়ন করা কঠিন।

ছোট্ট একটা অভিজ্ঞতার বলি। একবার এক পত্রিকার সম্পাদক আমার কিছু কবিতা ভি. এস. নাইপলের ফরাসি অনুবাদকের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তিনি কয়েকদিন ধরে মেইলে বেশ কিছু প্রশ্ন করেছিলেন, আলাপ হয়েছিল নানা বিষয়ে। জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আমার কোনো এজেন্ট আছে কিনা? কোনো সম্পাদক আছে কিনা?’ যা আমাদের লেখক বা প্রকাশনা শিল্পে অনেকটাই অনুপস্থিত। ওই সম্পাদক লেখাগুলো আরো দু’জন সম্পাদকের কাছে পাঠিয়েছিলেন। মতামত দিয়েছেন। বেশকিছু পরামর্শও দিয়েছিলেন আমাকে। তার কাছ থেকে অনেক কিছু জেনেছি, বুঝেছি ও শিখেছি। এটা আমার জীবনে কাজে লেগেছে। লেখা নিয়ে নতুন করে ভাববার অবসর দিয়েছে। আসলে আমাদের জানার বাইরে জগৎ অনেক অনেক বিশাল।

স্ট্রিম: আপনার নিজের কবিতার জগত নিয়ে যদি কিছু বলেন—বর্তমানে কী নিয়ে কাজ করছেন বা নতুন কোনো কাব্যগ্রন্থের কাজ চলছে কি?

টিপু: কোনো বিষয় নিয়ে ভাবাকে আমার লেখার অর্ধেক কাজ মনে হয়। আর বাকি অর্ধেক কাজ ভাষায় প্রকাশ করা। তবে আমি যেভাবে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি, সেভাবে লিখছি। লিখে আমি অনেকদিন ফেলে রাখি। মনোপুত না হলে প্রকাশ করি না। কবিতা লিখছি। ফাঁকে প্রবন্ধ ও গল্প লিখছি। কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প মিলিয়ে আমার কয়েকটি পাণ্ডুলিপি অপ্রকাশিত অবস্থায় আছে। বেঁচে থাকলে কোনো একদিন প্রকাশিত হবে। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রে যোগ দেওয়ার পর অনেক প্রকাশক আমার পাণ্ডুলিপি চেয়েছেন। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বর্তমান প্রতিষ্ঠানটিতে যতদিন আছি, ততদিন দেশে কোনো নতুন বই প্রকাশ করব না। সত্যিকারভাবে প্রতিষ্ঠানটি আমার কাছে সবকিছুর ঊর্ব্ধে আছে। আমি চাই, সবার সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটি আরো সুন্দর ও কার্যকর হয়ে উঠুক।

স্ট্রিম: বর্তমান সময়ে কাগজের দাম ও মুদ্রণ খরচ বাড়ায় প্রকাশনা শিল্প সংকটে। প্রকাশকদের সহায়তায় বা বইয়ের দাম সাধারণের নাগালে রাখতে আপনাদের কোনো ভাবনা আছে?

টিপু: প্রকাশনা শিল্পে অধিক প্রণোদনার বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় দিয়েও থাকে। যেমন—২০২৬ সালের বইমেলায় স্টল ভাড়া মওকুফ করে দিয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে প্রতিবছর বাছাইকৃত পাঠাগারসমূহে অনুদানের বই দেওয়া হয়। আমাদের মনে রাখা দরকার যে বাজার-মূল্যস্ফীতির কথা বিবেচনা করলে বাংলাদেশে বইয়ের মূল্য এমনিতে কম। বিদেশি বইয়ের সঙ্গে বাংলাদেশে প্রকাশিত বইয়ের মূল্যের পার্থক্য করলে এটা দেখতে পাবেন। শুধু প্রণোদনা দিয়ে বই প্রকাশ করলে বা অনুদান হিসেবে দিলে মানুষ বই পড়বে এমন নয়। জনশিক্ষা, জনসংস্কৃতি, রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক সমাজ, সৃজন ও মননশীল ভাল লেখা, সুসম্পাদিত ভাল বই প্রকাশসহ অনেক বিষয়-আশয় এটার সঙ্গে জড়িত।

স্ট্রিম: যারা নতুন লিখছেন বা সাহিত্য চর্চায় আসতে চাইছেন, বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?

টিপু: নিজের লেখা শাণিত করতে পড়ার কোনো বিকল্প নেই। প্রথমত পড়া, দ্বিতীয়ত পড়া এবং তৃতীয়ত পড়া! সৃষ্টিশীল ভাষাটাকে নিজের আয়ত্তে আনা। ভাষা মানে শুধু বাক্য নয়, দার্শনিক চিন্তাও। আর সৃষ্টিশীল প্রতিভাবান নবীন-তরুণদের আমার পছন্দ। তাদের লেখা আমি দরদ দিয়ে পড়তে পছন্দ করি। নানা সময় সম্পাদনা করতে গিয়ে অনেক প্রতিভাবান নবীনের লেখা প্রকাশের সুযোগ হয়েছে। প্রতিভার প্রাথমিক উপকরণগুলো তাদের কাছে পাওয়া যায়। তা ছাড়া প্রত্যেক সৃষ্টিশীল মানুষ নিজের মতো ইউনিক। আমি চাই, তারা সৎভাবে স্বাধীন চিন্তা নিয়ে নিজেদের মতো বেড়ে উঠুক।

স্ট্রিম: জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক হিসেবে আপনার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর, প্রতিষ্ঠানটিকে আপনি কোন উচ্চতায় রেখে যেতে চান?

টিপু: মানুষের স্বপ্ন আর সম্ভাবনার শেষ নেই। চেষ্টা থাকবে যতটুকু সম্ভব জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের কাজকে সামনে এগিয়ে নেওয়া। সবার সহযোগিতায় সবকিছু শুভ ও সুন্দর হবে—এটাই আশা।

সর্বাধিক পঠিত
লেটেস্ট
Ad 300x250

সম্পর্কিত