শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

কোরবানির চামড়া: সোনা ফেলে ছাই কুড়ানোর গল্প
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক
#######################
ব্রিজের ওপর থেকে কোরবানির পশুর শতশত মূল্যবান চামড়া নদীতে ফেলে দিচ্ছেন এক ব্যক্তি। চামড়ার উপযুক্ত দাম পাওয়াতো দূরের কথা, চামড়া নেয়ার মতো কোনো পাইকার বা বেপারি না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন এই মৌসুমি ব্যবসায়ী। ঈদের পরের দিন মোটামুটি সারাদেশের চিত্রই এমন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন জেলার খবরে দেখা গেছে, রাস্তার পাশে স্তূপ করা চামড়া, ক্লান্ত মুখের ব্যবসায়ী, আর লোকসানের হিসাব মেলাতে গিয়ে মাথায় হাত দেওয়া মৌসুমি বিক্রেতা। এই দৃশ্য বাংলাদেশে নতুন নয়, প্রতি বছরের। কিন্তু একটি সম্ভাবনাময় খাতের কেন এই বেহাল অবস্থা, এর জন্য দায়ী কারা, আর কারাই বা পর্দার আড়ালে থেকে তুলছে চামড়া অরাজকতার এই লাভের ফসল?
এক লাখ বিশ হাজার টাকার গরু কোরবানি দিয়ে চামড়া বিক্রি করতে গেলে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র চারশো টাকা। রংপুরের চামড়াপট্টিতে গত কোরবানির ঈদে এমন একজনের সঙ্গে কথা হয়েছিল, যিনি প্রায় চার ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও এর বেশি দাম পাননি। আর ছাগলের চামড়া? সেটা পাঁচ থেকে দশ টাকায় বেচতে হয়েছে, নয়তো ফেলে রেখে আসতে হয়েছে। অথচ সেই একই চামড়া থেকে তৈরি জুতার দাম আজ চার থেকে দশ হাজার টাকা। চামড়ার এই দুরবস্থা এক দিনের নয়। বছরের পর বছর জমে থাকা নীতি ও ব্যবস্থাপনার সমস্যার ফল এটি।
তাহলে কি এই দরপতন শুধু বাজারের স্বাভাবিক নিয়মে হয়েছে? একেবারেই না। রংপুরের চামড়াপট্টিতে এবং ঢাকার কিছু আড়তদারের সঙ্গে কথা বলে যা বুঝলাম, বাজারে কয়েকজন বড় আড়তদারের প্রভাব এতটাই বেশি যে কার্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে না। হাতেগোনা চার-পাঁচজন বড় আড়তদার মিলে দাম বেঁধে দেন। সেই দামের বাইরে চামড়া কেনার লোক নেই। মৌসুমি ব্যবসায়ী গড়ে ছয়শো-আটশো টাকায় চামড়া কিনে এনে পাঁচশো টাকায় এমনকি চারশো বেচতে বাধ্য হচ্ছেন। লোকসান মেনে নিতে হচ্ছে কারণ চামড়া পচনশীল, রাখার জায়গা নেই, লবণের দাম বেশি।
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২২ থেকে ২৫ কোটি বর্গফুট কাঁচা চামড়া উৎপাদিত হয়। এর ৬০ শতাংশই আসে মাত্র তিন দিনে, কোরবানির ঈদে। শিল্প-সংশ্লিষ্ট মহলের তথ্য মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে এই চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম এক থেকে তিন মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। অথচ স্থানীয় বাজারে আস্ত গরুর চামড়াটাই বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০০-৪০০ টাকায়। দুই দশক আগে একটি কোরবানির গরুর চামড়া দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকায় বিকেছে। এখন সেই একই চামড়া তিনশো টাকার বেশি পাচ্ছে না। এ বছর সরকার ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে— গত বছরের তুলনায় মাত্র ৫ টাকার সামান্য বৃদ্ধি। সরকার নির্ধারিত মূল্য থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর বাস্তবায়ন নেই।
দাম কমে যাওয়া সমস্যার একটি অংশ মাত্র। মূল জটটা পুরো ব্যবস্থার ভেতরেই। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে ২০১৭ সালে ট্যানারি স্থানান্তরের পর প্রায় এক যুগ পেরিয়ে গেছে, কিন্তু কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার বা সিইটিপি এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। সিইটিপি শুরু থেকেই কার্যকর নয়, এবং শিল্পনগরীর কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও পরিবেশসম্মত উপায়ে করা হচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশ লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) আন্তর্জাতিক সনদ পাচ্ছে না। আর সেই সনদ ছাড়া নাইকি বা অ্যাডিডাসের মতো বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে চামড়া কিনছে না। ১৬০টির বেশি ট্যানারির মধ্যে এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি।
ফলে কী হচ্ছে? পর্যাপ্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে না পারায় বাংলাদেশ তুলনামূলক কম মূল্যে কাঁচা বা আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানি করতে বাধ্য হচ্ছে। চীন সেটা নিজেদের কমপ্লায়েন্ট কারখানায় প্রক্রিয়া করে উচ্চমূল্যে ইউরোপে রপ্তানি করছে। আগে যেখানে প্রতি বর্গফুট দেড় ডলারে বিক্রি হতো, এখন সেটা ৬০-৬৫ সেন্টে দিতে বাধ্য হচ্ছেন ট্যানারি মালিকরা। প্রতি বছর প্রায় ৫০ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির সুযোগ হারাচ্ছে দেশ। আর ২০১৪ অর্থবছরে চামড়া রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৯৮ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে নেমে মাত্র ১২৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এক দশকের কম সময়ে রপ্তানি এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।
এখানে আরেকটা প্রশ্ন মাথায় আসে এই পরিমাণ চামড়া উৎপাদন হওয়ার পরও দেশের ফুটওয়্যার কোম্পানিগুলো কেন বিদেশ থেকে চামড়া আমদানি করছে? কারণটা শুনলে বোঝা যায়, সমস্যাটা চামড়ার নয় সমস্যাটা পুরো ব্যবস্থার। দেশীয় ট্যানারির অধিকাংশই কমপ্লায়েন্ট নয়, তাই তাদের চামড়া দিয়ে রপ্তানিযোগ্য পণ্য তৈরি করা যাচ্ছে না। প্রতি মাসে বাংলাদেশের ফুটওয়্যার কোম্পানিগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চামড়া বিদেশ থেকে আমদানি করছে। নিজের দেশে কাঁচামাল পড়ে থাকছে রাস্তায়, আর কারখানা চলছে আমদানি করা চামড়ায়। এটি দেশের চামড়া শিল্পের বিদ্যমান অসংগতি ও সক্ষমতার ঘাটতিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
কোরবানির ঈদকে আমরা ধর্মীয় দায়িত্বের দৃষ্টিতে দেখি। কিন্তু এর পেছনে যে বিশাল অর্থনৈতিক চক্র আছে, সেটা নিয়ে আলোচনা কম হয়। বাংলাদেশে প্রতিবছর এক কোটিরও বেশি পশু কোরবানি হয়। শুধু চামড়া নয়, পশু কেনাবেচায় কয়েক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। এই পুরো চক্রটা যদি সুশৃঙ্খল হতো, কোরবানির চামড়া শিল্প একা বছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় দিতে পারত কৃষক, মৌসুমি বিক্রেতা ও এতিমখানাগুলোকে। কিন্তু কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে প্রক্রিয়াকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সমন্বয়হীনতা আর সিন্ডিকেটের দাপটে সেই সম্ভাবনা বছরের পর বছর নষ্ট হচ্ছে। ঈদের পর যে টাকাটা কৃষকের ঘরে যাওয়ার কথা, সেটা মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে ঢুকছে। একটি পশু কোরবানির পর তার চামড়া হাত বদলায় অন্তত পাঁচ থেকে সাতবার — মৌসুমি সংগ্রহকারী, স্থানীয় ব্যবসায়ী, আড়তদার, ট্যানারি, রপ্তানিকারক। এই প্রতিটি হাতবদলে আসল উৎপাদক অর্থাৎ যিনি পশু পালন করলেন এবং যিনি কোরবানি দিলেন, তারা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ঈদুল আজহার পর দেশের কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের অনেকটাই চলত কোরবানির চামড়ার টাকায়। এতিমখানা, হেফজোখানা ও কওমি মাদ্রাসার অর্থের বড় একটি যোগান আসে কোরবানির চামড়া বিক্রি থেকে। চামড়ার দাম তলানিতে নামায় সেই আয় প্রায় শেষ হয়ে গেছে। ফলে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খাচ্ছে এতিমখানা ও আবাসিক ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। তাই এই সংকটকে শুধু বাজারের হিসাব দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে।
সমাধান কি নেই? আছে, তবে সহজ নয়। সিইটিপির কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় ট্যানারি মালিকরা দাবি তুলছেন যে সাভারের চামড়াশিল্প নগরীর পরিচালনার দায়িত্ব বেজা বা বেপজার মতো আরও দক্ষ সংস্থার হাতে দেওয়া হোক। সিইটিপি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। এলডব্লিউজি সনদ পাওয়া গেলে বাংলাদেশ সরাসরি বড় বাজারে ঢুকতে পারবে এবং স্থানীয় বাজারেও চামড়ার দাম পাঁচ থেকে সাত গুণ বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কোরবানির অন্তত দুই সপ্তাহ আগে থেকে জেলা পর্যায়ে লবণের নিশ্চিত সরবরাহ এবং সিন্ডিকেট ভাঙতে প্রশাসনের সত্যিকারের সক্রিয়তা দরকার। এ বছর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চামড়া ব্যবস্থাপনায় কন্ট্রোল রুম চালু করেছে— এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, তবে কেবল কন্ট্রোল রুমে সংকট সামলানো যাবে না।
বিশ্ব চামড়াজাত পণ্যের বাজার বর্তমানে কয়েকশো বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং ২০৩০-এর দশকে আরও বাড়বে বলে পূর্বাভাস। অথচ এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব এক বিলিয়ন ডলারেরও কম, অর্থাৎ শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশেরও কম। সঠিক পরিকল্পনায় এটা অনায়াসেই বছরে ১৫ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। তৈরি পোশাক খাতের মতো চামড়া শিল্পকে কাঁচামালের জন্য বিদেশমুখী হতে হয় না। কারণ প্রয়োজনীয় কাঁচামালের বেশির ভাগই দেশে রয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বিরাট সুবিধা। অথচ এই সোনা ফেলে দিয়ে আমরা বিদেশ থেকে ছাই কুড়াচ্ছি।
আরও একটি ঈদুল আজহা আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিলো। বিগত বছরগুলোর মত এবছরও চামড়া নিয়ে সেই একই হতাশা আর সংকট দৃশ্যমান। প্রশ্ন থেকে যায়, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই সমস্যাগুলোর কার্যকর ও দৃশ্যমান সমাধান বাস্তবে কবে দেখা যাবে? এই বিপুল সম্ভাবনাময় দেশীয় খাতকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সদিচ্ছা, সিন্ডিকেট ভাঙার অদম্য সাহস আর দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। তা না হলে, প্রতি বছরই আমাদের সোনা ফেলে ছাই কুড়ানোর এই আক্ষেপের গল্প লিখে যেতে হবে।
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

কোরবানির চামড়া: সোনা ফেলে ছাই কুড়ানোর গল্প
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক
#######################
ব্রিজের ওপর থেকে কোরবানির পশুর শতশত মূল্যবান চামড়া নদীতে ফেলে দিচ্ছেন এক ব্যক্তি। চামড়ার উপযুক্ত দাম পাওয়াতো দূরের কথা, চামড়া নেয়ার মতো কোনো পাইকার বা বেপারি না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন এই মৌসুমি ব্যবসায়ী। ঈদের পরের দিন মোটামুটি সারাদেশের চিত্রই এমন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন জেলার খবরে দেখা গেছে, রাস্তার পাশে স্তূপ করা চামড়া, ক্লান্ত মুখের ব্যবসায়ী, আর লোকসানের হিসাব মেলাতে গিয়ে মাথায় হাত দেওয়া মৌসুমি বিক্রেতা। এই দৃশ্য বাংলাদেশে নতুন নয়, প্রতি বছরের। কিন্তু একটি সম্ভাবনাময় খাতের কেন এই বেহাল অবস্থা, এর জন্য দায়ী কারা, আর কারাই বা পর্দার আড়ালে থেকে তুলছে চামড়া অরাজকতার এই লাভের ফসল?
এক লাখ বিশ হাজার টাকার গরু কোরবানি দিয়ে চামড়া বিক্রি করতে গেলে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র চারশো টাকা। রংপুরের চামড়াপট্টিতে গত কোরবানির ঈদে এমন একজনের সঙ্গে কথা হয়েছিল, যিনি প্রায় চার ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও এর বেশি দাম পাননি। আর ছাগলের চামড়া? সেটা পাঁচ থেকে দশ টাকায় বেচতে হয়েছে, নয়তো ফেলে রেখে আসতে হয়েছে। অথচ সেই একই চামড়া থেকে তৈরি জুতার দাম আজ চার থেকে দশ হাজার টাকা। চামড়ার এই দুরবস্থা এক দিনের নয়। বছরের পর বছর জমে থাকা নীতি ও ব্যবস্থাপনার সমস্যার ফল এটি।
তাহলে কি এই দরপতন শুধু বাজারের স্বাভাবিক নিয়মে হয়েছে? একেবারেই না। রংপুরের চামড়াপট্টিতে এবং ঢাকার কিছু আড়তদারের সঙ্গে কথা বলে যা বুঝলাম, বাজারে কয়েকজন বড় আড়তদারের প্রভাব এতটাই বেশি যে কার্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে না। হাতেগোনা চার-পাঁচজন বড় আড়তদার মিলে দাম বেঁধে দেন। সেই দামের বাইরে চামড়া কেনার লোক নেই। মৌসুমি ব্যবসায়ী গড়ে ছয়শো-আটশো টাকায় চামড়া কিনে এনে পাঁচশো টাকায় এমনকি চারশো বেচতে বাধ্য হচ্ছেন। লোকসান মেনে নিতে হচ্ছে কারণ চামড়া পচনশীল, রাখার জায়গা নেই, লবণের দাম বেশি।
বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২২ থেকে ২৫ কোটি বর্গফুট কাঁচা চামড়া উৎপাদিত হয়। এর ৬০ শতাংশই আসে মাত্র তিন দিনে, কোরবানির ঈদে। শিল্প-সংশ্লিষ্ট মহলের তথ্য মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে এই চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম এক থেকে তিন মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। অথচ স্থানীয় বাজারে আস্ত গরুর চামড়াটাই বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০০-৪০০ টাকায়। দুই দশক আগে একটি কোরবানির গরুর চামড়া দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকায় বিকেছে। এখন সেই একই চামড়া তিনশো টাকার বেশি পাচ্ছে না। এ বছর সরকার ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে— গত বছরের তুলনায় মাত্র ৫ টাকার সামান্য বৃদ্ধি। সরকার নির্ধারিত মূল্য থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার কার্যকর বাস্তবায়ন নেই।
দাম কমে যাওয়া সমস্যার একটি অংশ মাত্র। মূল জটটা পুরো ব্যবস্থার ভেতরেই। সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে ২০১৭ সালে ট্যানারি স্থানান্তরের পর প্রায় এক যুগ পেরিয়ে গেছে, কিন্তু কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার বা সিইটিপি এখনও পুরোপুরি চালু হয়নি। সিইটিপি শুরু থেকেই কার্যকর নয়, এবং শিল্পনগরীর কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও পরিবেশসম্মত উপায়ে করা হচ্ছে না। ফলে বাংলাদেশ লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) আন্তর্জাতিক সনদ পাচ্ছে না। আর সেই সনদ ছাড়া নাইকি বা অ্যাডিডাসের মতো বড় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে চামড়া কিনছে না। ১৬০টির বেশি ট্যানারির মধ্যে এলডব্লিউজি সনদ পেয়েছে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি।
ফলে কী হচ্ছে? পর্যাপ্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে না পারায় বাংলাদেশ তুলনামূলক কম মূল্যে কাঁচা বা আধা-প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানি করতে বাধ্য হচ্ছে। চীন সেটা নিজেদের কমপ্লায়েন্ট কারখানায় প্রক্রিয়া করে উচ্চমূল্যে ইউরোপে রপ্তানি করছে। আগে যেখানে প্রতি বর্গফুট দেড় ডলারে বিক্রি হতো, এখন সেটা ৬০-৬৫ সেন্টে দিতে বাধ্য হচ্ছেন ট্যানারি মালিকরা। প্রতি বছর প্রায় ৫০ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির সুযোগ হারাচ্ছে দেশ। আর ২০১৪ অর্থবছরে চামড়া রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৯৮ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২২-২৩ অর্থবছরে নেমে মাত্র ১২৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এক দশকের কম সময়ে রপ্তানি এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়।
এখানে আরেকটা প্রশ্ন মাথায় আসে এই পরিমাণ চামড়া উৎপাদন হওয়ার পরও দেশের ফুটওয়্যার কোম্পানিগুলো কেন বিদেশ থেকে চামড়া আমদানি করছে? কারণটা শুনলে বোঝা যায়, সমস্যাটা চামড়ার নয় সমস্যাটা পুরো ব্যবস্থার। দেশীয় ট্যানারির অধিকাংশই কমপ্লায়েন্ট নয়, তাই তাদের চামড়া দিয়ে রপ্তানিযোগ্য পণ্য তৈরি করা যাচ্ছে না। প্রতি মাসে বাংলাদেশের ফুটওয়্যার কোম্পানিগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমাণে চামড়া বিদেশ থেকে আমদানি করছে। নিজের দেশে কাঁচামাল পড়ে থাকছে রাস্তায়, আর কারখানা চলছে আমদানি করা চামড়ায়। এটি দেশের চামড়া শিল্পের বিদ্যমান অসংগতি ও সক্ষমতার ঘাটতিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
কোরবানির ঈদকে আমরা ধর্মীয় দায়িত্বের দৃষ্টিতে দেখি। কিন্তু এর পেছনে যে বিশাল অর্থনৈতিক চক্র আছে, সেটা নিয়ে আলোচনা কম হয়। বাংলাদেশে প্রতিবছর এক কোটিরও বেশি পশু কোরবানি হয়। শুধু চামড়া নয়, পশু কেনাবেচায় কয়েক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। এই পুরো চক্রটা যদি সুশৃঙ্খল হতো, কোরবানির চামড়া শিল্প একা বছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি আয় দিতে পারত কৃষক, মৌসুমি বিক্রেতা ও এতিমখানাগুলোকে। কিন্তু কাঁচামাল সংগ্রহ থেকে প্রক্রিয়াকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সমন্বয়হীনতা আর সিন্ডিকেটের দাপটে সেই সম্ভাবনা বছরের পর বছর নষ্ট হচ্ছে। ঈদের পর যে টাকাটা কৃষকের ঘরে যাওয়ার কথা, সেটা মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে ঢুকছে। একটি পশু কোরবানির পর তার চামড়া হাত বদলায় অন্তত পাঁচ থেকে সাতবার — মৌসুমি সংগ্রহকারী, স্থানীয় ব্যবসায়ী, আড়তদার, ট্যানারি, রপ্তানিকারক। এই প্রতিটি হাতবদলে আসল উৎপাদক অর্থাৎ যিনি পশু পালন করলেন এবং যিনি কোরবানি দিলেন, তারা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
ঈদুল আজহার পর দেশের কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের অনেকটাই চলত কোরবানির চামড়ার টাকায়। এতিমখানা, হেফজোখানা ও কওমি মাদ্রাসার অর্থের বড় একটি যোগান আসে কোরবানির চামড়া বিক্রি থেকে। চামড়ার দাম তলানিতে নামায় সেই আয় প্রায় শেষ হয়ে গেছে। ফলে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খাচ্ছে এতিমখানা ও আবাসিক ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। তাই এই সংকটকে শুধু বাজারের হিসাব দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে।
সমাধান কি নেই? আছে, তবে সহজ নয়। সিইটিপির কাজ অসম্পূর্ণ থাকায় ট্যানারি মালিকরা দাবি তুলছেন যে সাভারের চামড়াশিল্প নগরীর পরিচালনার দায়িত্ব বেজা বা বেপজার মতো আরও দক্ষ সংস্থার হাতে দেওয়া হোক। সিইটিপি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। এলডব্লিউজি সনদ পাওয়া গেলে বাংলাদেশ সরাসরি বড় বাজারে ঢুকতে পারবে এবং স্থানীয় বাজারেও চামড়ার দাম পাঁচ থেকে সাত গুণ বাড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কোরবানির অন্তত দুই সপ্তাহ আগে থেকে জেলা পর্যায়ে লবণের নিশ্চিত সরবরাহ এবং সিন্ডিকেট ভাঙতে প্রশাসনের সত্যিকারের সক্রিয়তা দরকার। এ বছর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চামড়া ব্যবস্থাপনায় কন্ট্রোল রুম চালু করেছে— এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, তবে কেবল কন্ট্রোল রুমে সংকট সামলানো যাবে না।
বিশ্ব চামড়াজাত পণ্যের বাজার বর্তমানে কয়েকশো বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং ২০৩০-এর দশকে আরও বাড়বে বলে পূর্বাভাস। অথচ এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব এক বিলিয়ন ডলারেরও কম, অর্থাৎ শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশেরও কম। সঠিক পরিকল্পনায় এটা অনায়াসেই বছরে ১৫ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া সম্ভব বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। তৈরি পোশাক খাতের মতো চামড়া শিল্পকে কাঁচামালের জন্য বিদেশমুখী হতে হয় না। কারণ প্রয়োজনীয় কাঁচামালের বেশির ভাগই দেশে রয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বিরাট সুবিধা। অথচ এই সোনা ফেলে দিয়ে আমরা বিদেশ থেকে ছাই কুড়াচ্ছি।
আরও একটি ঈদুল আজহা আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিলো। বিগত বছরগুলোর মত এবছরও চামড়া নিয়ে সেই একই হতাশা আর সংকট দৃশ্যমান। প্রশ্ন থেকে যায়, দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত এই সমস্যাগুলোর কার্যকর ও দৃশ্যমান সমাধান বাস্তবে কবে দেখা যাবে? এই বিপুল সম্ভাবনাময় দেশীয় খাতকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সদিচ্ছা, সিন্ডিকেট ভাঙার অদম্য সাহস আর দীর্ঘমেয়াদি নীতির ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। তা না হলে, প্রতি বছরই আমাদের সোনা ফেলে ছাই কুড়ানোর এই আক্ষেপের গল্প লিখে যেতে হবে।
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

‘পদ্মা ব্যারেজ’ মেগা প্রকল্প নির্মাণের মাধ্যমে গঙ্গার পানি বিষয়ক বাংলাদেশের ন্যায্য দাবি দুর্বল হতে পারে—এমন যুক্তি গ্রহণ করা কঠিন। আন্তর্জাতিক আন্তঃসীমান্ত নদীনীতি এবং দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের বৈধ অধিকার সম্পূর্ণভাবে বহাল থাকবে।
১ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম শুধু ব্যক্তি নয়, একটি যুগের প্রতিনিধিত্ব করে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেই ধরনেরই একজন নেতা। তাঁর জীবন ছিল ঘটনাবহুল। তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ছিল এক অর্থে অস্বাভাবিক। তাঁর মৃত্যু মর্মান্তিক।
২ ঘণ্টা আগে
মানুষের স্মৃতিতে জিয়াউর রহমান এমন এক শাসক, যিনি উন্নয়নের ভাষাকে শহরের মসনদ থেকে নামিয়ে খাল, মাঠ ও ইউনিয়ন পরিষদের উঠোনে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। খাল কাটা কর্মসূচি, স্বনির্ভর বাংলাদেশ ও গ্রাম সরকার; এসব ধারণা আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রশ্ন হচ্ছে, তাঁর সেই উন্নয়ন-দর্শন আজকের
৫ ঘণ্টা আগে
১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর এক চরম ভূ-রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ সংকটের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের শাসনভার গ্রহণ করেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত ভারত এবং সোভিয়েত ব্লকের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল থাকলেও, জিয়াউর রহমানের শাসনামল (১৯৭৭-১৯৮১) দেশের জাতীয় নিরাপত
৬ ঘণ্টা আগে