leadT1ad

বড় দলের বৃত্ত ভেঙে বিকল্প রাজনীতির লড়াই

মো. রাশিদুল ইসলাম
মো. রাশিদুল ইসলাম

প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬: ২১
মো. রাশিদুল ইসলাম। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

দীর্ঘ ষোল বছর ধরে বাংলাদেশে যে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা জেঁকে বসেছিল, তা ছিল মূলত জনগণের সম্মতিবিহীন এক শাসন। এই দীর্ঘ সময় সাধারণ মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে সেই বদ্ধ দুয়ার খুলে দিয়েছে। এই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান কারণই ছিল ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দাঁড়িয়ে আজ যখন আমরা নির্বাচনের পথে হাঁটছি, তখন মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট বুঝতে পারছি—মানুষ পরিবর্তন চায়। তারা কেবল গত ১৬ বছরের দুঃশাসনের অবসানই চায়নি, বরং গত ৫৪ বছর ধরে পালাক্রমে যারা এদেশ শাসন করেছে, সেই গতানুগতিক ধারারও পরিবর্তন চায়।

আওয়ামী লীগ বিদায় নিয়েছে, কিন্তু তাদের তৈরি করা দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির কাঠামোটি এখনো বহাল তবিয়তে আছে। অতীতে যারা ক্ষমতার বাইরে ছিল এবং কিছুটা নিপীড়নের শিকার হয়েছিল, আজ তারা মাঠে সরব। উদ্বেগের বিষয় হলো, তাদের রাজনৈতিক আচরণে পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ নেই। ৫ই আগস্টের পর আমরা দেখেছি, সেই পুরনো ধারায়, সেই একই কায়দায় বড় দলগুলো তাদের রাজনীতি পরিচালনা করছে। জনগণ বুঝতে পারছে যে, এই দলগুলোও বিদ্যমান ব্যবস্থার খুব একটা পরিবর্তন করবে না। এই প্রেক্ষাপটে আমরা যখন মেহনতি মানুষের অধিকারের কথা বলছি, মানুষ আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে। তারা আমাদের কথায় ভরসা রাখতে চাইছে, যা আমাদের নির্বাচনী প্রচারণায় এক ইতিবাচক সাড়ার ইঙ্গিত দেয়।

আমাদের নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি প্রচলিত ধারণা বা মিথ তৈরি হয়েছে যে, ছোট দলগুলোকে ভোট দেওয়া মানে ভোটটি নষ্ট করা। মানুষ মনে করে, শেষ পর্যন্ত বড় দলগুলোর কেউ না কেউ ক্ষমতায় আসবে, তাই তাদেরই ভোট দেওয়া শ্রেয়। এই মানসিকতা একদিনে তৈরি হয়নি। আমাদের দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাটি আদতে একটি বুর্জোয়া ব্যবস্থা। এখানে রাজনীতি দুটি প্রধান শিবিরে বিভক্ত— আওয়ামী লীগ আমলে আমরা দেখেছি যে আওয়ামী লীগ-বিএনপি, কিংবা এখন আমরা দেখছি একদিকে বিএনপি শিবির, অন্যদিকে জামায়াত শিবির। এমনকি ছোট দলগুলোও কোনো না কোনোভাবে এই দুই মেরুতে বিভক্ত হয়ে আছে। অর্থাৎ মানুষকে সবসময় আসলে দুইভাগে বিভক্ত রাখতে চাওয়া হয়েছে।

এই ব্যবস্থার পেছনে মূল চালিকাশক্তি হলো দেশের বড় বড় শিল্পপতি ও পুঁজিপতিরা। তারা সবসময় চায় তাদের স্বার্থরক্ষাকারী রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় আসুক। এই লক্ষ্যে তারা তাদের হাতের মুঠোয় থাকা প্রচারযন্ত্র, মিডিয়া এবং বিপুল অর্থ ব্যবহার করে। নির্বাচনের সময় এমন একটি ‘হাওয়া’ বা আবহ তৈরি করা হয়, যার মাধ্যমে জনগণের সম্মতি উৎপাদন করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলে। আমাদের সমাজব্যবস্থা এমন একটি স্তরায়িত বা হায়ারার্কিক্যাল কাঠামোতে গড়ে উঠেছে যে, ক্ষমতার কাছাকাছি না থাকলে সাধারণ নাগরিক সুবিধা পাওয়া যায় না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেগুলো মানুষের অধিকার হিসেবে পাওয়ার কথা, সেগুলো পেতে হলেও এখানে ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থাকতে হয়। এই নিরাপত্তাহীনতা থেকেই মানুষ মনে করে, যে দল জিতবে বলে মনে হচ্ছে, তাদের দিকেই থাকা ভালো। এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সংকট।

তবে এখানে আমাদের মতো বামপন্থী বা অধিকার আদায়ের রাজনীতিরও একটি আত্মসমালোচনার জায়গা আছে। দীর্ঘদিন ধরে ট্রেড ইউনিয়ন বা শ্রমিক রাজনীতি কেবল তাদের দৈনন্দিন দাবি-দাওয়া বা বেতন বৃদ্ধির লড়াইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। শ্রমিকদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলার কাজটি আমরা যথেষ্ট জোর দিয়ে করতে পারিনি। অধিকার আদায়ের লড়াই এবং রাজনৈতিক সচেতনতা—এই দুটির সম্মেলন ঘটানো প্রয়োজন। আমরা এখন সেই চেষ্টাই করছি। উদাহরণস্বরূপ, যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন চলছিল, একই সময়ে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির আন্দোলনও চলছিল। আমরা চেষ্টা করেছি এই দুই ধারাকে মেলাতে। শ্রমিকদের বুঝিয়েছি, শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোর পরিবর্তনও তাদের রুটি-রুটির জন্য জরুরি। এই ধারা অব্যাহত থাকলে মানুষ ধীরে ধীরে সঠিক রাজনৈতিক পথের দিকে ধাবিত হবে।

নির্বাচন মানেই এখন টাকার খেলা। শোনা যায়, বড় দলগুলোর প্রার্থীরা প্রতি ঘণ্টায় এক লক্ষ টাকার উপরে খরচ করছেন। সেই তুলনায় আমাদের সক্ষমতা নগণ্য। নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমান সুযোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা নেই। আমরা আশা করেছিলাম, গণ-অভ্যুত্থানের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, নির্বাচন কমিশনের সংস্কার কমিশন অনেক সুপারিশ করলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচনের জামানত ছিল ২০,০০০ টাকা, আর এই সরকার তা বাড়িয়ে ৫০,০০০ টাকা করেছে। এটি সাধারণ নাগরিকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা।

নির্বাচনী ব্যয়সীমা নিয়েও অসংগতি রয়েছে। একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ২৪-২৫ লক্ষ টাকা খরচ করতে পারবেন বলা হলেও, ভোটার প্রতি ১০ টাকা খরচের হিসেবে তা গড়ে ৫০ লক্ষ টাকায় পৌঁছায়। আজকের বাস্তবতায় একজন সাধারণ নাগরিক বা মেহনতি মানুষের প্রতিনিধির পক্ষে ৫০ লক্ষ টাকা খরচ করা অসম্ভব। আমরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছি যে, নির্বাচনের যাবতীয় খরচ রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে। তবেই কেবল কালো টাকার দৌরাত্ম্য কমবে এবং যোগ্য প্রার্থীরা উঠে আসবে। কিন্তু সেই দাবি মানা হয়নি।

অনেকেই বলেন, নতুন প্রজন্ম রাজনীতিবিমুখ। তারা ‘আই হেট পলিটিক্স’তত্ত্বে বিশ্বাসী। কিন্তু এই ধারণা কি পুরোপুরি সঠিক? ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে আমরা কী দেখলাম? এই কিশোর-তরুণরাই তো জানবাজি রেখে লড়াই করল। শহীদদের মধ্যে ৩৩ শতাংশই শিক্ষার্থী, এবং ১৩ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে।

আমাদের রাজনীতি কোনো কালো টাকা বা পুঁজিপতিদের অনুদানের ওপর নির্ভরশীল নয়। ১৯৮০ সালে বাসদ (মার্ক্সবাদী) প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আমরা গণ-মানুষের সহযোগিতায় দল পরিচালনা করি। বর্তমানে বহুচর্চিত ‘ক্রাউড ফান্ডিং’ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘদিনের চর্চা। আমরা নির্বাচনেও জনগণের কাছে হাত পেতেছি। আমাদের বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সহযোগিতায় আমাদের তহবিল গঠিত হয়। এটি হয়তো বিশাল অংকের নয়, কিন্তু এই অর্থের জোর অনেক, কারণ এতে মানুষের ভালোবাসা মিশে আছে। রাষ্ট্র ও নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ হলেও, আমরা জনগণের শক্তিতেই এই অসম লড়াই লড়ে যাচ্ছি।

আমার নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৬ মূলত গার্মেন্টস শ্রমিক এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। এখানে মানুষের প্রধান সংকট নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। আমরা আমাদের ইশতেহারে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণকে এক নম্বর অগ্রাধিকার দিয়েছি। আওয়ামী লীগ সরকার সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছেও আমাদের আশা ছিল তারা সিন্ডিকেট ভাঙবে, কিন্তু তারাও ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এটি প্রমাণ করে, সরকার বদলালেও রাষ্ট্রযন্ত্র বুর্জোয়াদের হাতেই জিম্মি।

আমরা সংসদে যেতে পারলে মূল্যবৃদ্ধি রোধে কঠোর অবস্থান নেব। তবে এর দ্রুত সমাধানের জন্য আমাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা রয়েছে—রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা। শ্রমজীবী ও নিম্নবিত্ত মানুষকে যদি রেশনের আওতায় আনা যায় এবং ন্যায্যমূল্যের দোকানের সংখ্যা বাড়ানো যায়, তবে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় অনেকটা লাঘব হবে। সংসদে না যেতে পারলেও, আমরা রাজপথে এই দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাব।

অনেকেই বলেন, নতুন প্রজন্ম রাজনীতিবিমুখ। তারা ‘আই হেট পলিটিক্স’তত্ত্বে বিশ্বাসী। কিন্তু এই ধারণা কি পুরোপুরি সঠিক? ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে আমরা কী দেখলাম? এই কিশোর-তরুণরাই তো জানবাজি রেখে লড়াই করল। শহীদদের মধ্যে ৩৩ শতাংশই শিক্ষার্থী, এবং ১৩ শতাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে। আনাসের মতো কিশোর মাকে চিঠি লিখে রাজপথে শহীদ হয়েছে। তাদের মধ্যে দেশপ্রেম বা চেতনার কোনো ঘাটতি নেই।

ঘাটতিটা আসলে আমাদের রাজনীতির মডেলে। গত ৫৪ বছর ধরে তারা রাজনীতির নামে যা দেখেছে—চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মারামারি—তাতে তাদের মনে রাজনীতি সম্পর্কে ঘৃণার জন্ম হওয়াই স্বাভাবিক। তারা রাজনীতি বলতে দুর্বৃত্তায়নকেই চিনেছে। কিন্তু রাজনীতির আরেকটি ধারা আছে—মাওলানা ভাসানী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস বা সুভাষ বোসের রাজনীতি। সেই ত্যাগ ও আদর্শের রাজনীতি তাদের সামনে তুলে ধরা হয়নি।

আজকের তরুণরা যখন দেখে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মতো প্ল্যাটফর্মের নেতৃত্বেও বিভ্রান্তি বা আকাঙ্ক্ষার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা তৈরি হচ্ছে, তখন তারা হতাশ হয়। তারা কোনো সাংগঠনিক কাঠামোর ওপর ভরসা পায় না। আমাদের দায়িত্ব হলো, সেই আস্থার জায়গাটি তৈরি করা। আমরা যদি আদর্শিক রাজনীতির পুনরুত্থান ঘটাতে পারি, যদি দেখাতে পারি যে রাজনীতি মানে ভোগের নয়, ত্যাগের—তবে এই তরুণরাই আবার রাজনীতিমুখী হবে। বাংলাদেশের মাটি রক্ত দেওয়ার মাটি, সংগ্রামের মাটি। এই মাটিতে তরুণরা বিভ্রান্ত হতে পারে, কিন্তু পথ হারাবে না। সঠিক নেতৃত্ব ও আদর্শ পেলে তারা অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াবে এবং আগামীর বাংলাদেশ গড়বে। সেই বিশ্বাস ও প্রত্যয় নিয়েই আমাদের এই লড়াই।

(ভিডিও থেকে অনুলিখিত)

  • মো. রাশিদুল ইসলাম: বাসদ মার্ক্সবাদী থেকে মনোনীত ঢাকা-১৬ আসনের প্রার্থী
Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত