leadT1ad

নির্বাচনে নারীর অংশগ্রহণ: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

শামীমা সুলতানা
শামীমা সুলতানা

স্ট্রিম গ্রাফিক

নারীরা নিজের যোগ্যতা ও স্বকীয়তায় পৃথিবীর বুকে অমোচনীয় পদচিহ্ন এঁকে দিতে সক্ষম হয়েছে। মানুষ হিসেবে নিজের প্রাপ্য মর্যাদার পাশাপাশি নাগরিক অধিকার আদায়ের দিকটিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ভোটাধিকার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রে নারীর অবস্থান সুদৃঢ় হয়েছে। উনিশ শতকের শেষদিকে ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, সুইডেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু উপনিবেশে নারীরা প্রথম ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নারীদের অসামান্য অবদানের পর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নারীদের ভোটাধিকার অপরিহার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের সংবিধানে নারী ও পুরুষের সমান ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থী ও নারী ভোটার প্রসঙ্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় একান্ন শতাংশ নারী। অর্থাৎ পুরুষের তুলনায় নারী ভোটারের সংখ্যা বেশি। তাই নির্বাচনে নারীদের ভোট ফলাফল বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। অথচ বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।

নির্বাচনে ৫১টি দল অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে। এর মধ্যে ৩১টি দলের কোনো নারী প্রার্থী নেই। ১৫ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ৭৬ জন নারী প্রার্থী এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর কোনো নারী প্রার্থী নেই। সর্বোচ্চ নারী প্রার্থী অংশগ্রহণ করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি থেকে। বিএনপির নারী প্রার্থীর সংখ্যা ১০ জন। এছাড়া বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল থেকেও ১০ জন নারী প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। নারী প্রার্থীর আনুপাতিক হার সাড়ে তিন শতাংশ।

বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীরা অনেকটাই কোণঠাসা অবস্থায় থাকেন। নারীর অবদান ও যোগ্যতা মূল্যায়ন করার দিক থেকে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র অনেকটাই পিছিয়ে আছে। নারী জাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ রোকেয়া সাখাওয়াত বহু আগেই দেখিয়ে গেছেন সমাজের অগ্রগতির জন্য নারীর অগ্রগতি জরুরি। কারণ জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক অংশ নারীকে বাদ দিয়ে উন্নয়নের চিন্তা করা আর হাওয়ায় অট্টালিকা বানানো সমান কথা।

একথা ঠিক যে, বর্তমান সময়ে নারীরা শিক্ষাদীক্ষা ও কর্মপরিসরে স্বকীয় মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনেও নারীরা অবিশ্বাস্য সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। একজন নারী হয়েও বেগম খালেদা জিয়া দেশ পরিচালনা ও বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন তা বাংলাদেশ ও সমগ্র বিশ্বে উদাহরণ হয়ে থাকবে।

নারীদের এত এত উজ্জ্বল কীর্তি থাকা সত্ত্বেও সমাজে নারীর সামগ্রিক অবস্থান এখনো পাকাপোক্ত হয়নি। নারীর প্রতি অবমাননাকর দৃষ্টিভঙ্গিরও খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নারীদের অগ্রগতির জন্য রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে। যে দলগুলোর মধ্যে কোনো নারী প্রার্থী নেই তাদের আশ্বাসও খুব একটা গ্রহণযোগ্য মনে করছি না। নারীর প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কথায় নয়, কাজেই প্রমাণিত।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ৩১ দফায় নারীর ক্ষমতায়নের দিকটিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দফা ২৪ এ বলা হয়েছে, ‘জাতীয় উন্নয়নে নারীদের কার্যকর অংশগ্রহণ বাড়াতে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণের অঙ্গীকার করা হয়েছে। নারী ও শিশুদের জীবনমান উন্নয়নে যুগোপযোগী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে।’ এছাড়া প্রান্তিক নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড ও কর্মজীবী নারীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দিকটিকেও তারা প্রাধান্য দিচ্ছে।

নারী ভোটারদের তাই ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যে দল নারীদের জীবন ও জীবিকার নিশ্চয়তা বিধান করবে সে দলের প্রতিই তাদের সমর্থন জানাতে হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশের প্রান্তিক পর্যায়ের নারীদের অধিকার সচেতনতা লক্ষণীয় নয়। অশিক্ষিত ও খেটে খাওয়া নারীদের খুব সহজে বিভিন্নভাবে লক্ষ্যভ্রষ্ট করার চেষ্টা করে বিভিন্ন মহল। ফলে তারা ভুল প্রার্থীকে ভোট দিতেও দ্বিধা করে না। হয়তো সাময়িক লাভের লোভে তারা স্থায়ীভাবে বঞ্চনার পথ তৈরি করে আসে।

বর্তমান সময়ে পত্র-পত্রিকা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা বিষয় বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দেখা যাচ্ছে একটা দল নারীদের ব্যবহার করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার চেষ্টা করছে। এক্ষেত্রে ধর্মকে তারা নির্বাচনে জেতার অন্যতম ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। বাসায় বাসায় গিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করার খবরও সামনে এসেছে। নারীরা এই প্রক্রিয়ার অন্যতম টার্গেট।

লক্ষণীয় যে, তাদের নারী কর্মীরা বাসায় গিয়ে নারীদের কাছ থেকেই তথ্য ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নেওয়ার চেষ্টা করছে। এর পেছনে যে মনস্তত্ত্ব কাজ করছে তা হলো, নারীদের ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করা সহজ। ধর্মভীরু নারীদের পরকালের শান্তির নিশ্চয়তা দিয়ে ভোট আদায় করা সম্ভব হবে বলে একটা গোষ্ঠী মনে করছে। আবার কারো কাছ থেকে বিকাশ নম্বর নেওয়া হচ্ছে ইহকালের প্রাপ্তিযোগের লোভ দেখিয়ে। অর্থাৎ নারী ভোটারদের বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টা নানাভাবে চলছে। কিছু হয়তো দৃশ্যমান। কিন্তু অনেকটা অদৃশ্য প্রক্রিয়ায় চলছে বলে ধারণা করা যায়। ফলে নারী ভোটের মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে নারীদের সত্যিকার অর্থে মতামতের কতটা প্রতিফলন ঘটবে সেটাও নিশ্চিত নয়। কারণ অনেক নারী ভোটারই হয়তো নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে ভোট দিতে বাধ্য হবেন।

প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর কোনো নারী প্রার্থী নেই। সর্বোচ্চ নারী প্রার্থী অংশগ্রহণ করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি থেকে। বিএনপির নারী প্রার্থীর সংখ্যা ১০ জন।

সাম্প্রতিক সময়ে একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ ব্যক্তির এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে কর্মজীবী নারীদের ক্ষেত্রে অবমাননাকর শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে, যা সারাদেশে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও চাপে পড়ে তারা বলছে দলীয় প্রধানের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছে কিন্তু তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে বোঝা যায়, নারীদের নিয়ে তাদের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি খুব একটা সম্মানজনক নয়। তাদের দলের নারী কর্মীরাও বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছে, যা খুবই আপত্তিকর ও বিপজ্জনক।

সমাজে নারীর শিক্ষা ও মর্যাদা বৃদ্ধি পেলে হয়তো এ অবস্থার অবসান ঘটবে। তবুও আমরা স্বপ্ন দেখতে চাই যে, নারীরা তাদের স্বার্থকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে রাজনীতি করবেন ও ভোট দেবেন। কারো প্রলোভন কিংবা ভয়ের কাছে মাথা নত করবেন না। তাদের মনে রাখতে হবে, ক্ষুদ্র লোভ লালসার কাছে পরাজিত হলে এর চেয়ে বড় ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে অচিরেই। নিজের বিবেকবুদ্ধি ও চিন্তা-চেতনার দুয়ার খোলা রাখতে হবে।

নারীদের মুখ ও মুখোশের পার্থক্য বুঝতে হবে। আমি যখন প্রান্তিক নারীদের কথা বলছি তখন শহুরে শিক্ষিত অনেক নারীর আচরণও হতাশাজনক পরিস্থিতি তৈরি করছে। তবে এখানেও কাজ করছে সাময়িক স্বার্থের হিসাব-নিকাশ। যা আরও বেশি হতাশাজনক। শিক্ষিত নারীরাও এমন সব প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন যা চূড়ান্ত পর্যায়ে নারীদের বিরুদ্ধেই যায়। নারীদের স্বার্থের বিরুদ্ধে নারীদেরই দাঁড় করানো হচ্ছে এবং বুঝে কিংবা না বুঝে নারীদের একটা অংশ অবলীলায় এসব স্ববিরোধী কাজ করে যাচ্ছে। নারীর অগ্রযাত্রায় এসব প্রবণতা প্রতিবন্ধতা তৈরি করছে।

বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ভবিষ্যতে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে নারীদের আরও বেশি অন্তর্ভুক্ত করবেন, এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা। জাতীয় সংসদের নারীর প্রতিনিধিত্ব আরও জোরালো হওয়া জরুরি। দেশে নারীর আনুপাতিক হার অনুযায়ী জাতীয় সংসদেও নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি নারী ভোটারদেরও নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেতন হতে হবে। তাহলেই কেবল আমরা পেতে পারি নারীদের জন্য বাসযোগ্য প্রার্থিত স্বপ্নের বাংলাদেশ।

লেখক: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক

Ad 300x250

সম্পর্কিত