আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সাক্ষাৎকার
আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া; ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র। আন্দোলনের শুরু, সরকার পতনের দিকে মোড় নেওয়া, ডিবি হেফাজতের অভিজ্ঞতা, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছে স্ট্রিম।
স্ট্রিম প্রতিবেদক

স্ট্রিম: ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সেই আন্দোলন কীভাবে আবার নতুন করে ২৪-এ, বিশেষ করে ৫ জুন থেকে তীব্র হয়ে উঠল?
আসিফ মাহমুদ: ২০১৮ সালে যখন কোটা সংস্কার আন্দোলন হয়, তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। কেবল ভর্তি হয়েছি। আন্দোলনটি শুরু হয় ফেব্রুয়ারি মাস থেকে। তখন আমার মনে হলো যে, যে কারণের জন্য আন্দোলনটি হচ্ছে, সেটি একেবারেই যৌক্তিক। আমি সরকারি চাকরি করি বা না করি, এটার জন্য দাঁড়ানো উচিত। ক্যাম্পাসের মোস্ট জুনিয়র ব্যাচ হিসেবে আমি ও আমার বন্ধুরা আন্দোলনে যুক্ত হলাম। সরকার শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে একধরনের সমাধানের পথে গিয়ে, অনেক নাটকীয়তা শেষে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা বাতিল করল। কিন্তু ২৪ সালে যখন হাইকোর্টে একজন কোটা বাতিলের বৈধতা নিয়ে রিট করলে, হাইকোর্ট কোটা বাতিল করার প্রজ্ঞাপনটিকে অবৈধ ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে আবার কোটা ফিরে আসে। অথচ ২০১৮ সালেও আমাদের দাবি ছিল সব শ্রেণিতেই কোটার সংস্কার। প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণিতে চাকরিপ্রত্যাশীর সংখ্যা তো কম, বরং তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণিতে অনেক বেশি। তাই সব শ্রেণিতেই কোটার একটি যৌক্তিক সংস্কার প্রয়োজন। সেই জায়গা থেকেই ২০২৪ সালেও কোটা সংস্কার আন্দোলনটি শুরু হয়।
বিষয়টি এরকম যে, সরকার ২০১৮ সালে চাপের মুখে কোটা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু যখনই তারা সুযোগ পেল, হাইকোর্টের মাধ্যমে বা হাইকোর্ট দেখিয়ে বিষয়টি আবারও ফিরিয়ে আনল। এতে আমাদের মনে হলো, ২০১৮ সালে যাঁরা অনেক পরিশ্রম করে আন্দোলনটি সফল করেছিলেন, তাঁদের সেই অর্জনের প্রাপ্তিটুকু হারানোর একটি শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আরেকটি বিষয় ছিল—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থী নিয়মিত লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করতেন, তাঁদের জন্য এটি একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মেধা দিয়ে প্রতিযোগিতার জায়গাটি যখন মাত্র ৪৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকে আর ৫৬ শতাংশই কোটায় চলে যায়। তো এটার একটা যৌক্তিক সংস্কার আমরা চেয়েছিলাম।
আমরা প্রস্তাব করেছিলাম—কোটা ১০ শতাংশ বা ১৫ শতাংশ রাখেন। কিন্তু এটি কখনোই ৫৬ শতাংশ হতে পারে না। এ প্রেক্ষিতে সব শ্রেণিতে কোটার সংস্কারের দাবিটা আমরা শুরু করি। ৫ জুন থেকে শুরু হলেও মাঝে ঈদের একটি ছুটি ছিল। ফলে ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার পর, জুলাইয়ের প্রথম থেকে মূল আন্দোলনটি শুরু হয়। জুলাই মাস শুরু হওয়ার এই সময়টা থেকেই আন্দোলন মূলত তীব্র হয়। পরবর্তী সময়ে আমরা চিন্তা করলাম যে ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ করলে কেউ কান দিচ্ছে না। তাই আমাদের শাহবাগে যাওয়া উচিত। এভাবেই এটি ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
স্ট্রিম: আপনারা যখন আন্দোলন শুরু করলেন, তখন কি ভেবেছিলেন যে এই আন্দোলন একটি সরকার পতনের আন্দোলনের দিকে বা একটি গণ-অভ্যুত্থানের দিকে চলে যাবে? এ ধরনের কোনো ধারণা বা পারসেপশন কি আপনাদের আগে থেকেই ছিল?
আসিফ মাহমুদ: প্রথমত, ২০১৮ সালের ওই আন্দোলনের পর থেকেই আমি ধীরে ধীরে ছাত্ররাজনীতি ও অ্যাক্টিভিজমের সঙ্গে যুক্ত হই। ক্যাম্পাসে আমাদের অনেক ইস্যু ছিল। গণরুম-গেস্টরুম নির্যাতন থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, এমনকি জাতীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও আমরা কাজ করেছি। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, আয়নাঘরের বিরুদ্ধে, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, এনআরসি-সিএএ-র বিরুদ্ধে আমরা দাঁড়িয়েছিলাম। মোদিবিরোধী আন্দোলনেও ছিলাম। ২০২২ সালে প্রায় দেড় মাসের মতো জেলে ছিলাম।
স্ট্রিম: সেটা কি মোদিবিরোধী আন্দোলনে?
আসিফ মাহমুদ: মোদিবিরোধী আন্দোলনে আমার নামে মামলা ছিল। তবে আমি গ্রেপ্তার এড়াতে পেরেছিলাম। পরে আমরা আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের তৃতীয় বর্ষ উপলক্ষে একটি শোক কর্মসূচির আয়োজন করতে চেয়েছিলাম। সেখানে ছাত্রলীগ আমাদের ওপর হামলা করে। উল্টো আমাদের নামেই মামলা দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। তাই ব্যক্তিগতভাবে আমার বা আমাদের জন্য এটিই প্রথম আন্দোলন ছিল না। এর আগে অনেকগুলো আন্দোলন আমি নিজে অর্গানাইজ করেছি, অংশগ্রহণ করেছি। মূলত সংগঠকের জায়গাতেই আমি বেশি দায়িত্ব পালন করেছি। ছোট মানববন্ধন থেকে শুরু করে বড় আন্দোলন পর্যন্ত ধরলে, এই সংখ্যাটি অন্তত ১০০-এর কাছাকাছি হবে। ফলে আগে থেকেই আমাদের মধ্যে একটি অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট বা অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট মনোভাব ও আকাঙ্ক্ষা ছিল। সেই জায়গা থেকে সব আন্দোলনেই আমাদের একটি প্রচেষ্টা থাকত—যদি সম্ভব হয়, তবে বিষয়টিকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া যায় কি না। কিন্তু ওই সময়কার পরিস্থিতি এমন ছিল এবং ফ্যাসিবাদ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, একটি অরাজনৈতিক ছাত্র আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানের রূপ নেবে, তা কল্পনা করাও কঠিন ছিল। এরপরও সম্ভবত ৭ কি ৮ জুলাইয়ের দিকে এক সহযোদ্ধাকে বলেছিলাম, যদি আমরা এই আন্দোলন থেকেও সুযোগ পাই, তবে হয়তো একে সরকার পতনের আন্দোলনের দিকে নিয়ে যাব।
আমাদের একটি অংশ অবশ্যই চাকরির দাবি নিয়ে আন্দোলনে এসেছিলেন। কিন্তু লিডারশিপ বা নেতৃত্বের বড় একটি অংশ—যাঁরা সামনে থেকে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন, তাঁদের অনেকেই ছিলেন পলিটিক্যালি অ্যাফিলিয়েটেড বা রাজনৈতিকভাবে সচেতন। যেমন—আমি কখনো সরকারি চাকরি করব, এমন চিন্তা আমার ছিল না। কলেজজীবন থেকেই এই ভাবনা আমার মধ্যে ছিল না। তাহলে আমি কেন এলাম? আমার কাছে এটি ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের একটি সুযোগ এবং যদি এটার থেকে সম্ভব হয় ফ্যাসিবাদের পতন ঘটানো বা ফ্যাসিবাদকে চ্যালেঞ্জ করা, আই উইল ডু দ্যাট। যাঁরা রাজনৈতিকভাবে আগে থেকেই সচেতন ছিলেন, যুক্ত ছিলেন এবং অ্যাক্টিভিজমের সঙ্গে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে এই মোটিভেশনটি ছিল।
স্ট্রিম: জুলাই আন্দোলনে যাঁরা পরাস্ত বা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন, তাঁরা এই অভিযোগ করেন যে—আপনারা আসলে দক্ষিণপন্থী। আপনারা গোপনীয়তার সঙ্গে কাজ করতেন এবং সুযোগ বুঝে দেশকে ডানপন্থী বা দক্ষিণপন্থী ধারায় নিয়ে যাওয়ার জন্য একত্র হয়েছিলেন। এই আন্দোলন এবং অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেটাই ঘটেছে বলে তাঁরা দাবি করেন। এ ধরনের অভিযোগের জবাবে আপনারা অবশ্য কথা বলছেন, তবে এখানে কী বলবেন?
আসিফ মাহমুদ: রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার জন্য এটি মূলত তাদের একটি ন্যারেটিভ। আমাদের এই আন্দোলনে যাঁরাই সামনের সারিতে ছিলেন, তাঁরা আগে থেকেই সবার পরিচিত মুখ। এই আন্দোলনের আগে আমি দুটি ছাত্র সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির দায়িত্বে ছিলাম। একটিতে সভাপতি এবং আরেকটিতে আহ্বায়ক ছিলাম। ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি ছিলাম। পরে সেখান থেকে পদত্যাগ করে আমরা যখন 'ছাত্রশক্তি' গঠন করি, সেটির আহ্বায়ক ছিলাম। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজনৈতিক পরিসরে আমি আগে থেকেই পরিচিত। আমি প্রকাশ্যে রাজনীতি করেছি, ছাত্ররাজনীতি করেছি, আক্রমণের শিকার হয়েছি, জেলেও গিয়েছি। আমার এসব কর্মকাণ্ড সবার কাছেই ওপেন। ক্যাম্পাসে আমার ছয়-সাত বছরের রাজনৈতিক বেড়ে ওঠার বিষয়টিও খুবই পরিষ্কার। নাহিদ ইসলামও প্রকাশ্যে তাঁর অ্যাক্টিভিজম চালিয়ে গেছেন। একটা সময় তাঁরা পাঠচক্র করেছেন। তিনিও একসময় ছাত্র অধিকার পরিষদে ছিলেন। আখতার হোসেনও আগে থেকেই পরিচিত মুখ। তিনি ২০১৯ সালে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক ছিলেন। হাসনাত আব্দুল্লাহও আগে থেকেই অ্যাক্টিভিজম করতেন। তবে তিনি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সেভাবে যুক্ত ছিলেন না।
সারজিস আলমও একটা সময় পর্যন্ত ছাত্রলীগের সঙ্গে হয়তো কিছুটা জড়িত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি এই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে নেতৃত্বে এসেছেন। সুতরাং, আমাদের সবার ব্যাকগ্রাউন্ডই মানুষের জানা। এমন তো নয় যে কেউ বাইরে থেকে ট্রেনিং নিয়ে হঠাৎ করে চলে এসেছে! দাবি করা হয়েছে যে আমরা নাকি দেশটাকে একটি নির্দিষ্ট এজেন্ডার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। এখন, একটি গণ-অভ্যুত্থানের ফলাফলের দিক থেকে যদি চিন্তা করেন যে, অভ্যুত্থানের পর কোন শক্তিগুলো এখানে শক্তিশালী হলো বা সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতা কারা পূরণ করল—তার একটি স্বাভাবিক ব্যাখ্যা আছে।
একটা সেন্টার লেফট পলিটিক্যাল পার্টি যখন ফ্যাসিস্ট পার্টি হয়ে ওঠে এবং তখন তার ওই অপ্রেশনের কারণে সেন্টার রাইট টু রাইট যারা এই অঞ্চলে রাজনীতিটা করছেন তারা তো বিগত ১৭ বছরে মানুষের একটা সহানুভূতি পেয়েছেন। ফলে এই গণ-অভ্যুত্থানে তারাও অংশগ্রহণ নিয়েছে। তাই ৫ আগস্টের পর যখন ফ্যাসিবাদের ওই অংশটি রাজনীতি থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল, তখন স্বাভাবিকভাবেই ডানপন্থী অংশটির রাজনৈতিক উপস্থিতি বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। তবে এই পরিস্থিতিকে রাজনীতি দিয়েই মোকাবিলা করতে হবে। যেমনটি গণতান্ত্রিক উপায়ে বিএনপি করছে। একটু খেয়াল করলে দেখবেন, এই অভ্যুত্থানের আগে বিএনপির যে 'সেন্টার টু সেন্টার-রাইট' অবস্থান ছিল, অভ্যুত্থানের পর তারা সেখান থেকে 'সেন্টার টু সেন্টার-লেফটে' এসে নিজেদের রাজনীতিতে একটি পরিবর্তন এনেছে। ফলে একটি গণতান্ত্রিক সরকার আসার পর এই জায়গাটি আবারও মোটামুটি একটি ভারসাম্যে চলে এসেছে। সামনে এটি আরও আসবে। তবে এর মধ্যে যে ওই ধরনের প্রবণতা (উগ্রপন্থার) দেখা যায়নি, তা নয়। এমনটি হয়েছে। অনেকেই অনেকভাবে এটি করার চেষ্টা করেছেন। কারণ এখানে অনেকের অনেক স্বার্থ জড়িয়ে আছে।
স্ট্রিম: আপনারা কি কোনো বিকল্প নেতৃত্বের ব্যবস্থা রেখেছিলেন যে, আপনারা যদি গ্রেপ্তার হন বা আটকে পড়েন...
আসিফ মাহমুদ: একটি পরিকল্পনা আমাদের আগে থেকেই ছিল। এই আন্দোলনে প্রথম থেকেই আমাদের একটি নীতি পলিসি ছিল যে, আমরা নেতৃত্ব নির্দিষ্ট করে দেব না। অর্থাৎ, আমরা বলে দেব না যে নাহিদই নেতা, আসিফই নেতা কিংবা অমুক-তমুক নেতা। এ ক্ষেত্রে আমরা একটি ‘রোটেটিং সিস্টেম’ বা পালাবদলের পদ্ধতি অনুসরণ করতাম। সাধারণত কর্মসূচিতে কী হয়—যিনি সবার শেষে বক্তব্য দেন, তিনিই নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। এ কারণে আমাদের যে কমিটি প্রকাশ করা হয়, সেখানেও সবাইকে ‘সমন্বয়ক’ হিসেবে সমান পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়র-জুনিয়রের ভিত্তিতে নামের একটি তালিকা উপর-নিচ করা হয়েছিল এবং জুনিয়রদের ‘সহ-সমন্বয়ক’ পদ দেওয়া হয়েছিল। তাই কাউকে সুনির্দিষ্ট পদবি দিয়ে আলাদাভাবে নেতা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ ছিল না। আমাদের কোনো ‘প্রধান সমন্বয়ক’ ছিল না, সবাই সমন্বয়ক। আর কর্মসূচির শেষ বক্তব্যের বিষয়টিও আমরা প্রতিদিন পালা করে দিতাম। একদিন নাহিদ ভাই, একদিন সারজিস ভাই, একদিন আমি, একদিন হাসনাত ভাই, আবার কোনোদিন অন্য কেউ দিতেন।
স্ট্রিম: যাতে সরকার টার্গেট করে নির্দিষ্ট কাউকে ধরতে না পারে?
আসিফ মাহমুদ: হ্যাঁ, যাতে টার্গেট করতে না পারে। কারণ আমরা আগের আন্দোলনগুলোতে দেখেছি—নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে টার্গেট করা হয়, সুনির্দিষ্টভাবে তাঁর চরিত্র হনন করা হয়, তাঁর ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা হয় এবং জামায়াত-শিবির ট্যাগ দিয়ে মূলত আন্দোলনটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়। তবে এসবের পরও স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি নেতৃত্ব ঠিকই উঠে এসেছে…
স্ট্রিম: এই শিক্ষাটা আপনারা কোথা থেকে পেয়েছেন? আপনি বলছিলেন যে আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে, সেখান থেকেই কি?
আসিফ মাহমুদ: এটা আগের আন্দোলনগুলো থেকে আমরা দেখেছি। যেমন, আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে আমরা যখন আন্দোলন করলাম, তখনো চিহ্নিত করা হলো যে—এরা অমুক পরিষদ করে, এরা সাবেক শিবির, এদের আন্দোলনে যাওয়া যাবে না। এভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে একধরনের ভীতি তৈরি করা হয়। সেই জায়গা থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল, প্রতিদিন নতুন নতুন মুখ সামনে আসবে। কিন্তু আন্দোলন যখন একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে চলে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কিছু কেন্দ্রীয় চরিত্র তৈরি হয়। এটি এমন নয় যে আমরা কাউকে নির্দিষ্ট করে দিচ্ছি। সিনিয়রিটি, রাজনৈতিক জানাশোনা ও বোঝাপড়া অথবা আন্দোলনের অভিজ্ঞতার জায়গা থেকেই এটি হয়। কারণ, কর্মসূচি ঠিক করার সময় কে বেশি ইনপুট দিতে পারছেন বা কার বক্তব্য ভালো হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করেও ধীরে ধীরে নেতৃত্ব গড়ে ওঠে। এরপর ১৬-১৭ তারিখের পর গিয়ে মোটামুটি একটি চিত্র পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল যে, ঠিক আছে, এই চার-পাঁচজন সামনে আছেন। কিন্তু এর আগ পর্যন্ত, জুন থেকে ধরলে প্রায় দেড় মাসের আন্দোলনে, কারা আসলে নেতৃত্বে আছেন, সেটি বোঝা যাচ্ছিল না।
স্ট্রিম: এখানে একটি প্রশ্ন আসে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মোটামুটি দমন করে ফেলার পর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যুক্ত হলো। রিক্সাচালক, শ্রমিক, দোকানদার সর্বোপরি সাধারণ মানুষ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হলেন। এটি কি স্বতঃস্ফূর্তভাবে হয়েছে, নাকি আপনাদের একধরনের সমন্বয় বা যোগাযোগ স্থাপন করতে হয়েছিল?
আসিফ মাহমুদ: যখন ক্যাম্পাস বন্ধ হবে হবে আলাপটা আমাদের কানে আসতে শুরু করে। বিশেষ করে ১৪ তারিখ রাতেই যখন শেখ হাসিনার ওই বক্তব্যের প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে একধরনের বিক্ষোভ হয় এবং ছাত্রলীগের সাথে ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একধরনের ক্ল্যাশের সিচুয়েশন তৈরি হয় তখন আন্দোলনটা নতুন মাত্রা পায়। ১৪ তারিখ রাতে এবং ১৫ তারিখ ছাত্রলীগ হল ছেড়ে পালায় এবং ক্যাম্পাসের সম্পূর্ন নিয়ন্ত্রণ তারা হারিয়ে ফেলে। তখনই আমরা বুঝতে পারছিলাম যে ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেওয়া হবে। এরকম একটা সংবাদও কানাঘুষার মধ্য দিয়ে আসছিল।
তখন আমরা আমাদের বক্তব্য ও ভিডিওবার্তায় খুব সুনির্দিষ্টভাবে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানানো শুরু করি। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদেরও আহ্বান জানাতে থাকি। ১৪, ১৫ ও ১৬ তারিখের ভিডিওবার্তাগুলোতে মূলত এই মেসেজগুলোই ছিল। একই সঙ্গে আমাদের যে যোগাযোগের জায়গাটি ছিল—আন্দোলনের শুরুর দিকেই আমরা সাত কলেজের অনেক শিক্ষার্থীকে নিয়ে টিএসসিতে বসেছিলাম, একটি সমন্বয় করেছিলাম। তারা তাদের কলেজগুলো থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে মহাখালী, নিউমার্কেট ও সায়েন্সল্যাবে বেরিয়ে আসে। এখানে আমি বলব, ছাত্রসংগঠনগুলো একটি ভালো ভূমিকা পালন করেছে। তারা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিসসহ বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাঠে নিয়ে আসে। একটি সম্মিলিত দৃষ্টিভঙ্গি অ্যাপ্রোচ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই শিক্ষার্থীরা নেমে এসেছিল। যখন দমন-পীড়নের মাধ্যমে পাবলিক ইউনিভার্সিটিগুলোকে থামিয়ে দেওয়ার বা বন্ধ করার চেষ্টা করা হলো এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা হচ্ছিল, তখন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা, মাদ্রাসা এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের একটি নতুন ফ্রন্ট খুলে দেয়। যেমন—যাত্রাবাড়ীর পুরো জোনটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দখলে ছিল। আবার বাড্ডা ও উত্তরা জোন ছিল প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের দখলে। তখন সরকারকে বাধ্য হয়ে আরেকটি ফ্রন্টে মনোযোগ দিতে হয়। এর ফলে আমরা কিছুটা শ্বাস ফেলার সুযোগ পাই। কিন্তু পাবলিক ইউনিভার্সিটিগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে আসলে কিছু করার সুযোগ ছিল না। শিক্ষার্থীদের হল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। অধিকাংশ শিক্ষার্থীই বাড়ি চলে গিয়েছিল। অনেকে শুধু আন্দোলন করার জন্যই ঢাকায় কোনোভাবে আশ্রয় নিয়েছিল। যখন নতুন ফ্রন্টগুলো খুলে যায়, তখনই সরকার বুঝতে বাধ্য হয় যে মাঠে তারা আর এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ফলে, যখন কমপ্লিট শাটডাউন চলছিল, তখন তারা ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় এবং আন্দোলনের নেতৃত্বকে তুলে নেওয়া বা গুম করা শুরু করে।
কিন্তু আমরা ভাগ্যবান ছিলাম যে, আমাদের পরের স্তরে বা জুনিয়রদের মধ্যে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা ওই সময়ে এসে আন্দোলনের হাল ধরেন। আবদুল কাদের তখন ৯ দফা ঘোষণা করে। সেটিতে আমাদের মোটামুটি সবারই সম্মতি ছিল। আমরা ঠিক করেছিলাম যে, কোটা আন্দোলন থেকে সরে গিয়ে এবার আমরা সরকারের ওই চারজন মন্ত্রীর পদত্যাগ এবং সরকারের ক্ষমা প্রার্থনাসহ অন্যান্য দাবিতে এগোব। এটি ছিল কোটা আন্দোলন থেকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে একটি ট্রানজিশন। একই সঙ্গে সরকারও ইন্টারনেট বন্ধ করার মধ্য দিয়ে আরও কঠিন ক্র্যাকডাউনের দিকে যায়।
স্ট্রিম: তখন তো আপনাদের ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য নানা রকম অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছিল। টেলিভিশনে গিয়ে কিছু লোক নানা রকম বক্তব্য রাখছিলেন, পাশাপাশি নানা অপপ্রচারও চলছিল।
আসিফ মাহমুদ: হ্যাঁ, তখন ওই পুরোনো কৌশল অনুযায়ী আমাদের রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড খুঁজে বের করা হচ্ছিল এবং জামায়াত-শিবির ট্যাগ দেওয়া হচ্ছিল। এরপর যে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটছিল, সেগুলো তো আওয়ামী লীগ সরকার ও তাদের গুন্ডাবাহিনীই করছিল। কিন্তু এর দায় অনেকটা ছাত্রনেতাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়—যেন আমরা আন্দোলন করছি বলেই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটছে। এমনকি আমাদের দাবিগুলো আদায় হয়ে যাওয়ার পরও যখন আমরা ডিটেনশনে ছিলাম। তখন আমাদের বলা হচ্ছিল, ‘সব দাবি তো আদায় হয়ে গেছে, তাহলে এখন কিসের আন্দোলন? তোমরা প্রোগ্রাম ডাকছ, মানুষ এসে মারা যাচ্ছে—এর দায় কার? এর দায় তো তোমাদের।’ এভাবে মানসিকভাবে আমাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করার চেষ্টা চলছিল।
আন্দোলনে তো শুরুতে সব ধরনের মানুষই এসেছিলেন। আমাদের একটি রাজনৈতিক বোঝাপড়া ছিল বলে আমরা এসেছি; কিন্তু অনেকে এসেছেন একেবারে সাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে, অনেকে চাকরি পাওয়ার জায়গা থেকে এসেছেন, আবার অনেকে বৈষম্যবিরোধী চেতনা থেকে এসেছেন।
স্ট্রিম: আপনার কি মনে হয় যে, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা মূল্যস্ফীতির চাপ এবং অর্থনৈতিক সংকট—এগুলো মানুষকে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্ররোচিত করেছে?
আসিফ মাহমুদ: সরকারবিরোধী যে সেন্টিমেন্ট বা ক্ষোভ ছিল, সেটিকে আরও পরিপক্ব করেছে মূলত এই অর্থনৈতিক সংকট এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। কারণ ২০১৩-১৪ সাল থেকেই তো বিরোধী দলের ওপর, বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়ন, বাক্স্বাধীনতা হরণ, মিডিয়া দখল—এগুলো তো চলছিলই। কিন্তু শুধু এগুলোই সাধারণ মানুষকে সেভাবে ক্ষুব্ধ করে না। সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে কোন জিনিসটি? এই অর্থনৈতিক সংকট বা তাদের জীবনের সংকট। যখন এই দমন-পীড়নের মাত্রা এমন পর্যায়ে চলে গেল যে সাধারণ মানুষও আর রক্ষা পাচ্ছিল না, এমনকি আওয়ামী লীগের মধ্যেও কেউ ভিন্নমত পোষণ করলে তাকেও আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছিল—তখন মানুষের মনের সেই ক্ষোভ এক ধরণের ম্যাচিউরিটি লাভ করে। ওই ম্যাচিউরড সিচুয়েশনটা তৈরি না হলে কিন্তু এই আন্দোলনে মানুষ এত বিপুলভাবে অংশগ্রহণ করত না। আর মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া এটি সফল হওয়ারও কোনো সুযোগ ছিল না।
স্ট্রিম: শেষ দিকে যখন ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণার বিষয়টি এল, তার আগে সেনাসদরে সেনাবাহিনী একটি অবস্থান নিল যে, তারা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালাবে না। ওই সময়ে ৬ তারিখে নয়, ৫ তারিখেই ‘মার্চ টু ঢাকা’ হবে—এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কারা কারা ছিলেন? তা নিয়ে কি আপনাদের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য ছিল?
আসিফ মাহমুদ: ৩ তারিখে এক দফা ঘোষণার পর রাতের আলোচনায় আমাদের যে সিদ্ধান্তটি ছিল, সেটি হলো—৪ তারিখে সারা দেশে যথারীতি গণজমায়েত কর্মসূচি পালিত হবে। এই কর্মসূচি ৩ তারিখেই ঘোষণা করা হয়েছিল। তো মোটামুটি সিদ্ধান্ত ছিল যে, ৪ তারিখে আমরা আবার মাঠে গিয়ে শাহবাগ থেকে পরের দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করব। এখন কর্মসূচিটি কী হবে? সেটি ছিল, ৫ তারিখে আমরা শ্রমিক সমাবেশ, নারী সমাবেশ এবং লেখক-বুদ্ধিজীবীসহ সিভিল সোসাইটিকে নিয়ে একটি সমাবেশ করব। এর মাধ্যমে আমরা সমাজের বিভিন্ন অংশকে আমাদের এই আন্দোলন, অসহযোগ এবং এক দফার সঙ্গে যুক্ত করব। এরপর ৬ তারিখের জন্য আমরা ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিটি রেখেছিলাম, যাতে মানুষ ঢাকায় এসে জড়ো হতে পারে। আমরা চাচ্ছিলাম না ইমম্যাচিউর কোনো পদক্ষেপ নিতে। তখনো এই নিশ্চয়তা ছিল না যে সেনাবাহিনী গুলি করবে না। সেনাবাহিনী যদি গুলি চালাত, তবে আমরা যত বড় পদক্ষেপ নিয়েই এগোই না কেন, সেখানে তাদের কামান ও ট্যাংক প্রস্তুত ছিল। সেই জায়গা থেকেই ঢাকায় জড়ো হওয়ার প্রাথমিক পরিকল্পনাটি ছিল ৬ তারিখে।
স্ট্রিম: ৩ তারিখে সেনাসদরের যে বৈঠকটি হয়, সেখান থেকে কি আপনারা কোনো রাজনৈতিক বার্তা পাননি?
আসিফ মাহমুদ: আমরা বার্তাটা পেয়েছিলাম, তবে আমরা শিওর ছিলাম না যে এর ওপর আমরা কতটা ভরসা রাখতে পারি। কারণ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন জায়গায় গুলি করছে সেটাও আমরা দেখছিলাম, ছবি আসছিল, ভিডিও আসছিল। এবং আমরা দেখছিলাম ইউএন-এর হেলিকপ্টারও ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে আমরা বুঝতে পারছিলাম না যে কে কোন পক্ষে আছে বা পরিস্থিতি আসলে কী।
তবে ওই বার্তাটি আমাদের মধ্যে অবশ্যই একটি সাহসের সঞ্চার করেছিল। পরে ৪ তারিখে যখন আমাদের বের হওয়ার কথা, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা কয়েকজন বের হতে পারিনি। আমার সঙ্গে আবু বাকের মজুমদার, মুয়াজ্জেম হোসেনসহ আরও কয়েকজন ছিলেন। আমরা যে জায়গাটায় আশ্রয় নিয়েছিলাম, সেদিন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ অলিতে-গলিতে সব জায়গায় এমনভাবে পাহারা বসিয়েছিল, যাতে কেউ আন্দোলনে যেতে না পারে। সেখানে তাদের পাহারাটি ছিল ঠিক আমাদের ওই বিল্ডিংয়ের নিচে। ফলে আমি অনেক চেষ্টা করেও বের হতে পারিনি। নাহিদ ভাই তখন শাহবাগে ছিলেন। নিরাপত্তার কারণে তাঁর ফোনটি বন্ধ রাখতে হয়েছিল। কারণ, ফোন খোলা রাখলেই ট্র্যাক করে ধরে নিয়ে যাওয়ার শঙ্কা ছিল। তো পরে, আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই আমি দুপুর ১২টা কি ১টার দিকে একটি ভিডিও বার্তা দিই যে—৫ তারিখে সমাবেশ হবে। ৬ তারিখে হবে লংমার্চ।
তখন আমাদের কাছে তথ্য আসতে শুরু করে যে—আওয়ামী লীগ ঢাকার আশপাশের জেলাগুলো থেকে ট্রাকে ভরে ভরে মানুষ ঢাকায় নিয়ে আসছে। তারা ঢাকা দখল করার একটি পরিকল্পনা করছে। তখন আমাদের মনে হলো, আমরা কি তাদের ৬ তারিখ পর্যন্ত এই সময়টুকু দেব? এটি একটি বড় উদ্বেগ ছিল। আরেকটি বিষয় আলোচনায় আসছিল যে আবারও ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আর আমাদের আগের অভিজ্ঞতা বলছিল, ইন্টারনেট বন্ধ হলে আন্দোলন একেবারেই পিছিয়ে যায়; যেমনটি ২৫-২৬ তারিখের দিকে আন্দোলন প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। সেই শঙ্কা থেকে তখন কথা উঠতে শুরু করে যে, আমরা কর্মসূচিতে পরিবর্তন আনব কি না। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে তখন আবদুল কাদের ও মাসুদ ফোন দিয়ে বলে যে ভাইয়া এটা আমরা রিথিংক করব কি না। তখন আমি ওদের বলি, আমি তো নাহিদ ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না; তাই এই সিদ্ধান্তটি আমার একা নেওয়া কঠিন হয়ে যাবে। কারণ, এর ফলাফল যদি পুরোপুরি নেতিবাচক হয় এবং আমরা যদি ব্যর্থ হই—কারণ মাত্র এক দিনে মানুষের ঢাকায় পৌঁছানোটা খুবই কঠিন একটি ব্যাপার ছিল।
কিন্তু শুনলাম ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাবে। সবকিছু মিলিয়ে যখন একটা ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিল। আবার পাশাপাশি এ-ও শুনলাম যে সেনাবাহিনী গুলি করবে না। তখন ওই জায়গা থেকে আমি সিদ্ধান্তটি নিই। আমি একটি হোয়াটসঅ্যাপ কলে আরও চার-পাঁচজনকে যুক্ত করি। বাকের সেখানে ছিল, মাহিন ছিল। শেষ পর্যন্ত সাহস করেই আমরা সিদ্ধান্তটি নিয়ে নিই। আগের কর্মসূচিটি পরিবর্তন করে তিন ঘণ্টা পরই আমি আরেকটি ভিডিও বার্তা দিয়ে ৫ তারিখে লংমার্চের ঘোষণা দিই। যদিও ভেতরে ভয় ও আতঙ্ক ছিল—যদি শেষ পর্যন্ত আমরা সফল হতে না পারি! কারণ, রাস্তাগুলোতে ব্যারিকেড দেওয়া ছিল, ফলে আশপাশের জেলা থেকে মানুষজন হয়তো আসতে পারবে না। আর ঢাকায়ও যদি পর্যাপ্ত মানুষ না নামে, তবে চূড়ান্ত ডাক দেওয়ার পর তো আসলে আর কিছু বাকি থাকে না। চূড়ান্ত ডাকের পর আপনি যদি ব্যর্থ হন, তবে আপনার সবকিছু শেষ। তবে সৌভাগ্যবশত, পরের দিন মানুষ ঠিকই রাস্তায় নেমে এসেছিল।
স্ট্রিম: সেটি কি আপনাদের কাছে অভাবিত মনে হয়েছিল, এতটা আশা করেননি?
আসিফ মাহমুদ: আমরা আশা নিয়ে ছিলাম যে মানুষ নামবে। কিন্তু এত বড় পরিসরে মানুষ নামবে, তা ভাবিনি। আমার মনে হয় সেদিন ঢাকা শহরের কোনো রাস্তাই খালি ছিল না। এত মানুষ নেমে এসেছিল! আর আমার মনে হয়, ৫ আগস্ট সকালেই সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড হয়েছিল। ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষকে সেদিন খুন করা হয়েছিল; পুরো এক দিনেও নয়, মাত্র এক প্রহরে অর্থাৎ সকালের মধ্যেই। আমি নিজে তখন চানখাঁরপুলে ছিলাম। সেখান দিয়ে আমি শাহবাগের দিকে ঢোকার চেষ্টা করছিলাম। সেখানেই আমার চোখের সামনে ৫ জন নিহত হন এবং আরও ১৫-২০ জনের মতো গুলিবিদ্ধ হন। তখন আমার মনে হচ্ছিল, পুরো ঢাকায় বোধ হয় এমনই পরিস্থিতি চলছে। আমরা হয়তো হেরে যাচ্ছি বা পরাজিত হচ্ছি। ওই সময় বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য আসছিল যে সামরিক শাসন জারি হতে পারে। আরও অনেক মৃত্যুর খবর আসছিল—এই মোড়ে ২৫ জন, ওই মোড়ে ৩০ জন মারা গেছেন। সেটি খুবই ভয়াবহ একটি পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু হঠাৎ আমরা দেখলাম, চারদিক থেকে মানুষের ভিড় এমনভাবে আসতে শুরু করল—যাত্রাবাড়ী থেকে এল, চানখাঁরপুল থেকে এল, বকশীবাজার থেকে এল। পরিস্থিতি দেখে পুলিশ ও এপিবিএন জিপ নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেল। এরপর শাহবাগের দিকে গিয়ে দেখলাম পুরো এলাকা ইতিমধ্যে জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। ঠিক তখনই খবর পেলাম যে গণভবন ইতিমধ্যেই আন্দোলনকারীদের দখলে চলে গেছে। তখন আমরা শাহবাগ থেকে সংসদ ভবনের দিকে রওনা হলাম।
স্ট্রিম: ড. ইউনূসের সঙ্গে যে যোগাযোগ তৈরি হলো। তাঁকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান করা হলো। এই সিদ্ধান্তটি কি আপনাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত ছিল? নাকি এটি বিচ্ছিন্নভাবে হয়েছিল?
আসিফ মাহমুদ: ওই সময়টাতে খুব গুছিয়ে বা সুসংগঠিতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা একটু কঠিন ছিল। যেমন ধরুন, লংমার্চের মতো একটি বড় ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ও আমি সবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। যাঁরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের অনেকেই আমার ফেসবুক ঘোষণা দেখে জানতে পেরেছেন যে লংমার্চ টু ঢাকা এক দিন এগিয়ে আনা হয়েছে। তাঁরাও তখন সেটিই অনুসরণ করেছেন। মানে তখন আমাদের মধ্যে এমন একটি বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল যে, হয়তো আমরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না, কিন্তু কোনো নির্ভরযোগ্য জায়গা থেকে সিদ্ধান্ত এলে সবাই সেটিই মেনে চলবে। সবাই সেটিই সমানভাবে পোস্ট করবে এবং বাস্তবায়নের জন্য কাজ করবে। তো, ২ তারিখে যখন আমরা এক দফা ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিই, তার মানে তো আমরা স্থির করেই ফেলেছি যে শেখ হাসিনার পতন ঘটাব। ছাত্ররাজনীতি করতে গিয়ে এটিই শিখেছি যে, পরের ধাপটি আগে থেকেই ভেবে রাখতে হয়। সেই জায়গা থেকেই ভাবা শুরু হয় যে, পতনের পর তাহলে কী হবে? তখন আমাদের ভাবনা ছিল যে, সংস্কারসহ অন্যান্য কাজ করার জন্য হয়তো আমরা একটি জাতীয় সরকার গঠন করব। সেই জায়গা থেকে বিভিন্ন নামের প্রস্তাব আসতে শুরু করে এবং আমরা সবাইকে জিজ্ঞেস করতে থাকি যে আসলে কে প্রধান হতে পারেন। বেশির ভাগ মানুষই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামটি বলছিলেন। আর দ্বিতীয় কোনো নাম, যিনি তাঁর সমসাময়িক বা সমপর্যায়ের হতে পারেন—যেমন আমরা অনেক সময় দুই-তিনজনের একটি শর্টলিস্ট করি—সেটিও আসলে হয়ে উঠছিল না। কারণ তাঁর মাপের আর কাউকে আমরা পাচ্ছিলাম না।
আমার মনে পড়ে, ২ তারিখে আমি আলী রীয়াজ স্যার ও বদিউল আলম মজুমদার স্যারের সঙ্গে কথা বলি। তাঁদের সঙ্গে আমার আগে থেকেই কথা হতো। তো আলী রীয়াজ স্যার আমাকে বলেন যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাজি হবেন না, তিনি এই দায়িত্ব নিতে চাইবেন না। পরে আমি তাঁদের কাছ থেকে যোগাযোগের মাধ্যম সংগ্রহ করি। এখানে আরেকজন ছিলেন, সাবেক ছাত্রদলের এক বড় ভাই আশিক—তিনিও ড. ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছিলেন। তো আমি ড. ইউনূসের টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং জানাই যে আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই। এরপর ৩ তারিখে তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম কথা হয়। তিনি তখন প্যারিসে ছিলেন এবং তাঁর একটি মাইনর অপারেশন হওয়ার কথা ছিল। তাঁর সঙ্গে কথা হলো, আমি তাঁকে বললাম যে আমরা তো এক দফা ঘোষণা করেছি, এখন আমরা আপনার সমর্থন চাই। তিনি বললেন, ‘আমার সমর্থন আছে। আন্তর্জাতিকভাবে আমি হয়তো বিষয়টি দেখব।’ তখন আমি তাঁকে বলি, যদি এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয় যে সরকারের পতন ঘটে, তবে আমরা চাই আপনি দায়িত্বটি গ্রহণ করুন। কিন্তু তিনি নিশ্চিত ছিলেন না যে সরকারের সত্যিই পতন হবে। ফলে আমার দিক থেকেও প্রস্তাবটি খুব জোরেশোরে দেওয়া হয়নি। তবু তিনি প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি বললেন যে, ‘আমি আসলে এই কাজের জন্য উপযুক্ত নই। ২০০৭ সালের দিকেও এমন একটি বিষয় এসেছিল, কিন্তু আমি আসলে এসবে আসিনি।’ তখন আমি তাঁকে বললাম, ‘স্যার, আপনি বিষয়টি নিয়ে অন্তত ভেবে দেখুন।’
এরপর ৪ ও ৫ তারিখেও তাঁর এবং তাঁর টিমের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। ৫ তারিখ বিকেলে যখন শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলেন, তখন তাঁর সঙ্গে আমার আবার কথা হয়। আমি তাঁকে বললাম, ‘এখন তো সময় হয়ে গেছে, আমাদের আসলে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ তখন তিনি কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে বললেন, ‘তোমরা এঁদের কথা ভাবতে পারো কি না দেখো।’ ড. আলী রীয়াজ, সালেহউদ্দিন আহমেদ বা ড. আসিফ নজরুল—এমন কয়েকটি নাম তিনি প্রস্তাব করলেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এমন যে, অন্য যেকোনো কাউকে আমরা যেন বিবেচনা করি। তখন আমি তাঁকে বললাম, ‘আমরা যে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি এবং এই গণ-অভ্যুত্থানের পর আমাদের যে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, সেটি আপনার মতো ব্যক্তিত্ব ছাড়া অন্য কাউকে দিয়ে সমাধান হবে বলে আমি কল্পনাও করতে পারছি না।’ তখন তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি ভেবে দেখছি এবং জানাচ্ছি। তবে তোমরা বিকল্প খুঁজতে থাকো।’ এর মধ্যে বিষয়টি নিয়ে হয়তো নাহিদ ভাই, মাহফুজ ভাইসহ আরও দু-একজনের সঙ্গে আমার অল্পস্বল্প আলাপ হয়েছিল। খুব বড় পরিসরে আলোচনা করার সুযোগ তখন হয়নি। আমি তাঁদের শুধু অবহিত করেছিলাম যে আমি যোগাযোগ করছি। তাঁরাও বলেছিলেন, ‘ঠিক আছে, যোগাযোগ করে দেখো কী হয়।’ তবে সবার মধ্যেই একটি ধারণা ছিল যে, তিনি হয়তো শেষ পর্যন্ত আসবেন না।
এমনকি ৫ আগস্ট রাতে ৪টা-৬টার দিকে তো তাঁর সঙ্গে আমার কথা হলোই, ১১টায় যখন আসিফ নজরুল স্যারের সঙ্গে দেখা হলো। তিনিও বললেন, ‘ইউনূস স্যার আসবেন না। তাঁকে আমি ২৫ বছর ধরে চিনি, তিনি দায়িত্ব নেবেন না।’ আলী রীয়াজ স্যারও বলছিলেন যে তিনি আসবেন না। তো রাতে আমরা তাঁকে আবারও অনুরোধ করি। আমি আর নাহিদ ভাই রাত ১টা-দেড়টার দিকে তাঁর সঙ্গে খুব আর্জেন্সি নিয়ে কথা বলি। আমরা বলি যে, ‘আমাদের এখন আপনার নামটাই ঘোষণা করতে হবে। হ্যাঁ কিংবা না—যা-ই হোক, একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নামটা ঘোষণা করতে হবে। কারণ, দেশ এখন নেতৃত্বহীন অবস্থায় আছে এবং একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়ে গেছে।’ যদিও সরকার গঠন হয়েছিল তিন দিন পর, কিন্তু তখন আমাদের মনে হয়েছিল যে, অন্তত নামটা ঘোষণা করা গেলে মানুষের মধ্যে একটি আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে। পরিস্থিতিও আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কারণ তখন সামরিক শাসন জারি হতে পারে বা অন্য কেউ ক্ষমতা নিতে পারে—এমন অনেক ধরনের কথা শোনা যাচ্ছিল। তখন তিনি বললেন, ‘তাহলে তো তোমাদের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলতে হবে।’ এরপর প্রায় এক-দেড় ঘণ্টার মতো আমাদের কথা হলো। এপাশে আমি ও নাহিদ ভাই ছিলাম, আর ওপাশে তিনি ছিলেন। তিনি তাঁর বেশ কয়েকটি কনসার্নের কথা জানালেন। তিনি জানতে চাইলেন যে তাঁকে কি পুতুল হিসেবে রাখা হবে কি না! ২০০৭ সালের দিকে তাঁকে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, সেটি ছিল এমন যে—তিনি সামনে থাকবেন, তাঁর ভাবমূর্তিটা কাজে লাগানো হবে, কিন্তু পেছন থেকে সেনাবাহিনী ও অন্যরা কলকাঠি নাড়বে। তো তিনি পরিষ্কারভাবেই বললেন যে, ‘আমি যদি আসি, তবে সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব বা অথরিটি আমার হাতে থাকতে হবে।’ আর আমরাও এই বিষয়ে পুরোপুরি একমত ছিলাম।
স্ট্রিম: তিনি কি নির্দিষ্ট কোনো সময় চেয়েছিলেন? যেমন—আমাকে এত দিন সময় দিতে হবে?
আসিফ মাহমুদ: না না, ওই সময় সরকারের মেয়াদ নিয়ে আমাদের কোনো আলোচনা হয়নি। তাছাড়া ওই আলোচনা করার মতো পরিস্থিতিও তখন সেভাবে ছিল না। তবে শর্তের জায়গায় যখন আমরা একমত হলাম যে আমরা সামরিক শাসন সমর্থন করি না এবং আমরা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে আগ্রহী—সেই জায়গা থেকেই তিনি রাজি হন। পরবর্তী সময়ে মূলত সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন—এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
স্ট্রিম: সংস্কারের বিষয়গুলো নিয়ে তখনই আলোচনা হয়েছিল?
আসিফ মাহমুদ: হ্যাঁ, বিশেষ করে সংস্কার নিয়ে। কারণ আমাদের এক দফাতেই বলা ছিল যে, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ চাই। তখন তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, তাহলে আমার নামটা তোমরা ঘোষণা করতে পারো।’ এরপর ওই রাতেই, আনুমানিক রাত ২টা বা ৩টার দিকে, আমরা একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে আমার প্রোফাইল থেকে ঘোষণা করে দিই যে তিনিই প্রধান উপদেষ্টা হবেন। এরপরের দুই দিন সেনাবাহিনী, সামরিক বাহিনীর প্রধান ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে লিয়াজোঁ করা এবং উপদেষ্টা পরিষদ ঠিক করার পর শেষ পর্যন্ত ৮ তারিখে শপথটা হলো।
স্ট্রিম: আপনিসহ আপনাদের একটি অংশ উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দিয়েছিলেন। এত দিন পর এবং এত অভিজ্ঞতার পর এখন সেই সিদ্ধান্তটি নিয়ে কী মনে হয়?
আসিফ মাহমুদ: আমার মনে হয় ওই সময়টাতে অনেক বেশি সিচুয়েশনের ওপর ডিপেন্ড করে আমাদেরকে সিদ্ধান্তগুলো নিতে হচ্ছিল। সরকারের অংশ হওয়ার চিন্তাটা এই জায়গা থেকে ছিল যে এই গভর্নমেন্টে যারা উপদেষ্টা পরিষদে আসছেন তাদেরকে হয়তো আমরা নামে চিনি, কিন্তু তাদের সঙ্গে আমাদের ওয়ার্কিং রিলেশনশিপ নাই। তারা এই গণঅভ্যুত্থানকে কতটা ধারণ করবেন, গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে কতটা কাজ করবেন আমরা জানিনা। আমরা এর আগেও দেখেছি গণঅভ্যুত্থান হয়, তারপর হারিয়ে যায়। ৯০-এর দশকের অভিজ্ঞতা তো আছেই, যা আমরা ইতিহাস থেকে জেনেছি। সেই জায়গা থেকেই আমাদের একটি লক্ষ্য ছিল। এমন নয় যে আমাদের উপদেষ্টাই হতে হবে, মন্ত্রী হতে হবে বা মন্ত্রণালয় চালাতে হবে—এটি আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সরকারের অংশ হয়ে একটি 'ওয়াচডগ' হিসেবে কাজ করা। সরকার যদি কখনো কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে যায়, তখন যেন আমরা ভেতর থেকে কথা বলতে পারি—মূলত সেই জায়গা থেকেই আমরা সরকারে গিয়েছিলাম।
কিন্তু এখন যদি আমাকে মূল্যায়ন করতে বলেন, তবে আমি বলব, তখন আইডিয়াল বা আরও ভালো সিদ্ধান্ত কী হতে পারত? একটি হতে পারত—পুরো সরকারটাই বিপ্লবী কায়দায় গঠন করা এবং সরকারে গণ-অভ্যুত্থানের অংশীজনদের সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। অন্ততপক্ষে ৭০ শতাংশ অংশীজন এবং ৩০ শতাংশ টেকনোক্র্যাট থাকতে পারতেন। আরেকটি বিকল্প হতে পারত—আমাদের কারও সরকারে না যাওয়া। তবে সে ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা নিয়ে একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারত। কারণ, ওই সময় আমরা যদি সরকারের মুখোমুখি দাঁড়াতাম, তাহলে এই সরকারের ফাংশন করার কোনো সুযোগই থাকত না। অনেকেই তখন এর সুযোগ নিতে পারত। তবে সেটিও একটি বিকল্প হতে পারত; সে ক্ষেত্রে অন্তত মাঠের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে থাকত এবং গণ-অভ্যুত্থানের পর্যায়টি হয়তো আরেকটু দীর্ঘ হতো। কিন্তু যেহেতু সরকারটি আমরাই নিয়ে এসেছিলাম, তাই ওই সময়ের জন্য সরকারে থেকে 'ওয়াচডগ' হিসেবে কাজ করাকেই আমাদের কাছে বেশি বাস্তবসম্মত মনে হয়েছিল। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, পরবর্তী সময়ে সরকার অনেক ক্ষেত্রেই সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছে। আমি শুরুতেই যেমন বললাম—আমরা যদি বিপ্লবী কায়দায় সরকার গঠন করতাম, তাহলে হয়তো আমরা নিজেরাই সেটি করতে পারতাম।
স্ট্রিম: সরকার যে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে আপনারা কী করেছেন? এই প্রশ্নটি তো আসেই।
আসিফ মাহমুদ: হ্যাঁ, আমরা আমাদের জায়গা থেকে বারবার কথা বলেছি। আপনি যদি সংস্কারের কথা বলেন, এটি তো একটি চলমান প্রক্রিয়া। যখন আলোচনা উঠছিল যে এই সংস্কার করার ম্যান্ডেট বা এখতিয়ার এই সরকারের আছে কি না? তখন আমরা পরিষ্কার বলেছি—হ্যাঁ, আছে। কারণ এটি গণ-অভ্যুত্থানের সরকার। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টাসহ সরকারের অন্যান্য উপদেষ্টারা হয়তো এই আত্মবিশ্বাস পাচ্ছিলেন না। তাঁদের ভাবনা ছিল—আমরা সবাইকে ডাকি, আলোচনা করে ঐকমত্যে আসি, তারপর আবার এটি গণভোটে দিই। অর্থাৎ, আপনার বৈধতা থাকা সত্ত্বেও নতুন করে বৈধতা নেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং এই চেষ্টায় গিয়েই কিন্তু আস্তে আস্তে মূল বিষয়গুলো হালকা হয়ে গেল। এই জায়গাটিতে আমরা সবসময় আমাদের দিক থেকে ভেতর থেকে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, যতটুকু আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল। তবে এখানে অবশ্যই একটি বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে—এই সরকারের ব্যাকগ্রাউন্ড রাজনৈতিক নয় এবং তাঁরা সে অর্থে বিপ্লবীও নন। ফলে বিপ্লবী বা কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া, কিংবা ভালোর জন্য নিজেদের কাছে কর্তৃত্ব রাখাটা তাঁদের জন্য কঠিন ছিল।
স্ট্রিম: অনেকে বলছেন যে গণ-অভ্যুত্থানের ফলে শুধু একটি স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হয়েছে, আর কিছুই হয়নি। আপনারও কি এমনটি মনে হয়?
আসিফ মাহমুদ: প্রথমত, মূল প্রত্যাশাটি ছিল স্বৈরাচারী সরকারের পতন হবে। এই প্রত্যাশা তো আমরাই তৈরি করেছি। আমরা শুধু বলিনি যে শেখ হাসিনার পতন চাই। পাশাপাশি এ-ও বলেছি যে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থারও বিলোপ চাই। আর এটি আমরা সচেতনভাবেই আমাদের রাজনৈতিক বোঝাপড়া থেকে বলেছি। ফলে মানুষের প্রত্যাশা ছিল যে—ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ হবে, দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান হবে, রাষ্ট্রের একটি সুন্দর কাঠামো তৈরি হবে, গণতন্ত্রের সূচকে আমরা আরও এগিয়ে যাব এবং জবাবদিহির পরিবেশ তৈরি হবে। অর্থাৎ, শেখ হাসিনার পতনের পর বহুদূর পর্যন্ত মানুষের প্রত্যাশা ছিল। সেই প্রত্যাশা আমরাই তৈরি করেছিলাম। কিন্তু সরকারের যখন পতন হলো, তখন আমরা একটি ধাপ পার করলাম ঠিকই, কিন্তু পরবর্তী ধাপে যতটুকু গতি ও অ্যাগ্রেসিভ মনোভাব নিয়ে কাজ করা দরকার ছিল, সেটি আর সম্ভব হয়নি। ফলে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে একটি ফারাক তৈরি হয়েছে। তবে আমি কখনোই মনে করি না যে এই গণ-অভ্যুত্থান শুধু আওয়ামী লীগের পতন ঘটিয়েছে। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক চর্চা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ডেমোগ্রাফি—পুরো জায়গাতেই একটি বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এখন প্রশ্ন হলো, এটিকে আমরা দেশের মঙ্গলের জন্য কাজে লাগাতে পারছি কি না। আপনি যদি খেয়াল করেন, যে ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়িত হলেও রাষ্ট্র হিসেবে আমরা জবাবদিহি ও গণতন্ত্রের সূচকে অনেক দূর এগিয়ে যেতাম। কিন্তু আমাদের এই বাজে রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে সেই জায়গাতেও আমরা আবার পিছিয়ে গেছি।
স্ট্রিম: আপনার কাছে শেষ প্রশ্ন। আপনারা তরুণদের নেতৃত্বে এনসিপি গঠন করেছেন। তারা এখন পার্লামেন্টে আছে। রাজপথে থাকারও সুযোগ তাদের আছে। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি ক্ষমতায় আছে। আরেকটি দল ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক অবস্থায় আছে। কিন্তু দেশে তাদেরও একধরনের জনসমর্থন আছে। সে অর্থে তারা একেবারে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে তা বলা যাবে না। এই অবস্থায় আপনারা নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য নিয়ে দাঁড়াতে পারবেন—এ বিষয়ে আপনার প্রত্যাশা কতটুকু?
আসিফ মাহমুদ: বাংলাদেশের মতো একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে খুব দ্রুত পরিবর্তন আসা বা মানুষের মননে খুব দ্রুত নতুন কাউকে গ্রহণ করে নেওয়ার উদাহরণ খুব একটা নেই। তারপরও আমার মনে হয়, মাত্র এক বছর বয়সী একটি রাজনৈতিক দল হয়ে সংসদে ৮ জন আইনপ্রণেতা পাঠাতে পারা এবং ভোট ও আসন পাওয়ার দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে থাকাটা এনসিপির জন্য একটি বড় অর্জন। যদিও এটি আরও ভালো হতে পারত। আমার জায়গা থেকে মনে হয়, রাজনৈতিকভাবে এনসিপির একটি শক্ত জায়গা তৈরি করার সম্ভাবনা আছে। মানুষের মধ্যেও একটি আকাঙ্ক্ষা আছে, মানুষের সঙ্গে কথা বললে বুঝতে পারি যে তারা এটি চায়। এই সম্ভাবনা পুরোপুরিই আছে, তবে এটি নির্ভর করবে এনসিপির নেতৃত্ব কতটা চৌকসভাবে এটি বাস্তবায়ন করতে পারে তার ওপর। যেহেতু এনসিপির নেতৃত্ব মূলত তরুণদের হাতে—যাঁদের ছাত্ররাজনীতি ও গণ-অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে তাঁরা অনেকটাই নতুন—তাই আমাদের কাজ করতে করতে শিখতে হচ্ছে। কারণ জাতীয় রাজনীতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে আমরা অনেক জায়গায় প্রতারণার শিকার হয়েছি, ফলে রাজনীতি আসলে কীভাবে কাজ করে সেটি আমাদের প্রতিনিয়ত শিখতে হচ্ছে। তাই হয়তো এতে কিছুটা সময় লাগবে, তবে আমি মনে করি সম্ভাবনাটি প্রবল। আমরা যেহেতু নেতৃত্বে আছি, তাই এটিকে আমরা কোথায় নিয়ে যেতে পারব, তা নির্ভর করবে আমাদের নিজেদের সক্ষমতার ওপর।
স্ট্রিম: আসিফ মাহমুদ আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
আসিফ মাহমুদ: ঢাকা স্ট্রিমকেও ধন্যবাদ।

আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া; ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র। আন্দোলনের শুরু, সরকার পতনের দিকে মোড় নেওয়া, ডিবি হেফাজতের অভিজ্ঞতা, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন এবং গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছে স্ট্রিম।
.png)
স্ট্রিম: ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়েছিল। সেই আন্দোলন কীভাবে আবার নতুন করে ২৪-এ, বিশেষ করে ৫ জুন থেকে তীব্র হয়ে উঠল?
আসিফ মাহমুদ: ২০১৮ সালে যখন কোটা সংস্কার আন্দোলন হয়, তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। কেবল ভর্তি হয়েছি। আন্দোলনটি শুরু হয় ফেব্রুয়ারি মাস থেকে। তখন আমার মনে হলো যে, যে কারণের জন্য আন্দোলনটি হচ্ছে, সেটি একেবারেই যৌক্তিক। আমি সরকারি চাকরি করি বা না করি, এটার জন্য দাঁড়ানো উচিত। ক্যাম্পাসের মোস্ট জুনিয়র ব্যাচ হিসেবে আমি ও আমার বন্ধুরা আন্দোলনে যুক্ত হলাম। সরকার শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে একধরনের সমাধানের পথে গিয়ে, অনেক নাটকীয়তা শেষে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা বাতিল করল। কিন্তু ২৪ সালে যখন হাইকোর্টে একজন কোটা বাতিলের বৈধতা নিয়ে রিট করলে, হাইকোর্ট কোটা বাতিল করার প্রজ্ঞাপনটিকে অবৈধ ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে আবার কোটা ফিরে আসে। অথচ ২০১৮ সালেও আমাদের দাবি ছিল সব শ্রেণিতেই কোটার সংস্কার। প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণিতে চাকরিপ্রত্যাশীর সংখ্যা তো কম, বরং তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণিতে অনেক বেশি। তাই সব শ্রেণিতেই কোটার একটি যৌক্তিক সংস্কার প্রয়োজন। সেই জায়গা থেকেই ২০২৪ সালেও কোটা সংস্কার আন্দোলনটি শুরু হয়।
বিষয়টি এরকম যে, সরকার ২০১৮ সালে চাপের মুখে কোটা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু যখনই তারা সুযোগ পেল, হাইকোর্টের মাধ্যমে বা হাইকোর্ট দেখিয়ে বিষয়টি আবারও ফিরিয়ে আনল। এতে আমাদের মনে হলো, ২০১৮ সালে যাঁরা অনেক পরিশ্রম করে আন্দোলনটি সফল করেছিলেন, তাঁদের সেই অর্জনের প্রাপ্তিটুকু হারানোর একটি শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আরেকটি বিষয় ছিল—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব চাকরিপ্রত্যাশী শিক্ষার্থী নিয়মিত লাইব্রেরিতে পড়াশোনা করতেন, তাঁদের জন্য এটি একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মেধা দিয়ে প্রতিযোগিতার জায়গাটি যখন মাত্র ৪৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকে আর ৫৬ শতাংশই কোটায় চলে যায়। তো এটার একটা যৌক্তিক সংস্কার আমরা চেয়েছিলাম।
আমরা প্রস্তাব করেছিলাম—কোটা ১০ শতাংশ বা ১৫ শতাংশ রাখেন। কিন্তু এটি কখনোই ৫৬ শতাংশ হতে পারে না। এ প্রেক্ষিতে সব শ্রেণিতে কোটার সংস্কারের দাবিটা আমরা শুরু করি। ৫ জুন থেকে শুরু হলেও মাঝে ঈদের একটি ছুটি ছিল। ফলে ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার পর, জুলাইয়ের প্রথম থেকে মূল আন্দোলনটি শুরু হয়। জুলাই মাস শুরু হওয়ার এই সময়টা থেকেই আন্দোলন মূলত তীব্র হয়। পরবর্তী সময়ে আমরা চিন্তা করলাম যে ক্যাম্পাসে প্রতিবাদ করলে কেউ কান দিচ্ছে না। তাই আমাদের শাহবাগে যাওয়া উচিত। এভাবেই এটি ধীরে ধীরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
স্ট্রিম: আপনারা যখন আন্দোলন শুরু করলেন, তখন কি ভেবেছিলেন যে এই আন্দোলন একটি সরকার পতনের আন্দোলনের দিকে বা একটি গণ-অভ্যুত্থানের দিকে চলে যাবে? এ ধরনের কোনো ধারণা বা পারসেপশন কি আপনাদের আগে থেকেই ছিল?
আসিফ মাহমুদ: প্রথমত, ২০১৮ সালের ওই আন্দোলনের পর থেকেই আমি ধীরে ধীরে ছাত্ররাজনীতি ও অ্যাক্টিভিজমের সঙ্গে যুক্ত হই। ক্যাম্পাসে আমাদের অনেক ইস্যু ছিল। গণরুম-গেস্টরুম নির্যাতন থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, এমনকি জাতীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়েও আমরা কাজ করেছি। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে, আয়নাঘরের বিরুদ্ধে, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, এনআরসি-সিএএ-র বিরুদ্ধে আমরা দাঁড়িয়েছিলাম। মোদিবিরোধী আন্দোলনেও ছিলাম। ২০২২ সালে প্রায় দেড় মাসের মতো জেলে ছিলাম।
স্ট্রিম: সেটা কি মোদিবিরোধী আন্দোলনে?
আসিফ মাহমুদ: মোদিবিরোধী আন্দোলনে আমার নামে মামলা ছিল। তবে আমি গ্রেপ্তার এড়াতে পেরেছিলাম। পরে আমরা আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের তৃতীয় বর্ষ উপলক্ষে একটি শোক কর্মসূচির আয়োজন করতে চেয়েছিলাম। সেখানে ছাত্রলীগ আমাদের ওপর হামলা করে। উল্টো আমাদের নামেই মামলা দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। তাই ব্যক্তিগতভাবে আমার বা আমাদের জন্য এটিই প্রথম আন্দোলন ছিল না। এর আগে অনেকগুলো আন্দোলন আমি নিজে অর্গানাইজ করেছি, অংশগ্রহণ করেছি। মূলত সংগঠকের জায়গাতেই আমি বেশি দায়িত্ব পালন করেছি। ছোট মানববন্ধন থেকে শুরু করে বড় আন্দোলন পর্যন্ত ধরলে, এই সংখ্যাটি অন্তত ১০০-এর কাছাকাছি হবে। ফলে আগে থেকেই আমাদের মধ্যে একটি অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট বা অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট মনোভাব ও আকাঙ্ক্ষা ছিল। সেই জায়গা থেকে সব আন্দোলনেই আমাদের একটি প্রচেষ্টা থাকত—যদি সম্ভব হয়, তবে বিষয়টিকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া যায় কি না। কিন্তু ওই সময়কার পরিস্থিতি এমন ছিল এবং ফ্যাসিবাদ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, একটি অরাজনৈতিক ছাত্র আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানের রূপ নেবে, তা কল্পনা করাও কঠিন ছিল। এরপরও সম্ভবত ৭ কি ৮ জুলাইয়ের দিকে এক সহযোদ্ধাকে বলেছিলাম, যদি আমরা এই আন্দোলন থেকেও সুযোগ পাই, তবে হয়তো একে সরকার পতনের আন্দোলনের দিকে নিয়ে যাব।
আমাদের একটি অংশ অবশ্যই চাকরির দাবি নিয়ে আন্দোলনে এসেছিলেন। কিন্তু লিডারশিপ বা নেতৃত্বের বড় একটি অংশ—যাঁরা সামনে থেকে সিদ্ধান্ত নিচ্ছিলেন, তাঁদের অনেকেই ছিলেন পলিটিক্যালি অ্যাফিলিয়েটেড বা রাজনৈতিকভাবে সচেতন। যেমন—আমি কখনো সরকারি চাকরি করব, এমন চিন্তা আমার ছিল না। কলেজজীবন থেকেই এই ভাবনা আমার মধ্যে ছিল না। তাহলে আমি কেন এলাম? আমার কাছে এটি ছিল ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের একটি সুযোগ এবং যদি এটার থেকে সম্ভব হয় ফ্যাসিবাদের পতন ঘটানো বা ফ্যাসিবাদকে চ্যালেঞ্জ করা, আই উইল ডু দ্যাট। যাঁরা রাজনৈতিকভাবে আগে থেকেই সচেতন ছিলেন, যুক্ত ছিলেন এবং অ্যাক্টিভিজমের সঙ্গে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে এই মোটিভেশনটি ছিল।
স্ট্রিম: জুলাই আন্দোলনে যাঁরা পরাস্ত বা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন, তাঁরা এই অভিযোগ করেন যে—আপনারা আসলে দক্ষিণপন্থী। আপনারা গোপনীয়তার সঙ্গে কাজ করতেন এবং সুযোগ বুঝে দেশকে ডানপন্থী বা দক্ষিণপন্থী ধারায় নিয়ে যাওয়ার জন্য একত্র হয়েছিলেন। এই আন্দোলন এবং অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেটাই ঘটেছে বলে তাঁরা দাবি করেন। এ ধরনের অভিযোগের জবাবে আপনারা অবশ্য কথা বলছেন, তবে এখানে কী বলবেন?
আসিফ মাহমুদ: রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার জন্য এটি মূলত তাদের একটি ন্যারেটিভ। আমাদের এই আন্দোলনে যাঁরাই সামনের সারিতে ছিলেন, তাঁরা আগে থেকেই সবার পরিচিত মুখ। এই আন্দোলনের আগে আমি দুটি ছাত্র সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির দায়িত্বে ছিলাম। একটিতে সভাপতি এবং আরেকটিতে আহ্বায়ক ছিলাম। ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি ছিলাম। পরে সেখান থেকে পদত্যাগ করে আমরা যখন 'ছাত্রশক্তি' গঠন করি, সেটির আহ্বায়ক ছিলাম। ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজনৈতিক পরিসরে আমি আগে থেকেই পরিচিত। আমি প্রকাশ্যে রাজনীতি করেছি, ছাত্ররাজনীতি করেছি, আক্রমণের শিকার হয়েছি, জেলেও গিয়েছি। আমার এসব কর্মকাণ্ড সবার কাছেই ওপেন। ক্যাম্পাসে আমার ছয়-সাত বছরের রাজনৈতিক বেড়ে ওঠার বিষয়টিও খুবই পরিষ্কার। নাহিদ ইসলামও প্রকাশ্যে তাঁর অ্যাক্টিভিজম চালিয়ে গেছেন। একটা সময় তাঁরা পাঠচক্র করেছেন। তিনিও একসময় ছাত্র অধিকার পরিষদে ছিলেন। আখতার হোসেনও আগে থেকেই পরিচিত মুখ। তিনি ২০১৯ সালে ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক ছিলেন। হাসনাত আব্দুল্লাহও আগে থেকেই অ্যাক্টিভিজম করতেন। তবে তিনি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সেভাবে যুক্ত ছিলেন না।
সারজিস আলমও একটা সময় পর্যন্ত ছাত্রলীগের সঙ্গে হয়তো কিছুটা জড়িত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি এই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে নেতৃত্বে এসেছেন। সুতরাং, আমাদের সবার ব্যাকগ্রাউন্ডই মানুষের জানা। এমন তো নয় যে কেউ বাইরে থেকে ট্রেনিং নিয়ে হঠাৎ করে চলে এসেছে! দাবি করা হয়েছে যে আমরা নাকি দেশটাকে একটি নির্দিষ্ট এজেন্ডার দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। এখন, একটি গণ-অভ্যুত্থানের ফলাফলের দিক থেকে যদি চিন্তা করেন যে, অভ্যুত্থানের পর কোন শক্তিগুলো এখানে শক্তিশালী হলো বা সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতা কারা পূরণ করল—তার একটি স্বাভাবিক ব্যাখ্যা আছে।
একটা সেন্টার লেফট পলিটিক্যাল পার্টি যখন ফ্যাসিস্ট পার্টি হয়ে ওঠে এবং তখন তার ওই অপ্রেশনের কারণে সেন্টার রাইট টু রাইট যারা এই অঞ্চলে রাজনীতিটা করছেন তারা তো বিগত ১৭ বছরে মানুষের একটা সহানুভূতি পেয়েছেন। ফলে এই গণ-অভ্যুত্থানে তারাও অংশগ্রহণ নিয়েছে। তাই ৫ আগস্টের পর যখন ফ্যাসিবাদের ওই অংশটি রাজনীতি থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল, তখন স্বাভাবিকভাবেই ডানপন্থী অংশটির রাজনৈতিক উপস্থিতি বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। তবে এই পরিস্থিতিকে রাজনীতি দিয়েই মোকাবিলা করতে হবে। যেমনটি গণতান্ত্রিক উপায়ে বিএনপি করছে। একটু খেয়াল করলে দেখবেন, এই অভ্যুত্থানের আগে বিএনপির যে 'সেন্টার টু সেন্টার-রাইট' অবস্থান ছিল, অভ্যুত্থানের পর তারা সেখান থেকে 'সেন্টার টু সেন্টার-লেফটে' এসে নিজেদের রাজনীতিতে একটি পরিবর্তন এনেছে। ফলে একটি গণতান্ত্রিক সরকার আসার পর এই জায়গাটি আবারও মোটামুটি একটি ভারসাম্যে চলে এসেছে। সামনে এটি আরও আসবে। তবে এর মধ্যে যে ওই ধরনের প্রবণতা (উগ্রপন্থার) দেখা যায়নি, তা নয়। এমনটি হয়েছে। অনেকেই অনেকভাবে এটি করার চেষ্টা করেছেন। কারণ এখানে অনেকের অনেক স্বার্থ জড়িয়ে আছে।
স্ট্রিম: আপনারা কি কোনো বিকল্প নেতৃত্বের ব্যবস্থা রেখেছিলেন যে, আপনারা যদি গ্রেপ্তার হন বা আটকে পড়েন...
আসিফ মাহমুদ: একটি পরিকল্পনা আমাদের আগে থেকেই ছিল। এই আন্দোলনে প্রথম থেকেই আমাদের একটি নীতি পলিসি ছিল যে, আমরা নেতৃত্ব নির্দিষ্ট করে দেব না। অর্থাৎ, আমরা বলে দেব না যে নাহিদই নেতা, আসিফই নেতা কিংবা অমুক-তমুক নেতা। এ ক্ষেত্রে আমরা একটি ‘রোটেটিং সিস্টেম’ বা পালাবদলের পদ্ধতি অনুসরণ করতাম। সাধারণত কর্মসূচিতে কী হয়—যিনি সবার শেষে বক্তব্য দেন, তিনিই নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। এ কারণে আমাদের যে কমিটি প্রকাশ করা হয়, সেখানেও সবাইকে ‘সমন্বয়ক’ হিসেবে সমান পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনিয়র-জুনিয়রের ভিত্তিতে নামের একটি তালিকা উপর-নিচ করা হয়েছিল এবং জুনিয়রদের ‘সহ-সমন্বয়ক’ পদ দেওয়া হয়েছিল। তাই কাউকে সুনির্দিষ্ট পদবি দিয়ে আলাদাভাবে নেতা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ ছিল না। আমাদের কোনো ‘প্রধান সমন্বয়ক’ ছিল না, সবাই সমন্বয়ক। আর কর্মসূচির শেষ বক্তব্যের বিষয়টিও আমরা প্রতিদিন পালা করে দিতাম। একদিন নাহিদ ভাই, একদিন সারজিস ভাই, একদিন আমি, একদিন হাসনাত ভাই, আবার কোনোদিন অন্য কেউ দিতেন।
স্ট্রিম: যাতে সরকার টার্গেট করে নির্দিষ্ট কাউকে ধরতে না পারে?
আসিফ মাহমুদ: হ্যাঁ, যাতে টার্গেট করতে না পারে। কারণ আমরা আগের আন্দোলনগুলোতে দেখেছি—নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে টার্গেট করা হয়, সুনির্দিষ্টভাবে তাঁর চরিত্র হনন করা হয়, তাঁর ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা হয় এবং জামায়াত-শিবির ট্যাগ দিয়ে মূলত আন্দোলনটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়। তবে এসবের পরও স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটি নেতৃত্ব ঠিকই উঠে এসেছে…
স্ট্রিম: এই শিক্ষাটা আপনারা কোথা থেকে পেয়েছেন? আপনি বলছিলেন যে আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে, সেখান থেকেই কি?
আসিফ মাহমুদ: এটা আগের আন্দোলনগুলো থেকে আমরা দেখেছি। যেমন, আবরার ফাহাদ হত্যার প্রতিবাদে আমরা যখন আন্দোলন করলাম, তখনো চিহ্নিত করা হলো যে—এরা অমুক পরিষদ করে, এরা সাবেক শিবির, এদের আন্দোলনে যাওয়া যাবে না। এভাবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে একধরনের ভীতি তৈরি করা হয়। সেই জায়গা থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল, প্রতিদিন নতুন নতুন মুখ সামনে আসবে। কিন্তু আন্দোলন যখন একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে চলে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কিছু কেন্দ্রীয় চরিত্র তৈরি হয়। এটি এমন নয় যে আমরা কাউকে নির্দিষ্ট করে দিচ্ছি। সিনিয়রিটি, রাজনৈতিক জানাশোনা ও বোঝাপড়া অথবা আন্দোলনের অভিজ্ঞতার জায়গা থেকেই এটি হয়। কারণ, কর্মসূচি ঠিক করার সময় কে বেশি ইনপুট দিতে পারছেন বা কার বক্তব্য ভালো হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করেও ধীরে ধীরে নেতৃত্ব গড়ে ওঠে। এরপর ১৬-১৭ তারিখের পর গিয়ে মোটামুটি একটি চিত্র পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল যে, ঠিক আছে, এই চার-পাঁচজন সামনে আছেন। কিন্তু এর আগ পর্যন্ত, জুন থেকে ধরলে প্রায় দেড় মাসের আন্দোলনে, কারা আসলে নেতৃত্বে আছেন, সেটি বোঝা যাচ্ছিল না।
স্ট্রিম: এখানে একটি প্রশ্ন আসে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মোটামুটি দমন করে ফেলার পর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যুক্ত হলো। রিক্সাচালক, শ্রমিক, দোকানদার সর্বোপরি সাধারণ মানুষ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হলেন। এটি কি স্বতঃস্ফূর্তভাবে হয়েছে, নাকি আপনাদের একধরনের সমন্বয় বা যোগাযোগ স্থাপন করতে হয়েছিল?
আসিফ মাহমুদ: যখন ক্যাম্পাস বন্ধ হবে হবে আলাপটা আমাদের কানে আসতে শুরু করে। বিশেষ করে ১৪ তারিখ রাতেই যখন শেখ হাসিনার ওই বক্তব্যের প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে একধরনের বিক্ষোভ হয় এবং ছাত্রলীগের সাথে ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একধরনের ক্ল্যাশের সিচুয়েশন তৈরি হয় তখন আন্দোলনটা নতুন মাত্রা পায়। ১৪ তারিখ রাতে এবং ১৫ তারিখ ছাত্রলীগ হল ছেড়ে পালায় এবং ক্যাম্পাসের সম্পূর্ন নিয়ন্ত্রণ তারা হারিয়ে ফেলে। তখনই আমরা বুঝতে পারছিলাম যে ক্যাম্পাস বন্ধ করে দেওয়া হবে। এরকম একটা সংবাদও কানাঘুষার মধ্য দিয়ে আসছিল।
তখন আমরা আমাদের বক্তব্য ও ভিডিওবার্তায় খুব সুনির্দিষ্টভাবে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানানো শুরু করি। প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদেরও আহ্বান জানাতে থাকি। ১৪, ১৫ ও ১৬ তারিখের ভিডিওবার্তাগুলোতে মূলত এই মেসেজগুলোই ছিল। একই সঙ্গে আমাদের যে যোগাযোগের জায়গাটি ছিল—আন্দোলনের শুরুর দিকেই আমরা সাত কলেজের অনেক শিক্ষার্থীকে নিয়ে টিএসসিতে বসেছিলাম, একটি সমন্বয় করেছিলাম। তারা তাদের কলেজগুলো থেকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে মহাখালী, নিউমার্কেট ও সায়েন্সল্যাবে বেরিয়ে আসে। এখানে আমি বলব, ছাত্রসংগঠনগুলো একটি ভালো ভূমিকা পালন করেছে। তারা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিসসহ বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাঠে নিয়ে আসে। একটি সম্মিলিত দৃষ্টিভঙ্গি অ্যাপ্রোচ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই শিক্ষার্থীরা নেমে এসেছিল। যখন দমন-পীড়নের মাধ্যমে পাবলিক ইউনিভার্সিটিগুলোকে থামিয়ে দেওয়ার বা বন্ধ করার চেষ্টা করা হলো এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা হচ্ছিল, তখন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা, মাদ্রাসা এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের একটি নতুন ফ্রন্ট খুলে দেয়। যেমন—যাত্রাবাড়ীর পুরো জোনটি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দখলে ছিল। আবার বাড্ডা ও উত্তরা জোন ছিল প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের দখলে। তখন সরকারকে বাধ্য হয়ে আরেকটি ফ্রন্টে মনোযোগ দিতে হয়। এর ফলে আমরা কিছুটা শ্বাস ফেলার সুযোগ পাই। কিন্তু পাবলিক ইউনিভার্সিটিগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখানে আসলে কিছু করার সুযোগ ছিল না। শিক্ষার্থীদের হল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। অধিকাংশ শিক্ষার্থীই বাড়ি চলে গিয়েছিল। অনেকে শুধু আন্দোলন করার জন্যই ঢাকায় কোনোভাবে আশ্রয় নিয়েছিল। যখন নতুন ফ্রন্টগুলো খুলে যায়, তখনই সরকার বুঝতে বাধ্য হয় যে মাঠে তারা আর এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। ফলে, যখন কমপ্লিট শাটডাউন চলছিল, তখন তারা ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় এবং আন্দোলনের নেতৃত্বকে তুলে নেওয়া বা গুম করা শুরু করে।
কিন্তু আমরা ভাগ্যবান ছিলাম যে, আমাদের পরের স্তরে বা জুনিয়রদের মধ্যে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা ওই সময়ে এসে আন্দোলনের হাল ধরেন। আবদুল কাদের তখন ৯ দফা ঘোষণা করে। সেটিতে আমাদের মোটামুটি সবারই সম্মতি ছিল। আমরা ঠিক করেছিলাম যে, কোটা আন্দোলন থেকে সরে গিয়ে এবার আমরা সরকারের ওই চারজন মন্ত্রীর পদত্যাগ এবং সরকারের ক্ষমা প্রার্থনাসহ অন্যান্য দাবিতে এগোব। এটি ছিল কোটা আন্দোলন থেকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে একটি ট্রানজিশন। একই সঙ্গে সরকারও ইন্টারনেট বন্ধ করার মধ্য দিয়ে আরও কঠিন ক্র্যাকডাউনের দিকে যায়।
স্ট্রিম: তখন তো আপনাদের ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য নানা রকম অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছিল। টেলিভিশনে গিয়ে কিছু লোক নানা রকম বক্তব্য রাখছিলেন, পাশাপাশি নানা অপপ্রচারও চলছিল।
আসিফ মাহমুদ: হ্যাঁ, তখন ওই পুরোনো কৌশল অনুযায়ী আমাদের রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড খুঁজে বের করা হচ্ছিল এবং জামায়াত-শিবির ট্যাগ দেওয়া হচ্ছিল। এরপর যে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটছিল, সেগুলো তো আওয়ামী লীগ সরকার ও তাদের গুন্ডাবাহিনীই করছিল। কিন্তু এর দায় অনেকটা ছাত্রনেতাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়—যেন আমরা আন্দোলন করছি বলেই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটছে। এমনকি আমাদের দাবিগুলো আদায় হয়ে যাওয়ার পরও যখন আমরা ডিটেনশনে ছিলাম। তখন আমাদের বলা হচ্ছিল, ‘সব দাবি তো আদায় হয়ে গেছে, তাহলে এখন কিসের আন্দোলন? তোমরা প্রোগ্রাম ডাকছ, মানুষ এসে মারা যাচ্ছে—এর দায় কার? এর দায় তো তোমাদের।’ এভাবে মানসিকভাবে আমাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করার চেষ্টা চলছিল।
আন্দোলনে তো শুরুতে সব ধরনের মানুষই এসেছিলেন। আমাদের একটি রাজনৈতিক বোঝাপড়া ছিল বলে আমরা এসেছি; কিন্তু অনেকে এসেছেন একেবারে সাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে, অনেকে চাকরি পাওয়ার জায়গা থেকে এসেছেন, আবার অনেকে বৈষম্যবিরোধী চেতনা থেকে এসেছেন।
স্ট্রিম: আপনার কি মনে হয় যে, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা মূল্যস্ফীতির চাপ এবং অর্থনৈতিক সংকট—এগুলো মানুষকে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্ররোচিত করেছে?
আসিফ মাহমুদ: সরকারবিরোধী যে সেন্টিমেন্ট বা ক্ষোভ ছিল, সেটিকে আরও পরিপক্ব করেছে মূলত এই অর্থনৈতিক সংকট এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। কারণ ২০১৩-১৪ সাল থেকেই তো বিরোধী দলের ওপর, বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়ন, বাক্স্বাধীনতা হরণ, মিডিয়া দখল—এগুলো তো চলছিলই। কিন্তু শুধু এগুলোই সাধারণ মানুষকে সেভাবে ক্ষুব্ধ করে না। সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে কোন জিনিসটি? এই অর্থনৈতিক সংকট বা তাদের জীবনের সংকট। যখন এই দমন-পীড়নের মাত্রা এমন পর্যায়ে চলে গেল যে সাধারণ মানুষও আর রক্ষা পাচ্ছিল না, এমনকি আওয়ামী লীগের মধ্যেও কেউ ভিন্নমত পোষণ করলে তাকেও আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছিল—তখন মানুষের মনের সেই ক্ষোভ এক ধরণের ম্যাচিউরিটি লাভ করে। ওই ম্যাচিউরড সিচুয়েশনটা তৈরি না হলে কিন্তু এই আন্দোলনে মানুষ এত বিপুলভাবে অংশগ্রহণ করত না। আর মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া এটি সফল হওয়ারও কোনো সুযোগ ছিল না।
স্ট্রিম: শেষ দিকে যখন ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণার বিষয়টি এল, তার আগে সেনাসদরে সেনাবাহিনী একটি অবস্থান নিল যে, তারা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালাবে না। ওই সময়ে ৬ তারিখে নয়, ৫ তারিখেই ‘মার্চ টু ঢাকা’ হবে—এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কারা কারা ছিলেন? তা নিয়ে কি আপনাদের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য ছিল?
আসিফ মাহমুদ: ৩ তারিখে এক দফা ঘোষণার পর রাতের আলোচনায় আমাদের যে সিদ্ধান্তটি ছিল, সেটি হলো—৪ তারিখে সারা দেশে যথারীতি গণজমায়েত কর্মসূচি পালিত হবে। এই কর্মসূচি ৩ তারিখেই ঘোষণা করা হয়েছিল। তো মোটামুটি সিদ্ধান্ত ছিল যে, ৪ তারিখে আমরা আবার মাঠে গিয়ে শাহবাগ থেকে পরের দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করব। এখন কর্মসূচিটি কী হবে? সেটি ছিল, ৫ তারিখে আমরা শ্রমিক সমাবেশ, নারী সমাবেশ এবং লেখক-বুদ্ধিজীবীসহ সিভিল সোসাইটিকে নিয়ে একটি সমাবেশ করব। এর মাধ্যমে আমরা সমাজের বিভিন্ন অংশকে আমাদের এই আন্দোলন, অসহযোগ এবং এক দফার সঙ্গে যুক্ত করব। এরপর ৬ তারিখের জন্য আমরা ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিটি রেখেছিলাম, যাতে মানুষ ঢাকায় এসে জড়ো হতে পারে। আমরা চাচ্ছিলাম না ইমম্যাচিউর কোনো পদক্ষেপ নিতে। তখনো এই নিশ্চয়তা ছিল না যে সেনাবাহিনী গুলি করবে না। সেনাবাহিনী যদি গুলি চালাত, তবে আমরা যত বড় পদক্ষেপ নিয়েই এগোই না কেন, সেখানে তাদের কামান ও ট্যাংক প্রস্তুত ছিল। সেই জায়গা থেকেই ঢাকায় জড়ো হওয়ার প্রাথমিক পরিকল্পনাটি ছিল ৬ তারিখে।
স্ট্রিম: ৩ তারিখে সেনাসদরের যে বৈঠকটি হয়, সেখান থেকে কি আপনারা কোনো রাজনৈতিক বার্তা পাননি?
আসিফ মাহমুদ: আমরা বার্তাটা পেয়েছিলাম, তবে আমরা শিওর ছিলাম না যে এর ওপর আমরা কতটা ভরসা রাখতে পারি। কারণ সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন জায়গায় গুলি করছে সেটাও আমরা দেখছিলাম, ছবি আসছিল, ভিডিও আসছিল। এবং আমরা দেখছিলাম ইউএন-এর হেলিকপ্টারও ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে আমরা বুঝতে পারছিলাম না যে কে কোন পক্ষে আছে বা পরিস্থিতি আসলে কী।
তবে ওই বার্তাটি আমাদের মধ্যে অবশ্যই একটি সাহসের সঞ্চার করেছিল। পরে ৪ তারিখে যখন আমাদের বের হওয়ার কথা, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা কয়েকজন বের হতে পারিনি। আমার সঙ্গে আবু বাকের মজুমদার, মুয়াজ্জেম হোসেনসহ আরও কয়েকজন ছিলেন। আমরা যে জায়গাটায় আশ্রয় নিয়েছিলাম, সেদিন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ অলিতে-গলিতে সব জায়গায় এমনভাবে পাহারা বসিয়েছিল, যাতে কেউ আন্দোলনে যেতে না পারে। সেখানে তাদের পাহারাটি ছিল ঠিক আমাদের ওই বিল্ডিংয়ের নিচে। ফলে আমি অনেক চেষ্টা করেও বের হতে পারিনি। নাহিদ ভাই তখন শাহবাগে ছিলেন। নিরাপত্তার কারণে তাঁর ফোনটি বন্ধ রাখতে হয়েছিল। কারণ, ফোন খোলা রাখলেই ট্র্যাক করে ধরে নিয়ে যাওয়ার শঙ্কা ছিল। তো পরে, আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই আমি দুপুর ১২টা কি ১টার দিকে একটি ভিডিও বার্তা দিই যে—৫ তারিখে সমাবেশ হবে। ৬ তারিখে হবে লংমার্চ।
তখন আমাদের কাছে তথ্য আসতে শুরু করে যে—আওয়ামী লীগ ঢাকার আশপাশের জেলাগুলো থেকে ট্রাকে ভরে ভরে মানুষ ঢাকায় নিয়ে আসছে। তারা ঢাকা দখল করার একটি পরিকল্পনা করছে। তখন আমাদের মনে হলো, আমরা কি তাদের ৬ তারিখ পর্যন্ত এই সময়টুকু দেব? এটি একটি বড় উদ্বেগ ছিল। আরেকটি বিষয় আলোচনায় আসছিল যে আবারও ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আর আমাদের আগের অভিজ্ঞতা বলছিল, ইন্টারনেট বন্ধ হলে আন্দোলন একেবারেই পিছিয়ে যায়; যেমনটি ২৫-২৬ তারিখের দিকে আন্দোলন প্রায় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল। সেই শঙ্কা থেকে তখন কথা উঠতে শুরু করে যে, আমরা কর্মসূচিতে পরিবর্তন আনব কি না। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে তখন আবদুল কাদের ও মাসুদ ফোন দিয়ে বলে যে ভাইয়া এটা আমরা রিথিংক করব কি না। তখন আমি ওদের বলি, আমি তো নাহিদ ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না; তাই এই সিদ্ধান্তটি আমার একা নেওয়া কঠিন হয়ে যাবে। কারণ, এর ফলাফল যদি পুরোপুরি নেতিবাচক হয় এবং আমরা যদি ব্যর্থ হই—কারণ মাত্র এক দিনে মানুষের ঢাকায় পৌঁছানোটা খুবই কঠিন একটি ব্যাপার ছিল।
কিন্তু শুনলাম ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যাবে। সবকিছু মিলিয়ে যখন একটা ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছিল। আবার পাশাপাশি এ-ও শুনলাম যে সেনাবাহিনী গুলি করবে না। তখন ওই জায়গা থেকে আমি সিদ্ধান্তটি নিই। আমি একটি হোয়াটসঅ্যাপ কলে আরও চার-পাঁচজনকে যুক্ত করি। বাকের সেখানে ছিল, মাহিন ছিল। শেষ পর্যন্ত সাহস করেই আমরা সিদ্ধান্তটি নিয়ে নিই। আগের কর্মসূচিটি পরিবর্তন করে তিন ঘণ্টা পরই আমি আরেকটি ভিডিও বার্তা দিয়ে ৫ তারিখে লংমার্চের ঘোষণা দিই। যদিও ভেতরে ভয় ও আতঙ্ক ছিল—যদি শেষ পর্যন্ত আমরা সফল হতে না পারি! কারণ, রাস্তাগুলোতে ব্যারিকেড দেওয়া ছিল, ফলে আশপাশের জেলা থেকে মানুষজন হয়তো আসতে পারবে না। আর ঢাকায়ও যদি পর্যাপ্ত মানুষ না নামে, তবে চূড়ান্ত ডাক দেওয়ার পর তো আসলে আর কিছু বাকি থাকে না। চূড়ান্ত ডাকের পর আপনি যদি ব্যর্থ হন, তবে আপনার সবকিছু শেষ। তবে সৌভাগ্যবশত, পরের দিন মানুষ ঠিকই রাস্তায় নেমে এসেছিল।
স্ট্রিম: সেটি কি আপনাদের কাছে অভাবিত মনে হয়েছিল, এতটা আশা করেননি?
আসিফ মাহমুদ: আমরা আশা নিয়ে ছিলাম যে মানুষ নামবে। কিন্তু এত বড় পরিসরে মানুষ নামবে, তা ভাবিনি। আমার মনে হয় সেদিন ঢাকা শহরের কোনো রাস্তাই খালি ছিল না। এত মানুষ নেমে এসেছিল! আর আমার মনে হয়, ৫ আগস্ট সকালেই সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড হয়েছিল। ৩০০ থেকে ৪০০ মানুষকে সেদিন খুন করা হয়েছিল; পুরো এক দিনেও নয়, মাত্র এক প্রহরে অর্থাৎ সকালের মধ্যেই। আমি নিজে তখন চানখাঁরপুলে ছিলাম। সেখান দিয়ে আমি শাহবাগের দিকে ঢোকার চেষ্টা করছিলাম। সেখানেই আমার চোখের সামনে ৫ জন নিহত হন এবং আরও ১৫-২০ জনের মতো গুলিবিদ্ধ হন। তখন আমার মনে হচ্ছিল, পুরো ঢাকায় বোধ হয় এমনই পরিস্থিতি চলছে। আমরা হয়তো হেরে যাচ্ছি বা পরাজিত হচ্ছি। ওই সময় বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য আসছিল যে সামরিক শাসন জারি হতে পারে। আরও অনেক মৃত্যুর খবর আসছিল—এই মোড়ে ২৫ জন, ওই মোড়ে ৩০ জন মারা গেছেন। সেটি খুবই ভয়াবহ একটি পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু হঠাৎ আমরা দেখলাম, চারদিক থেকে মানুষের ভিড় এমনভাবে আসতে শুরু করল—যাত্রাবাড়ী থেকে এল, চানখাঁরপুল থেকে এল, বকশীবাজার থেকে এল। পরিস্থিতি দেখে পুলিশ ও এপিবিএন জিপ নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেল। এরপর শাহবাগের দিকে গিয়ে দেখলাম পুরো এলাকা ইতিমধ্যে জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। ঠিক তখনই খবর পেলাম যে গণভবন ইতিমধ্যেই আন্দোলনকারীদের দখলে চলে গেছে। তখন আমরা শাহবাগ থেকে সংসদ ভবনের দিকে রওনা হলাম।
স্ট্রিম: ড. ইউনূসের সঙ্গে যে যোগাযোগ তৈরি হলো। তাঁকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান করা হলো। এই সিদ্ধান্তটি কি আপনাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত ছিল? নাকি এটি বিচ্ছিন্নভাবে হয়েছিল?
আসিফ মাহমুদ: ওই সময়টাতে খুব গুছিয়ে বা সুসংগঠিতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা একটু কঠিন ছিল। যেমন ধরুন, লংমার্চের মতো একটি বড় ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ও আমি সবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। যাঁরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের অনেকেই আমার ফেসবুক ঘোষণা দেখে জানতে পেরেছেন যে লংমার্চ টু ঢাকা এক দিন এগিয়ে আনা হয়েছে। তাঁরাও তখন সেটিই অনুসরণ করেছেন। মানে তখন আমাদের মধ্যে এমন একটি বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল যে, হয়তো আমরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছি না, কিন্তু কোনো নির্ভরযোগ্য জায়গা থেকে সিদ্ধান্ত এলে সবাই সেটিই মেনে চলবে। সবাই সেটিই সমানভাবে পোস্ট করবে এবং বাস্তবায়নের জন্য কাজ করবে। তো, ২ তারিখে যখন আমরা এক দফা ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিই, তার মানে তো আমরা স্থির করেই ফেলেছি যে শেখ হাসিনার পতন ঘটাব। ছাত্ররাজনীতি করতে গিয়ে এটিই শিখেছি যে, পরের ধাপটি আগে থেকেই ভেবে রাখতে হয়। সেই জায়গা থেকেই ভাবা শুরু হয় যে, পতনের পর তাহলে কী হবে? তখন আমাদের ভাবনা ছিল যে, সংস্কারসহ অন্যান্য কাজ করার জন্য হয়তো আমরা একটি জাতীয় সরকার গঠন করব। সেই জায়গা থেকে বিভিন্ন নামের প্রস্তাব আসতে শুরু করে এবং আমরা সবাইকে জিজ্ঞেস করতে থাকি যে আসলে কে প্রধান হতে পারেন। বেশির ভাগ মানুষই ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামটি বলছিলেন। আর দ্বিতীয় কোনো নাম, যিনি তাঁর সমসাময়িক বা সমপর্যায়ের হতে পারেন—যেমন আমরা অনেক সময় দুই-তিনজনের একটি শর্টলিস্ট করি—সেটিও আসলে হয়ে উঠছিল না। কারণ তাঁর মাপের আর কাউকে আমরা পাচ্ছিলাম না।
আমার মনে পড়ে, ২ তারিখে আমি আলী রীয়াজ স্যার ও বদিউল আলম মজুমদার স্যারের সঙ্গে কথা বলি। তাঁদের সঙ্গে আমার আগে থেকেই কথা হতো। তো আলী রীয়াজ স্যার আমাকে বলেন যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাজি হবেন না, তিনি এই দায়িত্ব নিতে চাইবেন না। পরে আমি তাঁদের কাছ থেকে যোগাযোগের মাধ্যম সংগ্রহ করি। এখানে আরেকজন ছিলেন, সাবেক ছাত্রদলের এক বড় ভাই আশিক—তিনিও ড. ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করেছিলেন। তো আমি ড. ইউনূসের টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং জানাই যে আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই। এরপর ৩ তারিখে তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম কথা হয়। তিনি তখন প্যারিসে ছিলেন এবং তাঁর একটি মাইনর অপারেশন হওয়ার কথা ছিল। তাঁর সঙ্গে কথা হলো, আমি তাঁকে বললাম যে আমরা তো এক দফা ঘোষণা করেছি, এখন আমরা আপনার সমর্থন চাই। তিনি বললেন, ‘আমার সমর্থন আছে। আন্তর্জাতিকভাবে আমি হয়তো বিষয়টি দেখব।’ তখন আমি তাঁকে বলি, যদি এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয় যে সরকারের পতন ঘটে, তবে আমরা চাই আপনি দায়িত্বটি গ্রহণ করুন। কিন্তু তিনি নিশ্চিত ছিলেন না যে সরকারের সত্যিই পতন হবে। ফলে আমার দিক থেকেও প্রস্তাবটি খুব জোরেশোরে দেওয়া হয়নি। তবু তিনি প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি বললেন যে, ‘আমি আসলে এই কাজের জন্য উপযুক্ত নই। ২০০৭ সালের দিকেও এমন একটি বিষয় এসেছিল, কিন্তু আমি আসলে এসবে আসিনি।’ তখন আমি তাঁকে বললাম, ‘স্যার, আপনি বিষয়টি নিয়ে অন্তত ভেবে দেখুন।’
এরপর ৪ ও ৫ তারিখেও তাঁর এবং তাঁর টিমের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল। ৫ তারিখ বিকেলে যখন শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলেন, তখন তাঁর সঙ্গে আমার আবার কথা হয়। আমি তাঁকে বললাম, ‘এখন তো সময় হয়ে গেছে, আমাদের আসলে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’ তখন তিনি কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে বললেন, ‘তোমরা এঁদের কথা ভাবতে পারো কি না দেখো।’ ড. আলী রীয়াজ, সালেহউদ্দিন আহমেদ বা ড. আসিফ নজরুল—এমন কয়েকটি নাম তিনি প্রস্তাব করলেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল এমন যে, অন্য যেকোনো কাউকে আমরা যেন বিবেচনা করি। তখন আমি তাঁকে বললাম, ‘আমরা যে অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি এবং এই গণ-অভ্যুত্থানের পর আমাদের যে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে, সেটি আপনার মতো ব্যক্তিত্ব ছাড়া অন্য কাউকে দিয়ে সমাধান হবে বলে আমি কল্পনাও করতে পারছি না।’ তখন তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি ভেবে দেখছি এবং জানাচ্ছি। তবে তোমরা বিকল্প খুঁজতে থাকো।’ এর মধ্যে বিষয়টি নিয়ে হয়তো নাহিদ ভাই, মাহফুজ ভাইসহ আরও দু-একজনের সঙ্গে আমার অল্পস্বল্প আলাপ হয়েছিল। খুব বড় পরিসরে আলোচনা করার সুযোগ তখন হয়নি। আমি তাঁদের শুধু অবহিত করেছিলাম যে আমি যোগাযোগ করছি। তাঁরাও বলেছিলেন, ‘ঠিক আছে, যোগাযোগ করে দেখো কী হয়।’ তবে সবার মধ্যেই একটি ধারণা ছিল যে, তিনি হয়তো শেষ পর্যন্ত আসবেন না।
এমনকি ৫ আগস্ট রাতে ৪টা-৬টার দিকে তো তাঁর সঙ্গে আমার কথা হলোই, ১১টায় যখন আসিফ নজরুল স্যারের সঙ্গে দেখা হলো। তিনিও বললেন, ‘ইউনূস স্যার আসবেন না। তাঁকে আমি ২৫ বছর ধরে চিনি, তিনি দায়িত্ব নেবেন না।’ আলী রীয়াজ স্যারও বলছিলেন যে তিনি আসবেন না। তো রাতে আমরা তাঁকে আবারও অনুরোধ করি। আমি আর নাহিদ ভাই রাত ১টা-দেড়টার দিকে তাঁর সঙ্গে খুব আর্জেন্সি নিয়ে কথা বলি। আমরা বলি যে, ‘আমাদের এখন আপনার নামটাই ঘোষণা করতে হবে। হ্যাঁ কিংবা না—যা-ই হোক, একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে নামটা ঘোষণা করতে হবে। কারণ, দেশ এখন নেতৃত্বহীন অবস্থায় আছে এবং একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়ে গেছে।’ যদিও সরকার গঠন হয়েছিল তিন দিন পর, কিন্তু তখন আমাদের মনে হয়েছিল যে, অন্তত নামটা ঘোষণা করা গেলে মানুষের মধ্যে একটি আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে। পরিস্থিতিও আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কারণ তখন সামরিক শাসন জারি হতে পারে বা অন্য কেউ ক্ষমতা নিতে পারে—এমন অনেক ধরনের কথা শোনা যাচ্ছিল। তখন তিনি বললেন, ‘তাহলে তো তোমাদের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলতে হবে।’ এরপর প্রায় এক-দেড় ঘণ্টার মতো আমাদের কথা হলো। এপাশে আমি ও নাহিদ ভাই ছিলাম, আর ওপাশে তিনি ছিলেন। তিনি তাঁর বেশ কয়েকটি কনসার্নের কথা জানালেন। তিনি জানতে চাইলেন যে তাঁকে কি পুতুল হিসেবে রাখা হবে কি না! ২০০৭ সালের দিকে তাঁকে যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, সেটি ছিল এমন যে—তিনি সামনে থাকবেন, তাঁর ভাবমূর্তিটা কাজে লাগানো হবে, কিন্তু পেছন থেকে সেনাবাহিনী ও অন্যরা কলকাঠি নাড়বে। তো তিনি পরিষ্কারভাবেই বললেন যে, ‘আমি যদি আসি, তবে সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব বা অথরিটি আমার হাতে থাকতে হবে।’ আর আমরাও এই বিষয়ে পুরোপুরি একমত ছিলাম।
স্ট্রিম: তিনি কি নির্দিষ্ট কোনো সময় চেয়েছিলেন? যেমন—আমাকে এত দিন সময় দিতে হবে?
আসিফ মাহমুদ: না না, ওই সময় সরকারের মেয়াদ নিয়ে আমাদের কোনো আলোচনা হয়নি। তাছাড়া ওই আলোচনা করার মতো পরিস্থিতিও তখন সেভাবে ছিল না। তবে শর্তের জায়গায় যখন আমরা একমত হলাম যে আমরা সামরিক শাসন সমর্থন করি না এবং আমরা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে আগ্রহী—সেই জায়গা থেকেই তিনি রাজি হন। পরবর্তী সময়ে মূলত সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন—এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
স্ট্রিম: সংস্কারের বিষয়গুলো নিয়ে তখনই আলোচনা হয়েছিল?
আসিফ মাহমুদ: হ্যাঁ, বিশেষ করে সংস্কার নিয়ে। কারণ আমাদের এক দফাতেই বলা ছিল যে, ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ চাই। তখন তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, তাহলে আমার নামটা তোমরা ঘোষণা করতে পারো।’ এরপর ওই রাতেই, আনুমানিক রাত ২টা বা ৩টার দিকে, আমরা একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে আমার প্রোফাইল থেকে ঘোষণা করে দিই যে তিনিই প্রধান উপদেষ্টা হবেন। এরপরের দুই দিন সেনাবাহিনী, সামরিক বাহিনীর প্রধান ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা হয়। এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে লিয়াজোঁ করা এবং উপদেষ্টা পরিষদ ঠিক করার পর শেষ পর্যন্ত ৮ তারিখে শপথটা হলো।
স্ট্রিম: আপনিসহ আপনাদের একটি অংশ উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দিয়েছিলেন। এত দিন পর এবং এত অভিজ্ঞতার পর এখন সেই সিদ্ধান্তটি নিয়ে কী মনে হয়?
আসিফ মাহমুদ: আমার মনে হয় ওই সময়টাতে অনেক বেশি সিচুয়েশনের ওপর ডিপেন্ড করে আমাদেরকে সিদ্ধান্তগুলো নিতে হচ্ছিল। সরকারের অংশ হওয়ার চিন্তাটা এই জায়গা থেকে ছিল যে এই গভর্নমেন্টে যারা উপদেষ্টা পরিষদে আসছেন তাদেরকে হয়তো আমরা নামে চিনি, কিন্তু তাদের সঙ্গে আমাদের ওয়ার্কিং রিলেশনশিপ নাই। তারা এই গণঅভ্যুত্থানকে কতটা ধারণ করবেন, গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে কতটা কাজ করবেন আমরা জানিনা। আমরা এর আগেও দেখেছি গণঅভ্যুত্থান হয়, তারপর হারিয়ে যায়। ৯০-এর দশকের অভিজ্ঞতা তো আছেই, যা আমরা ইতিহাস থেকে জেনেছি। সেই জায়গা থেকেই আমাদের একটি লক্ষ্য ছিল। এমন নয় যে আমাদের উপদেষ্টাই হতে হবে, মন্ত্রী হতে হবে বা মন্ত্রণালয় চালাতে হবে—এটি আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল সরকারের অংশ হয়ে একটি 'ওয়াচডগ' হিসেবে কাজ করা। সরকার যদি কখনো কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে যায়, তখন যেন আমরা ভেতর থেকে কথা বলতে পারি—মূলত সেই জায়গা থেকেই আমরা সরকারে গিয়েছিলাম।
কিন্তু এখন যদি আমাকে মূল্যায়ন করতে বলেন, তবে আমি বলব, তখন আইডিয়াল বা আরও ভালো সিদ্ধান্ত কী হতে পারত? একটি হতে পারত—পুরো সরকারটাই বিপ্লবী কায়দায় গঠন করা এবং সরকারে গণ-অভ্যুত্থানের অংশীজনদের সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। অন্ততপক্ষে ৭০ শতাংশ অংশীজন এবং ৩০ শতাংশ টেকনোক্র্যাট থাকতে পারতেন। আরেকটি বিকল্প হতে পারত—আমাদের কারও সরকারে না যাওয়া। তবে সে ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা নিয়ে একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারত। কারণ, ওই সময় আমরা যদি সরকারের মুখোমুখি দাঁড়াতাম, তাহলে এই সরকারের ফাংশন করার কোনো সুযোগই থাকত না। অনেকেই তখন এর সুযোগ নিতে পারত। তবে সেটিও একটি বিকল্প হতে পারত; সে ক্ষেত্রে অন্তত মাঠের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে থাকত এবং গণ-অভ্যুত্থানের পর্যায়টি হয়তো আরেকটু দীর্ঘ হতো। কিন্তু যেহেতু সরকারটি আমরাই নিয়ে এসেছিলাম, তাই ওই সময়ের জন্য সরকারে থেকে 'ওয়াচডগ' হিসেবে কাজ করাকেই আমাদের কাছে বেশি বাস্তবসম্মত মনে হয়েছিল। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, পরবর্তী সময়ে সরকার অনেক ক্ষেত্রেই সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়েছে। আমি শুরুতেই যেমন বললাম—আমরা যদি বিপ্লবী কায়দায় সরকার গঠন করতাম, তাহলে হয়তো আমরা নিজেরাই সেটি করতে পারতাম।
স্ট্রিম: সরকার যে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে আপনারা কী করেছেন? এই প্রশ্নটি তো আসেই।
আসিফ মাহমুদ: হ্যাঁ, আমরা আমাদের জায়গা থেকে বারবার কথা বলেছি। আপনি যদি সংস্কারের কথা বলেন, এটি তো একটি চলমান প্রক্রিয়া। যখন আলোচনা উঠছিল যে এই সংস্কার করার ম্যান্ডেট বা এখতিয়ার এই সরকারের আছে কি না? তখন আমরা পরিষ্কার বলেছি—হ্যাঁ, আছে। কারণ এটি গণ-অভ্যুত্থানের সরকার। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টাসহ সরকারের অন্যান্য উপদেষ্টারা হয়তো এই আত্মবিশ্বাস পাচ্ছিলেন না। তাঁদের ভাবনা ছিল—আমরা সবাইকে ডাকি, আলোচনা করে ঐকমত্যে আসি, তারপর আবার এটি গণভোটে দিই। অর্থাৎ, আপনার বৈধতা থাকা সত্ত্বেও নতুন করে বৈধতা নেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং এই চেষ্টায় গিয়েই কিন্তু আস্তে আস্তে মূল বিষয়গুলো হালকা হয়ে গেল। এই জায়গাটিতে আমরা সবসময় আমাদের দিক থেকে ভেতর থেকে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করেছি, যতটুকু আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল। তবে এখানে অবশ্যই একটি বাস্তবতা স্বীকার করতে হবে—এই সরকারের ব্যাকগ্রাউন্ড রাজনৈতিক নয় এবং তাঁরা সে অর্থে বিপ্লবীও নন। ফলে বিপ্লবী বা কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া, কিংবা ভালোর জন্য নিজেদের কাছে কর্তৃত্ব রাখাটা তাঁদের জন্য কঠিন ছিল।
স্ট্রিম: অনেকে বলছেন যে গণ-অভ্যুত্থানের ফলে শুধু একটি স্বৈরাচারী ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হয়েছে, আর কিছুই হয়নি। আপনারও কি এমনটি মনে হয়?
আসিফ মাহমুদ: প্রথমত, মূল প্রত্যাশাটি ছিল স্বৈরাচারী সরকারের পতন হবে। এই প্রত্যাশা তো আমরাই তৈরি করেছি। আমরা শুধু বলিনি যে শেখ হাসিনার পতন চাই। পাশাপাশি এ-ও বলেছি যে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থারও বিলোপ চাই। আর এটি আমরা সচেতনভাবেই আমাদের রাজনৈতিক বোঝাপড়া থেকে বলেছি। ফলে মানুষের প্রত্যাশা ছিল যে—ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ হবে, দৈনন্দিন সমস্যার সমাধান হবে, রাষ্ট্রের একটি সুন্দর কাঠামো তৈরি হবে, গণতন্ত্রের সূচকে আমরা আরও এগিয়ে যাব এবং জবাবদিহির পরিবেশ তৈরি হবে। অর্থাৎ, শেখ হাসিনার পতনের পর বহুদূর পর্যন্ত মানুষের প্রত্যাশা ছিল। সেই প্রত্যাশা আমরাই তৈরি করেছিলাম। কিন্তু সরকারের যখন পতন হলো, তখন আমরা একটি ধাপ পার করলাম ঠিকই, কিন্তু পরবর্তী ধাপে যতটুকু গতি ও অ্যাগ্রেসিভ মনোভাব নিয়ে কাজ করা দরকার ছিল, সেটি আর সম্ভব হয়নি। ফলে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে একটি ফারাক তৈরি হয়েছে। তবে আমি কখনোই মনে করি না যে এই গণ-অভ্যুত্থান শুধু আওয়ামী লীগের পতন ঘটিয়েছে। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক চর্চা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ডেমোগ্রাফি—পুরো জায়গাতেই একটি বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এখন প্রশ্ন হলো, এটিকে আমরা দেশের মঙ্গলের জন্য কাজে লাগাতে পারছি কি না। আপনি যদি খেয়াল করেন, যে ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়িত হলেও রাষ্ট্র হিসেবে আমরা জবাবদিহি ও গণতন্ত্রের সূচকে অনেক দূর এগিয়ে যেতাম। কিন্তু আমাদের এই বাজে রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে সেই জায়গাতেও আমরা আবার পিছিয়ে গেছি।
স্ট্রিম: আপনার কাছে শেষ প্রশ্ন। আপনারা তরুণদের নেতৃত্বে এনসিপি গঠন করেছেন। তারা এখন পার্লামেন্টে আছে। রাজপথে থাকারও সুযোগ তাদের আছে। প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি ক্ষমতায় আছে। আরেকটি দল ক্ষমতাচ্যুত ও পলাতক অবস্থায় আছে। কিন্তু দেশে তাদেরও একধরনের জনসমর্থন আছে। সে অর্থে তারা একেবারে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে তা বলা যাবে না। এই অবস্থায় আপনারা নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য নিয়ে দাঁড়াতে পারবেন—এ বিষয়ে আপনার প্রত্যাশা কতটুকু?
আসিফ মাহমুদ: বাংলাদেশের মতো একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে খুব দ্রুত পরিবর্তন আসা বা মানুষের মননে খুব দ্রুত নতুন কাউকে গ্রহণ করে নেওয়ার উদাহরণ খুব একটা নেই। তারপরও আমার মনে হয়, মাত্র এক বছর বয়সী একটি রাজনৈতিক দল হয়ে সংসদে ৮ জন আইনপ্রণেতা পাঠাতে পারা এবং ভোট ও আসন পাওয়ার দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে থাকাটা এনসিপির জন্য একটি বড় অর্জন। যদিও এটি আরও ভালো হতে পারত। আমার জায়গা থেকে মনে হয়, রাজনৈতিকভাবে এনসিপির একটি শক্ত জায়গা তৈরি করার সম্ভাবনা আছে। মানুষের মধ্যেও একটি আকাঙ্ক্ষা আছে, মানুষের সঙ্গে কথা বললে বুঝতে পারি যে তারা এটি চায়। এই সম্ভাবনা পুরোপুরিই আছে, তবে এটি নির্ভর করবে এনসিপির নেতৃত্ব কতটা চৌকসভাবে এটি বাস্তবায়ন করতে পারে তার ওপর। যেহেতু এনসিপির নেতৃত্ব মূলত তরুণদের হাতে—যাঁদের ছাত্ররাজনীতি ও গণ-অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা আছে, কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে তাঁরা অনেকটাই নতুন—তাই আমাদের কাজ করতে করতে শিখতে হচ্ছে। কারণ জাতীয় রাজনীতিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে আমরা অনেক জায়গায় প্রতারণার শিকার হয়েছি, ফলে রাজনীতি আসলে কীভাবে কাজ করে সেটি আমাদের প্রতিনিয়ত শিখতে হচ্ছে। তাই হয়তো এতে কিছুটা সময় লাগবে, তবে আমি মনে করি সম্ভাবনাটি প্রবল। আমরা যেহেতু নেতৃত্বে আছি, তাই এটিকে আমরা কোথায় নিয়ে যেতে পারব, তা নির্ভর করবে আমাদের নিজেদের সক্ষমতার ওপর।
স্ট্রিম: আসিফ মাহমুদ আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
আসিফ মাহমুদ: ঢাকা স্ট্রিমকেও ধন্যবাদ।
.png)
.png)

প্রতি বছর একটি দৃশ্য নিয়মিত দেখা যায়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল তাদের দুর্নীতি ধারণাসূচক প্রকাশ করে, এরপর তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। কেউ বলেন, বাংলাদেশের অবস্থানের প্রতি অবিচার করা হয়েছে। কেউ বলেন, সূচকটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আবার কেউ প্রশ্ন তোলেন এর পদ্ধতি নিয়ে।
৫ ঘণ্টা আগে
তারেক রহমানের চীন সফরটি আগের সফর গুলোর চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ভারতের জন্য এর কূটনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ অংশীদার এবং একই সঙ্গে চীনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী।
৫ ঘণ্টা আগে
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে একই সঙ্গে বইছে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বাতাস। একদিকে দোহায় দীর্ঘমেয়াদি শান্তি চুক্তি ও হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলছে নিবিড় কারিগরি আলোচনা।
৮ ঘণ্টা আগে
কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এককেন্দ্রিক ধারায় পরিচালিত হয়ে এসেছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ষোলো বছরের দীর্ঘ শাসনামলে নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়।
১ দিন আগে