জন্মদিন
তুফায়েল আহমদ

ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমা বের হয়েছে শুনলেই আমার মতো ‘গতানুগতিক সিনেমা’ দেখা দর্শকের বুকের বাঁ দিকটা কেমন চিনচিন করে ওঠে। উত্তেজনার চেয়ে ভয়টাই যেন একটু বেশি কাজ করে। সিনেমা দেখতে বসার আগে মনে হয়, আগামীকাল উচ্চমাধ্যমিকের ফিজিক্স বা রসায়নের ফাইনাল পরীক্ষা, আর আমি সিলেবাসের কিছুই পড়িনি।
সিনেমা তো সাধারণত আরাম করে বসে দেখার একটা ব্যাপার। পপকর্ন হাতে, মাথা একটু হালকা রেখে গল্পে ডুবে যাওয়া। কিন্তু নোলানের সিনেমার ক্ষেত্রে মনে হয়, পপকর্নের সঙ্গে খাতা-কলম, ক্যালকুলেটর আর দুই কাপ কফিও রাখা দরকার। কখন কী মিস হয়ে যায়, কে জানে!
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সিনেমা দেখার মতো আনন্দের বিষয়টাকে নোলান কেন এমন মাথা খাটানোর কাজে পরিণত করেন? তাঁর সিনেমা বুঝতে এত কঠিন লাগে কেন? সোশ্যাল মিডিয়া মিমের ভাষায় বলতে গেলে ‘বড্ড হয়রান লাগে’!
সত্যিই কি নোলানের সিনেমা এত দুর্ভেদ্য? নাকি সমস্যাটা আমাদের? আমরা কি সহজ, বিনোদন আর গা ভাসিয়ে চলার মানসিকতায় গতানুগতিক দেখা-বোঝার বাইরের জিনিস নিয়ে অযথা ভয়ে থাকি? আমরা কি এতটাই অলস যে একটু পরিশ্রম করাকে অতিরিক্ত অত্যাচার মনে করি?
নোলানের সিনেমা দেখতে বসে আমরা এত ক্লান্ত হয়ে পড়ি কেন? এর উত্তর খুঁজতে হলে আগে আমাদের সিনেমা দেখার অভ্যাসটার দিকে একটু তাকাতে হবে।
সারাদিনের কাজের চাপ শেষে আমরা সিনেমা দেখতে বসি। একটু আরাম পাওয়া এবং মগজটাকে শান্ত করে কল্পনার জগতে হারিয়ে যাওয়াই থাকে মূল উদ্দেশ্য। ঠিক সেই মুহূর্তেই নোলান আমাদের সামনে এসে হাজির হন। তিনি আমাদের হাতে বিনোদনের বদলে একগাদা জটিল বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ধরিয়ে দেন। তাঁর গল্প সোজা পথে হাঁটে না।
পর্দায় ঠিক কী ঘটছে, তা বুঝতে হলে দর্শককে আক্ষরিক অর্থেই মগজের সবটুকু শক্তি খরচ করতে হয়। এদিকে আমরা এখন টিকটক আর রিলসের ১৫ সেকেন্ডের বিনোদনে অভ্যস্ত। আমাদের মনোযোগের পরিধিও আগের চেয়ে অনেক ছোট হয়ে গেছে। এমন এক মগজ নিয়ে যদি তিন ঘণ্টার কোয়ান্টাম ফিজিক্স, সময় আর বাস্তবতার গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়ি, তাহলে হয়রান লাগাটাই স্বাভাবিক। ফলে পুরোটা সময় চোখ এবং কানকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখতে হয়।
সমালোচকদের দাবি, নোলানের সিনেমার চরিত্রগুলোর দিকে তাকালে অদ্ভুত শূন্যতা চোখে পড়ে। রক্তমাংসের মানুষের আবেগ খুব কমই দেখা যায়। তারা যেন সারাক্ষণ গম্ভীর মুখে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে, আর উইকিপিডিয়া থেকে মুখস্থ করা তথ্যের মতো একের পর এক ‘এক্সপোজিশন’ বা পটভূমি ব্যাখ্যার সংলাপ আওড়ে যায়।

নোলানের সিনেমায় নারী চরিত্র নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। অনেকের মতে, তাদের ভূমিকা বেশির ভাগ সময় দুটি জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে। হয় তারা মারা গিয়ে নায়কের মধ্যে আজীবনের অপরাধবোধ বা ট্রমা তৈরি করেন। নয়তো বোকা বোকা প্রশ্ন করে নায়কের (এবং দর্শকের) কাছে সায়েন্সের থিয়োরিগুলো ব্যাখ্যা করার সুযোগ করে দেন।
প্রখ্যাত সমালোচক রিচার্ড ব্রডি ‘দ্য নিউ ইয়র্কার’-এ নোলানের ‘ডানকার্ক’ নিয়ে লিখেছিলেন, ‘নোলানের চরিত্রগুলোর কোনো অন্তর্নিহিত মনস্তত্ত্ব নেই, তারা কেবল প্লটকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্র মাত্র।’ যদিও বিখ্যাত পরিচালক কোয়েন্টিন টারান্টিনো ‘ডানকার্ক’-এর প্রশংসা করেছেন।
নোলানের ‘টেনেট’-এর মতো সিনেমার ক্ষেত্রে অনেকেই অভিযোগ করেছেন, এর শব্দমিশ্রণ এতই বিকট যে চরিত্রদের কথা শোনাই যায় না। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, টাইমলাইনের ভেলকি আর কান ফাটানো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিয়ে কি তবে নোলান ইমোশনাল সংযোগের অভাবটাকে গায়েব করে দেন?
২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ওপেনহাইমার’ সিনেমা জুড়ে দেখানো হলো, রবার্ট ওপেনহাইমার নামক শ্বেতাঙ্গ বিজ্ঞানীর মনে কত কষ্ট, কত জটিলতা। তিনি বোমা বানিয়ে ফেলার পর গীতার শ্লোক আওড়াচ্ছেন আর অপরাধবোধে ভুগছেন। কিন্তু যে পারমাণবিক বোমায় হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাল, মুহূর্তের মধ্যে শহর দুটো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো, হাজার হাজার মানুষ দগ্ধ হলো, আর পরবর্তী প্রজন্মও রেডিয়েশনের ভয়াবহ পরিণতি বয়ে বেড়াল—তাদের কোনো জায়গা হলো না নোলানের এই মহান সেলুলয়েডে!
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সমালোচক রিচার্ড লসন লিখেছিলেন, ‘ওপেনহাইমার সিনেমা বোমার স্রষ্টার মনস্তত্ত্ব নিয়ে যতটা চিন্তিত, বোমার শিকার হওয়া জাপানিদের নিয়ে ততটাই উদাসীন।’
এখানেই প্রশ্নটা উঠে আসে। ভুক্তভোগীদের প্রায় পুরোপুরি আড়ালে রেখে শুধু বোমার নির্মাতার মানসিক সংকট নিয়েই এত দীর্ঘ সময় ব্যয় করা কি শিল্পের সচেতন সিদ্ধান্ত? নাকি পশ্চিমা গল্প বলার সেই পরিচিত প্রবণতা? কেউ কেউ একে ‘হোয়াইট গিল্ট’ মানসিকতারই আরেক রূপ বলে মনে করেন।
এত এত সমালোচনার পরও ক্রিস্টোফার নোলান বর্তমান সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচালক। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তাঁর সিনেমা ভালো লাগতে পারে, নাও লাগতে পারে। কিন্তু সিনেমার ভাষা বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান নিয়ে তর্ক করার সুযোগ খুব কম।
একসময় হলিউডের বড় বাজেটের সিনেমা মানেই ছিল চোখধাঁধানো বিস্ফোরণ আর মাথা না খাটিয়ে উপভোগ করার মতো বিনোদন। নোলান সেই ধারণাটাই পাল্টে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ব্লকবাস্টার সিনেমাতেও বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার জায়গাও তৈরি করা সম্ভব।
‘দ্য ডার্ক নাইট’ ট্রিলজির কথা ভাবা যেতে পারে। সুপারহিরো সিনেমাকে তিনি এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কমিক বুকের চরিত্রকে তিনি বাস্তব পৃথিবীর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন।

আরেকটি জায়গায় নোলান একেবারেই ব্যতিক্রম। সিনেমায় স্পেশাল ইফেক্ট বা সিজিআইয়ের যথেচ্ছ ব্যবহারের এই যুগে নোলান একজন খাঁটি শিল্পী। ‘দ্য ডার্ক নাইট’ সিনেমায় সত্যিকারের আস্ত একটি ট্রাক উল্টে দেওয়া হয়েছিল। ‘টেনেট’ সিনেমায় তিনি সত্যিই একটি বোয়িং ৭৪৭ বিমান বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন। ‘ওপেনহাইমার’ সিনেমায় সিজিআই ছাড়াই ট্রিনিটি টেস্টের সেই পারমাণবিক বিস্ফোরণের দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে। সিনেমা বানানোর প্রতি এই অবিচল নিষ্ঠা অন্য সবার চেয়ে তাঁকে আলাদা করেছে।
শুধু তা-ই নয়, ডিজিটাল যুগেও নোলান সেলুলয়েড ফিল্মের অন্যতম বড় রক্ষাকর্তা। আইম্যাক্স ক্যামেরার ব্যবহারকে তিনি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। এই মনোভাব হলিউডে বিরল।
এবার আসা যাক আমাদের কথায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নোলান-প্রীতি নিজেই এক মজার সামাজিক গবেষণার বিষয় হতে পারে। শর্টকাটের প্রতি বাঙালির প্রেম নতুন কিছু নয়। রাস্তায় জ্যাম দেখলে উল্টো পথে বাইক চালাই, পরীক্ষার আগে পুরো বই না পড়ে সাজেশন খুঁজি, পাঁচ মিনিটের ইউটিউব ভিডিও দেখে পুরো ইতিহাস জেনে ফেলেছি বলে ভাবি। অথচ সেই আমরাই নোলানের সিনেমার সামনে বসলে হঠাৎ যেন অন্য মানুষ হয়ে যাই। আমরা চাই প্রমাণ দাখিল করতে যে আমাদের রুচি কতটা উন্নত। ফলে যে সিনেমাটা মাথার ওপর দিয়ে যায়, সেটাকেই আমরা সবার আগে ‘মাস্টারপিস’ ঘোষণা করি।
সবচেয়ে মজার ব্যাপারটা জানেন কোথায়? নোলান বছরের পর বছর বলে আসছেন, তাঁর সিনেমা দেখতে হলে ৭০ মিমি আইম্যাক্স পর্দার বিকল্প নেই। আর আমরা কী করি? টরেন্ট বা টেলিগ্রাম থেকে ১০৮০পি, কখনো ৭২০পি ওয়েব-রিপ নামিয়ে ১৪ ইঞ্চির ল্যাপটপে সিনেমা চালাই। ছোট্ট স্ক্রিনে, পাইরেটেড কপিতে নোলানের সেই ‘সিনেমাটিক এক্সপেরিয়েন্স’-এর বারোটা বাজিয়ে আমরা সিনেমাটা দেখি। অর্ধেক জিনিস বুঝি না, বাকি অর্ধেক বোঝার ভান করি। তারপর সিনেমা শেষ হওয়া মাত্রই ইন্টারনেটে ঢুকে ‘অডিসি এন্ডিং এক্সপ্লেইনড ইন বাংলা’ ভিডিও সার্চ করি। সেই ধার-করা জ্ঞান নিয়ে ফেসবুকে এসে এমন আড়াই হাজার শব্দের পোস্ট হাঁকাই, যেন নোলানের সাথে গত রাতেই চা খেতে খেতে আমার চিত্রনাট্য নিয়ে গভীর আলোচনা হয়েছে।
আসলে সমস্যাটা নোলানকে বোঝা নয়, সমস্যাটা হলো নোলানকে বোঝানোর চেষ্টা। তাঁর সিনেমা দেখা এখন অনেকের কাছে নিছক বিনোদন বা শিল্প উপভোগের বিষয় নয়; বরং এটা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ইন্টেলেকচুয়াল স্ট্যাটাস সিম্বল’ বা সামাজিক আভিজাত্যের প্রতীক। কেউ যদি সৎ সাহসে বলে ফেলে, ‘আমি টেনেট বা ইনসেপশন-এর মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝিনি, আমার ভালো লাগেনি’, তখন তাঁকে এমনভাবে জাজ করা হয়, যেন সে সিনেমা সম্পর্কে কিছুই জানে না। এই ভয়ে নোলানের সিনেমা ভালো না লাগলেও আমরা অনেকে তা বলতে পারি না।

ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমা বের হয়েছে শুনলেই আমার মতো ‘গতানুগতিক সিনেমা’ দেখা দর্শকের বুকের বাঁ দিকটা কেমন চিনচিন করে ওঠে। উত্তেজনার চেয়ে ভয়টাই যেন একটু বেশি কাজ করে। সিনেমা দেখতে বসার আগে মনে হয়, আগামীকাল উচ্চমাধ্যমিকের ফিজিক্স বা রসায়নের ফাইনাল পরীক্ষা, আর আমি সিলেবাসের কিছুই পড়িনি।
সিনেমা তো সাধারণত আরাম করে বসে দেখার একটা ব্যাপার। পপকর্ন হাতে, মাথা একটু হালকা রেখে গল্পে ডুবে যাওয়া। কিন্তু নোলানের সিনেমার ক্ষেত্রে মনে হয়, পপকর্নের সঙ্গে খাতা-কলম, ক্যালকুলেটর আর দুই কাপ কফিও রাখা দরকার। কখন কী মিস হয়ে যায়, কে জানে!
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সিনেমা দেখার মতো আনন্দের বিষয়টাকে নোলান কেন এমন মাথা খাটানোর কাজে পরিণত করেন? তাঁর সিনেমা বুঝতে এত কঠিন লাগে কেন? সোশ্যাল মিডিয়া মিমের ভাষায় বলতে গেলে ‘বড্ড হয়রান লাগে’!
সত্যিই কি নোলানের সিনেমা এত দুর্ভেদ্য? নাকি সমস্যাটা আমাদের? আমরা কি সহজ, বিনোদন আর গা ভাসিয়ে চলার মানসিকতায় গতানুগতিক দেখা-বোঝার বাইরের জিনিস নিয়ে অযথা ভয়ে থাকি? আমরা কি এতটাই অলস যে একটু পরিশ্রম করাকে অতিরিক্ত অত্যাচার মনে করি?
নোলানের সিনেমা দেখতে বসে আমরা এত ক্লান্ত হয়ে পড়ি কেন? এর উত্তর খুঁজতে হলে আগে আমাদের সিনেমা দেখার অভ্যাসটার দিকে একটু তাকাতে হবে।
সারাদিনের কাজের চাপ শেষে আমরা সিনেমা দেখতে বসি। একটু আরাম পাওয়া এবং মগজটাকে শান্ত করে কল্পনার জগতে হারিয়ে যাওয়াই থাকে মূল উদ্দেশ্য। ঠিক সেই মুহূর্তেই নোলান আমাদের সামনে এসে হাজির হন। তিনি আমাদের হাতে বিনোদনের বদলে একগাদা জটিল বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ধরিয়ে দেন। তাঁর গল্প সোজা পথে হাঁটে না।
পর্দায় ঠিক কী ঘটছে, তা বুঝতে হলে দর্শককে আক্ষরিক অর্থেই মগজের সবটুকু শক্তি খরচ করতে হয়। এদিকে আমরা এখন টিকটক আর রিলসের ১৫ সেকেন্ডের বিনোদনে অভ্যস্ত। আমাদের মনোযোগের পরিধিও আগের চেয়ে অনেক ছোট হয়ে গেছে। এমন এক মগজ নিয়ে যদি তিন ঘণ্টার কোয়ান্টাম ফিজিক্স, সময় আর বাস্তবতার গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়ি, তাহলে হয়রান লাগাটাই স্বাভাবিক। ফলে পুরোটা সময় চোখ এবং কানকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখতে হয়।
সমালোচকদের দাবি, নোলানের সিনেমার চরিত্রগুলোর দিকে তাকালে অদ্ভুত শূন্যতা চোখে পড়ে। রক্তমাংসের মানুষের আবেগ খুব কমই দেখা যায়। তারা যেন সারাক্ষণ গম্ভীর মুখে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে, আর উইকিপিডিয়া থেকে মুখস্থ করা তথ্যের মতো একের পর এক ‘এক্সপোজিশন’ বা পটভূমি ব্যাখ্যার সংলাপ আওড়ে যায়।

নোলানের সিনেমায় নারী চরিত্র নিয়েও সমালোচনা রয়েছে। অনেকের মতে, তাদের ভূমিকা বেশির ভাগ সময় দুটি জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে। হয় তারা মারা গিয়ে নায়কের মধ্যে আজীবনের অপরাধবোধ বা ট্রমা তৈরি করেন। নয়তো বোকা বোকা প্রশ্ন করে নায়কের (এবং দর্শকের) কাছে সায়েন্সের থিয়োরিগুলো ব্যাখ্যা করার সুযোগ করে দেন।
প্রখ্যাত সমালোচক রিচার্ড ব্রডি ‘দ্য নিউ ইয়র্কার’-এ নোলানের ‘ডানকার্ক’ নিয়ে লিখেছিলেন, ‘নোলানের চরিত্রগুলোর কোনো অন্তর্নিহিত মনস্তত্ত্ব নেই, তারা কেবল প্লটকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্র মাত্র।’ যদিও বিখ্যাত পরিচালক কোয়েন্টিন টারান্টিনো ‘ডানকার্ক’-এর প্রশংসা করেছেন।
নোলানের ‘টেনেট’-এর মতো সিনেমার ক্ষেত্রে অনেকেই অভিযোগ করেছেন, এর শব্দমিশ্রণ এতই বিকট যে চরিত্রদের কথা শোনাই যায় না। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, টাইমলাইনের ভেলকি আর কান ফাটানো ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক দিয়ে কি তবে নোলান ইমোশনাল সংযোগের অভাবটাকে গায়েব করে দেন?
২০২৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ওপেনহাইমার’ সিনেমা জুড়ে দেখানো হলো, রবার্ট ওপেনহাইমার নামক শ্বেতাঙ্গ বিজ্ঞানীর মনে কত কষ্ট, কত জটিলতা। তিনি বোমা বানিয়ে ফেলার পর গীতার শ্লোক আওড়াচ্ছেন আর অপরাধবোধে ভুগছেন। কিন্তু যে পারমাণবিক বোমায় হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারাল, মুহূর্তের মধ্যে শহর দুটো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো, হাজার হাজার মানুষ দগ্ধ হলো, আর পরবর্তী প্রজন্মও রেডিয়েশনের ভয়াবহ পরিণতি বয়ে বেড়াল—তাদের কোনো জায়গা হলো না নোলানের এই মহান সেলুলয়েডে!
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর সমালোচক রিচার্ড লসন লিখেছিলেন, ‘ওপেনহাইমার সিনেমা বোমার স্রষ্টার মনস্তত্ত্ব নিয়ে যতটা চিন্তিত, বোমার শিকার হওয়া জাপানিদের নিয়ে ততটাই উদাসীন।’
এখানেই প্রশ্নটা উঠে আসে। ভুক্তভোগীদের প্রায় পুরোপুরি আড়ালে রেখে শুধু বোমার নির্মাতার মানসিক সংকট নিয়েই এত দীর্ঘ সময় ব্যয় করা কি শিল্পের সচেতন সিদ্ধান্ত? নাকি পশ্চিমা গল্প বলার সেই পরিচিত প্রবণতা? কেউ কেউ একে ‘হোয়াইট গিল্ট’ মানসিকতারই আরেক রূপ বলে মনে করেন।
এত এত সমালোচনার পরও ক্রিস্টোফার নোলান বর্তমান সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচালক। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তাঁর সিনেমা ভালো লাগতে পারে, নাও লাগতে পারে। কিন্তু সিনেমার ভাষা বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান নিয়ে তর্ক করার সুযোগ খুব কম।
একসময় হলিউডের বড় বাজেটের সিনেমা মানেই ছিল চোখধাঁধানো বিস্ফোরণ আর মাথা না খাটিয়ে উপভোগ করার মতো বিনোদন। নোলান সেই ধারণাটাই পাল্টে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন, ব্লকবাস্টার সিনেমাতেও বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার জায়গাও তৈরি করা সম্ভব।
‘দ্য ডার্ক নাইট’ ট্রিলজির কথা ভাবা যেতে পারে। সুপারহিরো সিনেমাকে তিনি এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। কমিক বুকের চরিত্রকে তিনি বাস্তব পৃথিবীর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিশিয়ে দিয়েছেন।

আরেকটি জায়গায় নোলান একেবারেই ব্যতিক্রম। সিনেমায় স্পেশাল ইফেক্ট বা সিজিআইয়ের যথেচ্ছ ব্যবহারের এই যুগে নোলান একজন খাঁটি শিল্পী। ‘দ্য ডার্ক নাইট’ সিনেমায় সত্যিকারের আস্ত একটি ট্রাক উল্টে দেওয়া হয়েছিল। ‘টেনেট’ সিনেমায় তিনি সত্যিই একটি বোয়িং ৭৪৭ বিমান বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন। ‘ওপেনহাইমার’ সিনেমায় সিজিআই ছাড়াই ট্রিনিটি টেস্টের সেই পারমাণবিক বিস্ফোরণের দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে। সিনেমা বানানোর প্রতি এই অবিচল নিষ্ঠা অন্য সবার চেয়ে তাঁকে আলাদা করেছে।
শুধু তা-ই নয়, ডিজিটাল যুগেও নোলান সেলুলয়েড ফিল্মের অন্যতম বড় রক্ষাকর্তা। আইম্যাক্স ক্যামেরার ব্যবহারকে তিনি শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। এই মনোভাব হলিউডে বিরল।
এবার আসা যাক আমাদের কথায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নোলান-প্রীতি নিজেই এক মজার সামাজিক গবেষণার বিষয় হতে পারে। শর্টকাটের প্রতি বাঙালির প্রেম নতুন কিছু নয়। রাস্তায় জ্যাম দেখলে উল্টো পথে বাইক চালাই, পরীক্ষার আগে পুরো বই না পড়ে সাজেশন খুঁজি, পাঁচ মিনিটের ইউটিউব ভিডিও দেখে পুরো ইতিহাস জেনে ফেলেছি বলে ভাবি। অথচ সেই আমরাই নোলানের সিনেমার সামনে বসলে হঠাৎ যেন অন্য মানুষ হয়ে যাই। আমরা চাই প্রমাণ দাখিল করতে যে আমাদের রুচি কতটা উন্নত। ফলে যে সিনেমাটা মাথার ওপর দিয়ে যায়, সেটাকেই আমরা সবার আগে ‘মাস্টারপিস’ ঘোষণা করি।
সবচেয়ে মজার ব্যাপারটা জানেন কোথায়? নোলান বছরের পর বছর বলে আসছেন, তাঁর সিনেমা দেখতে হলে ৭০ মিমি আইম্যাক্স পর্দার বিকল্প নেই। আর আমরা কী করি? টরেন্ট বা টেলিগ্রাম থেকে ১০৮০পি, কখনো ৭২০পি ওয়েব-রিপ নামিয়ে ১৪ ইঞ্চির ল্যাপটপে সিনেমা চালাই। ছোট্ট স্ক্রিনে, পাইরেটেড কপিতে নোলানের সেই ‘সিনেমাটিক এক্সপেরিয়েন্স’-এর বারোটা বাজিয়ে আমরা সিনেমাটা দেখি। অর্ধেক জিনিস বুঝি না, বাকি অর্ধেক বোঝার ভান করি। তারপর সিনেমা শেষ হওয়া মাত্রই ইন্টারনেটে ঢুকে ‘অডিসি এন্ডিং এক্সপ্লেইনড ইন বাংলা’ ভিডিও সার্চ করি। সেই ধার-করা জ্ঞান নিয়ে ফেসবুকে এসে এমন আড়াই হাজার শব্দের পোস্ট হাঁকাই, যেন নোলানের সাথে গত রাতেই চা খেতে খেতে আমার চিত্রনাট্য নিয়ে গভীর আলোচনা হয়েছে।
আসলে সমস্যাটা নোলানকে বোঝা নয়, সমস্যাটা হলো নোলানকে বোঝানোর চেষ্টা। তাঁর সিনেমা দেখা এখন অনেকের কাছে নিছক বিনোদন বা শিল্প উপভোগের বিষয় নয়; বরং এটা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ইন্টেলেকচুয়াল স্ট্যাটাস সিম্বল’ বা সামাজিক আভিজাত্যের প্রতীক। কেউ যদি সৎ সাহসে বলে ফেলে, ‘আমি টেনেট বা ইনসেপশন-এর মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝিনি, আমার ভালো লাগেনি’, তখন তাঁকে এমনভাবে জাজ করা হয়, যেন সে সিনেমা সম্পর্কে কিছুই জানে না। এই ভয়ে নোলানের সিনেমা ভালো না লাগলেও আমরা অনেকে তা বলতে পারি না।
.png)

বাংলা চলচ্চিত্রের নন্দিত অভিনেত্রী ববিতার জন্মদিন আজ।
৪ ঘণ্টা আগে
ভারতীয় সাহিত্যে গত কয়েক দশকে শক্তিশালী যেসব সাহিত্যধারার উত্থান ঘটেছে, তার মধ্যে একটি দলিত সাহিত্য। দলিত সাহিত্য বলতে দলিত সম্প্রদায়ের মানুষের জীবন-সংগ্রাম, বঞ্চনা, বৈষম্য এবং আত্মমর্যাদার লড়াইকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সাহিত্যকে বোঝানো হয়েছে। এই সাহিত্য মূলত দলিতদের নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে লেখা
১৩ ঘণ্টা আগে
১৯৭৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম প্রকাশিত হয় মঈদুল হাসানের বই ‘মূলধারা ৭১’। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে এর দ্বিতীয় সংস্করণের সপ্তম মুদ্রণ প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও বইটির গুরুত্ব কমেনি। বরং নতুন প্রজন্মের কাছে এটি আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
২৯ জুলাই ২০২৬
গত কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি খবর ঘুরে বেড়াচ্ছে—‘গোপাল ভাঁড়’ কার্টুনটি নাকি শেষ হয়ে গেছে। ‘গোপাল মারা গেছে’, ‘শৈশব শেষ হয়ে গেল’—এমন সব কথা লিখে আবেগঘন পোস্ট দিচ্ছেন ভক্তরা। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক—সব জায়গায় একটি ছোট্ট ভিডিও ক্লিপ দেখা যাচ্ছে। সেখানে দেখা যায়, গোপাল মৃত্যুশয্যায় শুয়ে আছে।
২৯ জুলাই ২০২৬