৩০ জুলাই নাকি আগস্টের প্রথম রোববার, ফ্রেন্ডশিপ ডে আসলে কবে

স্ট্রিম গ্রাফিক

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সকাল থেকেই দেখা যাচ্ছে অনেকেই লিখছেন, ‘হ্যাপি ইন্টারন্যাশনাল ফ্রেন্ডশিপ ডে।’ কিন্তু আর মাত্র কয়েক দিন পরই, আগস্টের প্রথম রোববার আবারও ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম আর হোয়াটসঅ্যাপ ভরে যাবে একই শুভেচ্ছাবার্তায়। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—বন্ধু দিবস কি বছরে দুবার আসে?

এর উত্তর, হ্যাঁ এবং না—দুটোই। কারণ ৩০ জুলাই এবং আগস্টের প্রথম রোববার—দুই তারিখের পেছনে আছে দুই ভিন্ন উদ্দেশ্য এবং দুই ধরনের উদযাপন। একটি এসেছে আন্তর্জাতিক শান্তি ও কূটনৈতিক ভাবনার জায়গা থেকে, অন্যটি এসেছে মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক উদযাপনের সংস্কৃতি থেকে। তাই বিভ্রান্তি থাকলেও বাস্তবে দুটি দিনের অস্তিত্বের পেছনে রয়েছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা।

বন্ধুত্বকে শান্তির ভাষা বানানোর চেষ্টা

২০১১ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩০ জুলাইকে আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। তাদের যুক্তি ছিল, পৃথিবীতে যুদ্ধ, সংঘাত, ঘৃণা এবং বিভাজনের সময়ে বন্ধুত্ব কেবল ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়। এটি জাতি, সংস্কৃতি এবং ধর্মের মধ্যেও সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে।

জাতিসংঘের ঘোষণায় বিশেষভাবে বলা হয়, বিভিন্ন দেশ, সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে বন্ধুত্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা হতে পারে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে বন্ধুত্ব তৈরির মাধ্যমে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান এবং সংলাপকে উৎসাহিত করা হয়।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল ইউনেস্কোর বহু বছরের ‘সংস্কৃতির মাধ্যমে শান্তি’ ধারণা। নব্বইয়ের দশক থেকেই ইউনেস্কো বলছিল, যুদ্ধ থামানোর জন্য শুধু চুক্তি যথেষ্ট নয়, মানুষের মনেও শান্তির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। জাতিসংঘ পরে সেই ধারণাকেই আরও বিস্তৃত করে বন্ধুত্ব দিবসকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।

৩০ জুলাই পালিত হওয়া এই দিবসের মূল বার্তা হলো—বন্ধুত্ব মানে শুধু দুইজন মানুষের সম্পর্ক নয় বরং মানুষে মানুষে, এমনকি রাষ্ট্রে রাষ্ট্রেও বিশ্বাস ও সহমর্মিতা তৈরি করা।

কেন ৩০ জুলাই

এই নির্দিষ্ট তারিখ এসেছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়ে থেকে। ১৯৫৮ সালে প্যারাগুয়ের চিকিৎসক ডা. রামোন আর্তেমিও ব্রাচো তাঁর বন্ধুদের প্রস্তাব দেন—বিশ্বজুড়ে একই দিনে বন্ধুত্ব উদযাপনের জন্য একটি নির্দিষ্ট দিন থাকা উচিত। সেখান থেকে তাঁরা শুরু করেন ‘ওয়ার্ল্ড ফ্রেন্ডশিপ ক্রুসেড’ নামের একটি নাগরিক উদ্যোগ।

সংগঠনটি বহু বছর ধরে জাতিসংঘের কাছে ৩০ জুলাইকে আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য আহ্বান জানায়। কয়েক দশকের সেই প্রচেষ্টার ফল হিসেবেই ২০১১ সালে জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে ৩০ জুলাইকে আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস ঘোষণা করে।

আগস্টের প্রথম রোববার কেন

এই দিবস শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশসহ পৃথীবির অনেক দেশের মানুষ আগস্টের প্রথম রোববার ফ্রেন্ডশিপ ডে পালন করেন। এর পেছনে ইতিহাস ছাড়াও আছে বাণিজ্যিক কারণ।

বিশ শতকের ত্রিশের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে শুভেচ্ছা কার্ড ব্যবসার প্রসারের সময় বন্ধুত্ব উদযাপনের একটি বিশেষ দিনের ধারণা জনপ্রিয় হতে শুরু করে। পরে এই ধারণা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে এটি খুব বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে না পারলেও দক্ষিণ এশিয়ায় এটি গ্রহণযোগ্যতা পায়।

দিন হিসাব করে বন্ধুত্ব নয়, প্রকৃতই যেন আমরা একে অপরকে বন্ধু ভাবতে শিখি এবং দিনটি উদযাপন করতে পারি—এটিই মূল উদ্দেশ্য। ছবি: সংগৃহীত
দিন হিসাব করে বন্ধুত্ব নয়, প্রকৃতই যেন আমরা একে অপরকে বন্ধু ভাবতে শিখি এবং দিনটি উদযাপন করতে পারি—এটিই মূল উদ্দেশ্য। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় ধীরে ধীরে আগস্টের প্রথম রোববার বন্ধুত্ব দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এ ছাড়াও মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অংশেও এদিন ফ্রেন্ডশিপ ডে পালন করা হয়।

এই অঞ্চলে দিনটি আন্তর্জাতিক কূটনীতি নয় বরং ব্যক্তিগত সম্পর্ক উদযাপনের দিনে পরিণত হয়।

পার্থক্য কোথায়

দুই দিবসের নাম কাছাকাছি হলেও তাদের দর্শন এক নয়। ৩০ জুলাইয়ের আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস মূলত রাষ্ট্র, সমাজ, সংস্কৃতি ও মানবিক সম্প্রীতির কথা বলে। এটি জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক দিবস। এতে আন্তর্জাতিক কূটনীতিই প্রধান উদ্দেশ্য।

অন্যদিকে আগস্টের প্রথম রোববারের ফ্রেন্ডশিপ ডে মূলত বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, শুভেচ্ছা বিনিময়, উপহার দেওয়া এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক উদযাপনের একটি জনপ্রিয় সামাজিক উৎসব।

বাংলাদেশে কোনটি বেশি জনপ্রিয়

আনুষ্ঠানিকভাবে আজ ৩০ জুলাই আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস হলেও বাংলাদেশের মানুষের কাছে এখনো আগস্টের প্রথম রোববারই বেশি পরিচিত।

এর বড় কারণ সামাজিক সংস্কৃতি। নব্বইয়ের দশক থেকে টেলিভিশন, এফএম রেডিও, স্কুল-কলেজ এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগস্টের প্রথম রোববারকে ঘিরেই বেশি প্রচারণা হয়েছে। ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড, বিশেষ অনুষ্ঠান, আড্ডা, ছবি তোলা—সবকিছুই এই দিনকে কেন্দ্র করে জনপ্রিয় হয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতিসংঘ ঘোষিত ৩০ জুলাই সম্পর্কেও সচেতনতা বাড়ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা এই দিনটিকে গুরুত্ব দিয়ে পালন করছে।

তাই ক্যালেন্ডারে দুটি তারিখ থাকলেও তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। দিন হিসাব করে বন্ধুত্ব নয়, প্রকৃতই যেন আমরা একে অপরকে বন্ধু ভাবতে শিখি এবং দিনটি উদযাপন করতে পারি—এটিই মূল উদ্দেশ্য। যারা আমাদের জীবনের কঠিন সময়ে নিঃশব্দে পাশে থেকেছে তাদের নিয়ে ‘সেলিব্রেট’ করতে একের অধিক দিন থাকলে ক্ষতি কি!

Ad 300x250

সম্পর্কিত