জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ঈদ আয়োজন

উৎসবের আবহে এনসিপির ‘জনসংযোগ’

প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০২৬, ১৫: ০১
স্ট্রিম গ্রাফিক

ঈদের ছুটিতে রাজধানী ছেড়ে মানুষ যখন শেকড়ের টানে ছুটছে গ্রামে, ঠিক তখন ভিন্নধর্মী এক আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতারা। ‘ঈদ উৎসব’ নামের ৩ দিনের বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে তারা ঈদ উদযাপন করবেন ঢাকায়। আয়োজকদের দাবি, এটি সুলতানি ও মোগল আমলের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার একটি ‘নাগরিক উদ্যোগ’।

আপাতদৃষ্টিতে মুসলমানদের নিছক ধর্মীয় উৎসব উদযাপনের আয়োজন মনে হলেও বিশ্লেষকেরা এর মধ্যে দেখছেন ভিন্ন সমীকরণ। তাঁদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা তরুণদের দলটি এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে মূলত নিজেদের ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতির’ জানান দিচ্ছে। পাশাপাশি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে আসন্ন নির্বাচনের মাঠ যাচাই ও জনসংযোগেরও একটি বড় হাতিয়ার হয়ে উঠবে এই উৎসব।

তিন দিনের বর্ণাঢ্য আয়োজন

আয়োজক কমিটির ঘোষণা অনুযায়ী, উৎসব শুরু হবে চাঁদ রাতে (ঈদের আগের রাত) ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে ‘মেহেদি উৎসব ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা’ দিয়ে। এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণ ও ঈদের গান-কবিতার আসর থাকবে।

ঈদের দিন সকাল ১০টায় হাইকোর্ট প্রাঙ্গণের জাতীয় ঈদগাহের সামনে থেকে বের হবে মূল ‘ঈদ আনন্দ মিছিল’। দোয়েল চত্বর, শহীদ মিনার হয়ে শাহবাগ পর্যন্ত এই মিছিলে হাতি, ঘোড়া ও ঐতিহাসিক চরিত্রের উপস্থিতি থাকবে। শিশুদের জন্য রাখা হয়েছে বিশেষ কিডস জোন। আর ঈদের পরদিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে থাকছে ঘুড়ি উৎসব।

আয়োজক কমিটির সংগঠক হাসান ইনাম স্ট্রিমকে জানান, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের পাশাপাশি নগরের সাধারণ মানুষকে উৎসবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ও প্রথিতযশা সাংবাদিকদের দাওয়াত কার্ড পাঠিয়েছি। তবে আমাদের মূল আকর্ষণ নগরের লোকজন। এনসিপি, আপ বাংলাদেশ, ইনকিলাব মঞ্চ, বাংলা একাডেমি, জাতীয় জাদুঘরের পরিচালকদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।’

নাগরিক উদ্যোগের মোড়ক

ঈদ আনন্দ মিছিল উদযাপন কমিটি-২০২৬ ব্যানারে গত ১০ মার্চ এই উৎসবের ঘোষণা দেওয়া হয়। আয়োজক কমিটির দাবি, ৩২ সদস্যের কমিটিতে দল বিবেচনায় কাউকে রাখা হয়নি।

যদিও কমিটির মূল চালিকাশক্তিতে রয়েছেন এনসিপি এবং সহযোগী সংগঠনের নেতারাই। কমিটিতে আছেন এনসিপি মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, নুসরাত তাবাসসুম, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া এনসিপি মনোনীত ঢাকা-৭ আসনে এমপি পদপ্রার্থী তারেক এ আদেল। এ ছাড়া জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদ আহসান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতা আব্দুল কাদের, এনপিএ-এর মুখপাত্র তুহিন খান, মীর হুযাইফাহ আল মামদূহ। দাওয়াত দেওয়া হয়েছে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাদেরও।

লক্ষ্য কি সিটি নির্বাচন!

সরাসরি দলীয় ব্যানারের বদলে ‘নাগরিক উদ্যোগের’ মোড়কের কারণে এর পেছনে রাজনীতির হিসাব-নিকাশ দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। সামনেই ঢাকার সিটি করপোরেশন নির্বাচন। ঈদের দিন রাজপথে বিশাল মিছিল ও তিন দিনের আয়োজনে বিপুল মানুষের সমাগম ঘটানোর এই কৌশলকে ভোটের মাঠের প্রস্তুতি হিসেবেই দেখছেন তারা।

গত বছর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে যখন এই উৎসব হয়, তখন স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা ছিলেন আসিফ মাহমুদ। এবার তিনি সরকারে না থাকলেও উদ্যোগের পেছনে তার আগ্রহ ও সমর্থন রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পাড়া-মহল্লা থেকে সাধারণ মানুষকে এই মিছিলে সম্পৃক্ত করা এবং সেরা মিছিলকে পুরস্কৃত করার যে উদ্যোগ, তা মূলত ঢাকার তৃণমূল পর্যায়ে এনসিপির সাংগঠনিক সক্ষমতা ও জনসমর্থন যাচাইয়ের একটি মহড়া।

নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির বার্তা

এনসিপি নেতারা ঈদকে কেন্দ্র করে প্রাক-ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির চর্চা ফিরিয়ে আনার কথা বলছেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় এই ধরনের আয়োজন হচ্ছে বলে জানান এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার।

আয়োজক কমিটিতে থাকা দলের এই নেতা স্ট্রিমকে বলেন, ‘বিগত কয়েক দশকে দেশে ইসলাম ও মুসলমানদের উৎসবকে বৃহত্তর সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, আমরা সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক উৎসবটাই ফিরিয়ে আনতে চাই।’ পুরো উৎসবের ব্যয়ভার ক্রাউড ফান্ডিং বা গণতহবিলের মাধ্যমে মেটানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

আয়োজনটি এনসিপির রাজনৈতিক কর্মসূচি কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে সারোয়ার তুষার বলেন, এনসিপি নেতা নাকি অন্য কেউ আয়োজন করছে সেটা মুখ্য না বরং মানুষ নতুনত্ব চাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাফাত আলম এই উদ্যোগকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘গত বছরেই প্রথম এ ধরনের মোটিফ নিয়ে আনন্দ মিছিল হয়েছে। এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির আবহে হচ্ছে। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর এই ঈদ উৎসব নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই অংশ।’

তবে নতুন প্রজন্মের এই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বয়ান বাংলার জনমানসে কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত নন এই বিশ্লেষক। অধ্যাপক রাফাত আলমের মতে, এক-দুই বছরেই কোনো সংস্কৃতি টিকে যায় না। জনগণ এটিকে কতটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করে, তা দেখার জন্য আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে।

সম্পর্কিত