২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বাঁকবদলের দিন হিসেবে চিহ্নিত। এই দিনে দেশে জরুরি অবস্থা জারি ও নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রক্রিয়া স্থগিত করার মতো ঘটনা ঘটে। দিনটিকে পরবর্তীতে ‘ওয়ান ইলেভেন’ বা এক-এগারো নামে অভিহিত করা হয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেন। নির্ধারিত ২২ জানুয়ারির নির্বাচন বাতিল ঘোষণা করা হয়। সেনাপ্রধানসহ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন আসে। দৃশ্যত রক্তপাতহীন হলেও এই ঘটনার সুদূরপ্রসারী প্রভাব বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করে। অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা পরিবর্তনের এই অধ্যায় পরবর্তী দুই বছর দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে।
নাগরিক ভাবনা
বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন মতে, ২০০৭-এ দীর্ঘদিন ধরে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা ও টানা অবরোধের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। জানমালের নিরাপত্তা ও নিত্যদিনের চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় নাগরিকরা হতাশায় নিমজ্জিত ছিলেন। সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত নতুন ব্যবস্থা আসায় প্রাথমিকভাবে সহিংসতা বন্ধ হওয়ায় জনমনে স্বস্তি ফিরে আসে। তবে সচেতন নাগরিক সমাজ ও বুদ্ধিজীবী মহল দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন। মহিউদ্দিন আহমদের এক এগারো (বাংলাদেশ ২০০৭-২০০৮) বইয়ের তথ্যমতে, সুশীল সমাজের একটি অংশ দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের প্রত্যাশায় এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানায়। অন্য অংশ মনে করত অগণতান্ত্রিক সরকারের শাসন দেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যাবে। তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তাৎক্ষণিক উন্নতি সাধারণ নাগরিকদের কাছে তখন প্রধান বিবেচ্য বিষয় ছিল।
সংকট
এক-এগারোর প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছিল ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষের পর থেকেই। সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ নিয়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা দেয়। তৎকালীন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার সদ্য বিদায়ী প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা করতে চাইলে আওয়ামী লীগ তাতে ভেটো দেয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সমঝোতা না হওয়ায় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলো রাষ্ট্রপতির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তারা নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও নির্ভুল ভোটার তালিকার দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলে। মহাজোট ২২ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি দেয়। সারা দেশে সহিংসতায় বহু প্রাণহানি ঘটে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও কূটনীতিকরাও সংকট সমাধানে বিবদমান পক্ষগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেও ব্যর্থ হন। রাজনৈতিক দলগুলোর অনড় অবস্থান দেশকে কার্যত গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়।
অভ্যুত্থান?
১১ জানুয়ারি বিকেল ৪টার পর সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বঙ্গভবনে যান। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে তাঁদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সেনা কর্মকর্তারা রাষ্ট্রপতির কাছে দেশের চরম অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তুলে ধরেন। সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া ২২ তারিখে নির্বাচন হলে আন্তর্জাতিক মহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না বলে সতর্ক করা হয়। এ ছাড়া জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণের বিষয়টি ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা জানানো হয়।
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমদ ও সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ। স্ট্রিম কোলাজএকপর্যায়ে প্রবল চাপের মুখে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়তে সম্মত হন। একই সঙ্গে তিনি দেশে জরুরি অবস্থা জারির নথিতে স্বাক্ষর করেন। মধ্যরাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করেন। পরদিন থেকে মৌলিক অধিকার স্থগিত করে সারা দেশে রাত্রিকালীন কারফিউ জারি করা হয়। এর মধ্য দিয়ে দেশে সেনানিয়ন্ত্রিত বিশেষ ধরনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সূত্রপাত হয়।
দমকা হাওয়া
জরুরি অবস্থা জারির পরদিন ১২ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। এই সরকার প্রথমেই দুর্নীতি দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার এজেন্ডা সামনে আনে। রাজধানীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। নির্বাচন কমিশন ও পাবলিক সার্ভিস কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক রদবদল করা হয়। সরকারের এসব প্রাথমিক পদক্ষেপ জনমনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে দ্রুতই বোঝা যায় যে এই সরকার কেবল রুটিন মাফিক নির্বাচন আয়োজনের জন্য আসেনি। বরং তাদের দীর্ঘমেয়াদি ‘সংস্কার’ পরিকল্পনা রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রমে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ঘরোয়া রাজনীতি নিষিদ্ধ করে বিরাজনীতিকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
ধরপাকড়
ফেব্রুয়ারি মাস থেকে যৌথ বাহিনী সারা দেশে দুর্নীতিবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করে। ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’-এর আদলে পরিচালিত এই অভিযানে রাজনৈতিক নেতা ও ব্যবসায়ীদের টার্গেট করা হয়। গভীর রাতে প্রভাবশালী নেতাদের বাসভবনে তল্লাশি চালিয়ে তাঁদের আটক করা হয়। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়।
দুর্নীতি দমন কমিশনকে বা দুদককে শক্তিশালী করে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচারকার্য শুরু হয়। কর ফাঁকিবাজদের তালিকা প্রকাশ করে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়। তবে বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও রিমান্ডে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নির্বিচার গ্রেপ্তারের ফলে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দেশের অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা দেয়। রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করার নামে কার্যত রাজনৈতিক নেতৃত্ব শূন্য করার প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হয়।
মাইনাস টু
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে বহুল আলোচিত ছিল। ‘এক এগারো (বাংলাদেশ ২০০৭-২০০৮)’ বইয়ে দাবি করা হয়েছে, এই কৌশলের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেত্রীকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া। সেনাসমর্থিত সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করতেন শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াই রাজনৈতিক সংঘাতের মূল কারণ। তাঁদের বাদ দিয়ে দলে সংস্কার ও নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হয়। জরুরি অবস্থার শুরুতেই আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সপরিবারে বিদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।
দুই নেত্রী সরকারের এই চাপ উপেক্ষা করে অনড় অবস্থান নেন। শেখ হাসিনা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দেশে ফেরার ঘোষণা দেন। খালেদা জিয়াও দেশ ত্যাগে অস্বীকৃতি জানান। পরিকল্পনায় ব্যাঘাত ঘটায় সরকার দুর্নীতির মামলার পথ বেছে নেয়। উভয় নেত্রীকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। রাজনৈতিক দলগুলোতে বিভাজন তৈরির চেষ্টা চালানো হয়। দলের একটি অংশকে দিয়ে সংস্কার প্রস্তাব তোলানো হয়। তবে তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রতিরোধ ও সাধারণ মানুষের অনাগ্রহে এই ফর্মুলা ব্যর্থ হয়। এই উদ্যোগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।
ক্যাম্পাসকাণ্ড
২০০৭ সালের আগস্ট মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। সেনাসদস্য ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা একপর্যায়ে শারীরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়। এই ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে। জরুরি অবস্থার বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগরসহ দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষকরাও ছাত্রদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
২০০৭ সালের আগস্টে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ। ছবি: সংগৃহীতসেনাসমর্থিত সরকারের জন্য এটি ছিল প্রথম বড় কোনো রাজনৈতিক ধাক্কা। সরকার কঠোর হাতে বিদ্রোহ দমনের সিদ্ধান্ত নেয়। ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে কারফিউ জারি করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে হল খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্রনেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগও ওঠে। শিক্ষকদের হাতে হাতকড়া ও প্রিজন ভ্যানের দৃশ্য জনমনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে। এই গণবিক্ষোভ সরকারের ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়। শাসকরা অনুধাবন করেন, শুধুই শক্তি প্রয়োগ করে সচেতন সমাজকে দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
বিদেশি হাত
এক-এগারোর পটভূমি রচনা ও পরবর্তী সরকার পরিচালনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা ছিল কৌশলী। বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর কূটনীতিকরা তখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। জাতিসংঘের বিশেষ দূত ও প্রভাবশালী দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতেরা বিবদমান রাজনৈতিক পক্ষগুলোর সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের নেতৃত্বে সামরিক হস্তক্ষেপের পেছনে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন বাতিলের হুমকি প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।
ফখরুদ্দীন আহমদের সরকারকে দাতা সংস্থাগুলো পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিল। তারা বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিল। ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা দেয়। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে তাদের চাপ ছিল দৃশ্যমান। অনেক বিশ্লেষকের মতে, সে সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণে কূটনীতিকদের প্রভাব সার্বভৌমত্বের জন্য প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। বিদেশি শক্তির এই অত্যধিক সম্পৃক্ততা ‘কফি হাউসের আড্ডা’ নামে রাজনৈতিক মহলে পরিচিতি পায়।
সেনাপ্রধানের বয়ান ও বাহিনীর মনস্তত্ত্ব
এক-এগারোর সরকার কাঠামোতে বেসামরিক উপদেষ্টারা সামনে থাকলেও ক্ষমতার মূল চাবিকাঠি ছিল সেনাবাহিনীর হাতে। এই পুরো ঘটনাপ্রবাহে সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ ছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্র। ২০০৮ সালের জুন মাসে টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি ক্ষমতাগ্রহণের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেন। তিনি দাবি করেন, রাজনীতিবিদরা দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ না করলে গৃহযুদ্ধ অনিবার্য ছিল। তিনি নিজেকে ক্ষমতা দখলকারী হিসেবে দেখতে নারাজ ছিলেন। তিনি বরং নিজেদের পরিস্থিতির শিকার ও ত্রাণকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করেন। তবে সে সময় সেনাকর্তাদের মনস্তত্ত্বে দুটি ভিন্ন ধারা কাজ করছিল। একাংশ মনে করতেন প্রচলিত রাজনীতিবিদরা দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছেন। তাই সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে দেশকে আমূল সংস্কার করতে হবে।
জেনারেল মইন বারবার বলতেন যে তিনি রাজনীতিতে আসবেন না বা দেশ শাসন করবেন না। কিন্তু তাঁর বিভিন্ন পদক্ষেপ ও ‘নিজের ব্র্যান্ডের’ গণতন্ত্র চালুর চেষ্টা ভিন্ন বার্তা দিত। তাঁর লেখা শান্তির স্বপ্নে ও আমার স্বপ্নের বাংলাদেশ বইগুলো তাঁর রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। তাঁরা চেয়েছিলেন রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করে নিজেদের জাতীয় বীর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। তিনি আন্তর্জাতিক মহলকে বোঝাতে চেয়েছিলেন এই সরকার কেবল নির্বাচনের জন্যই নয়, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের জন্যও অপরিহার্য। তবে বাহিনীর অপর একটি অংশ ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার বিপক্ষে অবস্থান নেয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও ছাত্র বিক্ষোভের ফলে সরকারের জনপ্রিয়তা দ্রুত কমতে থাকে। এতে সেনাবাহিনীর পেশাদার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সামরিক কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন রাজনীতিতে দীর্ঘদিন জড়িয়ে থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ বাস্তবতায় সেনাবাহিনী নির্বাচনের পথেই হাঁটতে বাধ্য হয়।
যোগ্য প্রার্থীর খোঁজ ও নাগরিক আন্দোলন
রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতাকে কাজে লাগিয়ে এক-এগারোর সময়ে এক ভিন্নধর্মী উদ্যোগের সূচনা হয়। ২০০৬ সালের মার্চ মাসেই গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ‘যোগ্য প্রার্থী আন্দোলন’ নামে একটি ধারণা সামনে এনেছিলেন। জরুরি অবস্থার সময়ে এই ধারণাটি নতুন করে প্রাণ পায়। প্রচলিত দলীয় মনোনয়ন প্রথার বাইরে এসে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচনে দাঁড় করানোর একটি আহ্বান জানানো হয়। এর মূল সুর ছিল রাজনীতিতে কালো টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাব কমানো।
ড. ইউনূসের প্রস্তাবনা অনুযায়ী প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় স্থানীয় মানুষের সমন্বয়ে একটি প্যানেল তৈরির কথা বলা হয়। সেখান থেকে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করার পরিকল্পনা ছিল। উদ্দেশ্য ছিল দুর্নীতিবাজদের সংসদে প্রবেশ ঠেকানো। সুশীল সমাজ ও দাতা সংস্থাগুলো এই প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানায়। তারা মনে করত গতানুগতিক রাজনীতির বাইরে এটি একটি তৃতীয় শক্তির উত্থান ঘটাতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত দলীয় রাজনীতির কাঠামোর কাছে এই নাগরিক আন্দোলন খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। তৃণমূলে রাজনৈতিক দলগুলোর শিকড় এতটাই গভীরে ছিল যে ‘সৎ প্রার্থী’র স্লোগান দিয়ে ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলা সম্ভব হয়নি।
দুই নেত্রীর অনড় অবস্থান ও রাজনৈতিক কৌশল
কারাবন্দি থেকেও দেশের দুই প্রধান নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া সরকারের ওপর চাপ বজায় রেখেছিলেন। শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময় আইনজীবীদের মাধ্যমে ও সাক্ষাৎকারে সরকারের সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার কালক্ষেপণ করছে। তাদের মূল লক্ষ্য সংবিধান লঙ্ঘন করে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা। তিনি স্পষ্ট করেন দুর্নীতির দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে মাইনাস করার চক্রান্ত জনগণ মেনে নেবে না।
অন্যদিকে খালেদা জিয়াও তাঁর অবস্থানে অনড় ছিলেন। ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক দোষারোপের সংস্কৃতির অবসান চান। তবে ১/১১-এর সরকারের কাজের বৈধতা ও ভবিষ্যতে তাদের বিচার না করার বিষয়ে তিনি সতর্ক ছিলেন। দুই নেত্রীই বুঝতে পেরেছিলেন নির্বাচনে অংশ না নিলে দলের অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে। আবার সরকারও বুঝতে পারে এই দুই দলকে বাইরে রেখে কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। ফলে পারস্পরিক অবিশ্বাস সত্ত্বেও উভয় পক্ষ একটি নির্বাচনী সমাধানে আসতে বাধ্য হয়।
বোঝাপড়া ও প্রস্থান
২০০৮ সালের শেষের দিকে সরকার ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের অঘোষিত সমঝোতার প্রক্রিয়া শুরু হয়। মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়ে সরকার বুঝতে পারে দুই নেত্রীকে কারাগারে রেখে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। তখন শুরু হয় ‘এক্সিট প্ল্যান’ বা নিরাপদে প্রস্থানের আলোচনা। সরকারের নীতিনির্ধারকরা আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি ও জরুরি অবস্থার অবসানের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়। এর বিনিময়ে সেনাসমর্থিত সরকারের কাজের বৈধতা দেওয়া ও পরবর্তী সময়ে তাদের বিচার না করার অলিখিত আশ্বাস চাওয়া হয়। সমঝোতার অংশ হিসেবে দুই নেত্রীকে প্যারোলে ও পরে জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। মামলাগুলো শিথিল হতে শুরু করে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। উভয় পক্ষই নিজেদের অস্তিত্ব ও স্বার্থ রক্ষায় একটি মধ্যবর্তী পথ বেছে নেয়। এই ‘বোঝাপড়া’র ফলেই দেশকে পুনরায় গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় বহু কাঙ্ক্ষিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বিএনপি জোট শোচনীয় পরাজয় বরণ করে। নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর করে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে দুই বছরের জরুরি অবস্থার অবসান ঘটে। সরকারের মূল কুশীলবরা ধীরে ধীরে দৃশ্যপটের আড়ালে চলে যান। সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ মেয়াদ শেষে অবসরে যান। পরবর্তী সময়ে তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাড়ি জমান। মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ অন্য প্রভাবশালী কর্মকর্তারাও কূটনৈতিক দায়িত্ব নিয়ে বিদেশে চলে যান অথবা অবসরে যান। এক-এগারোর সরকার জাতীয় পরিচয়পত্র ও নির্ভুল ভোটার তালিকার মতো কিছু ভালো কাজ করেছিল। তবে বিচারবহির্ভূত ক্ষমতা চর্চা ও বিরাজনীতিকরণের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। সেই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে, অগণতান্ত্রিক সরকার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। এক-এগারোর অধ্যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয় ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
তথ্যসূত্র: মহিউদ্দিন আহমদের এক এগারো (বাংলাদেশ ২০০৭-২০০৮), আহমেদ মূসার যেমন দেখেছি ওয়ান ইলেভেন, সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর ওয়ান ইলেভেন থ্রু দ্য আইজ অব আ উইটনেস, দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন, দ্য টাইমস ও বিবিসি।