ব্যাংক রেজল্যুশন বিল

বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন জড়িত: জামায়াত

>> গণভোটের বৈধতা স্বীকার করেও সেটি বাস্তবায়ন না করার দায় সরকারকেই নিতে হবে।

>> আইন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে আইনগত অসঙ্গতি রয়েছে

>> বিল অধিকতর সংশোধন ঈদের পরের আন্দোলনের মতো হয় কিনা প্রশ্ন

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬, ২২: ৫২
সংবাদ সম্মেলনে শিশির মোহাম্মদ মনিরসহ জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। ছবি: সংগৃহীত

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ বিল আকারে জাতীয় সংসদে পাসের সময় নতুন একটি ধারা যুক্ত করার পেছনে ‘বড় ধরনের অর্থনৈতিক লেনদেন’ জড়িত বলে জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী।

সোমবার (১৩ এপ্রিল) সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজার কার্যালয়ে ‘জরুরি’ সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংক রেজল্যুশন বিল নিয়ে এই অবস্থান তুলে ধরেন দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অ্যাডভোকেট শিশির মোহাম্মদ মনির।

ব্যাংক রেজল্যুশন বিলে নতুন ওই ধারা যুক্ত করার ফলে একীভূত হওয়া দুর্বল পাঁচ ব্যাংকে পুরোনো শেয়ারধারীদের ফেরার পথ খুলে গেছে বলে সমালোচনা হচ্ছে। শিশির মনির বলেন, অন্তবর্তী সরকারের সময়ে যে পাঁচটি ব্যাংককে এক করে একটি ব্যাংকে রূপান্তর করা হয়েছিল, বিএনপি সরকার ‘ব্যাংক রেজল্যুশন বিল, ২০২৬’ পাস করার মধ্য দিয়ে আবারো পুরোনো মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। এইটা করার মাধ্যমে এই ব্যাংকগুলোর যারা মালিক ছিলেন, অথবা অন্য কোনো ব্যক্তি যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে মনে হয়, সন্তুষ্ট হয়, তাহলে তাদের আগের বিষয়াদি তাদের ফিরিয়ে দিতে পারবে।

তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি– এই ব্যাংক রেজল্যুশনটা (অন্তর্বতী সরকারের সময়ে করা) বাতিল করার পেছনে মাত্র সরকার জড়িত না, এটার পেছনে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন (ফাইন্যান্সিয়াল ট্রানজেকশন) জড়িত।’

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী বলেন, আমরা মনে করি– এইভাবে ফাইন্যান্সিয়াল ট্রানজেকশন দিয়ে বাংলাদেশের মানি মার্কেটকে আবারো করায়ত্ত করার সুযোগ বিএনপি সরকারকে করে দেওয়া উচিৎ নয়। যারা ভুক্তভোগী তাদেরটা তাদের কাছেই ফেরত দেওয়া উচিৎ। যারা ব্যাংক লুট করে নিল, সব আমানতকারীর টাকা-পয়সা নিয়ে গেল, নতুন আইনে (অন্তবর্তী সরকারের সময়ে সংযোজিত ধারা-১৮(ক)) কীভাবে তার শাস্তি ছিল, কীভাবে তা রিকভার করা হবে– এই পুরোটাকে এখান থেকে আউট করে দিয়ে, ব্যাংক ডাকাতদের কাছেই আবার ব্যাংক ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক দখলের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যারা ব্যাংকটাকে একেবারে শূন্য করে ফেলল, এক ইসলামী ব্যাংক থেকেই ৭০ হাজার কোটি টাকা যারা সরাল; আপনারা জানেন, ২৪টি বিকল্প কোম্পানি তৈরি করে ইসলামী ব্যাংক থেকে লোন নেওয়া হয়েছে; এই মামলাটা আপনারা দেখলেই বুঝতে পারবেন, মানি লন্ডারিং কেস হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, ২৪টি বিকল্প কোম্পানি তৈরি করেছে, যেগুলো বাস্তবে এক্সিস্ট করে না।

শিশির মনির বলেন, ২৪টি কোম্পানি গঠন করে টু পার্সেন্ট করে শেয়ার নিয়ে এসে তারা বোর্ডে লোক বসিয়েছে। বোর্ডে লোক বসিয়ে তারা ৮২ শতাংশ অংশের মালিক হয়েছেন, সেই এস আলমের হাতে আবার সেই পাঁচটি কোম্পানির শেয়ার ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এ ব্যাপারে সংবাদ সম্মেলনে সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশের ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে বিলের কপি দিয়ে ১৮(ক) ধারা সংযোজনের মাধ্যমে আগের মালিকদের কাছে নিয়ন্ত্রণ ফেরানোর সুযোগ রাখা হয়েছে, যা স্বচ্ছতার পরিপন্থী।

আইন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে আইনগত অসঙ্গতি

সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্যে আইনগত অসঙ্গতি রয়েছে বলে দাবি করেছেন শিশির মনির। তিনি বলেন, গুম ও মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের যে ব্যাখ্যা সরকার দিয়েছে, তা আইনগতভাবে সঠিক নয়।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে গুম ‘ক্রাইম এগেইনস্ট হিউম্যানিটি’-এর একটি অংশ, যা বিচারযোগ্য হতে হলে ‘ওয়াইড স্প্রেড’ ও ‘সিস্টেম্যাটিক’ হতে হয়। কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে আলাদাভাবে গুম করার ঘটনা এই আইনের আওতায় পড়ে না। ফলে গুম অধ্যাদেশ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনের সংজ্ঞা এক নয়– এ কথা স্পষ্ট।

জামায়াতের এই নেতা বলেন, মানবাধিকার কমিশন আইনে তদন্ত, সময়সীমা ও ক্ষতিপূরণের বিষয়ে কোনো বিধান নেই– সরকারের এমন বক্তব্যও সঠিক নয়। আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোতে ৩০ দিনের সময়সীমা, তদন্ত প্রক্রিয়া এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয় উল্লেখ রয়েছে।

গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করার দায় সরকারকেই নিতে হবে

গণভোট অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে শিশির মনির বলেন, সরকার নিজেই একে ‘ফ্যাক্টাম ভ্যালিড’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে এটি বাস্তবায়নের দায়িত্বও সরকারের ওপর বর্তায়। বৈধতা স্বীকার করে বাস্তবায়ন না করা হলে, তার দায় সরকারকেই নিতে হবে।

এ সময় বিচারকদের শোকজ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই আইনজীবী। বলেন, যে আইনের আওতায় নোটিশ দেওয়া হয়েছে, সেটি ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্ট অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বাতিল করেছে। ফলে সেই আইনের ভিত্তিতে শোকজ করাকে শিশির মনির ‘আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য’ উল্লেখ করেন।

কোন ঈদের পরে বিল অধিকতর সংশোধন

জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সংসদের প্রথম অধিবেশনে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। সংবিধানের ৯৩ (ডি) অনুচ্ছেদের ৩০ দিনের সময়সীমা শেষে দেখা যায়, ১১৭টি অধ্যাদেশ পাস হয়েছে। এর মধ্যে কিছু হুবহু, কিছু সংশোধিত আকারে; ৭টি রহিত এবং ১৬টি ল্যাপস (অকার্যকর) হয়েছে, অর্থাৎ সংসদে উপস্থাপনই করা হয়নি।

তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথক সচিবালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বিষয়গুলো ল্যাপস করায় জনগণের প্রত্যাশা আন্ডার মাইন হয়েছে।

মোমেন জানান, তারা দুই দফায় ওয়াকআউট করেছেন। বিশেষ কমিটিতে মতবিরোধহীন বিষয় পাস ও মতবিরোধপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার ‘জেন্টলম্যান অ্যাগ্রিমেন্ট’ থাকলেও তা মানা হয়নি। সংসদে কথা বলার সুযোগ না পাওয়ায় তারা বাইরে এসে বক্তব্য দিয়েছেন। বিশেষ কমিটির প্রতিবেদনে বিরোধী দলসহ কিছু সরকারদলীয় সদস্যের নোট অব ডিসেন্ট অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যা গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী।

স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগকে তিনি সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী উল্লেখ করে বলেন, এই কারণেই প্রথম ওয়াকআউট করা হয়; পরে প্রক্রিয়াগত অসঙ্গতির প্রতিবাদে আবার ওয়াকআউট করা হয়।

ব্যারিস্টার মোমেন বলেন, বিএনপির একটি ইতিহাস আছে। গত ১৬ বছর দেখে এসেছি– তারা সব সময় বলতেন ঈদের পরে আন্দোলন হবে। কিন্তু সেই ঈদ কখনোই আসেনি। এখন যেই বিলগুলার ব্যাপারে তারা (সরকার) আন্তর্জাতিকভাবে চাপের মুখে পড়েছে। সেই মানবাধিকার কমিশন বিল, গুম কমিশনের বিল, স্বাধীন বিচার বিভাগের সচিবালয়ের বিল অধিকতর সংশোধন করে তারা স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা শেষে আনবেন বলছেন। কিন্তু এটি কবে আনবেন? এটি কি আবার সেই ঈদের পরের আন্দোলনের মতো ১৬ বছর আমাদের অপেক্ষা করতে হবে কিনা জাতির কাছে প্রশ্ন রইল।

তিনি বলেন, জনগণ তাদের অধিকার বাস্তবায়ন করার জন্য সংসদের ওপর আস্থা হারিয়ে রাস্তায় নেমে আসে, সেজন্য কিন্তু জনতাকে দায় দিতে পারবেন না। এর জন্য সরকার দলীয় সংসদ সদস্যদের দায় নিতে হবে।

সম্পর্কিত