দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, সার কারখানা, নৌবন্দর আর ধানের বিশাল মোকাম নিয়ে গঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল-আশুগঞ্জ) আসন। অপার সম্ভাবনা থাকলেও এ অঞ্চলের ভোটারদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ—কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত এই জনপদ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটাররা এবার একগুচ্ছ দাবি জানাচ্ছেন প্রার্থীদের কাছে। তবে উন্নয়নের পাশাপাশি নির্বাচিত প্রতিনিধির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে যুগ যুগ ধরে চলে আসা ‘গ্রাম্য দাঙ্গা’ বন্ধ করা।
আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিপুল বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও সরাইলের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং নিত্যদিনের সমস্যা। বিশেষ করে সরাইল উপজেলার অরুয়াইল ও পাকশিমুল ইউনিয়নের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। শুষ্ক মৌসুমে পায়ে হাঁটা আর বর্ষায় নৌকাই একমাত্র ভরসা। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি ‘চেত্রা’ নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু। অরুয়াইল ইউনিয়নের বাসিন্দা মনসুর আলী বলেন, ‘স্বাধীনতার পর থেকে শুধু প্রতিশ্রুতিই পেয়েছি, কিন্তু সেতু হয়নি। এবার আমরা টেকসই উন্নয়ন চাই।’
অন্যদিকে, অরুয়াইলে গড়ে ওঠা সম্ভাবনাময় ইঞ্জিন নৌকা ও বাল্কহেড নির্মাণ শিল্পের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং তিতাস নদী ড্রেজিং করে নৌবন্দর স্থাপনের দাবি তুলেছেন ভোটাররা।
সরাইল-আশুগঞ্জের প্রধান সামাজিক ব্যাধি হলো তুচ্ছ ঘটনায় টেঁটা-বল্লম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া বা গ্রাম্য দাঙ্গা। আশুগঞ্জের বাসিন্দা জাবেদ মিয়া বলেন, ‘সামান্য কিছু হলেই মারামারি শুরু হয়, এতে জেলার বদনাম হচ্ছে। যিনি এমপি হবেন, তাকে দাঙ্গা বন্ধে কঠোর হতে হবে।’
বিএনপি তাদের শরিকদের জন্য আসনটি ছেড়ে দিলেও এখানে মূল লড়াই হতে যাচ্ছে স্বতন্ত্র ও বিদ্রোহীদের মধ্যে। মোট ৯ জন প্রার্থীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন বিএনপির বহিষ্কৃত নেত্রী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। এছাড়া বিএনপির বিদ্রোহী এস এন তরুণ দে এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আশরাফ উদ্দিন মাহদিকে ঘিরেও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। আলোচনায় আছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী জিয়াউল হক মৃধাও।
স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, ‘ভোটাররা সৎ ও সাহসী নেতা চান। নির্বাচিত হলে সরাইল-আশুগঞ্জকে উন্নয়নের রোল মডেল করব। দাঙ্গা সমস্যার সমাধানে সমাজপতি ও বড় গোষ্ঠীগুলোর প্রধানদের নিয়ে সচেতনতা তৈরি এবং আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেব।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী মাওলানা আশরাফ উদ্দিন মাহদি বলেন, ‘সরাইলের যোগাযোগ ব্যবস্থাই আমার প্রধান অগ্রাধিকার। নির্বাচিত হলে ঠিকাদারদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতি তিন মাস অন্তর প্রতিবেদন নেব। দাঙ্গা নিরসনে প্রশাসনকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি গ্রামগুলোতে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের উদ্যোগ নেব।’
নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ৪ লাখের বেশি ভোটারের এই জনপদে ততই বাড়ছে উত্তাপ। শেষ পর্যন্ত ভোটাররা দাঙ্গা ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতে কার ওপর আস্থা রাখবেন, তা-ই এখন দেখার বিষয়।