রাজশাহীর সীমান্তঘেঁষা গোদাগাড়ী ও তানোর উপজেলা নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন রাজশাহী-১। উত্তর জনপদের এই গুরুত্বপূর্ণ জনপদে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দামামা বাজলেও ভোটারদের মূল আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে দুটি প্রধান সংকট—অবাধ মাদক কারবার এবং বরেন্দ্র অঞ্চলের সেচ সংকট। যুগ যুগ ধরে এই দুই সমস্যায় জর্জরিত সাধারণ মানুষ এবার প্রার্থীর কাছ থেকে কেবল আশ্বাস নয়, বরং সুনির্দিষ্ট ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ চান।
গোদাগাড়ী সীমান্ত দিয়ে বানের পানির মতো হেরোইন দেশে প্রবেশ করছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এই অবৈধ কারবারে যুক্ত হয়ে অনেকেই রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক বা ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হলেও সাধারণ মানুষের জীবন বিষিয়ে উঠেছে।
গোদাগাড়ী পৌরসভার বাসিন্দা আসগার আলী বলেন, ‘এখান দিয়ে যে পরিমাণ হেরোইন আসে তা দেশের আর কোথাও আসে না। ধরা পড়ে শুধু গরিব বহনকারীরা, কিন্তু গডফাদাররা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে।’
গোদাগাড়ী স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট সালাহউদ্দীন বিশ্বাস অভিযোগ করেন, ‘রাজনৈতিক নেতারা মাদক ব্যবসায়ীদের টাকা নিয়ে নির্বাচন করেন বলেই মাদক নির্মূল হয় না।’
অন্যদিকে, তানোর ও গোদাগাড়ীর সাধারণ কৃষকের প্রধান দুশ্চিন্তা ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়া। তানোরের কৃষক মইদুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, ‘হাতে চাপা কলে পানি ওঠে না, কৃষিকাজের পানিও পাই না। ১৮০ ফুট গভীরেও পানি পাওয়া যায় না। ভোটের আগে সবাই সমাধান দিবে বলে, কিন্তু পরে কেউ কথা রাখে না।’
সম্প্রতি সরকার একটি গেজেট প্রকাশ করেছে, যাতে বরেন্দ্র অঞ্চলে শুধু খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কাজের জন্য ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সে কথা উল্লেখ করে তানোরের মুন্ডুমালার কৃষক আফজাল হোসেন বলেন, ‘পাতালে পানি নাই জন্য সরকার এমন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কিন্তু আমরা পানি না তুললে চাষাবাদ করব কীভাবে? খাব কী? যারাই এখন আমাদের এলাকার এমপি হবে, তার কাছে দাবি সমস্যার যেন সমাধান হয়।’
৪ লাখ ৬৮ হাজার ৩৬২ জন ভোটারের এই আসনে এবার চারজন প্রার্থী থাকলেও মূল আলোচনা বিএনপি ও জামায়াতের দুই প্রার্থীকে ঘিরে। ধানের শীষের প্রার্থী হয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন। তাঁর বড় ভাই ব্যারিস্টার আমিনুল হক এই আসনে তিনবার এমপি ছিলেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন দলটির কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। তিনি ১৯৮৬ সালে এই আসন থেকে একবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন এই আসনটি আওয়ামী লীগের ওমর ফারুক চৌধুরীর দখলে ছিল।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন বলেন, ‘আমার ভাইয়েরা বরেন্দ্র প্রকল্প ও পানি সংকট নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন কিন্তু শেষ করতে পারেননি। আমি নির্বাচিত হলে গডফাদারদের ধরে মাদক নির্মূল করব এবং ভূ-উপরিস্থ পানির আধার তৈরি করে কৃষকদের সেচ সুবিধা দেব।’
অন্যদিকে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমান প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তিনি নির্বাচিত হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে মাদকের বিরুদ্ধে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেবেন। তাঁর পক্ষে প্রচারণায় তাঁর চাচাত ভাই এবং রাজশাহী জেলা আদর্শ শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি ড. মো. ওবায়দুল্লাহ বলেন, ‘আমরা নির্বাচিত হলে পদ্মার পানির হিস্যা আদায়ে ভারতের ওপর চাপ দেব, যাতে বরেন্দ্র অঞ্চলের পানির স্তর স্বাভাবিক হয়। অপারেটর নিয়োগে কোনো পেশিশক্তি বা স্বজনপ্রীতি থাকবে না।’
নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, গোদাগাড়ী-তানোরের সাধারণ মানুষ ততই সতর্কভাবে প্রার্থীদের অতীত ও বর্তমান বিশ্লেষণ করছেন। মাদক আর পানিশূন্যতার এই দীর্ঘস্থায়ী অভিশাপ থেকে কে মুক্তি দিতে পারবেন—তা যাচাই করেই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নিজেদের রায় দেবেন এই আসনের ৪ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি ভোটার।