leadT1ad

মঈনুল রোডের বাড়িটিই খালেদা জিয়ার শেষ স্থায়ী ঠিকানা, সম্পদ ৭৩ কোটি টাকার

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

স্ট্রিম গ্রাফিক

২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল রোডের যে বাড়ি থেকে খালেদা জিয়াকে এক কাপড়ে বের করে দেওয়া হয়েছিল, সেই ঠিকানাই মৃত্যুর আগের ১৫ বছর ব্যবহার করে গেছেন সদ্য প্রয়াত বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনটি আসনে (দিনাজপুর-৩ ও বগুড়া-৭ ও ফেনী-১) প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামাতেও তিনি এই ঠিকানায় ব্যবহার করেছেন।

হলফনামায় খালেদা জিয়া তাঁর স্থাবর সম্পত্তির বিবরণীতে ঢাকা সেনানিবাসে বাড়িটির কথা উল্লেখ করলেও তিনি বলেছেন, বাড়িটি তাঁর মালিকানা বা দখলে নেই।

শহীদ মঈনুল রোডের ছয় নম্বর বাড়িটি দেশের ইতিহাসের নানা চড়াই-উতরাইয়ের সাক্ষীও। ১৯৭২ সালে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর উপপ্রধান নিযুক্ত হওয়ার পর থেকে এই বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। সেনাপ্রধান ও পরে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরও তিনি স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে এখানেই থেকেছেন। ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর বন্দি, পরে ৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক সিপাহি-জনতার বিপ্লব; সবই ঘটেছিল এই বাড়ির আঙিনায়।

১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পর তৎকালীন জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্তে বার্ষিক মাত্র এক টাকা খাজনার শর্তে বাড়িটি খালেদা জিয়াকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেই থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এই বাড়িই ছিল খালেদা জিয়ার হাসি-কান্না ও সংগ্রামের সাক্ষী।

শহীদ মঈনুল রোডের বাড়ি ছেড়ে আসার পর খালেদা জিয়ার চোখে ছিল অশ্রুধারা। স্ট্রিম গ্রাফিক
শহীদ মঈনুল রোডের বাড়ি ছেড়ে আসার পর খালেদা জিয়ার চোখে ছিল অশ্রুধারা। স্ট্রিম গ্রাফিক

২০১০ সালে এক নাটকীয় উচ্ছেদ অভিযানের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়াকে তাঁর ৩৮ বছরের স্মৃতিবিজড়িত মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। সেদিন খালেদা জিয়া তাঁর ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় মালামালও সঙ্গে নিতে পারেননি। ঘর থেকে এক কাপড়ে বেরিয়ে এসে তাঁর সেই কান্নায় ভেঙে পড়ার দৃশ্য সারা দেশের মানুষকে নাড়া দিয়েছিল।

পরে মঈনুল রোড়ের বাড়িটি ভেঙে ফেলে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এখন সেখানে সেনানিবাসের কর্মকর্তাদের আবাসন হিসেবে ১৪ তলা বহুতল ভবন তৈরি করা হয়েছে।

খালেদা জিয়ার সম্পদের বিবরণী

হলফনামা অনুসারে খালেদা জিয়ার বার্ষিক আয় ১ কোটি ৭৬ লাখ ১৬ হাজার ৫৮০ টাকা। এর মধ্যে ভাড়া বাবদ পান ৯০ লাখ টাকা এবং শেয়ার বন্ড থেকে আয় করেন ৮৬ লাখ ১৬ হাজার ৫৮০ টাকা। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে তিনি কর দিয়েছেন ৬৬ হাজার ৬৫০ টাকা।

অস্থাবর সম্পত্তির বিবরণীতে তিনি লিখেছেন, তাঁর কাছে নগদ অর্থ আছে ৭ লাখ ৪১ হাজার ৭৫ টাকা এবং বিভিন্ন ব্যাংকে জমা আছে ১৩ কোটি ৯৩ লাখ ৭৫ হাজার ৩৫৬ টাকা। তিনি এখানে পাঁচটি ব্যাংকের ১২টি অ্যাকাউন্টের হিসাব দাখিল করেন। এছাড়া সঞ্চয়পত্র, ফিক্সড ডিপোজিট এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগ আছে ৭ কোটি ৮৫ লাখ ১৪ হাজার ২২৯ টাকা। এছাড়া তার মোট ৩৫ লাখ টাকা মূল্যের দুটি জিপ গাড়িও ছিল।

১৫ বছর আগে এক কাপড়ে বেরিয়ে আসা মঈনুল রোডের সেই বাড়িতে আর ফেরা হলো না খালেদা জিয়ার। ছবি: সংগৃহীত
১৫ বছর আগে এক কাপড়ে বেরিয়ে আসা মঈনুল রোডের সেই বাড়িতে আর ফেরা হলো না খালেদা জিয়ার। ছবি: সংগৃহীত

হলফনামা অনুসারে, তার ৫০ তোলা স্বর্ণ (জহরতসহ) ছিল। তবে উপহার হিসেবে পাওয়ায় সেগুলোর মূল্য তিনি উল্লেখ করেননি। এসব সম্পদসহ তাঁর মোট অস্থাবর সম্পত্তির মূল্য তিনি লিখেছেন ২২ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

এদিকে স্থাবর সম্পত্তির হিসাবে খালেদা জিয়া লিখেছেন, তাঁর পৃথক দুটি ৮ শতাংশ এবং ১৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ অকৃষিজ জমি আছে। এছাড়া তারেক রহমান যে বাসায় থাকেন অর্থাৎ ১৯৬ গুলশান এভিনিউয়ের এক তৃতীয়াংশের মালিকানা তার। ঠিকানা উল্লেখ না করলেও ক্যান্টনমেন্টে তার একটি বাড়ির কথা তিনি উল্লেখ করেছেন যা বর্তমানে মালিকানা বা দখলে নেই।

তার বর্তমান স্থাবর সম্পদের পরিমাণ তিনি লিখেছেন ৫০ কোটি টাকা। স্থাবর এবং স্থাবর দুটি মিলিয়ে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ হচ্ছে, ৭২ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

এছাড়া হলফনামা অনুসারে তার নামে বাড়ি ভাড়া বাবদ ঋণ, যা আনসিকিউরড লোন নামে উল্লেখ করা হয়েছে, আছে ১ কোটি ৮২ লাখ টাকার।

তিনি পেশা হিসেবে ‘রাজনীতি’ উল্লেখ করেছেন এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে লিখেছেন ‘স্বশিক্ষিত’।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা হয় ৩৫টি মামলা

ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মোট ৩৫টি মামলা করা হয়। তার মধ্যে ২২টি মামলায় খালাস ও ১৩টি মামলায় অব্যাহতি পেয়েছিলেন তিনি।

হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, মামলাগুলোতে দুর্নীতি, মানহানি, রাষ্ট্রদ্রোহ, হত্যা, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ, বোমা হামলা, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের নিয়ে কটাক্ষ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, মিথ্যা জন্মদিন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছিল।

এসব মামলার মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বাকি মামলাগুলোর বিচার চলমান ছিল। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজার রায় ঘোষণার পর ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হয় । এ সময়ে তিনি সাজা ভোগ করেন দুই বছর এক মাস ১৬ দিন।

এরপর করোনাকালে আওয়ামী লীগ সরকার তার সাজার কার্যকারিতা স্থগিত করে। শর্তসাপেক্ষে কারামুক্তি দিয়ে বাসায় থাকার সুযোগ দেওয়া হয় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে। তবে বয়সজনিত কারণে শারীরিক নানা জটিলতায় আক্রান্ত হলেও বারবার আবেদনের পরও তাকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০০৭ সাল থেকে রুজু হওয়া এসব রাজনৈতিক মামলা থেকে একে একে খালাস পেতে শুরু করেন তিনি।

হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোর মধ্যে ২০০৭ সালে দুটি, ২০১০ সালে একটি, ২০১৩ সালে একটি, ২০১৪ সালে দুটি, ২০১৫ সালে ১৬টি, ২০১৬ সালে ১০টি, ২০১৭ সালে দুটি এবং ২০২৪ সালে একটি মামলা দায়ের করা হয়। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সবকয়টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত