জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

মব সংস্কৃতি বিএনপির জন্যও সমস্যা

লেখা:
লেখা:
শাহরিয়ার ইসলাম শোভন

স্ট্রিম গ্রাফিক

নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা দেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যে ‘মব সংস্কৃতি’ গড়ে উঠেছিল, তার অবসান হয়েছে। কিন্তু ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার শপথ নেওয়ার পর থেকেই সরকারি কর্মস্থলে অন্তত তিনটি ঘটনায় ‘মব’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, বিএনপি সরকারের সামনেও মব বড় চ্যালেঞ্জ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, যৌক্তিক দাবি থাকলে তা নিয়ম মেনে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান করা হবে। আগে যেমন মবের চাপে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো, সেই পদ্ধতি থেকে সরে আসার কথাও জানান তিনি। তবে ঘোষণার দিনই বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) একটি মবের ঘটনা ঘটে। আর সর্বশেষ গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়, যার ফলে গভর্নরের পরিবর্তন পর্যন্ত ঘটেছে।

২৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন বিভিন্ন দাবি আদায়ে বিক্ষোভ করে। পরদিন সকালে তাদের দাবির তালিকায় গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের পদত্যাগের দাবিও যোগ হয়। তারা হুঁশিয়ারি দেয়, দাবি না মানলে পরদিন থেকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ধর্মঘটে যাবেন।

২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে বিক্ষোভের সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা চেয়েছি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন। কিন্তু পেয়েছি স্বৈরশাসন। এই স্বৈরশাসনে আমরা থাকতে চাই না। আমাদের কিছু ন্যায্য দাবি নিয়ে বারবার গভর্নরের কাছে গিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি সেগুলো আমলে নেননি। বরং উনি দমন-নিপীড়নের আশ্রয় নিয়েছেন।’

২৫ ফেব্রুয়ারি দুপুরে গভর্নর অফিসে এসে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, শৃঙ্খলা ভঙ্গ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু এর ঠিক এক ঘণ্টা পরেই তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। মজার ব্যাপার, এর মাত্র দুদিন আগেই অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে মনসুরের বৈঠক হয়েছিল এবং সেখানে তাঁকে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার চালিয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়।

আহসান মনসুরকে সরিয়ে দেওয়ার পর তাঁর উপদেষ্টাকেও মবের চাপে বের করে দেওয়া হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় নতুন গভর্নর হিসেবে তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমানকে নিয়োগ দেয়।

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আরও দুই ঘটনা

১. বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদকে ১৮ ফেব্রুয়ারি অফিস ছাড়তে বাধ্য করা হয়। বাসস সাংবাদিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সদস্যরা কক্ষে ঢুকে তাঁকে চলে যেতে বলেন। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, একদল লোক মাহবুব মোর্শেদের অফিসে ঢুকে তাঁকে চলে যেতে বাধ্য করে।

ঐক্য পরিষদের নেতারা জানান, জাতীয় নির্বাচনের আগে তারা পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনী কভারেজে প্রভাব পড়তে পারে ভেবে অপেক্ষা করেন। নির্বাচন শেষে সভা করে তারা সিদ্ধান্ত নেন, মাহবুব মোর্শেদের অধীনে কেউ কাজ করবেন না। তাঁর প্রতি অনাস্থা জানান এবং সরকারকে বিষয়টি জানাবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন।

জানানোর কিছুক্ষণ পরই মাহবুব মোর্শেদ অফিস ত্যাগ করেন। তাঁকে অফিসের গাড়িও ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি বলে নেতারা জানান। তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নিয়োগ পেয়েছিলেন।

২. বরিশাল চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ২৪ ফেব্রুয়ারি একটি মব হামলা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এতে বিএনপিপন্থী কিছু আইনজীবী জড়িত। বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকনের নেতৃত্বে একদল আইনজীবী অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতকক্ষে ভাঙচুর চালান। পরে সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

সংবাদমাধ্যমের তথ্যে, অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শরিয়াতুল্লাহর আদালতে সাবেক আওয়ামী লীগ এমপি তালুকদার মো. ইউনুস আত্মসমর্পণ করার পর জামিন পান। এর প্রতিবাদে আইনজীবীরা আদালতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন।

অর্থমন্ত্রীর ব্যাখ্যা

মনসুরকে অপসারণের পর অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, নতুন সরকারের অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তন একটি ‘স্বাভাবিক প্রক্রিয়া’। তিনি বলেন, ‘নতুন সরকারের যে কর্মসূচি আছে, যে অগ্রাধিকার আছে এবং যে চিন্তাভাবনা আছে— এগুলো বাস্তবায়নের জন্য যেখানে যেখানে প্রয়োজন, সেখানেই পরিবর্তন হবে। প্রয়োজনে আরও অনেক জায়গায় পরিবর্তন হবে এবং এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।’

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

দুই দিন আগে মনসুরকে আশ্বাস দেওয়ার পর এই অবস্থানকে অনেকেই ভিন্ন অবস্থান হিসেবে দেখছেন। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নুসরাত শারমিন বলেন, ‘যদি কোনো মব ভয় দেখিয়ে বা বেআইনি চাপ দিয়ে লক্ষ্য অর্জন করে। তাহলে এটি শক্ত বার্তা দেয়—এভাবে কাজ আদায় করা যায়।’

তিনি বলেন, ‘বড় দলে থাকলে ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ কমে যায়। একা থাকলে যে কাজ কেউ করতেন না, দলবদ্ধ হয়ে তা করে ফেলেন।’

রাজনীতিক তাজনূভা জাবীন বলেন, ‘বাংলাদেশে দাবি আদায়ের একটি অনানুষ্ঠানিক উপায় হয়ে উঠেছে মব। এভাবে দলবদ্ধ হলে কাজ আদায় করা যায়– এমন ধারণা জন্মেছে।’ তিনি বলেন, ‘মোহাম্মদ শাহেদ ওরফে রিজেন্ট শাহেদের মুক্তি, কক্সবাজারের বদির মুক্তির খবর এবং গভর্নর অপসারণ—সব মিলিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।’

তাজনূভার অভিযোগ, ‘যেভাবে গভর্নরকে সরানো হলো এবং যেভাবে একে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলা হলো, এটিকে সিন্ডিকেটের মতো মনে হচ্ছে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. শামসুল আলম বলেন, ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো না গেলে মানুষের আস্থা আরও কমে যেতে পারে।’ তাঁর মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মব কালচার শক্তভাবে গড়ে ওঠে এবং তখন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। নতুন সরকারও কীভাবে এটি সামলাবে, তা অনিশ্চিত মনে হচ্ছে।

অধ্যাপক শামসুল বলেন, ‘আইনি উপায়ে মব কালচার মোকাবিলা করা জরুরি। মবের পেছনের মূল পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার না করলে আইনশৃঙ্খলার জন্য এটি বড় হুমকি হয়ে থাকবে।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সায়েদ আহমেদ বলেন, ‘মবের চাপে পদত্যাগ আদায়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বদলানো বা দাবি আদায়ে সফল হলে সেই আচরণ ধীরে ধীরে অপরাধের দিকে যেতে পারে।’ তিনি যোগ করেন, ‘মানুষ যখন বিচারব্যবস্থা বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারায়, তখন কেউ কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়। সামাজিক বা রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় অনেক দেশেই এমনটা দেখা গেছে। বেআইনি সমাবেশ, হামলা, ভাঙচুর বা সরকারি কাজে বাধা—এসবই বাংলাদেশের আইনে অপরাধ।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মব কালচার বন্ধের ঘোষণা দিলেও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো নাজুক।

বিষয়:

বিএনপিমব

সম্পর্কিত