শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্রই এখন বইছে নির্বাচনী হাওয়া। মানিকগঞ্জ-১ (ঘিওর, দৌলতপুর ও শিবালয়) আসনে এবারের নির্বাচনে ভোটারদের প্রধান দাবি ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্থায়ী নদী শাসন এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ। যমুনা, ধলেশ্বরী ও কালীগঙ্গা নদী বেষ্টিত এই জনপদে প্রার্থীরা উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও চরাঞ্চলের মানুষ এবার কেবল মৌখিক আশ্বাসে সন্তুষ্ট হতে নারাজ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে চরাঞ্চলগুলোতে ভয়াবহ নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। অপরিকল্পিত ড্রেজিংয়ের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে সরাসরি আঘাত হানছে জনবসতিতে। ঘিওর উপজেলার তরা এলাকায় কালীগঙ্গা নদীর তীরে বসানো সিসি ব্লকগুলোও ধসে পড়ছে। দৌলতপুর ও শিবালয় এলাকায় নদী ভাঙনের শিকার হয়ে হাজারো মানুষ ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন।
দৌলতপুরের কল্যাণপুর চরাঞ্চলের বাসিন্দা হনুফা বেগম বলেন, ‘নির্বাচন এলে প্রার্থীরা নদী ভাঙন রোধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধোঁকা দেন। অথচ ক্ষমতায় গেলে তারাই আবার নদী থেকে বালু উত্তোলন করে আমাদের হুমকিতে ফেলেন। এবার আর মুখের কথায় বিশ্বাস নয়, কাজ দেখে ভোট দেব।’
শিবালয়ের জাফরগঞ্জ এলাকার সোহেল হোসেনের কণ্ঠেও একই ক্ষোভ। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ক্ষমতাসীনরা বালু উত্তোলন করেন। এতে বাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এবার আমরা স্রেফ গৎবাঁধা প্রতিশ্রুতিতে ভুলব না।’
ঘিওরের রাজ্জাক শেখ অভিযোগ করেন, বিগত শাসনামলে ক্ষমতাসীনেরা জোরপূর্বক আবাদি জমির মাটি কেটে নিয়েছিল। ৫ আগস্টের পর দেড় বছর পার হলেও পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। তাই ভোটাররা এবার যোগ্য প্রতিনিধি বেছে নিতে সজাগ রয়েছেন।
মানিকগঞ্জ-১ আসনে লড়াইয়ে থাকা প্রার্থীরা নদী ভাঙন ও কর্মসংস্থানকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এস এ জিন্নাহ কবির বলেন, ‘মানিকগঞ্জের তিনটি উপজেলার মানুষ সারা বছর নদী ভাঙন আতঙ্কে থাকেন। আমি নির্বাচিত হলে নদী ভাঙন রোধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণসহ এই অঞ্চলকে অর্থনৈতিক জোন হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করব।’
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘আমরা দেশ থেকে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে চাই। সোনার বাংলাদেশ গড়তে আমাদের ভোট দিন, প্রত্যাশিত উন্নয়ন হবে।’
চরাঞ্চলের সন্তান ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মোজাম্মেল হক তোজা বলেন, ‘আমি বিজয়ী হলে প্রথমেই যুবসমাজকে মাদক মুক্ত করব এবং চরাঞ্চলবাসীর দীর্ঘদিনের আশা পূরণ করব।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলার সিনিয়র সহ-সভাপতি ইকবাল হোসেন কচি বলেন, ‘নদী ভাঙনের মূলে রয়েছে অপরিকল্পিত ড্রেজিং। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছার অভাবেই ভাঙন রোধ করা যাচ্ছে না। সচেতন মানুষ রুখে দাঁড়ালেই এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব।’
মানিকগঞ্জ-১ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৬১ হাজার ৯৪২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৩১ হাজার ৮৫৭ জন, নারী ২ লাখ ৩০ হাজার ৮১ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৪ জন। নির্বাচনে মোট ৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন—ডা. আবু বক্কর সিদ্দিক (জামায়াত), এস এ জিন্নাহ কবির (বিএনপি), মোহাম্মদ ইলিয়াছ হুছাইন (গণঅধিকার পরিষদ), মুহাম্মদ শাহজাহান খান (জনতার দল), মোঃ খোরশেদ আলম (ইসলামী আন্দোলন), মোঃ তোজাম্মেল হক (স্বতন্ত্র) এবং আব্দুল আলী বেপারী (স্বতন্ত্র)।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট যুদ্ধে বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা।