leadT1ad

মানিকগঞ্জে তুরুপের তাস সংখ্যালঘু ও আওয়ামী লীগের ভোট

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
মানিকগঞ্জ

প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৯: ১৫
ছবি: সংগৃহীত

এক সময়ের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত মানিকগঞ্জের তিনটি সংসদীয় আসন পুনরুদ্ধারে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে হারানো ‘বিশ্বস্ত দুর্গ’ ফিরে পেতে নানা কৌশলী সমীকরণ মেলাচ্ছেন দলটির প্রার্থীরা। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ‘নিশ্চুপ’ সাধারণ সমর্থক এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটই এবার জয়-পরাজয়ের প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মানিকগঞ্জের নির্বাচনী পরিবেশে এখন বিএনপি বনাম জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ নির্বাচনী মাঠের বাইরে থাকায় তাদের বিশাল ভোট ব্যাংকটি নিজেদের দিকে টানতে চাইছে বিএনপি। দলটির প্রার্থীরা এখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সমর্থকদের মামলা, হামলা বা হয়রানি বন্ধের নিশ্চয়তা দিয়ে দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। পাশাপাশি সংখ্যালঘু ভোট নিশ্চিত করতে দলীয় নেতাকর্মীদের বাইরেও সমাজের প্রবীণ ও মাতব্বরদের কাজে লাগানো হচ্ছে।

মানিকগঞ্জ-১ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এস এ জিন্নাহ কবীর বলেন, ‘আসনটিতে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে জনগণের খুব কাছে থেকে কাজ করার সুযোগ হয়েছে আমার। আমি আশাবাদী বিএনপি বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে।’

তবে এই আসনে জিন্নাহ কবীরের একটি উঠান বৈঠকের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বানিয়াজুরী ইউনিয়নের হিন্দু সম্প্রদায়ের মুরব্বি পবিত্র কুমারের বাড়িতে আয়োজিত এক বৈঠকে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ মাঠে নেই, আছে বিএনপি ও জামায়াত। জামায়াত স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি। তারা ক্ষমতায় এলে হিন্দু ও আওয়ামী লীগ সমর্থকরা কেউ শান্তিতে থাকতে পারবেন না। নিরাপদ থাকতে ধানের শীষেই ভোট দিন।’

মানিকগঞ্জ-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী মইনুল ইসলাম খান শান্তর দাবি, এটি বিএনপির ঘাঁটি ছিল যা জোর করে আওয়ামী লীগ দখলে নিয়েছিল। এখন স্বাভাবিক পরিবেশ ফেরায় সাধারণ মানুষ ধানের শীষেই ভোট দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

অন্যদিকে মানিকগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী আফরোজা খানম রিতা গত বুধবার সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও পুটাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. মহিদুর রহমানের আয়োজনে তাঁর বাড়ির কাছে এক পথসভায় বক্তব্য রাখেন। সেখানে তিনি ভেদাভেদ ভুলে ধানের শীষের পক্ষে ভোট চান এবং নারীদের সকাল সকাল ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান।

যুক্তফ্রন্ট মনোনীত বাংলাদেশ জাসদের মানিকগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী শাহজাহান আলী সাজু বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচনে আমরা সব ধরণের আচরণবিধি মেনে চলছি। তবে বিএনপির যিনি প্রার্থী, তিনি কতটা আচরণবিধি মেনে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে নির্বাচনী ক্যাম্প থাকার কথা কিন্তু তারা প্রতিটি ওয়ার্ডেই ক্যাম্পসহ সাধারণ ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছে। এ বিষয়ে আমি রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। একদিন এসেছিলেন, কিন্তু তাদের কথার কোনো কর্ণপাত করেনি।’

মানিকগঞ্জ-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মোজাম্মেল হক তোজা বলেন, ‘আমি দলীয় (বিএনপি) মনোনয়ন চেয়ে ছিলাম কিন্তু পাইনি। জনগণের চাপের মুখে প্রার্থী হয়েছি, সারাও পাচ্ছি আশানুরূপ। গত কয়েক দিন ধরে আমার সমর্থকের হয়রানিসহ নানা ভাবে হুমকি দিয়ে আসছে। এছাড়া আমি বিজয়ী হলেও ক্ষমতায় বসতে দেওয়া হবে না বলেও গুনজন ছড়াচ্ছে ধানের শীষের নেতা সমর্থকরা।’

হরিরামপুরের কলতা গ্রামের ভোটার কমল কান্তি বলেন, ‘আমরা দেশের মাটিতে অসহায় বোধ করছি। ভোট দিলেও দোষ, না দিলেও দোষ। যিনি সমাজের জন্য ভালো করবেন, আমরা তাকেই বেছে নেব।’

শিবালয়ের কার্তিক কর্মকার জানান, নিরাপত্তার দিক থেকে তাঁরা ভালো থাকলেও ভোট দেবেন পছন্দের প্রার্থীকেই। পরিচয় গোপন রেখে একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা জানান, পদধারী নেতারা কেন্দ্রে না গেলেও সাধারণ সমর্থকরা কেন্দ্রে গেলে স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির দিকেই ঝোঁক থাকবে।

মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা নাজমুন আরা সুলতানা জানান, জেলার তিনটি আসনে ২০ জন প্রার্থীর মধ্যে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আচরণবিধি নিয়ন্ত্রণে প্রতি উপজেলায় দুজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত আছেন। জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

উল্লেখ্য, ১৯৭৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মানিকগঞ্জের আসনগুলো ছিল বিএনপির দখলে। ২০০৮ সালের আসন পুনর্বিন্যাসের পর থেকে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত আসনগুলো আওয়ামী লীগের অধীনে ছিল। দীর্ঘ দেড় দশক পর পুনরায় আসনগুলো পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ এখন বিএনপির সামনে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত