leadT1ad

সুনীল কর্মকার: ভাষার ধ্যানে মগ্ন এক ‘দানবীয় প্রেমিক’

জাহিদ জগৎ
জাহিদ জগৎ

প্রকাশ : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০: ১৪
সুনীল কর্মকাররের প্রয়াণে শুধু বিচ্ছেদ হলো এমন নয় বরং বাউল-ফকিরদের জ্ঞান ও ভাবচর্চার এই দুর্দিনে আমরা কাণ্ডারি হারালাম।

সময়টা পাগলামির, অচেনা রাস্তা কিন্তু লক্ষ্য ছিল ভাষার দরদ। কবিতার ভেতর অশ্রুকণার মতো জীবন্ত এক অনুভূতি খুঁজে পাবার নেশায় তখন দুনিয়া ভুলতে বসেছি। রাস্তায় সামান্য এক টুকরো মরা ডাল দেখলেও তার ভেতর খুঁজে পেতাম করুণাভার চোখ, বিদ্রূপের হাসি, জীবনের অর্থহীনতা। এই সময়ে বাংলা ভাষার শক্তিরূপের সন্ধান, আরাধনার তৃষ্ণা প্রবল হয়ে ওঠে। ততোদিনে লালনের গানের সাথে পরিচয় হয়ে গেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাধুসঙ্গে অবাধ যাতায়াত আমার। সেইসব নেশাঘন দিনে আমার পরিচয় জালাল খাঁ আর সুনীল কর্মকারের সঙ্গে।

২০১৪ সালের দিকে সম্ভবত নারায়ণগঞ্জের কোনো একটা সাধুর ঘরোয়া আয়োজনে সঙ্গ করতে গেছি, সেইখানে প্রথম শুনলাম মনোমোহন দত্তের ‘ইঙ্গিতে সঙ্কেতে পলকে পলকে/ কোথা যেতে নারি পাছে থেকে ডাকে/ শুনে সেই তান চমকিয়া ওঠে প্রাণ/ বলে কথা মান ফিরে ফিরে আয়/ মন মাঝে কার যেন ডাক শোনা যায়…’ ভাষার এমন বাঁধন আমার পুরো চিন্তার ধরন বদলে দিলো।বাংলা ভাষার যে সকল কবিদের কবিতা পড়ে আমাদের যাত্রা শুরু, তাদের কারো লেখায় এইরকম ঝংকার নাই, ভাষার অভ্যন্তরে এতো গভীর স্রোত আর প্রতি লহমায় সমানুপাতিক আর্তনাদ রইতে দেখি নাই। সারারাতের গান শেষে, ভোরে ফিরে এলাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সে সময় উদ্যানের মাঝখানে ছোট্ট একটা ছাউনির নিচে প্রতিসন্ধ্যায় লালন চর্চা কেন্দ্রের গানের আসর বসে। ওস্তাদ পাগলা বাবলু। তিনি শিষ্যদের বাদ্যযন্ত্রসহ লালনের গানের ভাব, ভক্তি, ভাষা আর সুরের তালিম দেন। মাঝে মধ্যেই লালনচর্চার কেন্দ্রের আয়োজনে সাধুসঙ্গ হয়। দেশের বড় বড় বাউল ফকির আসেন। সাধুরা রাতভর গান করেন, বৃক্ষতলে বসে নিয়ম করে সাধুসেবা নেন।

এইরকম এক সঙ্গে দেখা হলো, সোহাগ কুলি খানের সাথে। সোহাগ কুলি খান তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে পড়েন। তার সাথে আগেও এক দুইবার দেখা হয়েছে। কিন্তু সারা রাতের সঙ্গ ঐটাই প্রথম। হঠাৎ করে তিনি মাঝরাতে একটি গান শোনালেন, খালি গলায়, ‘কোন পরানে বলবো আমি/ বঁধু তোমায় ভালোবাসি/ সাগর হতে একটি বিন্দু/ তার চেয়ে যে আরো বেশি…’ ঐ গানের ভনিতায় শুনতে পারলাম, ‘...জালাল কয় মোর পথ চাওয়া/ ভাগ্যে নাহি পরশ পাওয়া/ সার হয়েছে আসা যাওয়া/ গলে বাঁধা মায়ার ফাঁসি…।‘ আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। জালালের গান? এতো মরমি, এতো প্রাঞ্জল আর এতো ভার সুর আর কথায়! আমি সোহাগ কুলি খানকে জালাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেই, তিনি আমাকে অল্প বিস্তর জানালেন। সেই রাতেই আমি প্রথম সুনীল কর্মকারের নাম শুনলাম। যতদূর মনে পড়ে ১৪ সালের শীতের শুরুতে। সোহাগ কুলি খানের বাড়িও নেত্রকোনার কেন্দুয়াতে। ততদিনে আমি সালাম সরকারের গানের সাথেও পরিচিত।

এ সব প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি শব্দ তো আমাদের সম্পদ। আমাদের শিক্ষার স্কুল, আমাদের জ্ঞানের পাঠ। তার প্রয়াণে শুধু বিচ্ছেদ হলো এমন নয় বরং বাউল-ফকিরদের জ্ঞান ও ভাবচর্চার এই দুর্দিনে আমরা কাণ্ডারি হারালাম।

এরপর সোহাগ কুলি খানের সাথে আমার যোগাযোগটা অত্যন্ত গাঢ় হয়, আর সেই সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘সুনীল কর্মকারের জালাল খাঁ’। এরপর ইউটিউবে শুনতে লাগলাম সুনীল কর্মকারের যা কিছু পাওয়া যায়। অর্থাৎ আমি তাঁর কণ্ঠের প্রেমে পড়ে গেছি। এরমধ্যে জালাল খাঁ সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে শুরু করলাম। আমাদের ভাইব্রাদারদের যারা গান করতেন, তাদেরকে সুনীল কর্মকারের গান শোনাতাম। গাইতে বলতাম। কিন্তু এতো বড়মাপের শিল্পীর দেখা পাওয়া সহজ নয় ভেবে তখন তেমন চেষ্টা করিনি। হঠাৎ করে ১৫ সালের শেষে বিরিশিরি হয়ে ময়মনসিংহ ফিরেছি আমাদের একজন কবিবন্ধুর আশ্রয়ে। রাতে খাওয়াদাওয়া করে বন্ধুর মেস থেকে বের হয়েছি, রাতের ময়মনসিংহ ঘুরে ঘুরে দেখবো বলে। কাছারিঘাটে পৌঁছাতেই আরও কয়েকজন কবির সাথে দেখা। নদীর ওপার থেকে মাইকে ভেসে আসছে বাউল গানের সুর। আর কি! নদী পার হয়ে ছুটলাম সুরের উৎসের দিকে।

ছোটখাট স্টেজ, সামনে সামিয়ানা টানানো। নিচে খড়বিচালি বিছানো। স্টেজের সামনে শ দেড়েক লোক। আর স্টেজে বসে আছে কয়েকজন শিল্পী। একজন লোকাল শিল্পী গান করছেন। কয়েকটা গান পরেই পূর্ববর্তী শিল্পী যে নাম ঘোষণা করলেন, তাতে রীতিমত আমার হাত-পা কাঁপা শুরু হয়ে গেল। বাবু সুনীল কর্মকার! ধীরে ধীরে স্টেজের সামনের দিকে গিয়ে বসলাম। সামনে থেকে দেখতেছি সেই ‘দানবীয় প্রেমিক’কে। প্রথম গান শেষ হওয়ার পর তিনি যখন কথা শুরু করলেন, আমি যেন নিজের মধ্যেই ভেঙেচুরে যাচ্ছিলাম। মানে ভালোবাসার জন্য ভুল জায়গা নির্ণয় করা যেন আমার নিয়তি। বাংলা ভাষার চর্চায় যিনি এতো বড় তাত্ত্বিক, আমি কি না তাকে মেপেছি কণ্ঠ দিয়ে! প্রায় ভোররাত পর্যন্ত গান শুনলাম, কথা শুনলাম। আর সবচেয়ে বেশি হলো, ‘আমি তাহারে পাইলাম’। গান শেষে তার কাছে গিয়ে বললাম, ‘আমি আপনার গানের একজন সামান্য ভক্ত। ঢাকা থেকে এসেছি আপনার গান শুনতে।’

এর পর থেকে বাবু সুনীল কর্মকারের আশপাশে যারা থাকেন বা তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন—এমন অনেকের সাথে যোগাযোগ শুরু করলাম। সুবিধাজনক জায়গা পেলেই ছুটে যেতাম তার গান শুনতে। বিশেষ করে পালাগানে। ঢাকা ফোকফেস্টে গেয়েছেন, সেইখানেও ছুটে গেছি। সেই যাওয়াটা অবশ্য একটু আলাদা। ১৬ সালে আমি একটা সিনেমার কাজে যুক্ত হই। নূর ইমরান মিঠুর ‘কমলা রকেট’ সিনেমার কাজ তখন পুরোদমে। তার আগে পরিচালক মিঠুর সাথে আমি স্ক্রিপ্টের কাজও করেছি টানা কয়েক মাস। এরপর গল্প গল্পের বাঁধন আর আমাদের মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক তখন এমনই ছিলো। স্ক্রিপ্টের কাজ চলাকালে আমি দিনরাত সুনীল কর্মকারের গাওয়া ‘মনমাঝে কার যেন ডাক শোনা যায়’ গানটা শুনি।

মিঠুও শুনতে শুনতে একসময় পছন্দ করে ফেলে। আমরা সিদ্ধান্ত নিই এই গানটা আমরা সিনেমায় ব্যবহার করব। সেই অনুযায়ী, মিঠু গানসংক্রান্ত সবার সাথে যোগাযোগ করতে বললে, আমি আনন্দ আশ্রমের সাথে যোগাযোগ করি। গানের স্বত্ত্বাধিকার হিসেবে তাদের অনুমতিসহ সব ফর্মালিটি শেষ করি। মিঠু আমাকে সুনীল কর্মকারের সাথে যোগাযোগ করতে বললে, এইখানে এসে আমি থেমে যাই। তারপর মিঠুই যোগাযোগ করে, তিনি ময়মনসিংহ থেকে ফোক ফেস্টে গাইতে আসবেন, আমরা যেন তার স্টেজে ওঠার আগে দেখা করি। আমরা ছুটলাম। প্রচণ্ড ভিড়ে খানিকটা লেট হয়ে গেল। তবু স্টেজের পাশে গ্রিনরুমে আমরা ঢুকলাম। তখনো বেশ সময় হাতে আছে তার। কিন্তু আমাদের যে দেরি হইছে, এই জন্য তিনি ছাড় দিলেন না।

সাধকের সময় জ্ঞান যে কতটা জরুরি তিনি প্রায় ২০ মিনিট ধরে বোঝালেন… প্রতিটি কাল, পর্ব, মুহূর্তের আলাদা সাধনা আছে। যথা সময়ে তা না করা সময়ের সাথে অন্যায় করা হয়, এই বয়ান আমাকে রীতিমত ঘাবড়ে দিল। আমি আস্তে আস্তে তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম। আমার স্বর শুনে সাথে সাথে উনি বললেন, ‘তোমার কণ্ঠ পরিচিত লাগছে। তুমি কি ময়মনসিংহ গেছিলা এর আগে?’ আমি আর কী বলব? এতো প্রখর তার শ্রবণ আর স্মরণশক্তি, যা আমার মতো ছোট মানুষের কল্পনার বাইরে। অনেক কথার পরে আমরা সেদিন মৌখিক কথা নিয়ে আসলাম, ‘কমলা রকেট’ সিনেমায় তিনি মনমোহন দত্তের গান করবেন। ব্যাস… আমরা রেকর্ডিংয়ে পেলাম আমাদের আন্তরিক সুনীল কর্মকারকে।

বাংলা ভাষার চর্চায় যিনি এতো বড় তাত্ত্বিক, আমি কি না তাকে মেপেছি কণ্ঠ দিয়ে! প্রায় ভোররাত পর্যন্ত গান শুনলাম, কথা শুনলাম। আর সবচেয়ে বেশি হলো, ‘আমি তাহারে পাইলাম’। গান শেষে তার কাছে গিয়ে বললাম, ‘আমি আপনার গানের একজন সামান্য ভক্ত। ঢাকা থেকে এসেছি আপনার গান শুনতে।’

ততদিনে জালাল খাঁ জেঁকে বসেছে মাথার মধ্যে, সোহাগ কুলি খানের সহযোগিতায় জোগাড় করেছি জালাল উদ্দিন খাঁ রচিত ‘বিশ্ব রহস্য’। জালাল খাঁ খুঁজতে খুঁজতে পেলাম ওস্তাদ রশিদউদ্দিন খাঁকে। তিনি এত বড় মাপের সাধক ছিলেন, অথচ আমরা তাঁর খোঁজই জানতাম না, সেই খোঁজটাও দিলেন সাধক সুনীল কর্মকার।

মানিকগঞ্জের একটা পালা গানের আসরে। গুরু শিষ্যের পালায় তিনি গুরুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন। ভরাট গলায় তিনি গান করতে করতে শোনালেন গুরু রশিদ উদ্দিনের কীর্তিগাথা। যে জালাল খাঁর গান শুনে আমার মতো সামান্যজন স্তব্ধ হয়ে থাকেন, সেই জালাল খাঁর গুরু রশিদ উদ্দিন খাঁ। যিনি মালজোড়া গানের স্রষ্টা। শোনালেন, একই স্টেজে তাত্ত্বিক জালাল খাঁকে শেষ মুহূর্তে কীভাবে পরাস্ত করেছিলেন গুরু রশিদ উদ্দিন খাঁ।

মানিকগঞ্জ থেকে ফিরে মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকল রশিদ উদ্দিন খাঁ। ২০১৮ সালের শীতে ছুটে গেলাম নেত্রকোনা, বাউল গুরু রশিদ উদ্দিনের বাড়ি। রশিদ উদ্দিন প্রবর্তিত বাৎসরিক অনুষ্ঠানে। রশিদ উদ্দিনের ভাতিজার অতিথি। দূরদূরান্ত থেকে বাউলফকিররা এলেন। অনেকের সঙ্গে আলাপ করলাম। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, রশিদ উদ্দিন এক সমুদ্র। তাঁর হাত ধরে সাধক চান মিয়া, উকিল মুন্সির মতো বড় বড় সাধক তৈরি হয়েছে এই বাংলায়। এমনি শেষ দিকে বাউল আব্দুল করিমও রশিদ উদ্দিনের স্কুলে দীক্ষা শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। আমি যেহেতু সাধকের বাড়ির অতিথি, ফলে আমার আশ্রয় হলো সাধকদের মধ্যে। এই প্রথম সুনীল কর্মকারকে ব্যক্তিগতভাবে পাইলাম। গানের আগে, তার পায়ের কাছে বসে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার কথা শুনলাম। জিজ্ঞেস করলাম অল্পই। আমার যেহেতু ভাষাজ্ঞান শূন্য অবস্থা, তিনি ধরিয়ে দিচ্ছিলেন শব্দ, শব্দের ব্যঞ্জনা। সুরের সাথে সময়ের সম্পর্ক আর ধ্যানীর অভিমান সম্পর্কে। গান শেষে তিনি যখন বিদায় নিলেন, সেই শূন্যতা আজ আবার নতুন করে টের পাচ্ছি।

এরপর আমার জার্নির মোড় ঘুরে গেলো। গান শোনার ক্ষেত্রেও আমার ইনার সেন্সের সেই পরিবর্তন টের পাইলাম নবপ্রাণ আখড়া বাড়িতে। সময়ের অন্যতম কবি ও দার্শনিক ফরহাদ মজহার যখন অত্যন্ত সমীহ করে কথা বলতে লাগলেন, তখন বুঝতে পারলাম সেই অধর ধরবার পথে আমাদের অবস্থা কতটা নাজুক। ভক্তিবাদ, জীব এবং পরমসম্পর্কিত সেই আলাপ এতো সরল ভাষার, অথচ আমার চিন্তার অনেক দূর দিয়ে ছুটে গেলো। তবু একটা বিষয়ে ধারণা পোক্ত হলো—বাংলায় চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে আমাদের যে পশ্চিমা নির্ভরতা তার থেকে কিছুটা হলে একমাত্র মুক্তি দিতে পারে আমাদের ভাব সাধকেরা।

ওই আসরের পর দেশের আনাচেকানাচে লুকিয়ে থাকা সাধকদের বাংলা গানকে আর সোজাভাবে গান হিসেবে নিতে চাইনি, সেইটা বোধহয় আমার আকাঙ্খাও৷ যারা (বেশিরভাগ) শিল্পী হিসেবে সাধক সুনীল কর্মকাররে চেনেন, তাদের জন্য আমার বলবার বিষয় হলো, আমাদের বেশিরভাগ কণ্ঠশিল্পী কিংবা গানের শিল্পীরা সাধকদের গান করেন, কিন্তু বেশিরভাগ শিল্পীই গানের ভাব, ভাষা আর তার দার্শনিক অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখেন না৷ সেই সন্ধানের চেষ্টাও করেন না। তারা বেশির ভাগ সময় নির্ভর করেন সুর স্বর আর ধ্বনি ব্যঞ্জনার মধ্যে। এইখানেই সুনীল কর্মকার আমার চোখ খুলে দিয়েছেন। সুর সময় আর দুনিয়ার আবর্তনের মধ্যকার যে সাধনা, সেইখানেও তিনি ছিলেন ওস্তাদ মানুষ। তার হাতের বেহালা, দোতারা, তবলা যেন তারই অন্তরের কথা ধারণ করতেন কিন্তু তিনি স্পষ্ট দেখিয়েছেন, বাংলার ভাব সাধনা কেবল সুরের ওপর ভর করে এগিয়ে আসেনি। তিনি ভাষার ওপর পূর্ণ দখল নিয়ে, তার উপযুক্ত ব্যাখ্যা করছেন।কেন, কী গান করছেন এবং সেই গানের কথা—কালানুসারে তার কথা—কেন জরুরি তার স্পষ্ট ধারণা রাখতেন। বাতুল বকতেন না।

এরপর যেন অটোমেটিক খবর আসত, কবে কোথায় কখন সুনীল কর্মকারের আসর আছে। সুযোগ পেলেই ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। সম্ভবত ২০১৯ সালের মধুমেলায় গেলাম গান শুনতে। বাবু সুনীল কর্মকার গান করবেন। স্টেজে অনেক শিল্পীর সুনীল বাবুও একজন। আয়োজক এমপি মমতাজ। তিনি গুরু বলে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পালার মাঝে মমতাজের অপ্রত্যাশিত ‘অহমিকা’ সামনে এল, বাবু সুনীল মাইক হাতে দরাজ গলায় সাবধান করলেন, ‘মমতাজ, আপনি এমপি হইতে পারেন, এই স্টেজে আপনি আমার মতোই সামান্য একজন গানের শিল্পী, এর বেশি কিছু না। সংসদ এমপি চেনে, রাষ্ট্রের পুলিশ এমপি চেনে কিন্তু জ্ঞান, সাধনা কইলাম এমপি-মন্ত্রী চেনে না। আপনার স্টেজে দাঁড়াইয়া কইলাম, কথাডা মনে রাইখেন।’

গান শেষ হওয়ার আগেই শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। আমার সঙ্গী ছিলেন কবি মামুন মিজানুর রহমান। অতৃপ্তি নিয়ে ফিরে এলাম সেদিন। এরপর জীবনের বহু বাঁকের কারণে বছরখানেক আর দেখা হলো না। ঠিক পরের বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গানকবি’ নামের একটা ব্যান্ডদল তাদের ৫ বছরপূর্তি উপলক্ষে নিয়ে এলেন বাবু সুনীল কর্মকারকে। মনটা খুশিতে ভরে উঠল। ছুটে গেলাম টিএসসির সুইমিংপুলে। সেখান থেকে শুনলাম ‘গানকবি’ গুনিজন সম্মাননা দিচ্ছেন বাবু সুনীল কর্মকারকে।

এই ঢাকাতেই অসংখ্যবার দেখা হয়েছে। প্রতিবারই তার স্বল্প কথার মুক্তা গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হয়েছি। বিশেষ করে ৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশে সাধক সুনীল কর্মকার ছিলেন প্রাণবন্ত। ডাকলেই আসতেন। বাউল ফকিরদের ওপর হামলার প্রতিবাদে তিনি ময়মনসিংহ থেকে ছুটে এলেন শহীদ মিনারে। গান করলেন, তাত্ত্বিক আলোচনা করলেন। তীব্র অসন্তোষ নিয়ে প্রতিবাদ করলেন। এসব প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি শব্দ তো আমাদের সম্পদ। আমাদের শিক্ষার স্কুল, আমাদের জ্ঞানের পাঠ। তার প্রয়াণে শুধু বিচ্ছেদ হলো এমন নয় বরং বাউল-ফকিরদের জ্ঞান ও ভাবচর্চার এই দুর্দিনে আমরা কাণ্ডারি হারালাম।

Ad 300x250

সম্পর্কিত